উপন্যাস- অতল জলের আয়না by বিপ্রদাশ বড়ুয়া

প্রথম অধ্যায়

স্বপ্নের মধ্যেই রোহণের যৌবন উন্মেষের দিনগুলো কেটে গেল। নিজেকে চেনার আগেই এক নারীর মনো-দৈহিক কুহেলি টানাপোড়েন দেখল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল বাস্তবতার রহস্য-রোমাঞ্চকর সেই জগতে। নিজের সেই জীবনকে সে বলল – আমি নই, সেই নারী নয়, আমরা কেউ কাউকে প্রকাশ্যে ও অন্তরে দোষ দিতে পারি না। ওর দোষ কোথায়? আমারওবা কী ছিল করার! নিজেকে বারবার তিলে-তিলে দগ্ধ করল সে, পরিত্রাণের পথ খুঁজেছে, আঘাত করেছে। আমি আঘাত পেলেই ছুটে যেতাম খেলার মাঠে। ফের ডুবে যেতাম বইপত্রে। মুখ লুকিয়েছি ফুটবল খেলায়। যতবার ছেলেমানুষি সেই অপ্রতিরোধ্য খেলায় তার কাছাকাছি হয়েছি, সাঁতার কাটতে-কাটতে অথবা নির্জন ঘরে কাছাকাছি পৌঁছেছি, ততবারই অপরাধবোধ তীব্রভাবে কশাঘাত করেছে। প্রত্যেক বার বিবেকের প্রসন্ন তাড়ায় দংশিত হয়েছি আর সেই অপরাধ বোধ থেকে মোক্ষ পেতে নিজের মধ্যে ডুব দিয়েছি, পড়ার বইতে ঢুকে পড়েছি, ভিটের প্রকৃতির কাছে মুক্তি খুঁজেছি। নিজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শরীর-মন-স্বপ্ন সবই উজাড় করে ফুটবল দলকে জিতিয়ে দিয়েছি গোল করে। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বই মুখস্থ করেছি, অঙ্ক পর্যন্ত ধারাপাতের মতো শিখেছি – যে-অঙ্ক আমি একবার করেছি তা দ্বিতীয়বার যাতে ভুল না হয় তার জন্য দ্বিতীয়-তৃতীয়বার কষেছি। খেলার মাঠে হয়েছি অপ্রতিরোধ্য। দৈহিক উচ্চতায় পাঁচ ফুট আট-নয় ইঞ্চি, বুকের ছাতি ছত্রিশ। পারি না শুধু নিজেকে সুবোধ্য সংযমে বাঁধতে, একবার পারি আবার অতল খাদে পড়ে যাই।

অলি, আলা বা আলেয়া ঠিক আলেয়ার মতো মনে করিয়ে দেয়, টুটু একদম আমার মতো দেখতে। গ্রামের লোকে নাকি কানাঘুসো করে, আমিই টুটুর…। রোহণ বলেছে, তোমার কী মত বলো।

আলা বলে, তুমি ওকে বিয়ে করো। এরকম বিয়ে হতে পারে।

রোহণ তখন ভাবে, এ-কথাগুলো বলতে আলার কষ্ট হয়। আলা তাকে ভালোও বাসে হয়তো। মৃত্যুর আগে রোহণের দাদা আলার মা-বাবাকে বলেও গেছে আলার সঙ্গে রোহণের বিয়ে হবে। রোহণ ভাবে, আমরা একসঙ্গে অনেকগুলো বছর স্কুলে গিয়েছি, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি, বৃষ্টি ও কুয়াশায় একসঙ্গে এক ছাতায় বিল পাড়ি দিয়েছি, কালবোশেখির ঝড়ে রাস্তার ঢালে ধুলো-ঝড় থামার অপেক্ষায় দুজনে দুজনের কাঁধে মুখ গুঁজে থেকেছি। ক্লাসে কখনও ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকেছি, সেও আনমনা হয়ে গেছে – সেই দিনগুলো কি হারিয়ে গেল! আমি অসহায় বইকি। বউদির জন্যও কষ্ট হয়, দাদাকে হারানোর কষ্টও। আলার ব্যবহারে বুক দুমড়ে-মুচড়ে যায়। সবকিছুর মধ্যে টুটুর হাসি উজ্জ্বল এক খুশির আয়না।

