নগরপিতা একটু ভাববেন কি? by সজল চৌধুরী

নিউইয়র্ক শহর। একদল তরুণ স্থপতি অতি উচ্চ স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন একটি দিনের স্বপ্ন দেখছেন। ২০১২ সাল থেকে তাঁরা এই স্বপ্নকে লালন করে চলেছেন এবং সফল করার জন্য নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। শুধু এই ভেবে যে হয়তো কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা শহরের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথ কিংবা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য জায়গা অথবা পরিত্যক্ত জায়গাগুলোকে সবুজের সমারোহে ভরিয়ে দিতে পারবেন, তৈরি করতে পারবেন ‘অন্ধ ভূমিগর্ভে সূর্যের আহ্বান’ আর লোকারণ্য শহরকে দিতে পারবেন আরও কিছু নতুন সবুজকেন্দ্র, যা এত দিন মাটির নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। তরুণ প্রজন্মের এই দলটির নাম লো-লাইন। যেখানে তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মাটির নিচের জায়গাগুলোতে দিনের সূর্যালোক প্রবেশ করিয়ে সবুজ বাগান করতে।
আমাদের দেশের আজকের তরুণ প্রজন্মও কিন্তু থেমে নেই—থেমে নেই তাদের চিন্তাচেতনা। সদ্য পাস করা স্থপতি-পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, সবাই কোনো না কোনোভাবে তাঁদের নকশা করা স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবুজের সমারোহ ঘটাচ্ছেন, পরিবেশ নিয়ে চিন্তা করছেন। স্থাপনার অভ্যন্তরে তাপমাত্রা ও শক্তির অপচয় কমানোর জন্য চিন্তা করছেন, গবেষণা করছেন; এমনকি সচরাচর এমনও দেখা যাচ্ছে, আমাদের নবীন স্থপতি-পরিকল্পনাবিদদের উদ্ভাবিত নকশা দেশে-বিদেশে স্থান করে নিচ্ছে, প্রশংসিত হচ্ছে অতি উচ্চপর্যায়ে। অথচ সেদিকে কোনো প্রকার ভ্রুক্ষেপ নেই আমাদের।
এবার একটু ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়া যাক। যখন কোনো স্থাপত্য-পরিকল্পনার ছাত্রছাত্রীকে নকশা প্রণয়ন কিংবা নগর সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়া হয়—প্রথম শেখানো হয় বিন্যাস, ছন্দ, বৈচিত্র্য, ব্যাপকতা সম্পর্কে। যেমন ধরা যাক, আমাদের মানব শরীর যেখানে হাত-পা কিংবা কোনো অঙ্গ ছাড়া যেমন পরিপূর্ণ মানব শরীরের কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনি একটি পরিপূর্ণ শহরকে ভাবা যায় না—সেখানকার সবুজ প্রাচীন আর নতুনের সহাবস্থান ব্যতিরেকে। আর যেকোনো একটির অভাবই যেকোনো শহরকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পারে, যার প্রতিটির মূল্য অপরিসীম। অথচ আমাদের দেশে কিছুদিন পরপরই খবর আসে নতুন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর ধ্বংসাত্মক মনোভাবের। আজ যখন উন্নত বিশ্বের একজন গবেষক ও অধ্যাপক অনেকের ভিড়ে শুধু বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেন, স্থপতি লুই আই কানের মহান স্থাপত্যকর্ম আমাদের মহান জাতীয় সংসদ ভবনকে দেখিয়ে বলে ওঠেন, ‘এই হচ্ছে বাংলাদেশ এবং স্থপতি লুই আই কানের মহান স্থাপত্যকীর্তি, যা কিনা স্থাপত্যের গর্ব সমস্ত বিশ্বের জন্য’, তখন একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্বিত হই। