ছাত্রলীগের কমিটি-সাবেকদেরই আধিপত্য মাঠের অর্ধশতাধিক নেতা বাদ by পাভেল হায়দার চৌধুরী

ছাত্রলীগের এবারের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটিতে শতাধিক নতুন মুখের আবির্ভাব ঘটেছে। সব মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সাবেক নেতাদের আধিপত্যই প্রতিফলিত হয়েছে। কমিটিতে ছাত্রদল ও শিবিরকর্মীদেরও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মামলার আসামি এবং টেন্ডারবাজও বাদ পড়েনি কমিটি থেকে। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা শীর্ষ প্রায় ৩০টি পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।


আর নতুন মুখের যাঁরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পেয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিজ এলাকার।
ঘোষিত ২২০ সদস্যের কমিটির অর্ধেক নেতাই অতীতে সাংগঠনিক কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একেবারেই নতুন তাঁরা। অন্যদিকে বাদ পড়েছেন অর্ধশতাধিক মাঠের ছাত্রনেতা। তাঁদের অভিযোগ, 'মাঠে' রাজনীতি না করে যাঁরা 'সিন্ডিকেট'ভুক্ত হয়ে রাজনীতি করেছেন, তাঁরাই পদ পেয়েছেন।
মাঠের নেতাদের বাদ পড়ার বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে দায়িত্বশীল বেশ কয়েকজন নেতা জানান, মাঠের পরিচিত নেতা যাঁরা, তাঁদের কারো বয়স নেই। তাই তাঁদের বাদ দিতে বাধ্য হয়েছি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের বয়স পার হয়ে গেলেও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুল হায়দার চৌধুরীর আস্থাভাজন হওয়ায় তাঁর পদ পাওয়ায় বেগ পেতে হয়নি। এদিকে বাদ পড়া মাঠের নেতা জগন্নাথ হলের উৎপল সাহা, সূর্যসেন হলের সাঈদ মজুমদার, মুহসীন হলের রেজাউল করিম পিন্টু কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের এখনো বয়স আছে। তা সত্ত্বেও তাঁরা কেন বাদ পড়েছেন তা জানেন না।
গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন : পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে মানা হয়নি গঠনতন্ত্রের বিধিবিধান। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে ১১ (ক) ধারায় বলা হয়েছে_ কেন্দ্রীয় কমিটি হবে ২০১ সদস্যের। সহসভাপতি ২১ এবং যুগ্ম সম্পাদক সাত ও সাংগঠনিক সম্পাদক হবেন সাতজন। গঠিত কমিটিতে এ ধারা লঙ্ঘন করে সহসভাপতি ৪১, যুগ্ম সম্পাদক ১০ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ১০ জন মনোনীত করা হয়েছে। কমিটিতে ১৯টি করে সম্পাদক, সহসম্পাদক ও উপসম্পাদকের পদ রয়েছে। ঘোষিত কমিটিতে চারটি সম্পাদক পদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন কমিটিতে মোট সম্পাদক পদ ২২টি। অন্যরা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ফলে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনটির ২৭তম কেন্দ্রীয় কমিটি হচ্ছে ২৫১ সদস্যের। এর মধ্যে সদস্য বাদে সম্পাদকীয় পদগুলোর ২২০ সদস্যের নাম গত সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে। গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে ২১ জন সহসভাপতির জায়গায় ৪১ জনকে পদ দেওয়া হয়েছে। যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদের সংখ্যার পাশাপাশি আরো চারটি সম্পাদকীয় পদ বাড়ানো হয়েছে। এগুলো হলো যথাক্রমে_মানবসম্পদ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল শিক্ষা গণযোগাযোগবিষয়ক সম্পাদকের পদ। একইভাবে গঠনতন্ত্র সংশোধন বা বিশেষ বর্ধিত সভা ছাড়াই চারটি সম্পাদক পদ বাড়ানো হয়েছে। বিভাগীয় সম্পাদকের সঙ্গে একজন করে উপসম্পাদক রাখার নিয়ম থাকলেও তিন থেকে ১০ জনকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ছাত্রলীগের এবারের কমিটিতে যাঁরা নেতা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের সবাই প্রকৃত ছাত্র। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে এমন কমিটি উপহার দিতে পারায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রের একটু ব্যত্যয় ঘটলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি তা সংশোধন করে নেবে।