চন্দ্রমল্লি টুটুকে নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকে। টুটুর পোশাকি নাম হলো অনির্বাণ। মায়ের দেওয়া নাম। সে বড় হচ্ছে। বিছানায় গড়াগড়ি দিতে জানে। ঘুমের মাঝে সে একা একা বিছানায় সাঁতার কেটে বেড়ায়, যেন বিছানাটা তার পক্ষে ছোট, অথবা খেলার মাঠ। অয়েল ক্লথটা ভেজা ভেজা মনে হয় বলেই কি সে আরেক দিকে পাড়ি জমায়? ভেজা বিছানায় সে শোবে কেন? ওটা ভেজে কেন? ভেজা বিছানা কি তার উপযুক্ত জায়গা? ওটা কে ভিজিয়ে রাখে? একেক সময় মায়ের মুখে পায়ের বুড়ো আঙুলটা ঘুমের মাঝে প্রায় গুঁজে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোয়, কখনো মায়ের বুকের ওপর পা তুলে দিয়ে অকাতরে ঘুমোয়। সারা বিছানায় সে ঘুমের মাঝে ডুব আর সাঁতার, সাঁতার আর ডুব দেওয়ার খেলা করে বেড়ায়। এসব নিয়ে মেতে থাকে, গল্প করে, নদী-কাকিকে শোনায়, শিউলির মাকে বলে। প্রথম-প্রথম বলত না, শুধু অবাক হয়ে যেত। শেষে তাতে গল্প ও ঐশ্বর্য খুঁজে পেল। সন্তানের এসব খেলার মাঝে যে এত সুখ লুকিয়ে থাকে তা কি আর আগে জানত? কারো কাছে শোনেওনি? বইপত্রেও পায়নি? কত গল্প-উপন্যাস পড়েছে – এসব কেউ লেখেনি কেন? ঘুমের মাঝে টুক করে হাসি দেওয়ার মূল্য কত? মাঝে মাঝে শব্দ করেও হাসে। ওমা, পাগল হয়ে গেল নাকি? নাকি দেবতার সঙ্গে হাসছে? স্বপ্ন দেখছে? দেখবেই তো। স্বপ্ন না দেখে কি কেউ বড় হতে পারে? যে-শিশু স্বপ্ন দেখে না, ঘুমের মাঝে হাসে না, সে বড় হয় কি করে?  ঘুমের মাঝেও সে বড় হয়, খেলতে-খেলতে বড় হয়, হাসতে-হাসতে ও কাঁদতে-কাঁদতে বাড়ে। ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখে বলেই মুখে দুধ খাওয়ার ভঙ্গি করে, ঠোঁট-দুটিতে ভঙ্গি তুলে দিব্যি দুধ খায়। সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের বুকেও কি পুলক জাগে, মাতৃত্বে বুক ভরে আসে? কী সুখ, কী তৃপ্তি, মধু সুখ-স্বপ্নে ভাসতে থাকে!

অনির্বাণ কি বাপের স্বপ্ন দেখে? তার জন্মদাতার? বড় হয়ে সে কোনোদিন বাবাকে বাবা ডাকতে পারবে না। অনির্বাণ, তোর চেয়ে দুঃখী পৃথিবীতে আর কে আছে? বড় হয়ে তুই বুঝতে শিখবি বাবা ডাকার অধিকার তোর নেই। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়বে, তুই বাবা ডাকতে পারবি না সেই সুরে সুর মিলিয়ে। পাখিরা ডাকবে, তুই বাবা ডাকতে পারবি না। আকাশে তারারা কথা বলবে, চাঁদ তার মতো গাইবে, মেঘ ভেসে যাবে, সমুদ্র ঢেউ তুলে ডাকবে, বর্ষার নদী কলকল করবে, বনের হরিণছানা ডাকবে, পুন-পুন করে কুয়াশা ডাকাডাকি করবে – তুই বাবাকে বাবা ডাকতে পারবি না। কোনোদিন না, কখনো নয়। অনির্বাণ, তুই জনম-দুঃখী। অনির্বাণ, ছেলেবেলায় বাবা ডাকার কী যে সুখ তা ছেলেবেলায় খুঁজে পাবি না। তুই বঞ্চিত, প্রবঞ্চিত। জন্মের পর থেকেই তুই সে অধিকার হারিয়ে ফেলেছিস।

অলি বলে, রোহণ, তোমার শহরে পড়তে যাওয়াই উচিত। তুমি ভালো কলেজে গেলে আরো ভালো করতে পারবে। মাধ্যমিকে যেমন মেধাতালিকায় আছো, কলেজেও যেন থাকে। তুমি শহরে যাও।

যদি না পারি? – রোহণ বিপদ মাখামাখি মুখে বলে মুখ ফিরিয়ে নিল।

বাড়ি থেকে দূরে যাওয়াই তোমার জন্য ভালো।

ওর কথায় রোহণ বুঝতে পারে কী ইঙ্গিত করছে। রোহণ কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। তখন আকাশে মেঘ-বৃষ্টি কিছুই ছিল না। শুধু কুরকালটা ধাতব বিষণ্ণ গলায় ডাকছিল গাছের ডালে বসে। ওর পাশে সঙ্গিনী ছিল।



দ্বিতীয় অধ্যায়

চালতা গাছে শালিক পাখির ছানা-দুটি বড় হচ্ছে। প্রায় সারাদিন মা ও বাবা খাবার আনে। খাওয়ায়, আবার উড়ে যায় আনতে। এ-সময় খুব খাবার চাই বাচ্চাদের। তিনটি ছানা। মা আসে তো বাবা যায়, বাবা আসে তো মা। গরমও পড়ছে লাফ-ঝাঁপ দিয়ে। খাবার খাইয়ে দিয়ে মা-বাবা গাছের ডালে ঠোঁট মুছে নেয়। এমনিতেও পাখিরা ডালে বসে থাকলে মোছে। পাখায় ঠোঁট চালিয়ে নেয়, গায়ের পোকা তাড়ায়, আবার পাখা পরিচর্যা করে। পায়ের নখ দিয়ে এখানে-ওখানে চুলকে নেয়। আবার ঠোঁট মোছে। মা ও বাবা শালিককে চেনা যায় না, জোড়ের দুটিই একরকম। পাখি-বিশারদেরা চিনতে পারেন। সলিম আলী চিনতে পারতেন। চন্দ্রমল্লি সেদিন সলিম আলীর হ্যান্ড বুক অফ দ্য বার্ডস পড়ছিল, তৃতীয় খন্ড। ওর মা চলে গেছে। এখন নদী-কাকি সাহায্য করে বউদিকে। পরদিন  বুদ্ধপূর্ণিমা, তাই কাজও বেড়েছে কিছু।

