তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা by মোহাম্মদ কায়কোবাদ



এ মাসেই আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তি। এই ৪০ বছর দেশটাকে আমরা কতটা এগিয়ে নিলাম, কতটা নিতে পারতাম তার হিসাব-নিকাশ, বিচার-বিশ্লেষণ করে শ্রেয়তর পথে, অগ্রগতির পথে ধাবিত হতে হবে। এই কলামে আমরা বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের তাত্ত্বিক পদার্থবিদদের দূরদর্শিতার সুবাদে পাকিস্তানের প্রথম কম্পিউটারটি ঢাকায় স্থাপিত হয়। কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তখনো শুরু হয়নি। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার স্নাতকেরা নিজেদের ক্ষেত্র পরিবর্তন করে কম্পিউটারকে তাঁদের বোঝা হিসেবে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তখন আইবিএম নানা বিষয়ের ছাত্রদের বুদ্ধঙ্কের পরীক্ষার মাধ্যমে স্নাতকদের বাছাই করত। তখনো মাইক্রোপ্রসেসর, মাইক্রো কম্পিউটারের যুগ আসেনি। চতুর্থ প্রজন্মের ভাষা নয়, অ্যাসেম্বলি কিংবা মেশিনের ভাষায় প্রোগ্রাম লেখার মতো দুরূহ চ্যালেঞ্জ তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন। এরপর পার্সোনাল কম্পিউটার তৈরির সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হলো—কম্পিউটার এখন শুধু বিজ্ঞানীরা নয়, সাধারণ মানুষও ব্যবহার করা শুরু করল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্নাতকোত্তর পড়ালেখা শুরু হলো। নানা বিষয়ের স্নাতক যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহারে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সখ্য অর্জন করেছেন, তাঁদের জ্ঞান-দক্ষতাকে কম্পিউটারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্পর্শে সমৃদ্ধ করার সুযোগ। এই সুযোগ যে পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করা হয়েছে, তা বলার সুযোগ নেই। অনেকেই তাঁদের আহূত জ্ঞান ও দক্ষতাকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার কষ্টিপাথরে যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেননি এবং তাতে পেশাজীবন ক্ষতিগ্রস্তও হয়নি।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সে ছাত্র ভর্তি করা হলো, তখন সারা দেশের শ্রেষ্ঠ ছাত্ররা ভর্তি হলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে, যেখানে শিক্ষকস্বল্পতা ছিল উল্লেখ করার মতো। তারপর ১০-১২ বছর বাংলাদেশের মেধাবীতম ছাত্রছাত্রীরা এই বিভাগে পড়ালেখা পছন্দ করে এসেছেন। সীমিত ভৌত অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তাঁরা যে প্রশংসনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, তার প্রমাণ পেশাজীবনে তাঁদের সাফল্য ও স্বীকৃতি। আমাদের এ বিভাগটি ইতিমধ্যে সিকি শতাব্দী পার করেছে, আমাদের স্নাতকেরা এখন রীতিমতো অভিজ্ঞ, দক্ষ, বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যেও কিন্তু অন্যান্য বিষয় থেকে আসা স্নাতকদের সংখ্যা কমেনি। তাঁরাও গণিত, পরিসংখ্যান, পদার্থবিদ্যা, ফলিত পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে এসে পেশাজীবী হচ্ছেন, চাকরিতে উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন। দেশে আমরা অনেকটা ধরেই নিয়েছি, কম্পিউটারে দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন নেই।
একসময় আমাদের দেশে ওঝা, বৈদ্যরা গ্রামে অপচিকিৎসা চালাত, মানুষ অসহায়ের মতো যেকোনো পরিণতিই মেনে নিত। এখনো তাদের উপস্থিতি আছে কিন্তু সংখ্যায় নগণ্য। এখন সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে জটিল রোগের চিকিৎসায় এমবিবিএস ডাক্তারে হবে না, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার লাগবে। বড় বড় সেতু কিংবা গগনচুম্বী ইমারত তৈরিতে যে পুরকৌশলীদের প্রয়োজন হয়, তাও আমরা জানি, সার কারখানা কিংবা সিমেন্টের কারখানায় চাই কেমিকৌশলীদের, ওকালতি করতে চাই আইনের ডিগ্রি, তবে কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হতে হলে কম্পিউটার বিজ্ঞান জানতেই হবে কিংবা ডিগ্রিধারী হতে হবে—এটা আমরা মেনে নিতে নারাজ। আবার এর সমর্থনে রয়েছে উজ্জ্বল উদাহরণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই রবিঠাকুর সাহিত্যে গোটা এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী, কবি নজরুলের সাহিত্যপ্রতিভাতেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আশীর্বাদ নেই, তবে স্বীকৃতি বিস্তর। সুতরাং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুর্বোধ্য ব্যাকরণে পিষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই, স্বশিক্ষিত হয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে চড়ে বেড়াতে পারলে ক্ষতি কী? তবে এ কথাও ঠিক, যখন-তখন যে কেউ রবিঠাকুর ও কবি নজরুল হতে পারে