দারিদ্র্যের মানচিত্র, না ঘুমপাড়ানি বয়ান? by জহির আহমেদ

গত ২৮ আগস্ট দাপ্তরিকভাবে আমরা ‘নতুন’ একটা মানচিত্র পেলাম, ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র’। দাতা সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি, ইউএনএফপিএ দারিদ্র্যের মানচিত্র প্রণয়নের সক্ষমতা রাখে। কিন্তু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কিংবা দরিদ্র–অধ্যুষিত জনপদ সম্পর্কে এ ধরনের নব নব আবিষ্কার আমাদের কতগুলো তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থপূর্ণ প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ দারিদ্র্যের যে মানচিত্র ও তার সম্পর্কিত সামাজিক পরিসর এবং এ–সম্পর্কিত হিসাব-নিকাশ প্রশ্নাতীত নয়। দারিদ্র্যের সূচক এবং দারিদ্র্য মাপার যে শৈলী এবং তার দ্বারা মানুষের অর্থনৈতিক যে শবব্যবচ্ছেদ পাওয়া যায়, তা বস্তুনিরপেক্ষ নয়।
গৃহস্থালিভিত্তিক আয়-ব্যয়ের জরিপের ভিত্তিতে অঞ্চলগত দারিদ্র্যের মাত্রা ও এলাকা চিহ্নিত করা হয় এই মানচিত্রে। বলা হয় যে ‘দারিদ্র্য মানচিত্র’ হচ্ছে সংখ্যাতাত্ত্বিক অনুশীলন, যার মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানিক পর্যায়ে দারিদ্র্যের মাত্রা বোঝা সম্ভব হয়। আর তাতে সরকার, সিভিল সোসাইটি ও উন্নয়ন সঙ্গীরা দারিদ্র্য নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে। ২০০৯ সালে আমরা এ ধরনের মানচিত্রের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই। পাঁচ বছরের মাথায় এখন আমরা আবার দ্বিতীয় মানচিত্র পাই, ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র’।
বৈশ্বিক পর্যায়ে একই বার্তা আমরা পাই যে ‘সর্বত্র দারিদ্র্যের হার কমছে’। এটি হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচনের কেন্দ্রীয় বয়ান, আর মহাবয়ান (গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ) হচ্ছে ‘চরম দারিদ্র্য অচিরেই বিলুপ্ত হবে’। দারিদ্র্য কমছে, কিন্তু আসলে কি তাই? দারিদ্র্য কি বিলুপ্ত হবে, বিমোচন হবে?
অনেক চিন্তকই এই আশাবাদকে ‘ভ্রান্তিবিলাস’ বলেছেন। তাঁরা হিসাব করে দেখিয়েছেন যে বৈশ্বিক দারিদ্র্য কমছে এই হিসাব ‘মিথ্যা’; এর বাস্তব চিত্র অনেক ভয়াবহ। ১৯৮১ সালের পর ১০৮ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে।
একইভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দারিদ্র্য কমছে, এমন হিসাব নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের এই বিপরীত চিত্র আমরা লক্ষ করি ঢাকায়। হাল আমলের দরিদ্রতর জনপদ হচ্ছে বরিশাল ও রংপুর। প্রতিবেদনে ২০ শতাংশের কম দরিদ্র মানুষের হারকে চিত্রিত করা হয়েছে সাদা রঙে, একেবারে হালকা কমলা দরিদ্র মানুষের শতকরা হার ২১%-২৯%, অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল কমলা ৩০%-৩৮%, আরেকটু গাঢ় কমলা ৩৭%-৪৮% এবং একেবারে গাঢ় কমলায় দরিদ্র মানুষের শতকরা হার ৪৭% ও তার থেকে বেশি (প্রথম আলো, ২৮ আগস্ট ২০১৪)।
কিন্তু সাধারণ মানুষ কি এ ধরনের মানচিত্রকে ধারণ করে? দারিদ্র্য অবস্থাকেই বা তারা কীভাবে দেখে? এ ধরনের মানচিত্রে আমজনতা ধাতস্থ নয়। তারা ভাবতে পারে আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ইহজাগতিক, পরজাগতিক—বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন পরিসরে। তৈরি হয়ে ওঠে মনোজাগতিক বাংলাদেশের মানচিত্র।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূমি পরিণত হয়েছে অঞ্চলগত বৈষম্যমূলক বর্ণিল ‘অগ্রসর’ ও ‘অনগ্রসর’ পরিসর হিসেবে। এই মানচিত্র এখন যতটা না ভূ-রাজনৈতিক, তার চেয়েও বেশি আরোপণমূলক। প্রাকৃতিক, নদীবিধৌত, সমতল, পাহাড়ি অঞ্চলের বৈচিত্র্যমুখী বিন্যাস, আধুনিক সফটওয়্যারের চাকচিক্যে বিলীন হয়ে পড়ে সাদা, ধূসর, হালকা কিংবা গাঢ় কমলায়। ভৌগোলিক মানচিত্র হয়ে পড়ে উত্তর পুঁজিবাদী প্রযুক্তির মানচিত্র। প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে একটা বার্তা আমরা লক্ষ করি। ‘এই মানচিত্রে যে তাৎপর্যপূর্ণ সত্য উদ্ঘাটিত হলো তা হচ্ছে, বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যেমন প্রকট, তেমনি এক অঞ্চলের সঙ্গে অন্য অঞ্চলের উন্নয়নের অসমতাও ঢের বেশি।’