ছানা-দুটি বড় হয়ে গেল। এখন ওরা বাসা থেকে গলা বের করে। – বউদি বলল।

ছানা যে দুটি কী করে বুঝলে? – রোহণ জানালা থেকে বলল অলসভাবে।

একটা হলে চেঁচামেচি অতো হতো না।

ঠিক বলেছো। তারপর রোহণ আর কথা খুঁজে পায় না। শালিক পাখির বাসা লতা, ঘাস, কাগজ, কাপড়ের টুকরো দিয়ে বানায়। বেশ বড় ও ভেতরটা গভীর। ওখানে কয়টি ছানা বোঝা মুশকিল। খাবার সময় শুধু ঠোঁট বের করে। বাসার গর্তের মুখের দিকে না তাকালে বাচ্চাদের ঠোঁটও দেখা যায় না। এসব নানা কথা রোহণ বলতে পারত। সে বাসার অন্ধিসন্ধি দেখেছে গাছে উঠে। কিন্তু বাসার কাছাকাছি গেলে শালিক মা-বাবা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। আশপাশ থেকেও শালিকরা এসে ত্রাণকর্তা হয়ে যোগ দেয়। চেঁচামেচি, উড়ে এসে ঠোকর মারা, কিছুই বাদ যায় না। এসব সে বলতে পারত। কিন্তু কিছুই মুখে জোগাল না।

পরদিন বুদ্ধপূর্ণিমা বলে ঘরদোর পরিষ্কার হচ্ছে। নদী-কাকি ব্যস্ত। চাষিরা পাকা লঙ্কা, ধনে, মসুর আস্ত গাছসহ নিয়ে আসছে চর থেকে। পাকা লঙ্কায় উঠোন রোদ টকটক করছে। রোদও গনগনে। লঙ্কার লাল রঙে যেন রোদও তেতে উঠেছে। ধনে ও মসুরের ডাল গাছসহ শুকাচ্ছে, একটু শুকোলে গাছ থেকে আলাদা করা হবে। রোহণ উঠোনে গিয়ে ধনে ও ডালের গাছ উলটে-পালটে দিচ্ছে। পায়রাগুলো নামলে নাশ করে ছাড়বে। উঠোনে নেমে খাবার খাওয়ার অভ্যেস তাদের আছে। লাল লঙ্কার দিকে পায়রাদের সঙ্গে রোহণও দেখছে। সেও তেজি হয়ে উঠছে।

রোহণ শহরে যাওয়ার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। হোস্টেলে থাকবে। এরই মধ্যে ভর্তির দিন-তারিখ ও সব খবর নিয়ে এসেছে শহরে গিয়ে। বৌদি ওর ঘরে অভিযান চালিয়েছে। আলার সঙ্গে দেওয়া-নেওয়া করা কোনো চিঠি বা কোনো অভিজ্ঞান খুঁজেছে হয়তো। রোহণ জানে, তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। ডায়েরিটা আলমারিতে বিশেষভাবে লুকিয়ে রেখে তালা মেরে গেছে। চুলগুচ্ছ তো আগেই ফিরিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে আলা এসেছিল ওর অনুপস্থিতিতে। হয়তো জেনে-শুনেই এসেছিল। ওর খবর নিয়ে গেছে, শহরে যাওয়ার খুঁটিনাটিও হয়তো জেনে নিয়েছে। তাও রোহণ জানতে পারত না। বউদি না বললে। আলা পাশের গ্রামের কলেজে পড়বে বিজ্ঞান নিয়ে। রোহণের কথা জানতে চেয়েছে। আরো অনেক কিছু।

রোহণ বউদিকে বলল, তুমি কি জানতে চাও আমার থেকে?

তুমি কি অলির কাছে যাও না?

না।

কেন যাও না?

সে আমাকে সন্দেহ করে বলে।

আমি ওর বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে তোমার, তোমার উপহার দেওয়া পাঁচটি বই ফেরত দিয়েছে। তোমার সই করা পাতাটা ছিঁড়ে নিয়েছে বই থেকে।

গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিলে? এসবের মানে কী? আমার ঘরেও ঘাঁটাঘাঁটি করেছো তাহলে। তুমি এরকম?

এর অর্থ তুমি নিজেই খুঁজে দেখো নিজের মধ্যে। আমার বলার কিছু নেই। মানুষ যখন কাঁদে তখন তাকে খুব ভঙ্গুর মনে হয়। একজন যখন আরেক জনকে ভালোবাসে এবং একজন অন্য জনের আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ে তখনো কি ভঙ্গুর মনে হয় না? তখন দু জনের ভাবনায় কী থাকে? একজন পুরুষের ভাবনা আর এক নারীর ভাবনা কি সমান হয়? এক হয়? অথবা সমান নয় কেন? পুরুষ তখন কী ভাবে? বিবাহিত নারীর ভাবনা কী, আর অবিবাহিত মেয়ের ভাবনা? অল্পবয়সী তরুণের ভাবনা বা প্রথম প্রেমেপড়া যুবকের ভাবনা কি আলাদা হয়? অনভিজ্ঞ বা অভিজ্ঞ পুরুষের ভাবনা আর কপট পুরুষের ভাবনা অন্যরকম হওয়াই কি স্বাভাবিক?