না। উপরন্তু তাঁদের সাহিত্যপ্রতিভার স্বীকৃতি কিন্তু পদার্থবিদ কিংবা প্রাণিবিদ্যা বিশারদ থেকে আসেনি। বাংলার অধ্যাপকেরাই তাঁদের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তাঁদের সাহিত্যপ্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন। যুগে যুগে অনেক মনীষীই এক বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করে নানা বিষয়ে অবদান রেখেছেন। হার্ভার্ড সায়মন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএ ও পিএইচডি ডিগ্রি করলেও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, কম্পিউটার বিজ্ঞানের টুরিং পুরস্কার পেয়েছেন, মনোবিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছেন, ন্যাশনাল মেডাল অব সায়েন্স পেয়েছেন। নানা বিষয়ে অত্যন্ত উঁচুমানের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছেন হাজারেরও বেশি, যার ফলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও কম্পিউটার বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে যাঁরা নানা ক্ষেত্র থেকে তথ্যপ্রযুক্তির পেশাজীবী হয়েছেন, তাঁরা কিন্তু কখনো তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেননি। তাঁদের গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও ছিল না, কারণ পদোন্নতি কিংবা লোভনীয় বেতনের তথ্যপ্রযুক্তির চাকরিদাতারা কখনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করেননি; যদিও ডিগ্রিবিহীন চিকিৎসকের চিকিৎসাসেবা তাঁরা নেবেন না, পুরকৌশলী না হলে বহুতল ভবন কিংবা বড় সেতু নির্মাণও করতে দেবেন না কিংবা গ্যাস কারখানা নির্মাণে কেমিকৌশলী ছাড়া নেবেন না।
তাও যদি তথাকথিত অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই আমাদের জাতীয় জীবনে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য মিলত, সে ক্ষেত্রেও বলা যদি অন্তত কাজটি হচ্ছে তো। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে শত উদ্যোগ নেওয়ার পরে সাফল্যের মাপকাঠি দেখাতে হয় এই খাতে কত টাকা খরচ করা গেল, তা-ই দিয়ে। ভারতের বছরের ৭০ বিলিয়ন ডলার আয়ের বিপরীতে আমাদের ৩৩ মিলিয়ন শুধু এটাই বলে, আমরা এই খাতকে যথাযথভাবে এগিয়ে নিতে পারছি না। আর এই না পারার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, এ খাতটির নেতৃত্বে তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের অভাব। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক সংস্থাগুলোর অবদান অসামান্য। তাঁরা মোটা অঙ্কের বেতন দেন আর বিশেষজ্ঞ কিংবা উপদেষ্টা হিসেবে যাঁদের রাখেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের না আছে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা, না আছে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন সংস্থায় সাক্ষাৎকারে দেখি, বিকম পাস কিন্তু ডেটাবেইস অ্যাডমিনিস্ট্রের, সিস্টেম এনালিস্ট কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ হিসেবে উচ্চ বেতনে বিদেশি কোনো সংস্থায় চাকরি করেছেন। আবার বিশেষজ্ঞ যদি বিদেশি হন, তা হলে শুধু চামড়ার গুণে কোনো প্রশ্নও করা যাচ্ছে না। একবার এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের দামি চাকরিতে এ রকম একটি অখ্যাত কলেজের বিএ পাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল। তাকে নাকি মহা উচ্চ বেতনে চাকরি দিয়ে ধন্য হয়েছিলাম আমরা, আর প্রকল্পটি যে সাফল্যের মুখ দেখেনি, তা বলাই বাহুল্য। আরেকবার আমাদের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রবাসী বাঙালির আট হাজার ডলার মাসিক বেতনের চাকরিতে নিয়োগের জন্য আবেদনকারীর পড়ার যোগ্য একটি সনদও পাওয়া গেল না। বছর পঁচিশেক আগে বিদেশি উপদেষ্টা আর বিশেষজ্ঞদের মান নিয়ে গবেষণাকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই দুর্ভাগা দেশে বিদেশি বিশেষজ্ঞ, যাঁদের আমরা উচ্চ বেতনে রেখে ধন্য, তাঁরা কিন্তু স্বীয় দেশে দুর্ভাগা—শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে তাঁরা নিজেদের দেশে চাকরি পান না, যদিও আমাদের দেশে অকল্পনীয় বেতন সুবিধাদি ভোগ করেন।
আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শদাতাদের নিয়ে যথাশিগগির সম্ভব জরিপ চালানো উচিত, তাঁদের তথ্যপ্রযুক্তির গ্রহণযোগ্য মাত্রায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে কি না। আমার অনুমান অন্তত ৯০ শতাংশের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই, যদিও আমাদের বিভাগের বয়স ২৫ পেরিয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করলে যে তথ্যপ্রযুক্তির সংশ্লিষ্ট কর্মতৎপরতায় অপারগ হবে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। যথাযোগ্য অভিজ্ঞ পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষকের অভাব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কম্পিউটার শিক্ষা মোটামুটি ভালোই চলছে। শুধু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নয়, ঢাকা, শাহজালাল কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকেরা আমাদের ডিগ্রি পাওয়ার আগেই মাইক্রোসফট গ্রহণ কিংবা ফেসবুকের মতো সুবিখ্যাত কোম্পানিতে চাকরি পাচ্ছেন। আমাদের ছাত্রদের প্রোগ্রামিং দক্ষতাও ঈর্ষণীয় স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা পরপর চৌদ্দবার এসিএমএর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্টওয়েস্ট, এআইইউবি ও নর্থ সাউথের ছেলেরাও এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছেন। আমাদের সাফল্যও প্রশংসনীয়। তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে দুই হাজার গুণ বেশি আয় করা ভারতের ছাত্রদের থেকে শ্রেয়তর সাফল্য আমরা নিয়মিতভাবে অর্জন করছি। ২০০৯ সালে আমরা আইসিপিসি চ্যালেঞ্জে রানারআপ হয়েছি, ২০০০ সালে বুয়েটের ছাত্ররা এমআইটি, হার্ভার্ড, স্টামফোর্ড বার্কলের দলগুলোকে পেছনে ফেলে একাদশ হয়েছেন। সারা পৃথিবীর লাখো ছাত্র থেকে বাছাই করে ২০০৬ সালে যে ১০০ জন ছাত্র টপকোডার প্রতিযোগিতায় নিউইয়র্কে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাতে আমাদের ইশতিয়াক আহমেদ ডলার ছিলেন। শুধু ছাত্রদের পর্যায়ে বলি কেন, আমাদের স্নাতক শাহরিয়ার মঞ্জুর অনেক বছর ধরে মর্যাদাকর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের একজন সম্মানিত বিচারক। প্রোগ্রামিং দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা আমেরিকা-কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোচিংয়ের দায়িত্বও পাচ্ছেন। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সারা দেশে আমরা এমন একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে আমাদের ছাত্ররা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা এবং জ্ঞান বৃদ্ধি করছে। সুতরাং এ রকম ভাবার কোনো অবকাশই নেই যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যতীত অন্য সব বিষয়ের জ্ঞান বিতরণেই আমরা ভালো করছি। আমাদের ছাত্ররা নিয়মিতভাবে ফুলব্রাইটের মতো মর্যাদাকর স্কলারশিপ পাচ্ছেন, পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছেন, শিক্ষকতা করছেন, নামকরা কোম্পানিগুলোতে চাকরি করছেন। স্বীকৃতিতে আমাদের শিক্ষক সম্প্রদায়ও পিছিয়ে নেই। আমাদের অধ্যাপক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক হাশেম, ড. আশিকুর রহমানের লেখা বই খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
সুতরাং বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা ঠিকমতো চলছে না, তা ভাবার কারণ নেই। বরং তথ্যপ্রযুক্তির অন্যান্য কিছুই ঠিকমতো চলছে না। আমাদের মেধাবী স্নাতকেরা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডক্টরেট করে দেশে ফিরে যখন দেখেন, ১০-১২ বছর কম্পিউটার বিজ্ঞান শিখে চর্চা করে তিনি বিশেষজ্ঞ হননি বরং যিনি এই বিজ্ঞান পড়েননি, এই বিজ্ঞানে যাঁর দক্ষতা, জ্ঞান প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি (শুধু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেই নয়, নিজের দক্ষতা, নতুন সৃষ্টি স্বীকৃত গবেষণা জার্নালে প্রকাশ করেও সেই স্বীকৃতি অর্জন করা যায়) তাঁরাই দেশের তথ্যপ্রযুক্তির বড় বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং তাঁর আহূত জ্ঞান অবহেলিত হচ্ছে, তখন তিনি আবার ঠিকই বিদেশ চলে যাচ্ছেন কোনো খারাপ চাকরি নিয়ে নয়, রীতিমতো লোভনীয় চাকরি নিয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিশেষ করে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন গোটা জাতিকে দেখাচ্ছেন, এই দুরূহ ও বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষের প্রয়োজন। নৌকা গাঁথার মিস্ত্রি দিয়ে এই বিশাল জাহাজ তৈরির কাজ করা যাবে না। সীমিত সম্পদের এ দেশে তথ্যপ্রযুক্তির জুতসই ও উদ্ভাবনী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারি, অপচয় কমাতে পারি। এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কিংবা স্বীকৃত দক্ষ মেধাবীদের দায়িত্ব দিতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কর্মকাণ্ডে ওঝা এবং হাতুড়ে ডাক্তারদের নেতৃত্বে যে সফল হবে না, তা আমাদের বিগত ২৫ বছরের নানা উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতার বর্ণহীন ফলাফলই বলে দেয়। আশা করি, ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবায়নের স্বার্থে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যথাযথ গুরুত্ব পাবে।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

No comments

Powered by Blogger.