সাহিত্যে নোবেল ২০১৩- গণকের দিন by মাসরুর আরেফিন

অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রতিবছর ঘোষিত হয় সাহিত্যে নোবেলজয়ীর নাম। এবারও সবার মনে একটাই প্রশ্ন, কে পাচ্ছেন এবার সাহিত্যে নোবেল?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলপ্রাপ্তির শততম বছরে সাহিত্যে এবারের সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী কে হতে পারেন, তা নিয়ে এক অ্যাবসার্ড লেখা লিখতে বসেছি। স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক এনরিমে ভিলা-মাতাসের (যিনি নিজেও এ বছরের সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় রয়েছেন) উপন্যাস মোন্তানো’স ম্যালাডিতে এক বড় ভাই তার পিঠাপিঠি জন্ম নেওয়া ছোট ভাইকে কাজ দেয় তাদের শৈশবে মোট কতবার দুপুরবেলায় বৃষ্টি হয়েছিল তা গুনে বের করে জানাতে যে, এ বছর বর্ষাকালে মোট কতগুলো পাখি বৃষ্টিতে ভিজে জমিদারবাড়ির পতাকাস্ট্যান্ডের পোলে বসে থাকতে আসবে তার আগাম হিসাব কষে দিতে হবে। এটা সেই ছোট ভাইয়ের জন্য যতখানি অ্যাবসার্ড এক প্রকল্প ছিল, মনে হচ্ছে, আমার এ লেখার অ্যাবসার্ডিটি তার থেকেও বেশি। সাহিত্যে নোবেলপ্রাপ্তির কোনো ভবিষ্যদ্বাণী হয় না। বেটিং এজেন্সিগুলো কিছু লেখককে প্রতিবছর ‘ফ্রন্টরানার’ বানিয়ে যে মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালায়, তা স্রেফ তাদের ব্যবসা বাড়ানোর স্বার্থেই। তার পরও মানুষ অনুমান করতে ভালোবাসে; আর তা যদি হয় ভবিষ্যদ্বাণী ধরনের অনুমান, তাহলে তো কথাই নেই। সেই ভবিষ্যদ্বাণী ধরনেরই কিছু কথা থাকছে আজকের এ লেখায়।
মূল কথায় যাওয়ার আগে জানিয়ে রাখি, নোবেল পুরস্কারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট nobelprize.org-এ গিয়ে বাঙালি হিসেবে বিরাট গর্ব বোধ করেছি এর সাহিত্য শাখার বর্তমান হোমপেজটা দেখে—সেখানে রবিঠাকুরের দারুণ এক সৌম্যকান্ত ছবি, তাঁকে নিয়ে সুন্দর এক নিবন্ধ, আর এসব কিছুর মাথায় জ্বলজ্বল করছে এক চমৎকার হেডিং: 100 years of Rabindranath Tagore’s Nobel Prize।
স্বাভাবিক যে সারা পৃথিবীর সাহিত্যমহলে, এই শেষ বেলায়, গসিপ ও বাদানুবাদ এখন তুঙ্গে। এটা পর্দার সামনের ব্যাপার। পর্দার আড়ালে আছে শক্তিশালী বড় দেশগুলোর সরকারপক্ষ থেকে লবিং, আগের নোবেল বিজয়ীদের সুপারিশ। সব মিলে মহা টান টান এক অবস্থা। অন্যদিকে ধনুকের ছিলার সেই টান টান ভাবটা আরও বাড়িয়ে চলেছে লন্ডনের ল্যাডব্রোকস নামের বিলিয়ন ডলার এক বেটিং এজেন্সি, আর সেই সঙ্গে পৃথিবীর প্রভাবশালী সাহিত্য পত্রিকাগুলো।
 ল্যাডব্রোকসের হিসাবমতে, এশীয় বাঙালি কবি রবিঠাকুরের নোবেল বিজয়ের শতবর্ষে সাহিত্যে নোবেল আবার যাচ্ছে এশিয়ায়—জাপানে। জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি তাদের বাজির দরে এগিয়ে আছেন সবচেয়ে সামনে। তাঁর পেছন পেছন আছেন আমেরিকার কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওউটস, হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক পিটার নাদাস, দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন এবং কানাডিয়ান ছোটগল্পকার অ্যালিস মুনরো। এই হচ্ছে ল্যাডব্রোকসের প্রথম পাঁচ। ছয়ে আছেন সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিস।