সঙ্গে সঙ্গে রোহণ ভাবল, দুটি উলঙ্গ নর-নারী যখন একত্রে নিভৃতে থাকে তখন তাদের সম্পন্নতায় ভেঙে পড়াই তো স্বাভাবিক, খুব ভঙ্গুর থাকে তখন তারা। দৈবাৎ তারা লোকচক্ষুর সামনে পড়লে কী অবস্থা হবে তখন তাদের? ভালোবাসা কী? এক থেকে অন্যতে প্রবাহিত হওয়া? নিরন্তর তারা একে অন্যের দিকে প্রবাহিত হয় কি! যখন দুটি নারী-পুরুষ উলঙ্গ থাকে তখন তারা ছদ্মবেশ থেকে ছদ্মবেশে যায় কি? অথবা তখন যদি কামই প্রধান হয় তখন তাদের মধ্যে একাকিত্ব থাকে? ছদ্ম-আবরণ থাকে? ব্যক্তিক থেকে নৈর্ব্যক্তিকতা, নৈর্ব্যক্তিকতা থেকে আরো গভীর নৈর্ব্যক্তিকতায় যাওয়া কি সম্ভব, অথবা যেতে পারে! অথবা কী অমোঘ একাকিত্বে তারা ভোগে তা যদি তারা একে অন্যকে ঠিক-ঠিক প্রকাশ করত! কী নারী, কী পুরুষ – কেউ কাউকে ঠিক-ঠিক প্রকাশ করে না। কেউ তাদের মনের কথা সঠিক বলে না। বলার সময়ও তখন থাকে না বোধহয়। তখনকার ভাবনা তখন ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে ভাঙতে থাকে, একটি থেকে অন্যটিতে গড়াতে থাকে… শেষে বলার যখন সময় হয় তখন কিছুই বলে না, মনে পড়ে না, এলোমেলো হয়ে যায়, অথবা তখন বলার প্রয়োজন মনে করে না বা প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়? অথবা বলতেও পারে না হয়তো সম্ভ্রমে।

চন্দ্রমল্লি চোখ বড়-বড় করে উত্তর শোনার অপেক্ষা করে রইল। বড়-বড় চঞ্চল চোখে বোধহয় সেই প্রথম রোহণ দেখতে পেল অদৃশ্যপূর্ব রহস্যময়তা। ঠোঁট-দুটো আলতো ফাঁকা হয়ে গেছে গ্রাহীর মতো, সুন্দর দাঁত প্রকাশিত হয়ে গেছে বিদ্যুতের ঝলক দিয়ে। রোহণ সঙ্গে-সঙ্গে আবার ফেলে আসা দিনগুলোতে চলে গেল উল্লস্ফন দিয়ে। সেখানে আলা চুপচাপ, যন্ত্রণা ও আনন্দে চুপচাপ তাকিয়ে আছে রোহণের দিকে।

চন্দ্রমল্লির সুপুষ্ট ঠোঁট যেন জ্বলছে, দ্রুত ওঠানামা করছে বুক। তবুও অপেক্ষা করে আছে ধৈর্য ধরে, আলা সম্পর্কে রোহণের ভাবনার কথা শোনার জন্য চুপ করে আছে। রোহণের স্মৃতিতে তখন ক্ষরণ হচ্ছে, আলেয়ার সঙ্গে সে মিশেছে স্কুলে যেতে-যেতে, নির্জন ভিটেয়, কালবোশেখির নেচে ওঠা প্রান্তরে হাতে হাত ধরে, দু জনের কাঁধে দু জনে মাথা রেখে। তখন ঝড়ো প্রান্তরে না হয়ে ঘরের নির্জন কোণে হলে কী হতো? হাতে হাত… তারপর, তারপর কী হতে পারত! সাঁতার শিখতে গিয়ে রোহণ অাঁকড়ে ধরেছিল বউদিকে, তখন সে ছোট ছিল, তবুও প্রবল শিহরণ ছিল, ভয়ের সঙ্গে আশ্রয় পাওয়ার সম্পন্নতা। সে-রকম আরো অনেক স্মৃতি আছে। কী সুন্দর, সরল, নৈর্ব্যক্তিক একাকিত্ব থেকে একাকিত্বে ঘুরে বেড়ানোর সময় ছিল। আলা জিব দিয়ে ওর চোখের বালি তুলে নিয়েছিল। ঝড়ের পর ওরা হাসতে হাসতে ঘরে ফিরেছে সুবোধ বালক-বালিকার মতো, এবং সহপাঠীদের সঙ্গে সেই সম্পর্কই তো তাদের ছিল।

রোহণ বলল, আর বেশি বলার দরকার আছে? আলার কথা আরো বলতে হবে? আরো জানতে চাও? তুমি নারী, তুমি আমাকে জানো, বুঝে নাও আমার প্রথম যৌবনের দিনগুলো, যা তুমি সবচেয়ে বেশি দিয়েছে দেখেছো এবং চেনো।

বউদি তখন রোহণের চিবুকে হাত দিয়ে মুখ একটু তুলে নিয়ে বলল, কোনো-কোনো সমস্যা মানুষের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। সে-সমস্যা লোকে অাঁচ করতে পারলেও সঠিক ধরতে পারে না, সমস্যাটা সে বয়ে বেড়ায়। সমস্যাটা তাকে কুরে-কুরে খেলেও নিজের মাঝে সুপ্ত শিশুর মতো থাকে, আবার মাঝে-মাঝে জেগে ওঠে, ঝড়ও বইয়ে দিতে পারে। তখন তা কি খুব ভয়াবহ? ওতে কি একটুও সুখের ছোঁয়া থাকে না? হ্যাঁ থাকে, জীবনভর বয়ে বেড়ানো এই সমস্যাও তাই মধুর হতে পারে – ওকে অযত্নে ও অবহেলায় তুচ্ছ করা যায় না। আলেয়ার কাছে গিয়েছিলাম এজন্যই। ঈর্ষাবশে নয়। তোমার কাছে, তোমার ঘরে যখন-তখন যাওয়াতে তো কোনো বাধা নেই। কিন্তু কোনো দিন এবারের মতো যাইনি। আমার অধিকারও তো আছে, সেটা আমি পরখ করতেও পারি। ছোট্ট অনির্বাণের মতো ঘুমিয়ে থাকা সমস্যাটা মাঝে-মাঝে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে। তুমি তো সব জানো। …নাও, এবার যাও। তোমার দেরি হয়ে যাবে। আজ দুটি গোল করে এসো। মনের মধ্যে জেদ রেখো। দৃঢ় আস্থা তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তোমার ভেতরের সমস্যা ফুটবলের মাঠে নামার আগে ভেতরেই ঘুম পাড়িয়ে রেখো, তারপর মাঠে নেমো। যাও, জিতে এসো। এই নাও আমার চুম্বন-আশীর্বাদ।

আসি!

