ঈদে বাড়ি ফেরায় চরম ভোগান্তি : ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করতে গিয়ে ৭ জন নিহত by কাজী জেবেল

হাসড়কে ব্যাপক যানজট এবং রেলওয়ের সময়সূচি বিপর্যয়ের মধ্যে চরম ভোগান্তি নিয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ। ঈদে ঘরে ফেরাকে কেন্দ্র করে এবার ট্রেনের সময়সূচির বিপর্যয় ছিল নজিরবিহীন। ৭ ঘণ্টা বিলম্বেও ট্রেন ছেড়েছে। অন্যদিকে মহাসড়কে যানজটের কারণে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছতে যাত্রীদের ১০ থেকে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। এককথায় পথের দুর্ভোগ ছিল অন্তহীন।গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনাল, ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট), কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে ঈদযাত্রীদের ঢল নামে। ঘরমুখো মানুষের পদচারণায় টার্মিনালগুলো যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়।


কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যেতে সবাই ব্যাকুল। স্বস্তি নিয়ে পথ চলার যেন নেই কোনো উপায়। এসব যাত্রীর কারও হাতে, কারও কাঁধে ব্যাগ-লাগেজ। এসব ব্যাগ-লাগেজে ব্যবহারের পোশাকের পাশাপাশি স্বজনদের জন্য উপহারসামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন সবাই। সবার চোখে-মুখে ঈদের আনন্দ থাকলেও বিড়ম্বনা কম নয়। গন্তব্যে পৌঁছতে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে বাস, লঞ্চ ও ট্রেনের ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরছেন তারা। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরতে গিয়ে শুক্রবার রাতে ও গতকাল টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার দেউভোগ নামক স্থানে এবং দিনাজপুরে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও চারজন।
এদিকে খানাখন্দে ভরা সড়ক-মহাসড়কগুলোতে গতকালও ভয়াবহ যানজট ছিল। গতকাল সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ঠাকুরগাঁও যাচ্ছেন মহসীন আলীর পরিবার। বিবিসিকে তারা জানান, ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার পর ৯ ঘণ্টায় টাঙ্গাইল পৌঁছেছেন। এখনও যমুনা ব্রিজ দেখতে পাচ্ছেন না। রায়হান আক্তার রনি এমপি জানান, ঢাকা থেকে নওগাঁয় যেতে ৪/৫ ঘণ্টা লাগে। কিন্তু তিনি নিজের গাড়ি নিয়ে পৌঁছেছেন ১৪ ঘণ্টায়। যানজটে বাসের শিডিউল বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত ট্রিপ দেয়া বন্ধ রয়েছে। একই অবস্থা নৌযানের ক্ষেত্রেও। লঞ্চ মালিকরা সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত যাত্রী না নিয়ে ছাড়ছে না। এসব লঞ্চের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হলে লঞ্চ মালিকদের আকস্মিক ধর্মঘট ডাকার হুমকিতে তটস্থ বিআইডব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের কর্মকর্তারা। র্যাব-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরাও নীরব। ফলে প্রতিটি লঞ্চ ওভারলোড নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। গতকাল রাজধানীর বাস, লঞ্চ ও ট্রেন স্টেশন ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোর না হতেই রাজধানীর টার্মিনালগুলোতে ঘরমুখো মানুষের আগমন ঘটতে থাকে। সময় যতই গড়াচ্ছে, মানুষের ভিড় ততই বাড়ছে। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই তা যেন জনসমুদ্রে রূপ নেয়। যানবাহন স্বল্পতা, অধিক ভাড়া আদায়, যানজট, ট্রেন ও বাসের দেরিতে ছাড়া, অতিরিক্ত যাত্রী বহন ঘরমুখো মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। পাশাপাশি পকেটমার, অজ্ঞান ও মলম পার্টির তত্পরতা যাত্রীদের মনে উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠার সৃষ্টি করে। গতকাল সকালে গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি বাস কাউন্টারের সামনে অপেক্ষমাণ যাত্রীর ভিড়। যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ছাড়ছে না। ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত সাধারণ বাসে আগে ১১০ টাকা নেয়া হলেও গতকাল আদায় করা হয় ৩০০ টাকা। নোয়াখালী ও রামগঞ্জ পর্যন্ত আগে ২০০-২৫০ টাকা নেয়া হলেও গতকাল আদায় করা হয় ৪০০-৫০০ টাকা। এসব বাসের ছাদের ভাড়া ১০০-১৫০ টাকা নেয়া হয়। নামি-দামি বাস কোম্পানিগুলোও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। স্টার লাইনের যাত্রী জাকির হোসেন বলেন, আগে ঢাকা থেকে ফেনী ২২০ টাকা নেয়া হলেও ঈদ স্পেশালের নামে ৫০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। যাত্রীদের এসব অভিযোগের প্রমাণ মিলল গাবতলী ঈগল পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে। মজিবর রহমান পরিচয়দানকারী টিকিট বিক্রেতা জানান, ঢাকা থেকে বরিশাল আগে ৩৫০ টাকা ভাড়া নেয়া হলেও এখন ৫০০ টাকা, খুলনা ও পিরোজপুর ৪৫০ টাকার স্থলে ৫০০ টাকা, বেনাপোল ৪৫০ টাকার স্থলে ৫৫০ টাকা, সাতক্ষীরা ৪৫০ টাকার স্থলে ৫০০ টাকা নিচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেসব গাড়ি বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে—তা আসার পথে যাত্রী পাচ্ছে না। ফলে ওইসব গাড়ি খালি ফিরছে। এছাড়া পথে ও ফেরিঘাটে যানজট থাকায় গাড়ির ট্রিপ কমে গেছে। এ কারণে লোকসান পোষাতে একটু বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বেশি ভাড়া নিলেও যাত্রীর অভাব নেই। আমাদের সব টিকিট বিক্রি শেষ হওয়ার পরও টিকিটের আশায় যাত্রীরা আসছেন।
এদিকে চাপ বেশি থাকায় বিপাকে পড়েছেন রেলওয়ের আগাম টিকিট কেনা যাত্রীরা। তিস্তা এক্সপ্রেসের যাত্রী সোহেল অভিযোগ করেন, গত ২৯ অক্টোবর রাতভর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকে ৩০ অক্টোবর টিকিট পেয়েছেন। কিন্তু টিকিটবিহীন যাত্রীদের ভিড়ের কারণে গতকাল সকালে তিনি ট্রেনে উঠতে পারেননি। এদিকে যোগাযোগমন্ত্রীর আশ্বাস সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে ছাড়েনি ট্রেন। গতকালও ট্রেনের শিডিউল ভেঙে পড়ে। যাত্রীরা জানান, খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ভোর ৬টা ২০ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত তার দেখা মেলেনি। নোয়াখালীগামী উপকূল এক্সপ্রেস ছেড়েছে এক ঘণ্টা দেরি করে। এদিকে স্টেশনে ট্রেন আসা মাত্রই হুড়োহুড়ি করে যাত্রীদের উঠতে দেখা গেছে। ট্রেনের ভেতরে দাঁড়িয়ে এবং ছাদে চড়েও বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চড়তে গিয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার দেউভোগ নামক স্থানে ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও চারজন। নিহত ও আহত যাত্রীরা সবাই ঢাকা থেকে রাজশাহী যাচ্ছিলেন। টাঙ্গাইল স্টেশন মাস্টার জালাল উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, বিদ্যুতের তারের নিচের প্রটেকশন তারে লেগে হতাহতরা নিচে ছিটকে পড়েন। এতে দুজন ঘটনাস্থলে ও একজন হাসপাতালে মারা যান। রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, গতকাল তিনটি স্পেশাল ট্রেন ছেড়ে গেছে। একইভাবে দিনাজপুর যাবার পথে সান্তাহারেও ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে চারজন মারা গেছেন। রেলওয়ের মহাপরিচালক আবু তাহের জানান, ট্রেনের সময় বিপর্যয়ের বিষয়টি মেনে নেয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ এতো মানুষ ট্রেনে উঠছেন তাতে ট্রেনকে স্টেশনে বেশি সময় থাকতে হচ্ছে, ধীরে যেতে হচ্ছে।
সদরঘাটে সকাল থেকে ঘরমুখো মানুষের প্রচণ্ড ভিড় দেখা যায়। দক্ষিণাঞ্চলগামী লঞ্চগুলো অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বিআইডব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, লঞ্চগুলো যাতে ওভারলোড ও ছাদে যাত্রী বহন না করে, সেজন্য লঞ্চ মালিকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু মালিকরা সাফ জানিয়েছেন ঈদে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করবেন। এক্ষেত্রে বাধা দেয়া হলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। এতে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় তাদেরই নিতে হবে। এসব কথা শুনে তারা মালিকদের ম্যানেজ করে লঞ্চ ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এ প্রসঙ্গে লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন (যা-প) সংস্থার সহ-সভাপতি সাহাবউদ্দিন মিলন আমার দেশকে বলেন, সব যাত্রী যাতে গন্তব্যে যেতে পারেন, সেজন্যই অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হচ্ছে। মালিকরা লঞ্চের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করছেন। তিনি আরও বলেন, যাত্রী থাকাসাপেক্ষে যত প্রয়োজন, তত লঞ্চ দেয়া হবে। এতে মালিকদের লোকসান হলেও ঈদযাত্রীদের স্বার্থে তারা তা মেনে নিয়েছেন। এদিকে সদরঘাট টার্মিনালে অব্যবস্থাপনা, পকেটমারদের দৌরাত্ম্যে অনেক যাত্রী মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও জিনিসপত্র হারিয়েছেন। সদরঘাটের ইজারাদার মো. ইকবাল জানান, সদরঘাটের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কমিউনিটি পুলিশ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শুক্রবার ৩ পকেটমারকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিরোধে আমাদের নিজস্ব বাহিনী কাজ করছে।

No comments

Powered by Blogger.