ইমদাদুল হক মিলনের বিশেষ লেখাঃ হরতালের বিকল্প ভাবতেই হবে

মহিলা পাগলের মতো দৌড়াতে দৌড়াতে এয়ারপোর্টে ঢুকলেন। ১০টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। সোয়া ১০টায় তাঁর ফ্লাইট। যানজটে ঘণ্টা তিনেক আটকে ছিলেন। ট্যাক্সি ক্যাবে করে আসছিলেন, ক্যাব ড্রাইভারের কিছুই করার ছিল না।
মার্চের ২০ তারিখের ঘটনা। এর আগের দুই দিন হরতাল ছিল। ঢাকা শহরের যানজট এমনিতেই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তার ওপর আগের দুই দিন হরতাল। স্বাভাবিকভাবেই সেদিনের যানজট ভয়াবহ।
মহিলাকে তাঁর গন্তব্যে যেতেই হবে। দিশাহারা ভঙ্গিতে এয়ারপোর্টে ঢুকে নির্দিষ্ট এয়ারলাইনসের কাউন্টারে এলেন। এসে দেখেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় পাসপোর্ট টিকিট ডলার ইত্যাদির হাতব্যাগটি সঙ্গে নেই। ট্যাক্সি ক্যাবেই ফেলে এসেছেন। মহিলার হার্ট অ্যাটাক করার মতো অবস্থা। তিনি আবার ছুটলেন ট্যাক্সি ক্যাবের উদ্দেশে। অবস্থা এমন, ও রকম অবস্থায় মানুষ কাঁদতেও ভুলে যায়।

ক্যাব ড্রাইভার কি থাকবে এতক্ষণ? তার ওপর ব্যাগে আছে পাসপোর্ট আর টিকিটের সঙ্গে অতগুলো নগদ ডলার!

কিন্তু আমাদের দেশে কত কত ভালো মানুষ, হৃদয়বান মানুষ এখনো আছেন! সাধারণ মানুষের মধ্যেই তাঁদের সংখ্যা বেশি। সেই মহান ক্যাব ড্রাইভার যখন দেখলেন ফ্লাইট মিস করার ভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে এয়ারপোর্টে ঢুকে গেছেন মহিলা, হাতব্যাগ ফেলে রেখে গেছেন, ড্রাইভার দাঁড়িয়ে রইলেন আগের জায়গায়, যেন ফিরে এলেই মহিলার হাতে ব্যাগটা তুলে দিতে পারেন।

মহিলা ফিরে এসে অবাক। তাঁর হাতব্যাগ নিয়ে ক্যাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ড্রাইভার। এবার মহিলার চোখে পানি এলো। গভীর কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেললেন তিনি। ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিয়ে আবার দৌড়ে ঢুকলেন এয়ারপোর্টে। কাউন্টারে পৌঁছে দেখেন কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব যাত্রী সময়মতো পৌঁছতে পেরেছিলেন, তাঁরা প্লেনে উঠে গেছেন। প্লেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। মহিলা এবার ধপ করে বসে পড়লেন। বসে অসহায় ভঙ্গিতে কাঁদতে লাগলেন।

তার পরও ওই ফ্লাইটের আরো ১০-১৫ জন কিংবা তারও বেশি যাত্রী এলেন। সবাই ফ্লাইট মিস করলেন। দুই দিন হরতালের পর মহাযানজটে মানুষগুলোর বিদেশ যাওয়ার সব পরিকল্পনা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

আমি সেদিন এয়ারপোর্টে। তাকিয়ে তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মহিলার কান্না দেখে চোখে পানি এলো।

কেন এই অবস্থা দেশের মানুষগুলোর? কেন এই হরতাল? কাদের স্বার্থে হরতাল?