আসলে ল্যাডব্রোকসের তালিকায় কে আছেন আর কে নেই, তা এক মূল্যহীন বিষয়। যেমন ধরুন, ২০১১ সালে সিরিয়ার সংকটের কথা মাথায় রেখে ল্যাডব্রোকস এক নম্বরে নিয়ে এল অ্যাডোনিসকে, কিন্তু সে বছর নোবেল পেলেন সুইডিশ কবি টমাস ট্রান্সট্রোমার। আবার ১০ বছর ধরেই মুরাকামি রয়েছেন ল্যাডব্রোকস তালিকার একদম শীর্ষভাগে, কিন্তু প্রতিবছর হতাশ হতে হচ্ছে মুরাকামির ওপরে বাজি ধরা লোকদের। গত বছরের কথাই ধরুন, ল্যাডব্রোকস তালিকার শীর্ষে ছিল সেই একই নামগুলো: মুরাকামি, ফিলিপ রথ, অ্যাডোনিস, কো উন, টমাস পিনচন, ডন ডেলিল্লো প্রমুখ। কিন্তু নোবেল পেলেন এঁদের প্রত্যেকের তুলনায় অখ্যাত এক চীনা ঔপন্যাসিক মো ইয়ান। সত্য হচ্ছে, ওই তালিকার দিকে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই। বাজি ধরা নিয়ে মূল কথাটা মানুষ কেন যে সব সময়েই ভুলে যায়: বাজির দরে কেউ ওপরে আছে মানে এটা নয় যে বাজিকরেরা চাইছে সে জিতুক, তার মানে স্রেফ এটাই যে তারা চাইছে আরও আরও বেশি মানুষ ওই লোকের ওপরে বাজি ধরুক।
আপনি হয়তো এক্ষণে, দিকভ্রান্ত হয়ে, সুইডিশ অ্যাকাডেমির নীতিমালাটা একবার পড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু কী লাভ তাতে? আপনি সেখানে শুধু ভালো কিছু আদর্শিক কথাই জানবেন যে সাহিত্যে নোবেল নিয়ে কোনো ভূগোল-লিঙ্গ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ নেই; শুধু (নাকি) আছে অ্যাকাডেমি কর্তৃক আলফ্রেড নোবেলের উইলকে সম্মান করা, যেখানে নোবেল সাহেব লিখেছিলেন, সাহিত্যে নোবেল তাঁকেই দেওয়া হবে—‘যে ব্যক্তি সাহিত্যের ক্ষেত্রে আদর্শিক অভিমুখ মাথায় রেখে সবচেয়ে অসামান্য কিছু রচনা করেছেন।’ বলা বাহুল্য, এই ‘আদর্শিক অভিমুখ’ কথার মধ্যেই রয়েছে শুভ ও অশুভের বিতর্ক। অর্থাৎ বিশ্বমানবের জন্য অশুভ হয় এমন কোনো লেখাকে তাঁরা নোবেল দেবেন না; আবার লেখাটা হয়তো শুভ, কিন্তু লেখকের কাজকর্ম যদি হয় মানবতাবিরোধী, তাহলেও একই কথা।
নোবেল কমিটির বিচারকদের যুক্তিতর্কের ইতিহাস জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় আলোচ্য বছর থেকে ৫০ বছর পার হওয়ার পর। নোবেল পদকদানের পুরোনো নথিপত্র দেখেই আমরা আজকাল জানতে পারছি, কমিটি সদস্যরা মুখে যতই বলুন না কেন, বাস্তবে ভূগোলের রাজনীতি তাঁরা ঠিকই মাথায় রাখেন। সে হিসাবে গত বছরের নোবেল যেহেতু চীনে গেছে, সেহেতু এ বছর যে জাপানে মুরাকামির হাতে যাচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। একই হিসাবে, শেষ আমেরিকান নোবেল পেয়েছিলেন ১৯৯৩ সালে—ঔপন্যাসিক টনি মরিসন। অতএব, সময় এসে গেছে নতুন এক আমেরিকান লেখক-কবির। তাই টমাস পিনচন, ফিলিপ রথ ও ডন ডেলিল্লোকে কিংবা কানাডার অ্যালিস মুনরোকে এ বছর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে লিঙ্গ বিষয়েও একটা সমতা তাঁরা আনার চেষ্টা করেন মোটামুটি প্রতি ১০ বছরে একজন নারীকে নোবেল দিয়ে। শেষ নারী নোবেল বিজয়ী ২০০৯-এর হেরটা মুলার। মাঝখানে মাত্র চার বছরের ব্যবধান। অতএব, ২০১৩ জয়েস ক্যারল ওউটসের হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। আবার কবি না ঔপন্যাসিক না ছোটগল্পকার নাকি নাট্যকার—তেমন একটা সমবণ্টনের বিষয়ও রয়েছে নোবেল রাজনীতিতে। এখানে ঔপন্যাসিকদেরই জয়জয়কার, শুধু মাঝেমধ্যে আমরা দেখি কোনো কবিকে, আর ছোট গল্পকার তো বলতে গেলে আজ পর্যন্ত নোবেল বিজয়ী ১০৯ সাহিত্যিকের তালিকাতেই নেই। সেই বিচারে, হতেও পারে, ২০১৩ কানাডার অ্যালিস মুনরোর বছরই হবে। একদিকে তিনি ছোট গল্পকার, অন্যদিকে উত্তর আমেরিকার একজন; শুধু একটা বিষয়ই তাঁর বিপক্ষে যায়—মাত্র চার বছর আগেই একজন নারী নোবেল জিতেছিলেন।

