নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ: জিডিপির সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্যও by মহিউদ্দিন আহমদ

১৯৬৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁর ডায়েরিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ সম্পর্কে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে লেখেন, ‘ইস্ট পাকিস্তান ইজ এ বটমলেস পিট’ (পূর্ব পাকিস্তান হলো একটা তলাবিহীন পাত্র)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১ সালেই বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এ দেশকে একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ বলেছিলেন। আমাদের গণমাধ্যমে লেখা হলো তলাবিহীন ঝুড়ি (বটমলেস বাস্কেট)।
বাংলাদেশে মানুষ সাড়ে চার দশক ধরে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য। জনগণের শ্রম, মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তির জোরে দেশটা এগিয়েছে অনেক দূর। আরও অনেক দূর যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অপচয়ের অর্থনীতি এবং একে প্রশ্রয় দানকারী বাগাড়ম্বরের রাজনীতির কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারিনি।
২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে শাসক দল আওয়ামী লীগ বলেছিল, তারা ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের একটি দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একে উন্নত দেশের পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বিএনপি পাল্টাপাল্টি বলেছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তারা উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশ বানাবে। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের সরকার বহাল থাকল। ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক থেকে একটা তথ্য প্রকাশিত হলো, বাংলাদেশসহ চারটি নিম্ন আয়ের দেশ নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। খুশির খবর, এতে সন্দেহ নেই। আমাদের গণমাধ্যমে এটা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমরা একটা বড়সড় হার্ডল (বিপত্তি) পার হলাম। ভারতের সঙ্গে ক্রিকেটে জিতে আমরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছি। এর সঙ্গে আরেকটা সুসংবাদ যোগ হলো। নিঃসন্দেহে আমাদের ‘জাতীয়তাবাদ’ এতে নতুন মাত্রা পাবে।
বিশ্বসভায় গরিব-মিসকিনকে করুণার চোখে দেখা হয়। আমাদের নেতা-নেত্রীদের চালচলন মোগল বাদশাহর মতো হলেও পশ্চিমের দেশগুলোতে তাঁরা যখন যান, অনেক বলে-কয়ে, টাকাপয়সা খরচ করে গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। আমি নিজে দেখেছি, জাতিসংঘের বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে পশ্চিমের ক্ষমতাধর দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পেছনে গণমাধ্যমের কর্মীরা যেমন হুমড়ি খেয়ে পড়েন, স্বল্পোন্নত দেশের সরকারপ্রধান সম্মেলন হলের করিডর দিয়ে হেঁটে গেলে কেউ তাঁদের দিকে তাকায় না। এই অবস্থার পরিবর্তন হবে, যদি আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ভিতটা আরও মজবুত করতে পারি। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যদি আমরা ‘গ্রহীতা’র সনাতন বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৬৮ সালে অতিদরিদ্র দেশগুলোর একটা জোট তৈরি হয়েছিল। এদের বলা হয় ‘লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রি’ বা স্বল্পোন্নত দেশ। এদের মাথাপিছু আয় কম, অর্থনীতি ভঙ্গুর এবং জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত নিচু। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ‘নৈতিক দায়বদ্ধতা’ থেকে এসব অতিদরিদ্র দেশকে সহায়তা দেওয়ার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
শুরুতে এই ‘মিসকিনদের ক্লাবে’র সদস্যসংখ্যা ছিল ২৪। এই সংখ্যাটি ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে একবার ৫০-এ গিয়ে ঠেকেছিল। স্বল্পোন্নত দেশের ‘মর্যাদা’ পাওয়ার অনেকগুলো শর্তের একটা ছিল, জনসংখ্যা হতে হবে ৭৫ মিলিয়ন বা সাড়ে সাত কোটির কম। বাংলাদেশ এই শর্ত পূরণ করেনি। বাংলাদেশ নিজ আগ্রহে ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের জোটে যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন গ্রাহ্য হয় এবং তখন থেকেই বাংলাদেশের কপালে ‘স্বল্পোন্নত’ তকমা আঠার মতো লেগে আছে। ব্যাপারটা মোটেও গৌরবের নয়।
ভিয়েতনাম যখন মার্কিন সেনাবাহিনীকে দেশ থেকে হটিয়ে দিয়েছিল, তখন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। এমনকি ১৯৯০ সালেও ভিয়েতনামের মাথাপিছু আয় ছিল ১৯০ ডলার। ভিয়েতনাম স্বল্পোন্নত দেশের জোটে কখনোই যোগ দেয়নি। দেশটির মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৫২ ডলার। ষাটের দশকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে আমরা তুলনীয় ছিলাম। এখন ওই দেশে মাথাপিছু আয় ২৮ হাজার ডলার। তারা পারল, আমরা পারলাম না। কেন?