আমরা এত দিন জেনেছি, রাজনীতির অর্থ হচ্ছে মানুষের কল্যাণ। মানুষের কল্যাণ হলে দেশের কল্যাণ হবে, দেশের উন্নতি-অগ্রগতি হবে। গণতন্ত্র শব্দের সহজ অর্থ `জনস্বার্থের পক্ষে কার্যকর যে ব্যবস্থা`।

এই কি কার্যকর ব্যবস্থা? হরতালের পর হরতাল দিয়ে গণতন্ত্রের চাকা চালু রাখা!
`

আজ থেকে আবার ৩৬ ঘণ্টার হরতাল। সর্বশেষ হরতাল ডাকার মধ্য দিয়ে চলতি মাসে অষ্টম ও নবম দিনের মতো হরতাল হতে যাচ্ছে দেশে। আর কোনো হরতাল না হলে স্বাধীনতার এই মাসে সব মিলিয়ে ২২টি দিনই কর্মহীন কেটে যাবে। কর্মহীনতার এই সংস্কৃতির ধারায় চলতি মাসে হরতালের ৯ দিনের সঙ্গে যোগ হচ্ছে নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি ১০ দিন। এর সঙ্গে সাধারণ ও বিশেষ সরকারি ছুটি রয়েছে তিন দিন। (`স্বাধীনতার মাসে কর্মহীন ২২ দিন`, কালের কণ্ঠ, ২৬ মার্চ)

`৩৬ ঘণ্টা হরতাল আহবান করায় দেশের ব্যবসায়ীসমাজ গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারা অক্ষুণ্ন রাখতে এ হরতাল প্রত্যাহারের জন্য ব্যবসায়ীসমাজ হরতাল আহবানকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছে...। জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবসায়ীসমাজ সব সময়ই হরতালের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।...উপর্যুপরি হরতাল ডাকার সংস্কৃতি দেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। (`ধ্বংসের মুখে অর্থনীতি`, সমকাল, ২৬ মার্চ)

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক তুহিন ওয়াদুদ লিখেছেন, "গেল হরতালের দিনে রংপুরের পার্ক মোড় এলাকায় দুজন যাত্রী বসে ছিলেন। জীর্ণ পোশাক। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। তাঁদের জিজ্ঞাসা করলাম, হরতাল কী জন্য? তাঁদের একজন বললেন, `জানি না।` আরেকজন বললেন, `মনে হয় বিরোধী দল রাজা হওয়ার জন্য`।" এক ডিম বিক্রেতাকে হরতালের কথা জিজ্ঞাসা করতেই খুব ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, `যারা হরতাল দেয়, তারা যদি কেউ এক দিন তাঁর মতো কষ্ট করে ডিম বিক্রি করে চলত, তাহলে বুঝত হরতালে কষ্টটা কী রকম। (`সংখ্যালঘু ও দিনমজুরেরা কেমন আছেন?`, প্রথম আলো, ২৬ মার্চ)

২৬ মার্চ `প্রথম আলো`র বিশাল বাংলা পাতায় একটি মন খরাপ করা ছবি ছাপা হয়েছে। রাস্তার ধারে পড়ে আছে মণকে মণ টমেটো। ছবির নিচে লেখা `বগুড়ার শাজাহানপুরের নয়মাইল হাটে গতকাল টমেটো ১০ থেকে ৬০ টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। এমন দর দেখে রাগে-দুঃখে চাষিরা মণকে মণ টমেটো রাস্তার দুই পাশে ফেলে দেন।`

এসব হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর কত দেখতে হবে?

হরতালের আগের দিন বিকেল-সন্ধ্যায় শুরু হয় গাড়ি ভাঙচুর। দাউদাউ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় গাড়ি। এ পর্যন্ত ৭০০ গাড়ি ভাঙচুর ও পোড়ানো হয়েছে। গাড়িগুলোর অপরাধ কী, দেশের মানুষ জানে না। বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে, আতঙ্কিত যাত্রীরা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করছেন। তিনজন ডাক্তার যাচ্ছেন গাড়ি করে, বোমা মারা হলো তাঁদের গাড়িতে। তিনজনই দগ্ধ হলেন। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। যাঁরা মানুষের জীবন বাঁচান, তাঁদেরই পুড়িয়ে মারার চেষ্টা।

