সুইস ব্যাংকের টাকা ফিরিয়ে আনা হবে- প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুইস ব্যাংকে কার কি টাকা আছে তা দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। শুধু তাই নয়, টাকা পাচারে যারা জড়িত তাদেরও বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। গতকাল আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশকে সুইজারল্যান্ডের মতো গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশকে সুইজারল্যান্ডের মতো করে গড়ে তোলা স্বপ্ন দেখতেন। আওয়ামী লীগ দেশকে সে লক্ষ্যে  পৌঁছানোর জন্য কাজ করে চলেছে। প্রায় ৪০ মিনিট দেয়া বক্তব্যের শুরুতে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম, হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেন। আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্যের জবাবে বলেন, খালেদা জিয়ার ছেলের পাচার করা টাকা দেশে প্রথম আনতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। শুধু তারেক, কোকো নয়, সুইস ব্যাংকে কার কি টাকা আছে সেটা আমরা ফিরিয়ে আনব। তার (খালেদা জিয়া) টাকাও আছে। তিনিও ধরা খাবেন। আমি শুনলাম উনি (খালেদা জিয়া) অভিযোগ করেছেন জিয়াকে না-কি আমরা হত্যা করেছি। আমরা কেন তাকে হত্যা করবো? আপনি তখন কোথায় ছিলেন? একটা বাক্স নিয়ে আসলো আপনি বা আপনার ছেলে সেটা খুলেও দেখলেন না। নব্বই সালে গুলিস্তানের এক জনসভায় হঠাৎ স্বীকার করলেন এরশাদ আপনার স্বামীর খুনি। জিয়া মারা যাওয়ার পর এরশাদ ভাবী সাহেবের (খালেদা জিয়া) যত্ন-আত্তি করতে কোন কার্পণ্য করেননি। আমি বলি রহস্যটা কি? বেগম জিয়াকে জিজ্ঞাসা করি আপনি মদত না দিলে এরশাদ কিভাবে ক্ষমতা দখল করে? জিয়া হত্যাকা-ের পর শেখ হাসিনা বোরকা পরে সীমান্তে পালিয়ে ছিলেন- খালেদা জিয়ার এ বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তখন সিলেট গিয়েছি মাজার জিয়ারতের জন্য। বন্যায় রেললাইনে পানি ঊঠলো। তাই ঢাকা আসতে পারছিলাম না। আখাউড়ায় আটকে গেলাম। আমার সঙ্গে তখন ছিলেন সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু। আমরা ঐদিন উঠলাম ভৈরবে জিল্লুর রহমানের শ্বশুর বাড়ি। জিয়া হত্যার পরে তিনিই (শেখ হাসিনা) একমাত্র প্রথম বিবৃতি দিয়েছিলেন দাবি করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ক্যু ও জিয়া হত্যার পরে আমি একটি বিবৃতি লিখলাম। হত্যার পর এটাই ছিল প্রথম বিবৃতি। তখন আর কেউ বিবৃতি দেয়ার সাহস করেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি নেত্রী হরতাল-অবরোধ করে গাড়িতে পেট্রোল বোমা মেরে, আগুন দিয়ে নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করেছেন। তার নির্মমতা থেকে শিশু পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। খালেদা জিয়া হরতাল-অবরোধ করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণের চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আপনার স্বামী খুনি, আপনি খুনি, আপনার ছেলে খুনি, আপনার পুরো পরিবার খুনি। জনগণ অপানাদের চায় না। জনগণ দেশকে স্থিতিশীল রাখতে আওয়ামী লীগের পাশে থেকেছে। পাশে থাকবে।
 আওয়ামী লীগকে ‘হীরের টুকরো’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে যতই ভাঙা ও কাটার চেষ্টা করা হয়েছে ততই আওয়ামী লীগ রশ্মি ছড়িয়েছে। ৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর মানুষ প্রথমে উপলব্ধি করে দেশে জনগণের সরকার এসেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতির রোল মডেল। আমরা আজ পরনির্ভরশীল নই, আত্মনির্ভরশীল।
