বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী বার্তা বয়ে আনবে -জলবায়ু সম্মেলন by আসাদউল্লাহ খান

বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ধনী ও গরিব সব দেশই এক কঠিন সমস্যা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অবস্থা এমন একপর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, বিশ্বের নীতিনির্ধারক মহল এ সর্বজনীন সমস্যা মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে আগামী ১০ বছরের আগেই দেশগুলো একে অপরের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংঘাত, এমনকি যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়বে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আঘাতটা আসবে প্রকৃতি এবং পরিবেশ থেকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চল নিমজ্জন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ফসলহানি ও ঘরবাড়ি নষ্ট হওয়ায় উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে, যা সামাল দেওয়া দুর্ভোগকবলিত দেশগুলোর সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আগামী ডিসেম্বর মাসে কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সামনে রেখে কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি টিম ফ্লানারি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বিশ্ব নেতারা কার্বন নির্গমনের ব্যাপারে যদি একটা সঠিক এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তাহলে সমগ্র বিশ্বের জন্য তা বয়ে আনবে এক অশনিসংকেত।
বিগত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে প্রায় ১০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কার্বন নির্গমনের যে হিসাব তিনি পেয়েছেন, তা একদিকে যেমন ভারসাম্যহীন, তেমনি অচিন্তনীয়। তাঁর কাছে বিশ্ব নেতাদের সবুজ সভ্যতা গড়ার আকুল আকুতি আসছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবন ওলট-পালট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সাগরের উপকূলে অবস্থিত দেশগুলো। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চলের বরফের চাঁইগুলো গলে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ৫০ কোটি মানুষ মারাত্মক পানিসংকটের মুখোমুখি হতে পারে। উত্তর চীনের বিরাট অংশ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। সাগরের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে তাতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মাইক্রোনেশিয়ার ক্ষুদ্র দ্বীপাঞ্চল বেষ্টিত দেশটি সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। দুঃসংবাদ এসেছে মৌরিতাস থেকে। সেখানকার জেলেরা বলছে, উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তারা গভীর সমুদ্রে টুনা মাছ ধরতে পারছে না। মারাত্মক শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গত বছর পেরুর জাতীয় আয় ৪.৫ শতাংশ কমে গেছে। ২০০৮ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত ৮০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এক সম্মেলনে পেরুর প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলে এই ভঙ্গুর পৃথিবী নামের গ্রহের কথা উল্লেখ করে যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা একে ধ্বংস করতে পারি, নয় তো পারি বাঁচাতে।’
বিশ্বের জন্য দুঃসংবাদ হলো, ২০০৭ সাল থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের দিক থেকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েরই কার্বন নিঃসরণের মাত্রা এখন ২০ শতাংশ, বাকি বিশ্বের ৪৯ শতাংশ, রাশিয়া ৫.৭ শতাংশ, ভারত ৪.৫ শতাংশ, জাপান ৪.৩ শতাংশ, জার্মানি সর্বনিম্ন ২.৯ শতাংশ। দুঃসংবাদ আমেরিকার দিক থেকেও আসছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে সবুজ শতাব্দীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ১৫০টি কয়লাচালিত বিদ্যুত্ স্থাপনা তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে খবরে জানা গেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বিদ্যুত্ স্থাপনাগুলোর কয়েকটাও যদি স্থাপিত হয়, তাহলে গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ আরও অনেক বেড়ে যাবে এবং তা শুধু আমেরিকার পরিবেশের জন্য যে হুমকি হবে তা নয়, এই বিশ্ব নামের গ্রহটি বসবাসের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে।
এ মাসে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিতব্য জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্ব নেতাদের সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বলার অপেক্ষা রাখে না একটি পরিবেশবান্ধব পৃথিবী তথা সবুজ পৃথিবী অর্থাত্ দূষণমুক্ত শিল্প-কারখানা, বিদ্যুত্শক্তি, পরিবহনব্যবস্থা এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণ করার উদ্যোগ আগেও গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে দূষণে ভারাক্রান্ত বিশ্বে এই প্রচেষ্টা অপরিসীম গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্ববাসী আশা করে, কোপেনহেগেনের এই সম্মেলন থেকে একটি আস্থার জগতে ফিরে আসার পথপরিক্রমা শুরু হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, সীমিত সম্পদের এই পৃথিবীতে প্রায় ৬৫০ কোটি মানুষ বাস করছে। খাবারদাবার, শস্য, বনজ, প্রাণিজ, এমনকি খনিজ যেসব বস্তু মানুষ এই পৃথিবী থেকে ১২ মাসে আহরণ করছে, তা পূরণ হতে সময় লাগে ১৪.৪ মাস। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন কিংবা দুর্বিপাকে মুক্ত জীবনযাত্রা চালানোর অর্থ হলো, আসলটা এই ভেবে খেয়ে না ফেলে জীবনের পাথেয় থেকে পাওয়া আসলের মুনাফার ওপর ভিত্তি করে চলা।
