ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব by শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

জগতের সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি এবং অকৃপণ দান। ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। ভাষা আল্লাহর দান, আল্লাহ তাআলার সেরা নিয়ামত; ভাষা মনুষ্য পরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইসলাম সব ভাষাকে সম্মান করতে শেখায়; কারণ সব ভাষাই আল্লাহর দান এবং তাঁর কুদরতের নিদর্শন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা-৩০ রুম, আয়াত: ২২)।
মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল করার কারণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে, ‘ইহা আমি অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায়, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২)। আরবদের কাছে আরবি কিতাব আল-কোরআন নাজিল করা হয়েছে, কারণ তাদের মাতৃভাষা আরবি; অনারবি ভাষায় নাজিল করলে তাদের বুঝতে এবং অনুসরণ করতে অসুবিধা হতো। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন সপ্ত বর্ণে অবতীর্ণ হয়েছে, তোমরা তার যেকোনোটি পাঠ করো।’ (আবু দাউদ)। বিদায় হজের ভাষণে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (বুখারি শরিফ)। সুতরাং কোনো ভাষাকে হেয় জ্ঞান করার অবকাশ নেই, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার সুযোগ নেই এবং অবহেলা করার অধিকার নেই। কেননা, ভাষার স্রষ্টা মহান আল্লাহ। তাঁর সৃষ্টির অবমূল্যায়ন করা তাঁর প্রতি অসম্মান প্রদর্শনেরই নামান্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’ (সুরা-১৪ ইবরাহীম, আয়াত: ৪)। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: তিন কারণে তোমরা আরবিকে ভালোবাসো; যেহেতু আমি আরবি, কোরআন আরবি এবং জান্নাতের ভাষাও হবে আরবি। (বুখারি)। কিন্তু আরবি পরকালের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সব নবী-রাসুল আরবি ভাষাভাষী ছিলেন না; এমনকি সব আসমানি কিতাবও আরবি ভাষায় ছিল না। আমরা জানি, তাওরাত কিতাব ইবরানি ভাষায় হজরত মুসা (আ.)-এর ওপর নাজিল করা হয়; জাবুর কিতাব ইউনানি ভাষায় হজরত দাউদ (আ.)-এর ওপর নাজিল করা হয়; ইঞ্জিল কিতাব সুরিয়ানি ভাষায় হজরত ঈসা (আ.)-এর ওপর নাজিল করা হয় এবং সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআন আরবি ভাষায় সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি নাজিল করা হয়। শুদ্ধ ভাষা ও সুন্দর বর্ণনার প্রভাব অনস্বীকার্য। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) ছিলেন ‘আফছাহুল আরব’ তথা আরবের শ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধ ভাষী। সুতরাং বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় কথা বলা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘ওয়া ইন্না মিনাল বায়ানি লা ছিহরুন’, অর্থাৎ কিছু বর্ণনায় রয়েছে জাদুর ছোঁয়া। (আন নাহজুল বালাগাহ)। কোরআনুল করিমের বর্ণনা, ‘দয়াময় রহমান আল্লাহ! কোরআন পাঠ শেখালেন; মনুষ্য সৃজন করলেন; তাকে ভাষা বয়ান শিক্ষা দিলেন।’ (সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ১-৪)। ভাষার চর্চা করা ইবাদত। আরবি ভাষার ব্যাকরণ মুসলমানদের হাতেই রচিত হয়। অনারবরা কোরআন পড়তে সমস্যা হতো বিধায় হজরত আলী (রা.) তাঁর প্রিয় শাগরেদ হজরত আবুল আসওয়াদ দুওয়াইলি (রহ.)-কে নির্দেশনা দিয়ে আরবি ভাষাশাস্ত্র প্রণয়ন করান, যা ইলমে নাহু ও ইলমে ছরফ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে উচ্চতর ভাষাতত্ত্ব ইলমে বায়ান, ইলমে মাআনি ও ইলমে বাদি’র উন্নয়ন ঘটে; যার পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম আবদুল কাহির যুরজানি (রহ.) ও ইমাম যামাখশারি (রহ.)। সব মানুষ একই পিতা-মাতার সন্তান। সবারই পিতা বাবা আদম আলাইহিস সালাম, সবারই মাতা মা হাওয়া আলাইহাস সালাম। সাদা-কালো, লম্বা-খাটো সে তো আল্লাহর সৃষ্টি প্রকৃতির অবদান। বর্ণবৈষম্য, ভাষাবৈষম্য এবং ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক পার্থক্য মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। কোরআনুল করিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সহিত পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।’
(সুরা-৪৯ হুজুরাত, আয়াত: ১৩)। আল্লাহ তাআলা মানুষের হিদায়াতের জন্য নবী-রাসুল (আ.) পাঠিয়েছেন। সব নবী-রাসুলের ধর্ম প্রচারের প্রধান মাধ্যম ছিল দাওয়াত তথা মহাসত্যের প্রতি আহ্বান। আর এর জন্য ভাষার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি ওহি নাজিল করলেন; তাঁকে নবী ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করলেন; তাঁর প্রতি তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ করেন, তখন তিনি তাঁর ভাই হজরত হারুন (আ.)-কে নবী ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আল্লাহর কাছে আরজ করলেন; কারণ তিনি ছিলেন বাগ্মী, শুদ্ধ ও স্পষ্টভাষী সুবক্তা, আর মুসা (আ.)-এর মুখে ছিল জড়তা। মুসা (আ.) কারণ হিসেবেও বলেছেন, ‘হওয়া আফছাহু মিন্নি’, অর্থাৎ সে আমা অপেক্ষা বাকপটু। কোরআন করিমে এই বর্ণনাটি এভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, ‘মুসা (আ.) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার সিনা প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার ভাষার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। আমার জন্য একজন সাহায্যকারী বানিয়ে দিন আমার স্বজনদের মধ্য হতে; আমার ভাই হারুনকে; তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন, এবং তাকে আমার (দাওয়াতি-প্রচার) কাজের শরিকদার করুন, যাতে আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা বেশি বেশি বর্ণনা করতে পারি; এবং আপনাকে অধিক স্মরণ করতে পারি; আপনি তো আমাদের সর্বোত প্রত্যক্ষকারী।’ (সুরা-২০ ত্বহা, আয়াত: ২৫-৩৬)। সুসাহিত্যও ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী (সা.), আমি আপনার প্রতি সর্বসুন্দর কাহিনি বর্ণনা করেছি।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২)। প্রিয় নবী (সা.) নিজে স্বয়ং কাব্য করতেন। বিখ্যাত সাহাবি হজরত হাসসান বিন সাবিত (রা.) কাব্য রচনা করতেন। হজরত আয়িশা (রা.) কাব্যচর্চা করতেন। এভাবে ইসলামের সব যুগেই বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যচর্চা চলে আসছে। (তাফসিরে ইবনে কাসীর)।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক
smusmangonee@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.