বহু কিছু ঘেঁটে, নোবেল রাজনীতির ভূগোল-লিঙ্গ-সাহিত্য বিভাগবিষয়ক ‘সমতা’র অলিখিত কায়দা-কানুন সব খানিকটা আঁচ করে নিয়ে এই অনর্থক লেখা এখন বরং দ্রুত শেষ করে আনতেই মন চাইছে। অনেক ভালো কাজ হবে যদি বরং নিজের জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে একটা আপাতত অনুমানে আসতে পারি। প্রথমে আসি আমার ব্যক্তিগত চাওয়ার কথায়। আমি চাই ২০১৩-এর সাহিত্যে নোবেল যাক এ পর্যন্ত (আনুমানিক) ছয়বার মনোনয়ন পাওয়া আমাদের অতি প্রিয় ফরাসি-চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরার হাতে। কুন্ডেরার পরেই আমার ব্যক্তিগত পছন্দে আছেন আমেরিকার টমাস পিনচন, হাঙ্গেরির লাজলো ক্রাজনাহোকাই আর এ দেশে যথেষ্ট পরিচিত উমবের্তো একো। জাপানের এক নামজাদা সাহিত্য পত্রিকা তাদের এ সংখ্যার শিরোনাম করেছে ‘মুরাকামি, আপনি উমবের্তো একোকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য তৈরি হয়ে নিন।’
ব্যক্তিগত পছন্দের কথা থাক, এবার আসি যুক্তি প্রসঙ্গে। যুক্তি বলছে, এ বছরের নোবেল ২৭ বছর পরে আবার যাচ্ছে আফ্রিকায়—কেনিয়ার নুগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর হাতে। মিসরের নাগিব মাহফুজ আর দক্ষিণ আফ্রিকার জে এম কুটসিকে বাদ দিলে, সত্যিকার অর্থে শেষ কালো আফ্রিকান নোবেল বিজয়ী ছিলেন নাইজেরিয়ার ওলে সোয়িঙ্কা, সেই ১৯৮৬ সালে। একদিকে আফ্রিকার ভাগ্যে এই দীর্ঘ যতি, অন্যদিকে নুগুগি প্রথাগত ঘরানার সত্য ও সুশাসনের পক্ষের ‘মানবতাবাদী’ লেখক, আর রাজনৈতিক দর্শনেও তিনি সুইডিশ অ্যাকাডেমির পছন্দের ধাঁচের (যেমন ১৯৬০-এর দশকে তিনি ঔপনিবেশিক শাসকদের ভাষা ইংরেজি ছেড়ে নিজের গিকুয়ু ভাষায় লেখা শুরু করলেন)—এই সব মিলে যুক্তি বলছে, নুগুগিই হবেন এবারের বিজয়ী। যুক্তি আরও বলছে, ‘সিরিয়ার অগ্নিগর্ভ বর্তমানকে মাথায় রাখো হে পণ্ডিত!’ অতএব, সেই বিচারে এবারের নোবেল সিরিয়ান কবি অ্যাডোনিসের। তবে গত বছরটা তো ছিল এশিয়ার। কিন্তু কে বলেছে যে সিরিয়া এশিয়াতে? যে অর্থে মিসরকে আমরা আফ্রিকা ধরি না, সেই একই অর্থে সিরিয়া এশিয়া নয়—এরা দুই দেশই মানচিত্রে অনুপস্থিত আরব নামের এক মহাদেশের অংশ।
দেখা যাক। আমি বরং নোবেলজয়ী গ্রিক কবি অডিসিয়ুস ইলাইটিসের মতো বলি: ‘আমার মনের আশা পূর্ণ করো হে নিওবির পাহাড়/ আর কাঁদিয়ো না, যন্ত্রণা আর দিয়ো না উপহার।’ তিনি এ কথা বলেছিলেন নিওবি নামের চিরক্রন্দনরতা দেবীকে, আর আমি বলছি সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে: দয়া করে এবারে মিলান কুন্ডেরা বা টমাস পিনচনকে আর হতাশ করবেন না। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সত্যিকারের বড় মাপের, পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ার মতো সত্যিকারের অভিনব লেখক লাজলো ক্রাজনাহোকোইকে নোবেল দিয়ে বিশ্বসাহিত্যে ‘অভিনবত্ব’কে আবার সম্মান করুন, যেমনটা আপনারা করেছিলেন ১৯৮২ সালে গার্সিয়া মার্কেসকে পদকটা দিয়ে। আর তাও যদি না হয়, তাহলে আফ্রিকার কালো মানুষ নুগুগিকে এবারের নোবেলটা দিয়ে আমাদের বাদামি চামড়ার বাঙালিদের অন্তত রাজনৈতিকভাবে খুশি করুন।


No comments

Powered by Blogger.