বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন- ডেসটিনির ৬৩ কোটি টাকা বিদেশে পাচার by ফখরুল ইসলাম

পণ্য আমদানির আবরণে অর্থ পাচার করেছে বিতর্কিত ডেসটিনি গ্রুপ। হংকংয়ের নোয়েল জি. ক্যারি নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশে ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন অর্থ পাচার করেছেন।
ডেসটিনি গ্রুপের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বা ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তৈরি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।


প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শফিকুর রহমান পাটোয়ারীর কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ডেসটিনি গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এক কোটি ৯৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৯৮ ডলার মূল্যমানের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়। এসব এলসির বিপরীতে আমদানিমূল্য পরিশোধ করা হয়েছে এক কোটি ৮৫ লাখ ৩২ হাজার ৯৪৪ ডলার। এক ডলারের দর ৮০ টাকা হিসাবে মোট অর্থের পরিমাণ ১৪৮ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
প্রতিবেদনমতে, এলসিগুলোর বড় অংশের সুবিধাভোগী হংকংয়ের প্রতিষ্ঠান সফটক অনলাইন (এইচকে) লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থাপিত হয়েছে ৭৮ লাখ ৮৮ হাজার ডলার মূল্যমানের ৫৩টি এলসি, যার বিপরীতে প্রায় পুরো অর্থ, অর্থাৎ ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০৫ ডলার পরিশোধিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সম্পূর্ণ শেয়ারের মালিক সমানভাবে হংকংয়ের নাগরিক নোয়েল জি. ক্যারি ও ডেসটিনি গ্রুপের এমডি রফিকুল আমীন। নোয়েল জি. ক্যারি ডেসটিনি-২০০০-এর একজন ওভারসিজ পরিচালক ছিলেন। অর্থাৎ, ডেসটিনি গ্রুপের এই দুই ব্যক্তি নিজেরা নিজেরাই লেনদেন করেছেন। এ ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬৩ কোটি টাকা।
গত জুলাইয়ে ডেসটিনির ওপর করা এক অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনেও (প্রাথমিক প্রতিবেদন) নোয়েল জি. ক্যারির সঙ্গে রফিকুল আমীনের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। এতে বলা হয়েছিল, সফটক অনলাইন (এইচকে) লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী নোয়েল জি. ক্যারি ও ডেসটিনি-২০০০-এর ওভারসিজ পরিচালক নোয়েল জি. ক্যারি একই ব্যক্তি কি না। যদি হয়ে থাকে, তবে কী প্রক্রিয়ায় তিনি ডেসটিনির ওভারসিজের পরিচালক হয়েছেন, এ দেশে তিনি অর্থ নিয়ে এসেছেন কি না বা এ দেশ থেকে অর্থ পাঠানো হয়েছে কি না ইত্যাদি খতিয়ে দেখা হবে। এরপর দুই মাসের মাথায় বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত হয়ে এবারের প্রতিবেদনে বলেছে, দুই নোয়েল জি. ক্যারি প্রকৃতপক্ষে একই ব্যক্তি।
ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর প্রটোকল কর্মকর্তা বিশ্বনাথ গতকাল রাত সাড়ে নয়টায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্যার একটু ব্যস্ত আছেন। ব্যস্ততা সেরে কথা বলবেন। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে তাঁকে বলব।’
পণ্য আমদানির জন্য ডেসটিনি গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বেশির ভাগ এলসি খোলা হয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংকের বংশাল শাখা থেকে। হংকংয়ের পাশাপাশি ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সুইজারল্যান্ড থেকেও ডেসটিনি পণ্য আমদানি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ডেসটিনির বছরওয়ারি এলসি খোলার পরিমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৬ সালে ৬৫ হাজার ডলার, ২০০৭ সালে ছয় লাখ ২৩ হাজার, ২০০৮ সালে ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলারের পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়। আর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে তা এক লাফে আগের বছরের তিন গুণ ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার ডলার, ২০১০ সালে ৬০ লাখ ডলার, ২০১১ সালে ৬৮ লাখ ডলার এবং ২০১২ সালের অল্প দিনে দুই লাখ ১৮ হাজার ডলারের এলসি খোলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাচারের পাশাপাশি কমিশনের আবরণে অভিনব পন্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ডেসটিনি গ্রুপের পরিচালকেরা। ডেসটিনি গ্রুপভুক্ত ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মূল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডেসটিনি-২০০০, ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন ও ডেসটিনি মাল্টি পারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি—এই তিনটির নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই তিনটির সম্পদ ও অনুমোদিত মূলধনই সবচেয়ে বেশি। সমবায় অধিদপ্তরই বলেছে, তারা যে কমিশন দেওয়া-নেওয়া করেছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ছাড়া ডেসটিনি গ্রুপের পরিচালকেরা গ্রুপের এক প্রতিষ্ঠানের টাকা আরেক প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে সবাইকে বিভ্রান্ত করেছেন।