বউদি বলল, আমি একা এবং নারী বলে অনেক সমস্যার উদ্ভব হবে। মাও বলেছে।… বলতে-বলতে কী ভেবে চুপ করে গেল।

অমনি রোহণের মনে পড়ে গেল সে-রাতের কথা, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারল না। কারণ সে তো সব শুনেছে। তাই তাড়াতাড়ি বলল, আমার সময় হয়ে এলো।

এসো। দুটি গোল চাই। একটা অনির্বাণের জন্য, আরেকটা আমার… না না, তুমি যাকে ভালোবাসো তার নামে।

ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিতে-নিতে মনের মধ্যে মাঠের কোলাহল শুনতে পেয়ে বেরিয়ে পড়ল।… বউদির মা বউদিকে বলেছিল, তুই বল, টুটু ওর ছেলে, তোকে বিয়ে করতে বল। মৃত বড় ভাইয়ের বউকে বিয়ে করা কোনো দোষের নয়। বল…



তৃতীয় অধ্যায়

বুদ্ধপূর্ণিমা। আকাশে রুপোর থালা-চাঁদ। পাপিয়া ডাকছে অশোক গাছে। পারিজাত ফুটে আছে থোকায় থোকায়। বিহারের দক্ষিণ সীমায় একসারি নাগকেশর সোনালি কেশর ও সাদা পাপড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার সুগন্ধ জ্যোৎস্নায় মিশে যাচ্ছে। বুদ্ধকীর্তন শুরু হয়েছে।

গৌতমের আবাল্য পরিচয় গোপাদেবীর সঙ্গে। সেদিন অশোকভান্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি পাত্রী নির্বাচন করবেন। শাক্যরাজ্যের সমস্ত কুমারী উৎসবে যোগ দিয়েছেন। কুমার গৌতমের হাত থেকে তাঁরা উপহার গ্রহণ করবেন। সে-সময় কুমারের যদি কাউকে পছন্দ হয়ে যায় তাহলে তিনিই হবেন গৌতমের জীবনসঙ্গী। পিতা শুদ্ধোদন রাজ-অনুচরদের নিয়োগ করেছেন কুমারের দিকে লক্ষ রাখতে, তাঁর মনোভাব জানতে। একে-একে অশোকভান্ড বিতরণ শেষ হয়ে যায়, কুমারের কাউকে পছন্দ হয় না। রাজ-অনুচরেরা হতাশ। আর তখন উপহার গ্রহণ করতে এলেন গোপাদেবী। গোপাদেবীকে দেখে কুমার মুগ্ধ। কী উপহার তিনি দেবেন? অশোকভান্ড যে ফুরিয়ে গেছে। আগে কোনো দিন গোপাদেবীকে এতো সুন্দরী মনে হয়নি কেন? এতো  অনুরাগই-বা তার জন্য কোথায় লুকিয়ে ছিল এতোদিন? মাতুলকন্যাকে এতো ভালো লেগে গেল কেন আজ? প্রকৃতির মাঝেই কি এতো শিহরণ লুকিয়ে থাকে? কুমার আর এক মুহূর্তও না ভেবে নিজের হাতের রাজ-অঙ্গুরীয় পরিয়ে দিলেন গোপাদেবীর চম্পাকলি আঙুলে, চোখে চোখে তাকিয়ে। অমনি চারদিকে বাদ্য উঠল বেজে, উলুধ্বনি দিয়ে উঠলেন শাক্যরাজ্যের কন্যারা। জয়ধ্বনি দিলেন রাজ-অনুচরেরা। রাজ্যজুড়ে শুরু হয়ে গেল উৎসব।…

বুদ্ধকীর্তন চলছে। খোল, করতাল, ঝাঁঝর, বীণা, বেহালা, বাঁশি বাজছে। সবাই বোধিবৃক্ষ ঘুরে-ঘুরে নেচে-নেচে গাইছে কুমার সিদ্ধার্থের পরিণয়-কীর্তন। পেছনে তরুণীরা, তরুণরা। আকাশে পূর্ণচাঁদ, বসন্ত-গ্রীষ্মের মিলন-হাওয়ায় নাগকেশর ও অশোকের সৌরভ। আলা পরেছে মায়ের চাঁপাবরণ গরদের শাড়ি, খোঁপায় চাঁপাফুলের মালা। চন্দ্রমল্লি পরেছে নীল-পাড় গোলাপি সিল্ক শাড়ি। গ্রামের সব কুমারীর মাথায় অশোক, নাগকেশর বা স্বর্ণচাঁপা। বড় খোঁপায় মালা। সুগন্ধ ধূপ জ্বলছে বেদিতে।