একজন দরিদ্র রিকশাওয়ালা হরতালের দিন পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়েছেন, তাঁর রিকশায় আগুন দেওয়া হয়েছে। তরুণ অসহায় রিকশাওয়ালা ভেবেছেন, দ্রুত রিকশা চালিয়ে দিলে হাওয়ায় হয়তো আগুন নিভে যাবে। তিনি শরীরের সব শক্তি দিয়ে রিকশা ছুটিয়েছেন। এই ছবি দেখে বুক হু হু করে ওঠে।

ককটেল বিস্ফোরণে মারা যাচ্ছে শিশু। হরতালের নৈরাজ্যে মারা যাচ্ছে মানুষ, ধ্বংস হচ্ছে অসহায় মানুষের ঘরবাড়ি, রেললাইন উপড়ে ফেলা হচ্ছে, পুলিশ চালাচ্ছে গুলি, হরতালকারীরা চালাচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ। এ কোন বাংলাদেশ?

একবার আওয়ামী লীগ বলেছিল, বিরোধী দলে গেলে তারা কখনো হরতাল দেবে না। হরতালের বিকল্প বের করবে। প্রতিবাদের বিকল্প পথ তৈরি করবে। তারা তাদের কথা রাখেনি। বিরোধী দলে গিয়ে হরতালের পর হরতাল দিয়েছে। তাহলে এখনকার বিরোধী দলকে আর দোষ দিয়ে লাভ কী? দুটি দলের তো একই উদ্দেশ্য। ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা। এ কারণেই এই দুটি দল নিয়ে দেশের মানুষ বলাবলি করে, মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ।

কিন্তু এভাবে দেশ চলতে পারে না। এ অবস্থা বদলাতেই হবে। হরতালের বিকল্প খুঁজে বের করতেই হবে। দেশের দুই নেত্রীকে সমঝোতায় আসতেই হবে। পরস্পরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে দেশের জনগণকে আপনারা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত একটি অবস্থায় ঠেলে দিতে পারেন না। আমরা আপনাদের দুজনকেই, আপনাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য দলগুলোর সব রাজনৈতিক নেতাকেই দেশপ্রেমিক মনে করি। কিন্তু আপনাদের কথাবার্তা আর আচরণে আমরা হতাশ। আমাদের এই হতাশা থেকে মুক্তি দিন। দেশের মানুষের কথা ভাবুন, অর্থনীতির কথা ভাবুন, মানুষের জানমাল ও নিরাপত্তার কথা ভাবুন, উন্নয়নের কথা ভাবুন। আপনারাও নিশ্চয় জানেন হরতালে প্রতিদিনের ক্ষতি ২০০ মিলিয়ন ডলার। আমাদের মতো গরিব দেশ এই ভার বহন করে কী করে?

আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা এবার ঘটেছে। গতকাল ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসেও বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। আগুন দেওয়া হয়েছে গাড়িতে। এই ধরনের ঘটনা কখনো ঘটেনি বাংলাদেশে।

একটি প্রচলিত প্রবাদ মনে পড়ছে। `পাটা-পুতায় ঘষাঘষি, মরিচের জান যায়।` এখন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটি পাটা-পুতার ভূমিকায়। মরিচের ভূমিকায় থাকা সাধারণ মানুষের জান যাচ্ছে। কিন্তু মরিচের যে ঝালও আছে, সেটা মনে রাখতে হবে। দেশের মানুষ যদি দলমত-নির্বিশেষে এসব অরাজকতার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে উঠে দাঁড়ায়, পথে নামে, তাহলে কিন্তু পাটা-পুতা খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে।

পবিত্র কোরআনের বাণী-
`আর অশান্তি সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষাও অধিকতর জঘন্য।` (সুরা বাকারা, দ্বিতীয় পারা, ২১৫ আয়াত) (সৌজন্যে: দৈনিক কালের কণ্ঠ)

ইমদাদুল হক মিলন, সম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

No comments

Powered by Blogger.