ঢাকা বিভাগে দারিদ্র্যের হার অন্য বিভাগ থেকে বেশিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে মনে করা হচ্ছে, অন্তত মঙ্গাকবলিত ‘অনুন্নত’ এলাকার তুলনায়। ব্যাপারটা এমন যে মানুষজন নড়াচড়া করে না; দারিদ্র্য তো ওখানে থাকার কথা, ঢাকায় নয়। মনে হচ্ছে দারিদ্র্য বাংলাদেশের জেলা-উপজেলার ভৌগোলিক চৌহদ্দিতে আবদ্ধ থাকে, আর মানুষগুলো থাকে স্থির ও অনড়—তৈরি করে এমন এক অচলায়তন, যার স্বরূপ হচ্ছে দরিদ্রতা। ওই অঞ্চলগুলোর মানুষ যারা অন্য সীমানায় থাকে এবং অঢেল টাকা উপার্জন করে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভকে ক্রমাগত স্ফীত করে, তারা কোথায়? তাদের কপালে কি দারিদ্র্য রেখার ভাঁজ পড়বে না, কিংবা অবয়বে সেঁটে দেওয়া হবে না ‘মফিজ’ বা ‘অনগ্রসর’ বা অন্যতর ভিন্ন কোনো অভিধা?
স্থানিক জনগোষ্ঠীর মানুষের মননের মধ্যেই তার মানচিত্র প্রোথিত। একটা সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্য দিয়ে তারা মানচিত্রকে ভাবে। তারা ক্ষুদ্র পরিসরে, এক পরিসর থেকে আরেক পরিসরকে সম্পর্কিত করে, ভালো-খারাপ এমন মাত্রায় হয়তো তার জনপদকে বিভাজিত করে। এই মানচিত্রের ধরন সাংস্কৃতিকভাবে নির্দিষ্ট এবং এর স্বরূপ মতাদর্শগত। এই মানচিত্র তার দীর্ঘদিন বেড়ে ওঠা জনপদের মানচিত্র, যার সঙ্গে রয়েছে তার আত্মিক সম্পর্ক এবং যার ওপর তার মালিকানার স্বত্ব রয়েছে।
পরিসংখ্যানের রয়েছে একটি শক্তিশালী ভাষা। এ ভাষার মাধ্যমে পারিসংখ্যানিক তথ্য ও তথ্যবহুল যুক্তি ব্যবহৃত হয় টার্গেট জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা এবং তাদের বিশেষ পরিচিতি সেঁটে দেওয়া। যেমন ‘পাহাড়ি’, ‘আদিবাসী’, ‘অনগ্রসর’, ‘অশিক্ষিত’ ইত্যাদি। তাই সংখ্যাতত্ত্বের বিষয়টি যতটুকু না প্রতিনিধিত্বের ব্যাপার, তারও অধিক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার ইউরোপীয় উপনিবেশে সংখ্যাতত্ত্বের জ্ঞানকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র’ ঔপনিবেশিক সেই হাতিয়ারকে যতটুকু না বিদ্যাজাগতিক জ্ঞান হিসেবে নিয়েছে, তার চেয়ে বেশি বিবেচনা করেছে জনগোষ্ঠীকে কীভাবে বিভাজন, পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
কোন অঞ্চল, কতজন বা কত হারে দারিদ্র্য অবস্থা বিদ্যমান, সে প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন করা যেতে পারে, কাদের জন্য এবং কী উদ্দেশ্যে এই মানচিত্র প্রণয়ন করা হয়েছে? দুস্তর অসমতা থাকা সত্ত্বেও অঞ্চলভেদে একটি সমস্বত্ব দারিদ্র্যের ল্যান্ডস্কেপ বা ভূমি তৈরিতে কেন আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি? দারিদ্র্যের মানচিত্র প্রণয়ন ও তার সংখ্যাতত্ত্বের হিসাব-নিকাশ একধরনের সামাজিক ক্ষমতাচর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে, যা কিনা একটি রাজনৈতিক ‘সাফল্যগাথার’ দিকে আমাদের নিয়ে যায়। সে জন্য বোধ হয় আমরা আমাদের নাগরিক পরিচিতির সবুজ মানচিত্রকে বর্ণিলভাবে দেখতে শুরু করেছি। কে জানে, নিকট ভবিষ্যতে হালকা-পাতলা-গাঢ় কমলা রং আবার কার ও কোন অঞ্চলের কপালে পড়বে!
জহির আহমেদ: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।
zahmed69@hotmail.com

No comments

Powered by Blogger.