পবিত্র হজ পালিত-লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক

লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলি্ল গতকাল শনিবার পবিত্র হজ পালন করেছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত 'লাব্বায়েক! আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক!' ধ্বনিতে মুখরিত ছিল আরাফাত ময়দান। মিনা থেকে ভোরে আরাফাত ময়দানে হাজির হয়ে তারা মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সরবে ঘোষণা করেন, 'লাব্বায়েক, আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লা শারিকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়াননি মাতা লাকা ওয়ালমুল্ক'। অর্থাৎ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সমগ্র সাম্রাজ্যও শুধুই তোমার।


গতকাল ফজরের নামাজের পর থেকে আরাফাত ময়দানে যান হাজিরা। এর আগে মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন তারা। সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের আরাফাত ময়দানে নেওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক যানবাহনের ব্যবস্থা করে। এবারই প্রথম মেট্রো রেলের ক্ষমতা
পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় এই ট্রেন ৭২ হাজার যাত্রী বহন করেছে। চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি এ রেলপথ মিনা, মুজদালিফা এবং আরাফাত ময়দানকে সংযুক্ত করেছে।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের সাড়ে ২৫ লাখের বেশি মুসলি্ল এ বছর হজ পালন করছেন। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৩০ হাজার বিভিন্ন দেশের, আর বাকিরা সৌদি আরবের। বাংলাদেশ থেকে এবার এক লাখেরও বেশি মুসলি্ল পবিত্র হজ পালন করতে গেছেন। মক্কার গভর্নর প্রিন্স খালেদ আল ফয়সাল বলেছেন, এবার হজ পালনকারীদের সংখ্যা গতবারের চেয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল হজের আনুষ্ঠানিকতা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
আরাফাত ময়দানে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বিদায় ভাষণ দেন। এ ময়দানে মহান আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় নবীর কাছে সর্বশেষ ওহি নাজিল করেছিলেন_ 'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে (ইসলাম) পরিপূর্ণ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম' (সুরা আল মায়িদা, আয়াত-৩)। বিদায় হজ থেকে ফেরার তিন মাস পর হজরত মোহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেন।
আরাফাত ময়দান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত চারপাশ পাহাড়ঘেরা একটি সমতল ভূমি। হাজিদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবু খাটিয়ে, কেউ খোলা জায়গায় ছাতা নিয়ে অবস্থান করেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মসজিদ 'মসজিদে নামিরাহ' থেকে সৌদি আরবের প্রধান মুফতি আবদুল আজিজ আল শাইখ বয়ান দেন ও খুতবা পাঠ করেন। অনেকে আগের রাতেই উঠে যান আরাফাত ময়দান সংলগ্ন ৭০ মিটার উঁচু 'জাবালে রহমত' তথা রহমতের পাহাড়ে। রহমতের পাহাড়ে উঠে সেখানেই তারা দিনভর আল্লাহর করুণা ও মাগফিরাত কামনা করেন।
খুতবা শেষে হাজিরা গতকাল জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন আরাফাত ময়দানে। বয়ান শুনে সূর্যাস্তের পর তারা বালু ও কঙ্করময় মুজদালিফা উপত্যকায় যান। তারা মুজদালিফায় মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করেন। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আসকার করে তারা সেখানে রাত কাটান। এখান থেকে তারা ৭০টি ছোট আকারের কঙ্কর সংগ্রহ করে আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মিনার তাঁবুতে ফিরে যাবেন। সেখান থেকে জামারাতে গিয়ে তারা শয়তানের প্রতীকী প্রতিকৃতিতে পাথর বা কঙ্কর ছুড়ে মারবেন। এর পর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাধ্যমতো পশু কোরবানি দেবেন।
এর পর হাজিরা মিনা থেকে মক্কায় ফিরে গিয়ে কাবা শরিফের চারপাশে সাত বার তাওয়াফ, জমজম কূপের পানি পান, সাফা-মারওয়াহ পাহাড় সাত বার 'সাঈ' বা প্রদক্ষিণের পর মাথার চুল ফেলে দিয়ে হজের অত্যাবশ্যকীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। মিনার কাজ শেষে মক্কায় বিদায়ী তাওয়াফ করার পর যারা মদিনায় যাননি তারা মদিনায় যাবেন। অন্যরা যার যার গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করবেন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল পরিস্থিতির আলোকে সৌদি কর্তৃপক্ষ এবার হাজিদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ১ লাখ সদস্য। এর মধ্যে আছে সাড়ে ৩ হাজার দাঙ্গা পুলিশ। অস্ত্র সজ্জিত সাড়ে চারশ' যানসহ আধুনিক যান রাস্তায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল দিচ্ছে। আকাশে চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার। হাজিদের পথ দেখাতে কাজ করছেন ১২ হাজার কর্মী। চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত আছেন চিকিৎসকসহ ২০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী।
জামারাতে শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে দুর্ঘটনায় হাজিদের মৃত্যু এড়াতে পুরনো ব্রিজ ভেঙে একমুখী বহুতল ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে হাজিরা এখন শৃঙ্খলার সঙ্গে পাথর ছুড়তে পারছেন। পাথর ছুড়তে গিয়ে ভিড়ে পদপিষ্ট হয়ে ১৯৯০ সালে ১ হাজার ৪২৬ জন, ২০০৬ সালে ৩৬ জন এবং ২০০৪ সালে ২৫১ জন হাজির মৃত্যু হয়।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেনারেল মনসুর বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, কাবাঘর সম্প্রসারণে সরকার ১০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ কাজ শেষ হলে পবিত্র কাবাঘরে একসঙ্গে ২০ লাখেরও বেশি মুসলি্ল জামাত আদায় করতে পারবেন।

No comments

Powered by Blogger.