দেশত্যাগের প্রবণতা বাড়তে পারে by প্রতীক বর্ধন

পুলিশের অভিযানে তামিম চৌধুরী ও এর আগে কল্যাণপুরে নয় জঙ্গির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জঙ্গি তৎপরতার রাশ অনেকটাই টেনে ধরা গেছে বলে পুলিশ মনে করছে। হয়তো সে দাবির সত্যতা রয়েছে। কিন্তু বছর খানেক ধরে জঙ্গিদের এই ধারাবাহিক হামলার প্রভাব জনমনে দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হবে। এসব হামলার কারণে বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। দেশের ভেতরেও মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তীব্র হয়েছে। এমনিতেই মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সুশাসনের অভাব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অভিবাসনের কথা সব সময়ই কম-বেশি ভাবেন। এসব ঘটনার পর তাঁরা এ ব্যাপারে আরও সিরিয়াস হয়ে উঠেছেন। তাঁদের অনেকেই হয়তো শেষমেশ চলে যাবেন। আবার সরকার ব্লগারদের নিরাপত্তার ব্যাপারে একরকম ঔদাসীন্য দেখানোয় তাঁদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন। অন্য অনেকেও এই সুযোগ নিয়েছেন বা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই অভিবাসনের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় থেকে এখানকার হিন্দু জনগোষ্ঠী পশ্চিম বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে চলে যাওয়া শুরু করে, যে ধারা এখনো শেষ হয়নি। তখন থেকে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক হামলার পর হিন্দুরা নীরবে দেশত্যাগ করে যাচ্ছে। দেশভাগের সময় পূর্ব বাংলা বা আজকের বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ,
আর এখন তা প্রায় ১১ শতাংশে নেমে এসেছে। অবশ্য বিবিএসের এই হিসাব নিয়ে বিতর্ক আছে। সব সরকারের আমলেই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু তার বিচার হয়নি। সেটা যেমন বিএনপির সরকারের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি আওয়ামী লীগের সরকারের আমলেও। এ বছরের শুরুতে যেভাবে হিন্দুধর্মাবলম্বীসহ সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে হত্যা করা হলো, তাতে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় বসে এটা টের পাওয়া না গেলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এর প্রভাব ঠিকই টের পাওয়া যাচ্ছে। হিন্দুদের দেশত্যাগের বিষয়টি রাজনৈতিক। কিন্তু এবার তার সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপির সরকার ভারতের নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী এনেছে। ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে হিন্দুসহ যেসব সংখ্যালঘু প্রাণভয়ে ভারতে যাবেন, ভারত সরকার তাঁদের প্রথমে ১০ বছরের জন্য এবং পরে স্থায়ীভাবে নাগরিকত্ব দেবে। বর্তমানে ভারতে প্রায় দুই লাখ অবৈধ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। এই আইনের কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠী আরও বিপদে পড়বে। নানা কারণে অনেকেই এই সুযোগ নিতে পারেন, কিন্তু যাঁরা নেবেন না, তাঁরা নানা বৈরী পরিবেশের সম্মুখীন হবেন। গত কয়েক বছরে দেশে নানা কারণেই ভারত-বিরোধিতা তীব্র হয়েছে, ভারত সরকারের এই পদক্ষেপে তা আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা যায়।
সেটা শেষমেশ হিন্দু-বিরোধিতায় রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের হিন্দুদেরই তার পরিণতি ভোগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের রাজনৈতিক জটিলতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুশাসনের অভাবের কারণে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে উন্নত দেশে অভিবাসনের ইচ্ছা সব সময়ই আছে। দেশের প্রায় এক কোটি লোক এখন প্রবাসী। এ পরিস্থিতিতে যাঁরা এত দিন অভিবাসনের ব্যাপারে দোটানায় ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবছেন। অভিবাসন বর্তমান যুগের খুবই আলোচিত বিষয়। সিরিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের লোকেরা দেশত্যাগ করছে বাধ্য হয়ে। যুদ্ধের কারণে সেসব দেশে এখন বসবাস করা দায় হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশের পরিস্থিতি তেমন নয়। এখানকার তরুণেরা দেশান্তরি হন মূলত উন্নত জীবনযাপনের সন্ধানে। সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার জন্য আমাদের দেশের কত তরুণ জমি বিক্রি করে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তার করুণ চিত্র আমরা দেখেছি। আবার যাঁরা অত্যন্ত মেধাবী মানুষ, তাঁদের কাজ করার সুযোগও দেশে নেই বললেই চলে। ফলে তাঁরাও অভিবাসন করতে চান। বাংলাদেশের নবীন ও শিক্ষিত লোকজনের মধ্যে অভিবাসন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যুক্তরাজ্যের গবেষক অ্যালেন ব্যাল একটি গবেষণা করেছেন, যার বঙ্গানুবাদ ত্রৈমাসিক প্রতিচিন্তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, পরিবারগুলোর শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রভৃতি কারণে উদীয়মান মধ্যবিত্ত নবীনদের মধ্যে নতুন আধুনিক জীবনাচরণের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দেশে তাদের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হচ্ছে না। বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেকেই এখন বিশ্বনাগরিক হতে চায়।
ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বেড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, গুলশানের হামলায় বিদেশি নাগরিকেরা নিহত হওয়ায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতিমধ্যে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র কার্যক্রমের মেয়াদ এক মাস বাড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া হামলার পর থেকে বিদেশিরা মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজে যাচ্ছেন না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নাগরিকদের জন্য সব জায়গাতেই নিরাপত্তা চেয়েছে। এমন হামলা আরও হলে বিদেশি বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে ব্যাহত হবে। অনেকে ব্যবসাও গুটিয়ে নিতে পারেন। সেটা হলে দেশে নতুন করে বেকারত্বের সমস্যা সৃষ্টি হবে। এমনিতেই দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। এর সঙ্গে যদি নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়, তাহলে পরিস্থিতি যে জটিল আকার ধারণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে জাপানিরা এখানে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে ইতিবাচক। তাদের এই আস্থার প্রতিদান আমাদের দিতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে অভিবাসন অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু সব ক্ষেত্রে নয়। একটি দেশের শিক্ষিত তরুণেরা যদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে হরেদরে দেশান্তরি হতে শুরু করেন, সেটা ওই দেশের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। বাংলাদেশ নানা কারণেই পৃথিবীতে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পেরেছিল, কিন্তু এসব কারণে আমাদের অর্জন ধূলিসাৎ হতে পারে। তাই তরুণদের এই হতাশা দূর করতে হবে। সে জন্য দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হবে, তাদের আশ্বস্ত করতে হবে।
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.