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, সারা বিশ্বে যখন স্থাপত্য-পরিকল্পনা নিয়ে পড়ানো হয়, তখন বাংলাদেশের সংসদ ভবন এবং পুরোনো কিছু স্থাপত্য উদাহরণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়। দুঃখ হয় এমনি সময়ে যখন দেশের সংবাদপত্রগুলোয় শিরোনাম হয় সংসদ ভবনের চারপাশে সুউচ্চ প্রাচীর তোলার পরিকল্পনা কিংবা অপরিকল্পিত মেট্রোরেল বা নদী দখলের খবর। কিছুদিন আগে হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো এক সেমিনারে দেখানো হয়েছিল ৩০০ বছরের পুরোনো লালবাগ কেল্লার স্থাপনা। এরপর খবর পেলাম পুরোনো প্রাচীর ভেঙে সেখানে গাড়ির পার্কিং করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়, অথচ আমরা বুঝতে শিখি না এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোই নীরবে দাঁড়িয়ে আমাদের বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে। বুঝতে শিখি না দিনের পর দিন কী দিয়ে যাচ্ছে আমাদের আর বিশ্বের সামনে কী বলতে চাইছে ইট কংক্রিটের জঞ্জালে বেড়ে ওঠা এই শহরকে।
জানা গেছে, লালবাগের কেল্লার দেয়াল ভেঙে বাগান নষ্ট করে সেখানে যে পার্কিংয়ের জায়গা করা হচ্ছিল, সে কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে খোদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। বিভিন্ন সেমিনারে, সভায় প্রদর্শিত হওয়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো যখন বিশ্বের কাছে আবেগতাড়িত হয়, যখন কোনো অধ্যাপক স্থপতি-পরিকল্পনাবিদ ডেকে বলেন, ‘আমি তোমাদের বাংলাদেশ দেখতে চাই, তোমাদের স্থাপত্যগুলোকে উপলব্ধি করতে চাই’, ঠিক তখন আমাদের মাঠে নামতে হয় এসব মহামূল্যবান স্থাপত্যকে আমাদের নিজেদেরই হাত থেকে রক্ষার জন্য। আর এই লজ্জা রাখার জায়গা কোথায়? অথচ জাপানে দেখছি কী পরম মমতায় তারা রক্ষা করে চলছে সুপ্রাচীন গাছের গুঁড়ি থেকে শুরু করে শহরের প্রাচীন প্রতিটি ইট এমনকি প্রাচীন স্থাপত্যগুলোকে রক্ষার জন্য তারা তৈরি করেছে নিজস্ব কিছু আইন। কারণ, তারা জানে ও বিশ্বাস করে, মূলকে ভুলে গেলে নতুনকে বরণ করবে কীভাবে?
একটি সমুন্নত নগর গঠন করতে আসলে কী দরকার হয় প্রথম? গঠনমূলক ইচ্ছা ও সুপরিকল্পনা। আমরা অনেকেই জানি না, প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থাপত্য-পরিকল্পনা বিভাগগুলোতে ছাত্রছাত্রীরা তাদের বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে নগর স্থাপত্য এবং পরিকল্পনাকেন্দ্রিক বিভিন্ন নকশা প্রণয়ন করে থাকে, যেখানে ওই বিষয়ের অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকারা সরাসরি তত্ত্বাবধান করে থাকেন। আমাদের দেশের নগর কর্তৃপক্ষ সেসব প্রকল্প থেকে খুব সহজে অন্তত নগর উন্নয়নকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ সব ধারণা পেতে পারেন। এমনকি শ্রেণি প্রজেক্ট হিসেবেও বিশেষ বিশেষ প্রকল্প ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা যেতে পারে, সেখান থেকে আর কিছু না হলেও অকারণে অপরিকল্পিতভাবে কোনো স্থাপনা যেমন শহরের বুকে গড়ে উঠবে না, ঠিক তেমনি নির্বুদ্ধিতার জন্য সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার কোনো অংশ ভেঙে সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের মতো অপরাধ ও অপরিকল্পনার কথা মাথায়ও আসবে না। আমাদের প্রয়োজন আমাদেরই বুঝতে হবে। আর এই সত্যটি আমাদের নবনির্বাচিত নগরপিতারা বুঝতে পারবেন কি?
সজল চৌধুরী: (বর্তমানে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিউম্যান এনভায়রনমেন্টাল সিস্টেমের ওপর গবেষণারত); সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
sajal_c@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.