গত ১০-১১ জুলাই ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ সভাপতি ও সিদ্দিকী নাজমুল আলম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সম্মেলনের চার মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হলো।
ছাত্রলীগের রীতি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করেন নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এবার তাঁর ব্যত্যয় ঘটিয়ে বর্তমান শীর্ষ দুই নেতা পাশাপাশি সদ্য বিদায়ী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কমিটি অনুমোদনে স্বাক্ষর করেছেন।
সিন্ডিকেটের আধিপত্য : জাতীয় সম্মেলনের কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার নিয়ম থাকলেও এবার তা হয়নি। দীর্ঘ চার মাস পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেলেন কর্মীরা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের একটি সিন্ডিকেটের আধিপত্য এ বিলম্বের কারণ। শেষ পর্যন্ত তাঁদের তৈরি তালিকা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে বাধ্য হয়েছেন নতুন নির্বাচিত নেতারা।
জানা গেছে, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত সিকদার ও সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাইফুজ্জামান শিখর পদপ্রত্যাশী মাঠপর্যায়ের নেতাদের নামের তালিকা তৈরি করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দিয়েছেন। বেশি আধিপত্য বিস্তার করেছেন সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন ও সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনও। ছাত্রলীগের নতুন কমিটিতে নিজেদের আস্থাভাজনদের পদ দিতে অন্তরালে কাজ করছেন সরকারদলীয় বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতা। অভিযোগ উঠেছে, সরকার ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে এবং মাঠে মিছিল সমাবেশ না করেও কমিটিতে স্থান পেয়েছেন অনেকে। সাবেক প্রভাবশালী নেতাদের আস্থাভাজন হয়ে ও বর্তমান নেতাদের বিভিন্নভাবে খুশি করে কমিটিতে ঠাঁই করে নিয়েছেন তাঁরা।
এসব বিষয়ে মাহমুদ হাসান রিপন বলেন, নতুন নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কমিটি গঠনের কাজে তিনি সহযোগিতা করেছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে কিছু করেননি।
অসংখ্য নতুন মুখ : ঘোষিত ২২০ সদস্যের কমিটির অর্ধেক নেতাই আগে কোনো কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেননি। ছাত্র রাজনীতিতে একেবারে নতুন হলেও পেয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পদ। সহসভাপতি থেকে শুরু করে বিভাগীয় সম্পাদক, উপসম্পাদক, সহসম্পাদক পদে নতুন মুখের ছড়াছড়ি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে। তাঁরা হলেন_সহসভাপতি উত্তম দাস, মাসুদ হাসান তুর্ণ, উপপ্রচার সম্পাদক দেবপ্রত দাস দেবু, উপদপ্তর সম্পাদক সুমন কুণ্ডু, রাশেদুজ্জামান, ক্রীড়া সম্পাদক মতিউর রহমান অপু, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক সম্পাদক মো. জাবেদ, উপবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক সম্পাদক এস এম রহিম তুহিন, আসাদুজ্জামান রনো, মাজহারুল হক, কাজী মেহেদী হাসান দীপু, নেছার উদ্দিন তপু, আসিফ জামান রুপম, রকি খান, জহিরুল আলম মামুন। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন আতাউল করিম আরবী, উপস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক সম্পাদক ডা. উজ্জ্বল, ডা. চয়ন, সুনীল চন্দ্র দাস।
অন্যদিকে বিতর্কিত হলেও সিন্ডিকেটের আশীর্বাদ নিয়ে যাঁরা কমিটিতে বিভিন্ন পদে স্থান পেয়েছেন তাঁরা হলেন_মো. আলী আশরাফ, ওয়াসিম উদ্দিন, দেবব্রত দাস দেবু, এরশাদুর রহমান, মহিউদ্দিন, নুরন্নবী সোহাগ, সাজ্জাদ, নিউটন দাস, আফরিন নুসরাত, আরিফ শাহরুখ মিরাজ, শেখ রাসেল, শরীয়তউল্যাহ লিটন, তরিকুল ইসলাম, মিরাজ, রুমি, জয়দেব নন্দী, শওকত, সৈকত প্রমুখ।
মাঠে থেকেও বাদ পড়লেন যাঁরা :
সূর্যসেন হলের সভাপতি সাঈদ মজুমদার, সূর্যসেন হলের জিয়াউল হায়দার তুহিন, বঙ্গবন্ধু হলের শরীফুল আলম তানভীর, জগন্নাথ হলের উৎপল সাহা, রেজাউল করিম পিন্টু, হাসানুর রশীদ মাকসুদ প্রমুখ।

No comments

Powered by Blogger.