গাইতে-গাইতে রোহণ দেখছে আলাকে। বোধিবৃক্ষের লাল নবপত্রিকা পতপত করছে। অশ্বত্থের পাতার বোঁটা লম্বা বলে এই মর্মরধ্বনি কীর্তনের সুরে-সুরে কোথায় যেন পাড়ি দিয়েছে। মৃদঙ্গ ও বীণা তরঙ্গে মিশে যায়। ওদিকে বিহারের আঙিনায় লোকারণ্য। ছেলেরা তারাবাজি পুড়ছে হাতে নিয়ে, তুম্বরুবাজি শব্দঝঙ্কার তুলেছে আলোয় আলোয়। হাউই উঠছে আকাশে জ্যোৎস্না পাড়ি দিয়ে। আলাকে একবার দেখে, আবার ভিড়ে মিশে যায়। মুখে কি ছায়া পড়েছে দেখতে পায় না রোহণ। সব কুমারী কি যুবরাজের স্বপ্ন অাঁকে চোখে, স্বপ্নের রাজকুমারীর স্বপ্ন দেখে তরুণেরা? কুমার সিদ্ধার্থের আসন্ন শুভ পরিণয়ে সবাই আনন্দিত, তবু পরিণয়ের আগে কুমার সিদ্ধার্থকে গোপাদেবীর পিতা দন্ডপাণির কাছে যোগ্যতার পরিচয় দিতে হয়েছিল। ক্ষাত্রধর্ম অনুযায়ী সর্ববিদ্যায় পারদর্শী কিনা সে-পরীক্ষা না দিলে কন্যার পিতা কন্যাকে গৌতমের সঙ্গে বিবাহ দেবেন কেন? প্রমাণ করতে হবে বেদ, জ্যোতিষ, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ, শিক্ষা, কল্প, সাংখ্য, যোগ, বৈশেষিক নিগম, পুরাণ, ইতিহাস, অর্থবিদ্যা, হেতুবিদ্যা, বার্হস্পত্য-শাস্ত্রে গৌতমের বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে। অবশেষে একে-একে ক্ষত্রিয়-ধর্মের পরিচয় দিয়ে কুমার গৌতম গোপাদেবীকে বিবাহ করলেন। কীর্তন গাইছে, ‘উলুধ্বনি দে রে তোরা, উলুধ্বনি দে/ পুরবাসী সবাই মিলে উলুধ্বনি দে’।

সঙ্গে-সঙ্গে আকাশ পাড়ি দিতে গেল হাউই, তারাবাজি জ্বলল, মৃদঙ্গে শব্দ ছুটল তুঙ্গবেগে, বীণা ও বেহালার মূর্ছনা। বিহারে টাঙানো রঙিন ফানুস-বাতির শিখা জ্বলছে দুলে-দুলে। আকাশে চাঁদ ও তারার প্রসন্নতা।

আলা ঘুরে-ঘুরে কী ভাবছে এই আনন্দ-উৎসবে? চন্দ্রমল্লি বিধবা বলে কি উলুধ্বনি দেয়নি? বিধবারা কোনো মঙ্গল অনুষ্ঠানে উলু দিতে পারে না। কিন্তু কুমার গৌতম ও বুদ্ধপূর্ণিমা তো সবার ঊর্ধ্বে। রোহণ দেখেছে, চন্দ্রমল্লি উলু দিয়েছে, আলা তো দিতেই পারে। এমন মুহূর্তে মানুষ মনে করে যে, তার মনে এক অপার্থিব শক্তির সঞ্চার হচ্ছে, এ-সময় সে বড় কাজ করার মতো শক্তির অধিকারী হয়। অন্য সময়ে সে যা ভাবতে বা অনুভব করতে পারে না, তা সে এরকম শুভ মুহূর্তের অনুভূতিতে নিজের মতো করে নিজেকে পেয়ে যায়। মনের গভীরে ডুবে সে মনে-মনে বহুদিনের আবেগ, দুঃখ-হতাশা ও আনন্দের খোঁজও যেন পেয়ে যায়। খুব সচেতন না হলেও সে কী যেন এক অনুভূতিতে কিছু পেয়ে যায়, সে যেন দেখতে পায় আনন্দ ও বিষাদ তার বুকের ভেতরে ধরা দিতে চায়…।

চন্দ্রমল্লি ভাবে, সে এখন সবকিছু করতে পারে। কীর্তন শুনতে-শুনতে সে শিহরণ অনুভব করে, ঠোঁট ও চিবুক থরথর করে কাঁপে। একে-একে সে সামনের সকলকে অতিক্রম করে কীর্তন দলের কাছাকাছি এসে পড়ে, এক যুবকের কনুই তার বুকে এসে লাগে। সঙ্গে-সঙ্গে সে জড়তা ও উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে। আস্তে-আস্তে সে রোহণের কাছে চলে যায়। রোহণ জানতেও পারেনি সে তার কাছে চলে এসেছে। চন্দ্রর হাতে ফানুস। আর একটি দৃশ্য চলে আসে কীর্তনের কথা ও সুরে – ‘কুমার সিদ্ধার্থ তখন মনের দুঃখ লাঘব করতে বের হয়েছেন উদ্যান-ভ্রমণে। প্রিয় সারথি ছন্দক তখন রথচালক, চলছে রথ, হয়তো মনোরথ। চারদিকে আনন্দ, বাদ্য, গীতধ্বনি। পাখির কাকলী, ফুলের সুবাস, আলোর ঝরনাধারা। কুমারের মনে হলো, জগতে দুঃখ নেই, শোক নেই, কান্না নেই, হতাশা নেই। আছে কেবল আনন্দ, আছে শোভা, আছে প্রীতিসমৃদ্ধ সুষমা। আনন্দ, আনন্দ শুধু।… হঠাৎ সিদ্ধার্থ চিৎকার করে সারথিকে ডাক দিলেন, ‘এ কোথায় নিয়ে এলে ছন্দক, কোন রাজ্যে আমি রথে চড়ে ঘুরছি।’ অমনি ঘোড়ার ক্ষুরের গতি গেল কমে। বিষাদে ছেয়ে গেল ছন্দকের মন।

