কিশোরী কন্যাদের যৌন হয়রানির কথা শুনুন by শান্ত নূরুননবী

যখন জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের গবেষণাসূত্রে আমরা বাংলাদেশের নারীদের এমনকি স্বামী কর্তৃক যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ তথ্য জেনে লজ্জিত, তখন খুলনা রেলওয়ে বালিকা গার্লস স্কুলের মেয়েরা যৌন হয়রানির বিপক্ষে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে শুরু করেছে এক অভিনব আন্দোলন।

খুলনার সংস্কৃতিকর্মী টুকুর নেতৃত্বে এই স্কুলের মেয়েরা একটি মর্মস্পর্শী নাটক মঞ্চস্থ করছে তাদের স্কুল ক্যাচমেন্টস এলাকায়। নিজেদের ও সহপাঠীদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করেই এ নাটক তৈরি হয়েছে। স্কুলের মিলনায়তনে বসে মাত্র ২০ মিনিটের এই মঞ্চনাটক দেখে শত শত দর্শকের মতো আমারও চোখ ভিজে উঠেছিল। নাটকের শুরুতে আছে প্রতীকী অন্ধকারের আবহ। কিশোরী মেয়েরা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, পথের ধারের চায়ের দোকানে বখাটেরা যৌন হয়রানি করার জন্য ওত পেতে বসে থাকে। প্রতিবেশী চাচাতো ভাই বা বন্ধুর সঙ্গে স্কুলে যেতে অস্বীকার করছে, কেননা সেও যৌন হয়রানকারী হিসেবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে কিশোরীর কাছে। প্রাইভেট শিক্ষকের রূপও কিশোরীদের কাছে হয়ে উঠেছে ভীতিকর। আমাদের কিশোরী কন্যাদের আত্মস্থ দৃষ্টির সামনে কেবলই অন্ধকার।
যদিও এসব কথা মা-বাবা ও শিক্ষকদের জানিয়ে লাভ হয় না। তাঁরা মনে করেন, এসবে কিশোরীদেরই দোষ আছে। কিশোরীরা আজকাল এমন সব পোশাক পরছে, এমনভাবে মাথা উঁচু করে চলতে শুরু করেছে যে বখাটে ছেলেরা, এমনকি বয়স্ক পুরুষেরাও যৌন হয়রানকারী হয়ে উঠতে প্ররোচিত হচ্ছে। পাড়ার মুরব্বিরাও এসব নিয়ে বলাবলি করছেন।
কিন্তু কিশোরীর যে স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে, খেলতে মন চায়, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে বাঁচতে ইচ্ছে করে জীবনের ছোট ছোট আনন্দের মধ্যে। নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে, চলতে পারে না বলে কিশোরী হতাশ হয়। অথচ ঘরেই যখন আত্মীয় পুরুষ যৌন হয়রানকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়, সে কথা কাউকে বলা যায় না। প্রথা ভেঙে মা-বাবার কাছে এ ধরনের ভীতিকর ঘটনার কথা বললেও তাঁরা বিশ্বাস করেন না অথবা অবিশ্বাস করার ভান করে চুপ করে থাকেন। কোনো কোনো কিশোরী বা কন্যাশিশু এভাবে এতটাই হতাশ হয়ে পড়ে যে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন কি মা-বাবার সামনে মেয়েটির আত্মা উপস্থিত হয়ে মনে করিয়ে দেয় না যে এ ধরনের অমানবিক মৃত্যুর জন্য দুর্ভাগা কিশোরীর মা-বাবা তাঁদের দায় এড়াতে পারেন না? শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কি আদৌ অনুতপ্ত হন কিশোরীর এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির জন্য? অনুতাপ চোখে পড়ে কি আইন প্রয়োগকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা রাষ্ট্রের অভিভাবকদের?
খুলনা রেলওয়ে গার্লস স্কুলের কিশোরীরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাদের অভিভাবকদের ৯০ শতাংশই শ্রমজীবী, জানালেন স্থানীয় কাউন্সিলর এবং এই স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে কেবল নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই যৌন হয়রানির শিকার হয়। খুলনার ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি স্কুলের শিক্ষার্থী মুন্নির বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। মুন্নিদের এক সহপাঠী ওদের স্কুলের সব মেয়ের সঙ্গেই বেপরোয়া আচরণ করছিল। মুন্নি বাবাকে বলারই সাহস পায়নি এ কথা। মাকে বলার পর মা পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধান শিক্ষককে জানাতে।
ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর সহকর্মী ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এক বাবার সেই ছেলেটিকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেও তিনি এটা করেছিলেন। তিনি বলেন, আমার শিক্ষার্থীরা আমার সন্তানের মতো। তাদের ভালোর জন্য প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে। অবশ্য ছেলেটির মা চান তার আচরণের জন্য এবং শর্ত সাপেক্ষে তার বহিষ্কারাদেশ যেন প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনা মুন্নিদের উদ্বুদ্ধ করে স্কুলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সব মেয়েদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে। এরপর মুন্নি তার পাড়ায়ও বন্ধুদের নিয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের কমিটি গঠন করেছে। প্রথম প্রথম পাড়ার লোকদের কটাক্ষ তো ছিলই, এমনকি মা-বাবাও খুব একটা উৎসাহ দেননি। এখন মুন্নিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই।
কেবল খুলনা নয়, সারা দেশেই আমাদের কিশোরী কন্যারা অনিরাপদ। একা চলার স্বাধীনতা ও সাহস তারা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। আমরাও কোনো দিন আমাদের কিশোরী কন্যাদের অন্তর্গত বিপর্যয়ের গল্প শোনার সময় করে উঠতে পারি না! আমরা দরিদ্ররা তো বটেই, এমনকি সচ্ছলরাও এ পরিস্থিতির সহজ সমাধান হিসেবে কন্যার অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াকে বিকল্প ভাবছি। ধ্বংস করছি তার শিক্ষার অধিকার, স্বপ্ন দেখার অধিকার ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত ভবিষ্যৎ রচনা করার সম্ভাবনাকে। অথচ আমরা তো ব্যস্ত থাকি কিশোরী কন্যার ভবিষ্যৎ সুখের কথা ভেবে কেবলই রোজগারের পেছনে। কিন্তু যখন দেশের দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরীকে ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে বন্দী হতে হয়, তখন সুখ ভেসে যায় সংসারের ভারে, প্রজননস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিপদগ্রস্ততায়।
মা-বাবা হওয়ার দায় অনেক। কন্যাশিশুর যৌন নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবন-দক্ষতা ও আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ জীবনের পথ রচনা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। কেবল নিজের কন্যার ভবিষ্যৎই সব নয়। দেশের সব কিশোরী কন্যার কথা শোনার সময় আমাদের থাকতে হবে। তাদের দোষ না দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কিশোরীদের যৌন হয়রানির আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে শিক্ষাব্যবস্থায় যথাযথ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্কুলগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি বেশ ঘটা করেই গঠন করা হয়েছিল। সেগুলো সক্রিয় করে তোলার ও বজায় রাখার ব্যবস্থাপনা কিংবা তদারকি কোনোটাই চোখে পড়ে না। কেন আমরা আমাদের সন্তানদের প্রতি এতটা উদাসীন? আসুন, কিশোরী কন্যার কথা শুনি, বিশ্বাস করি, পাশে থাকি।
শান্ত নূরুননবী: উন্নয়নকর্মী।
shantonabi@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.