পুরো টাকাই তুলে নেওয়া হয়েছে: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩৭টি প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের নামে ৪৭২টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যার মধ্যে ২৫২টি হিসাবই বন্ধ। প্রধান তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকে জমা হয়েছে পাঁচ হাজার ১৩২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। তবে এই টাকা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার ১১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকে স্থিতি রয়েছে ১৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। নগদে তুলে নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় গেল, সে সম্পর্কে আপাতত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তুলে নেওয়া অর্থের একাংশ জমি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি কেনায় ব্যয় হয়েছে।
জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট লে. জে. (অব.) হারুন-অর-রশিদ, এমডি রফিকুল আমীন, তাঁর স্ত্রী ফারহা দীবা, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মোহাম্মদ গোফরানুল হক, ডেসটিনি-২০০০-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন, পরিচালক ও শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা মেজবাহউদ্দিন স্বপন, সাঈদ-উর-রহমান, শেখ তৈয়েবুর রহমান, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, ইরফান আহমেদ সানি, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, জামসেদ আরা চৌধুরী, ফরিদ আক্তার প্রমুখের নামে হস্তান্তরিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেসটিনি গ্রুপের উল্লিখিত প্রধান তিন প্রতিষ্ঠানের নামে জমা হওয়া অর্থ পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থাৎ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: রোটি হারবাল, রোটি ফার্মাসিউটিক্যালস, অটো স্পেস, রশিদ কৃষি খামার, প্রগতি সিস্টেমস লিমিটেড, সফটক অনলাইন (প্রাইভেট) লিমিটেড ও ডেসটিনি সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং লিমিটেড।
এ ছাড়া ব্যক্তি নামে ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ স্থানান্তরের কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১৭৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে সাঈদ-উর-রহমান, তাঁর স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রোটি হারবালের নামে। এ ছাড়া গোফরানুল হক ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৮৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, রফিকুল আমীন, তাঁর স্ত্রী ফারহা দীবা ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ৮১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাস, তাঁর স্ত্রী মিতু রানী বিশ্বাস ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাপ্পী অ্যান্ড ব্রাদার্সের নামে ৩৪ কোটি টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে।
ব্যক্তির নামেও অর্থ স্থানান্তরিত করেছে ডেসটিনি। যেমন: মেজবাহউদ্দিন স্বপনের নামে ৭৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, শেখ তৈয়েবুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী সেলিনা রহমানের নামে ৩৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, হারুন-অর-রশিদের নামে ১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, জামশেদ আরা চৌধুরী ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন ১৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, ফরিদ আক্তার সাত কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং ইরফান আহমেদ সানির নামে এক কোটি আট লাখ টাকা জমা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হিসাবের বর্তমান স্থিতি খুবই কম। কোনো কোনো হিসাবে কোনো টাকাই নেই। এসব হিসাবে অর্থ জমা হওয়ার পর বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে হারুন-অর-রশিদ ও তাঁর স্ত্রী লাইলা নাজনীন হারুনের যৌথ হিসাবে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এই টাকা স্থানান্তরিত হয়েছে তাঁদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রশিদ কৃষিখামারে। এই টাকার মধ্যে আট কোটি ৪৯ লাখ টাকা এসেছে ডেসটিনি গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত হিসাব থেকে।

No comments

Powered by Blogger.