এই টেকসই জীবনযাত্রা কিংবা উন্নয়নের পথের প্রথম সিঁড়ি হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক। আমাদের দেশ এক বছরে যতটা খাদ্যশস্য উত্পাদন করবে, তা খরচ করার পর হাতে যেন কিছুটা উদ্বৃত্ত থাকে অনিশ্চিত সমস্যা যথা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, খরা, প্লাবন, ফসলহানি এবং অজানা দুর্বিপাক মোকাবিলা করার জন্য। এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেরই হাতে এমন নগদ উদ্বৃত্ত তো নেই, উপরন্তু নিরন্তর সংকট এবং মারাত্মক ঘাটতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও), ইউএনডিপি এবং ইউনিসেফের জরিপ প্রতিবেদন থেকে সম্প্রতি জানা গেছে, বর্তমান অবস্থায় পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনাহারের মুখোমুখি হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশ্বের ২০০ কোটি জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই সংখ্যার মধ্যে ৮০ কোটি এবং আরও সূক্ষ্ম হিসাবে ৩০ কোটি শিশু জন্মগতভাবে অপুষ্টির শিকার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সীমিত জমিতে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে হবে এবং সেজন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত সেচ, সার, এমনকি নিরাপদ জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের উত্পাদন বাড়ানো। সম্প্রতি উগান্ডার জাতীয় কৃষি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই দেশ গবেষণার মাধ্যমে পোকামাকড় এবং রোগসহিষ্ণু শস্যবীজ উদ্ভাবন করেছে। এই বীজে নাইট্রোজেনের ঘাটতি আছে এমন মাটিতেও চাষ করে ভালো ফসল পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থা লবণসহিষ্ণু এবং নিমজ্জনপ্রবণ এলাকায় চাষযোগ্য ধানের বীজ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো এখন মাঠপর্যায়ে এনে পরীক্ষা করে চাষ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আজ অনেকগুলো সমস্যা এবং সংকটের আবর্তে আটকে গিয়ে মুক্তির পথ খুঁজছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সংকট উত্তরণের ব্যাপারে যতটা কথা বলছে, মাঠপর্যায়ে তার সিকি ভাগও কাজ হচ্ছে না। সিডর ও আইলার আঘাত সহ্য করে যে মানুষগুলো বেঁচে আছে, তাদের অবস্থা দেখে এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, অথচ এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই। সাগরের উপকূলে প্রায় চার কোটি লোক বাস করছে প্রতিনিয়ত ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে হিমালয় এবং মেরু অঞ্চলে বরফের চাঁই গলে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সাগরের কাছাকাছি নিম্ন উচ্চতায় লোকালয়ের অবস্থান, বিশাল প্লাবনভূমি, সাইক্লোন, সিডর, আইলা এবং জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ বাস্তুভিটা ত্যাগ করে নতুন আশ্রয় এবং জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। বেসরকারি এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের আঘাতে বরগুনা, পটুয়াখালী, কাউখালী, পিরোজপুর, সাউথখালী এবং বাগেরহাটের বলেশ্বর প্রভৃতি এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ বছরের মে মাসে একই কারণে আইলার শিকার হয়েছে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার সাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ প্রভৃতি অঞ্চল। সুন্দরবনের অবস্থান এবং দিনের বেলায় আইলার তাণ্ডব ঘটায় প্রাণহানি কম হলেও, সাগর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো লোনা পানিতে নিমজ্জিত। বেড়িবাঁধ নির্মিত না হওয়ায় আশ্রয়হীন মানুষ বাড়িঘর নির্মাণের জন্য শক্ত মাটি খুঁজে পাচ্ছে না। খাওয়ার পানির অভাব তাদের জীবনে বিভীষিকা সৃষ্টি করে চলেছে। বেড়িবাঁধের ওপরই আশ্রয়হীন মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
চরম দারিদ্র্য, ঘন জনবসতি, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, বেকারত্ব এবং কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আঘাত দেশটির ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাগরের তীর ঘেঁষে অন্তত ১৪ ফুট উঁচু সাইক্লোন এবং জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করতে পারে এমন মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং নিমজ্জনসহিষ্ণু উঁচু ফলনশীল বীজ ধান সরবরাহ করতে হবে, যাতে দুর্যোগ ও দুর্বিপাক সহ্য করে ধানের গাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং মানুষের আশা ভঙ্গ না হয়। এককথায় বলতে গেলে হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাত সহ্য করে এ দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথার পুনরুক্তি করে বলতে হয়, বাংলাদেশের দিকে গতানুগতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে হবে না, অন্যের দায় মুক্তির জন্য খেসারত অর্থ দিতে হবে।
আসাদউল্লাহ খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক।
e-mail:aukhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.