‘গৌতম বললেন, ওই দেখো, কে যায়? লাঠিতে ভর দিয়ে দন্তহীন, অস্থিচর্মসর্বস্ব, কুঁজো এক বৃদ্ধ। দেখল ছন্দক। লোকটির হাত কাঁপছে, পা টলছে, ঘাড় দুলছে। কথা বলতে গিয়ে কথাও কেঁপে যাচ্ছে। বৃদ্ধ তার ছানিপড়া চোখে দেখতে পায় না, কানে শোনে না। কেবল লাঠিতে ভর দিয়ে, পোড়া কাঠের মতো দুখানা পায়ে ভর করে যেন অন্তহীন পথের যাত্রী। পৃথিবীর যত রূপ, যত রস, যত আনন্দ, যত সুখ তার জন্য নয়। জীবনের রূপরস সব শুকিয়ে গেছে। তবুও চলছে সে একা, আনন্দ নেই, তবুও চলছে সে। সুন্দর, উপভোগ্য ও মনোরম বলতে কিছুই তার চারদিকে নেই।…

‘সিদ্ধার্থ আর একদিন নগরীর দক্ষিণ দুয়ারে ভ্রমণ করতে গিয়ে দেখলেন রুগ্ণ এক মানুষ। সে দাঁড়াতে পারে না, চলতে পারে না, একটু ক্ষণের জন্যও তার বেদনার উপশম নেই। জ্বরে কাঁপছে, বেদনায় কাঁপছে, কষ্টে হা-হুতাশ করছে। কাঁদছে যেন পৃথিবীসুদ্ধ মানুষ!

‘এভাবে আরেক দিন পশ্চিম দুয়ারে ভ্রমণ করতে গিয়ে দেখতে পেলেন,

‘চারি জনের কাঁধে শবাধারে এক মৃত, পিছনে পিছনে বুঝি হাজার হাজার শবাধার, তার উপর অসংখ্য মৃত মানুষ, তার অনুগামী হয়েছে, তেমনি হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ। তাদের কান্না আর চিৎকারে সিদ্ধার্থের বুক ফেটে যাচ্ছে। সিদ্ধার্থ সারথির কাছে জানতে চাইলেন, ছন্দক, কে এই শবাধারে, কেন এতো শবাধার, কেন এই শোকাবহ দৃশ্য? জগতের এই কি নিয়ম?

‘ছন্দকের বুক ফেটে যায় মৃত্যুর কথা বর্ণনা করতে, প্রিয় রাজকুমারকে তবুও সব বুঝিয়ে দিতে হবে, পরিচয় করিয়ে দিতে হলো জীবের স্বাভাবিক পরিণতি মৃত্যুর সঙ্গে। সিদ্ধার্থ ইতিপূর্বে হয়তো এরকম মৃত্যুদৃশ্যের মুখোমুখি হননি, নিজ পরিবারের এমন করুণ দৃশ্য হয়তো দেখেননি, মায়ের মৃত্যুর পর জানতেও পারেননি গৌতমী তাঁর আসল মা নন, বিমাতা। অথবা আগে মৃত্যুর দৃশ্য দেখে থাকলেও এই প্রথম প্রবলভাবে ও জগতের অমোঘ সত্যের মুখোমুখি হয়ে সব জেনে নিলেন। চিতা জ্বলতে দেখলেন তিনি জগৎ সংসার জুড়ে। জগৎজুড়ে মৃত্যুর খেলা দেখতে পেলেন। তাঁর এতোদিনের শিক্ষা আজ পূর্ণ হলো।’

বোধিবৃক্ষ পরিক্রমণরত পেছনের মানুষ অনবরত ঠেলছে সামনের মানুষকে। চন্দ্রমল্লি যে রোহণকে ঠেলছে তা সে কী করে বুঝবে? আস্তে-আস্তে পেছন থেকে বলল, বাড়িতে গিয়ে অনির্বাণকে একটু দেখে আসবে? এখন ওর খাওয়ার সময়, নদী-কাকিকে খাওয়ার কথা বলে আসিনি।

তুমিও যাবে? – রোহণ গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো বলল।

আমার আরো কিছুক্ষণ থাকতে খুব ইচ্ছে করছে। তুমি ফিরে এলে পর একসঙ্গে যাব। আজকের এই অনুভবটা পুরো পেতে চাইছি।

ঠিক সে-সময় সে আলাকে দেখতে পেল একঝলক। পাশ থেকে দেখে তার মনে হলো আলার খোঁপায় পারিজাত ফুটে আছে আগুনে রং নিয়ে, তার গালের পাশেও আগুন। আলার হাতের ফানুস থেকে ওর মুখে আলো পড়েছে উৎসব করে। আগুন ধরেছে ওর মুখে ও ফুলে। ওদিকে কোথায় পাপিয়ার ডাকও শোনা গেল।

আস্তে-আস্তে বেরিয়ে পড়ল রোহণ। বিহারের উঠোন পেরিয়ে তোরণের সিঁড়ি থেকে রাস্তায় নামতেই আলী কাকা ছুটতে-ছুটতে এসে বলল, আলেয়াদের বাড়িতে আগুন লেগেছে…।

কী করে, কী করে, কে কে… বলতে-বলতে সে ছুটে গিয়ে বিহারের ঘণ্টা বাড়িয়ে দিলো। দ্রুতগতিতে বাজানো সেই শব্দের অর্থ কোথাও কোনো অনর্থ বা বিপর্যয় হয়েছে। অমনি সবাই জেনে গেল। আগুন, আগুন, আগুন! আলেয়াদের বাড়ির দিকে ছুটল সবাই। রোহণ ছুটে গিয়ে উঠল চালে।