তিনি বলেন, সবাই বলেছিল পদ্মা সেতু হবে না। আমরা বলেছিলাম হবে। ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা কাজ শুরু করেছি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, খালেদা জিয়া কোনোদিনই চান না দেশের বাচ্চারা পাস করুক। কারণ উনি নিজেই তো অংক আর আরবি ছাড়া আর কোন বিষয়ে এসএসসিতে পাস করতে পারেননি। শিক্ষামন্ত্রীকে বলেছি আমাদের পাসের দেশে ৯৮ শতাংশ পাস করে। আমাদেরও সেটা হওয়া উচিত। স্বাধীনতা ও জাতির ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পলাশীর আম্রকাননে বাঙালির স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করে সে সূর্যের নবোদয় ঘটিয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্ম, প্রতিষ্ঠা, সংগ্রাম ও আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালিকে মর্যাদা দেয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ যখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই ১৫ই আগস্ট ঘটিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য আবার অস্তমিত করার ষড়যন্ত্র করা হয়। পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যাস্তে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট সেই ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পলাশীর আম্রকাননে মোনাফেক বেঈমান ছিল মীর জাফর আর বঙ্গবন্ধু হত্যা ও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত আওয়ামী লীগেরই কুলাঙ্গার খোন্দকার মোশ্‌তাক। আর তার সঙ্গে একত্রিত হয়ে গাদ্দারি করেছেন জিয়াউর রহমান। কথায় বলে যে নালে যায় সে নালে আসে। মোশ্‌তাকও টিকতে পারেনি। ষড়যন্ত্রকারী মোশ্‌তাককে সরিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেন, তিনি ১৫ই আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেন, যার মাধ্যমে ১৫ই আগস্টের খুনিদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে না এসে ভুল করেছেন। এখন বিদেশী প্রভুদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করছেন, নালিশ করছেন। এসব কান্নাকাটি বন্ধ করুন। বিদেশীরা আপনাকে ক্ষমতায় আনবে না। তাদের কাছে ধরনা দিয়ে কোন লাভ নেই। আওয়ামী লীগ বিদেশী প্রভুদের উপর নয়, দেশের মানুষের শক্তিতে বলিয়ান। আওয়ামী লীগই পারে আওয়ামী লীগই পারবে। তাই দেশের জনগণই আওয়ামী লীগকে বার বার ক্ষমতায় আনে।
সভায় উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ষড়যন্ত্র আগেও ছিল। এখনও আছে। সকল ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়া বলেছেন আমাদের হাতে রক্ত। আমাদের হাতে রক্ত নেই। রক্ত আপনার হাতে। ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আপনি মানুষ খুন করেছেন। তিনি বলেন, আপনি জিয়া হত্যার বিষয়ে আমাদের দায়ী করছেন। অথচ স্বামী হত্যার পরে আপনিই ছিলেন সবচেয়ে সুবিধাভোগী। এরশাদ হবেন রাষ্ট্রপতি। আপনি হবেন উপ-রাষ্ট্রপতি এমনই সিদ্ধান্ত ছিল আপনার। তিনি বলেন, যতই দাবি করেন তত্ত্বাবধায়ক আর ফিরে আসবে না। এটা এখন অতীত। শেখ হাসিনার অধীনেই আপনাকে আগামী নির্বাচনে আসতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করেননি। কিন্তু এখন সেজেগুজে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে হোটেলে ঠিকই দেখা করতে গেলেন। ভুল হলেও রাজনীতিতে কেউ কাউকে ক্ষমা করে না। এরশাদের কাবিন করা বিবি রওশনও এরশাদকে খাতির করেনি।
প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, আওয়ামী কোন বিশেষ স্থান থেকে জন্ম লাভ করেনি। আওয়ামী লীগ আছে। আওয়ামী লীগ থাকবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রোগ, শোক, জরা ব্যাধি উপেক্ষা করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট সাহারা খাতুন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি প্রমুখ।

No comments

Powered by Blogger.