বর্তমান দশকে মাত্র দুটো দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে ‘গ্র্যাজুয়েশন’ পেয়েছে; ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মালদ্বীপ এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সামোয়া। মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় ২০১১ সালে ছিল ৭ হাজার ৪১৩ ডলার; ২০১৪ সালে সামোয়ার মাথাপিছু আয় ছিল ৪ হাজার ১৭৩ ডলার।
জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষে–মানুষে এবং অঞ্চলে– অঞ্চলে বৈষম্য কমানোর কৌশলও ঠিক করতে হবে। এটাই এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ একটা দেশের হাল-হকিকতের একমাত্র নির্ণায়ক নয়। স্বল্পোন্নত দেশের সীমান্ত পেরোতে হলে ন্যূনতম তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, দেশটির মাথাপিছু আয় হতে হবে ন্যূনতম ১ হাজার ৪৫ ডলার। আয়ের এই পরিমাণটা বছর বছর পরিবর্তিত হয়। দ্বিতীয়ত, মানবসম্পদের বিচারে দেশটি হতে হবে সবল। মানবসম্পদ ইনডেক্স নির্ধারণ করা হয় স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং বয়স্ক সাক্ষরতার কোন পর্যায়ে আছে দেশটি, তার ওপর। তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি কতটুকু তা বিবেচনা করা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা টেকসই হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় আনা।
জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নজরদারি করে তার নিজস্ব নিয়মে। তিন বছর পরপর এর পর্যালোচনা হয়। বাংলাদেশকে নিয়ে পর্যালোচনা হবে ২০১৮ সালে। ওই পরীক্ষায় টিকে গেলেও বাংলাদেশ নজরদারির মধ্যে থাকবে আরও তিন বছর। ২০২১ সালে যদি বাংলাদেশ পরীক্ষায় আবারও উতরে যায়, তাহলে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তকমাটাও মুছে ফেলতে পারবে।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব নম্বর ৬৮/এল অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সর্বশেষ যে তালিকা দেওয়া হয়েছিল, তাতে দেখা গেছে যে বিশ্বে স্বল্পোন্নত দেশ আছে ৪৮টি। এর মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশে ৩৪টি, এশিয়ায় ৯টি, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৪টি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে একটি। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল ও ইয়েমেন। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন (২০১৪) অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৯২ কোটি এবং মাথাপিছু গড় আয় ৯২৮ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ের চেয়ে একটু বেশি। কিন্তু খুব বেশি নয়। মিয়ানমারের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশ থেকে বেশি। ভুটানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের দ্বিগুণ। পূর্ব তিমুর এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মাথাপিছু আয়ও আমাদের চেয়ে বেশি। কিন্তু ওই দেশগুলো এখনো স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়ে গেছে অন্যান্য সূচকে পেছনে পড়ে থাকার কারণে। সুতরাং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সূচকে উত্তীর্ণ হওয়ার লড়াইটা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।
আমাদের রাজনৈতিক অভিভাবকেরা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছে যাব। ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। মা-বাবা ঘোষণা দিয়ে দিলেন, অমুক সালে আমার সন্তান এমএ পাস করবে। বিষয়টি অনেকটা সে রকমেরই। উন্নত (ডেভেলপড) দেশগুলোর মাথাপিছু গড় আয় ২০১১ সালে ছিল ৩৪ হাজার ১০০ ডলার। ২০১৬ সালে এটা সাড়ে ৪৬ হাজার ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুতরাং লক্ষ্যটা জানাই আছে, যেতে হবে কত দূর। এ নিয়ে এই মুহূর্তে কথার ফুলঝুরি না ছড়ানোই ভালো!
মাথাপিছু আয়ের মধ্যে অনেক ফাঁকি থেকে যায়। কথিত বিলিয়নিয়ার মুসা বিন শমসের আর আমার আয় যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ করলে আমি হব বিলিয়নিয়ার। অথচ আমি কপর্দকশূন্য। দেশের মোট জাতীয় আয় এবং সেই সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়লেই সব মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ে না। দেশে একজন কোটিপতি তৈরি হলে, তাঁর জন্য এক হাজার মানুষকে গরিব হয়ে যেতে হয়। অর্থনীতির এটাই নিয়ম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাগরে ভাসমান অভিবাসন-প্রত্যাশী মানুষের আহাজারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দারিদ্র্য কত প্রকট, কর্মসংস্থানের কী দুরবস্থা! মানুষ কতটা বেপরোয়া হলে এ রকম ঝুঁকি নেয়।
দেশজ উৎপাদন এবং জাতীয় আয়ের হিসাবে নানা রকম ফাঁকফোকর আছে। যে আয় দেখানো হয়, তা ভাগ করে দিলেই সবার পকেটে তা পৌঁছায় না। জাতীয় আয়ের হিসাবটা হয় অন্যভাবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা বোঝা যায় না। একদিকে দেশজ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। শহরে বড় বড় শপিংমল গড়ে উঠেছে। আবার জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উল্লম্ফনের খবর শুনে আহ্লাদিত হওয়ার অবকাশ নেই। আত্ম-অনুসন্ধান করারও প্রয়োজন আছে।
এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষে–মানুষে এবং অঞ্চলে–অঞ্চলে বৈষম্য কমানোর কৌশলও ঠিক করতে হবে। এটাই এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ। কোনো অযুত-নিযুত নাগরিক কমিটির ব্যানারে সরকারপ্রধানের জন্য আরেকটা ‘নাগরিক সংবর্ধনা’ আয়োজনের দরকার নেই।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক-গবেষক।
mohi2005@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.