আফগান চুক্তির জন্য পরিবেশ এত ভালো কখনোই ছিল না by এম কে ভদ্রকুমার

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন বেল্টওয়েতে প্রত্যাঘাত হয়েছে। কিন্তু তারপরও ট্রাম্পের ওভাল অফিস মঙ্গলবার যে মন্তব্য করেছে তাতে বোঝা গেছে যে তিনি প্রধানত পুলিশের দায়িত্ব পালন করার জন্য আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিনিয়োগ অব্যাহত রাখাকে মূর্খ্যতা মনে করছেন।

ট্রাম্পের সমালোচকেরা ৯/১১-এর স্মৃতি উস্কে দিয়ে তাকে ভয় পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের কথা এ প্রসঙ্গে তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, একটি খারাপ চুক্তি উগ্রবাদী ইসলামপন্থীদেরকে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে পারে। স্মার্ট হন, সময় নিন এবং আপনার জাতীয় নিরাপত্তা দলের কথা শুনুন।

গ্রাহাম পরে এক টুইটে বলেন যে তালেবান যে দাবিই জানাক না কেন যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য আমেরিকার অবশ্যই একটি সন্ত্রাসদমন বাহিনী থাকতে হবে।

এই সংশয়বাদীরা মার্কিন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা এস্টাবলিশমেন্টের অভিমত প্রতিফলিত করে আফগানিস্তানে সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখা ও সন্ত্রাসদমন অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন।

আফগান ও সেইসাথে আমেরিকানসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব গ্রুপ তালেবানের বিরুদ্ধে চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে।

অবশ্য, ভালো খবর হলো, বিষয়টি ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন। স্মার্ট রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি তার নজরদারির মধ্যেই আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি সন্ত্রাসী চক্রান্ত দানা বেঁধে ওঠুক সে ঝুঁকি তিনি নিতে পারেন না।

সেখানে আমাদের একজন সবসময় থাকবে

ফলে তিনি নিরাপদ অবস্থানে থেকেছেন এ ব্যাপার একমত হয়ে যে আফগানিস্তানে সবসময় আমাদের একজন গোয়েন্দা থাকবে, সেখানে আমাদের কেউ থাকবে। তিনি সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে কায়েমি স্বার্থেন্বেষী গ্রুপগুলো পেছনে খেলার কারণে এমনটা হচ্ছে।

মঙ্গলবার ট্রাম্প আসলে যা বলেছেন তা হলো, তালেবান যদি থাকে, তবে তারাই সব সন্ত্রাসকে আঁতুরেই বিনাশ করে দিতে পারবে।

এটিকে কথার কথা বলেই থেমে যাওয়া উচিত হবে না, বরং তালেবান-সম্পর্কে এমন মন্তব্য করার পেছনে ট্রাম্পের গভীর কোনো কারণ রয়েছে।

সম্ভবত ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো যাতে আবার আফগানিস্তানে ঘাঁটি গাড়তে না পারে, তা নিশ্চিত করার শক্তি আছে তালেবানের। এর অর্থ হলো, দোহায় চলমান শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে এমন প্রস্তাব দিতে হবে, যা তালেবান প্রত্যাখ্যান করতে না পারে।

পাকিস্তানও চায় আফগানিস্তানে একটি কৌশলগত গভীরতা সৃষ্টি করতে এবং মিশনকে সফল করতে। এ দিক থেকে নতুন একটি ম্যাট্রিক্সের আবির্ভাব ঘটেছে। তা হলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প। এর কারণে আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।

তা সত্ত্বেও ট্রাম্প সুযোগটি গ্রহণ করেননি। তিনি আরো কিছু সৈন্য ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।সেখানে উপস্থিতি রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন।

মূর্খতা

বাস্তবে কথার কথা যে আরেকটি ৯/১১ ঘটতে পারে আফগানিস্তান থেকে। যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবস্থার বিপুল উন্নতির ফলে প্রত্যন্ত, দূরের ও স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানে ষড়যন্ত্র করার মধ্যে কৌশলগত সুবিধা নেই। সম্প্রতি এই বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ফরেন পলিসি স্টাডিজের পরিচালক জন গ্লাসার।

গ্লাসার যথার্থভাবেই বলেছেন, ২০০০-০১ সময়কালের চেয়ে অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আফগানিস্তান থেকে এখন যে হুমকি আসছে তা আসছে ইসলামিক স্টেট খোরাসান বা আইএসকে নামের ছোট্ট একটি গ্রুপের কাছ থেকে।

এখন তালেবান মনে করছে আইএসকে-কে অস্তিত্বগত হুমকি মনে করছে। তারা তাদের বিরুদ্ধে লড়াইও করছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, তালেবান কখনোই আইএসকে-কে শক্তি বাড়াতে দেবে না।

পাশ্চাত্যের সহায়তা প্রয়োজন

ট্রাম্পকে দোহায় এমন কোনো প্রস্তাব দিতে হবে যা তালেবানের পক্ষে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হবে না। আর তাতে তালেবান স্বীকৃতি দেবে যে যুক্তরাষ্ট্র তার মিশন সফল করেই আফগানিস্তান ছেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ট্রাম্প কার্ড হতে পারে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পাশ্চাত্য সহায়তা ও আন্তর্জাতিক বৈধতার প্রয়োজন।

একইসাথে পাকিস্তানের সাথেও পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক রাখার প্রস্তাব দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ তালেবানের ওপর পাকিস্তানের প্রভাব বিপুল।

আবার বর্তমানে স্নায়ুযুদ্ধের মতো পরিবেশ বজায় থাকলেও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই এখন আফগানিস্তানকে স্থিতিশীল দেখতে চায়। কোনো আঞ্চলিক শক্তিই বিশৃঙ্খলা থেকে সুবিধা নিতে চায় না।

তালেবান নেতৃত্ব ও পাকিস্তানকে প্রভাবিত করার দিক থেকে চীন বেশ ভালো অবস্থায় আছে। আবার সব ইঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে, বেইজিং দোহায় শান্তি আলোচনাকে উৎসাহিতই করছে।

আবার রাশিয়া, ভারত ও ইরানের মতো দেশগুলো এখন নীরবতা অবলম্বন করছে প্রান্তিক অবস্থানের কারণে। রাশিয়া মনে করছে, তাকে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে; পাকিস্তানের মূখ্য ভূমিকাকে পছন্দ করছে না ভারত; যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অচলাবস্থা নিয়ে সমস্যায় আছে ইরান।

তবে তারা শান্তিপ্রয়াস ভণ্ডুল করতে চায়- এমনও মনে হয়নি।

আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার আকাঙ্ক্ষা

আবার অন্যান্য দেশের সাথে তালেবানেরও রয়েছে নানামাত্রিক সম্পর্ক। এমনকি ৯০-এর দশকের শেষ দিকেও তালেবান আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কামনা করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ওই সময় কাবুল সরকারের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পাকিস্তানের উপদেশ গ্রহণ করে নিত, তবে এর পরের ইতিহাস হতো সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অনেকেই হয়তো মনে করতে পারছেন না যে আমেরিকান তেল কোম্পানি ইউনোক্যালের সাথে তালেবানের সম্পর্ক ভালো ছিল। সব ইঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছে, আফগান পুনঃগঠনে ইরান, রাশিয়া বা ভারত- সবার কাছ থেকেই সহায়তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত তালেবান।

এসব কারণে সহজাত ধারণাতেই ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন যে তালেবানের সাথে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করে যুদ্ধ বন্ধ করার মতো অনুকূল সময় আগে আর কখনো আসেনি।

No comments

Powered by Blogger.