রান্নাঘরে প্রথম আগুন লেগেছে। সেখান থেকে আগুন গেল মাটির ঘরের চালে। পাশেই মাটির ঘর। আগুন নেভাতে হলে চালে উঠতে হয়। নিচের থেকে বালতিতে করে উঁচু চালে ঠিকমতো পানি দেওয়া যায় না। অনেক মানুষ সঙ্গে-সঙ্গে এসে গেল বলে অল্পতে সে-ঘর রক্ষা পেল। ছনের ছাউনি দেওয়া চাল। আগুন যেন ডুব দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলেছে। ঝনঝনে শুকনো ছন। বসন্তের অল্প শিশিরে আগুন পরোয়া করে না। রোহণের বাঁ পা খানিকটা ঝলসে গেছে। আলেয়া উঠোনে নাকি গাছতলায় ছিল সে দেখেনি।

পরদিন আলা দেখতে গেল রোহণকে। ওষুধ মেখে রোহণ তখন শুয়ে আছে। হাঁটুর নিচটায় পুড়েছে। পায়ের পাতা ও আঙুলের কিছু ক্ষতি হয়নি। আগুনের খুব কাছে গিয়েছিল ভেজা কাঁথা বিছিয়ে দিতে। আগুন তখন ডুব মেরে চালের ভেতর দিয়ে যেন তার পায়ের কাছে চলে এসেছিল। পুব-পশ্চিম ও দক্ষিণ তিন দিকের চালে ভেজা কাঁথা। উত্তরের চালের ছন খুলে নিয়েছে বলে সেখানে আগুন ছড়াতে পারেনি। চালের নিচে ছাদ ছিল খিলানো। কাঠের তক্তার ওপর মাটি দিয়ে মজবুত ছিল। ছাদে প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্র থাকে পরিবারের। আগুনের একটা আক্রোশ রোহণের পায়ের ওপর আছড়ে পড়েছিল। বাঁ পায়ে তার যত শক্তি ফুটবল খেলায় কারুকাজময় গোল করার। ভাবছিল আবার পারবে তো সে খেলতে? বোধহয় ঘুমও এসে থাকবে। সেই আধো ঘুম ও জাগরণে আলেয়াকে ভাবছিল। কথা বলেনি আলা। রোহণ তো আধো স্বপ্নসমুদ্রে ভাসছিল। কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছিল সে? কৃতজ্ঞতা জানাতে সে চোখ নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল? ওর হাতে ছিল অাঁচলের প্রান্ত। নীল অাঁচলের জ্বলজ্বল রং ওর আঙুলে শিখার মতো জ্বলছিল। অচেতনভাবেই হয়তো সে অাঁচলের খুঁট দাঁত দিয়ে কুটছিল। মানুষ কি সব সময় তার নিজের সব ব্যবহারের কারণ জানে?

আলা হঠাৎ অত্যন্ত সংযত ভাষায় আবেগ-অনুযোগকে কোনো রকম প্রশ্রয় না দিয়ে রোহণকে ঘুমুতে বলে ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক তখনই নদী-কাকি এসে বলল, পরে এসো তুমি, এখন ওকে একটু ঘুমুতে দাও, মা।

রোহণ চোখ খুলে বলতে চাইল, আমার ঘুম চলে গেছে…। কিন্তু বলতে পারল না। আলা তখন অপেক্ষা করে করুণ ও কঠিন চোখে শেষ বার তাকিয়ে ফিরে দাঁড়িয়েছে। আস্তে-আস্তে ফিরে যাচ্ছে। রোহণ আলার করুণ কঠিন চোখের ভাষা বোঝার জন্য চোখ বুজল। আর কী আশ্চর্য, ওর পায়ের ব্যথা তখনই আধখানা ভালো হয়ে গেছে মনে হলো। কিন্তু চোখ খোলার পর সেই অনুভব   বিদ্যুৎ-ঝলকে প্রচন্ড শব্দ করে উধাও হয়ে গেল।



চতুর্থ অধ্যায়

রোহণের শহরে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। চাষবাসের কাজ বুঝে নিল নদী-কাকি। শিউলির মা এসে দাঁড়াল। আলী ও রমেশ কাকা বলল, চাষের কাজ ঠিকমতো চলবে, ও-নিয়ে ভাবাভাবি করে পড়ার ক্ষতি না করতে। বর্ষার ঢেঁড়স, মুখীকচু ও ঝিঙে-বরবটির চাষ হয়ে গেছে। আউশ ধানের কাজও সময়মতো হয়ে যাবে।

শুধু বউদি ও অনির্বাণ বাকি। অনির্বাণ খিলখিল করে হাসে, কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। হাতের তালুতে আঙুল মুঠো করে ধরে থাকে। রোহণ ভাবল, শিশু অনির্বাণকে সব কথা বলে দেওয়া যায় – আমি পড়তে যাচ্ছি, ছুটিছাটায় আসব, গরম ও শীতের ছুটি থাকবে, রমজান ও দুর্গাপুজোর লম্বা ছুটি থাকবে। এছাড়া লঞ্চে করে ঘরে ফিরতে তিন ঘণ্টাও লাগে না। হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। কত কিছু পড়ার আছে… সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, সমুদ্রতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান… কত-কত পড়ার প্রিয় বিষয় আছে! মানুষ এক জীবনে সব পড়ে শেষ করতে পারে না, কিছু সে পড়ে পড়ে শেখে আর কিছু তার অধীত বিদ্যা ও মেধা দিয়ে অনুমান করে নেয়। জ্ঞানভান্ডারে শুধু জমা হচ্ছে। তারপর সে মনে-মনে আরো বলল, অনির্বাণ, তুই বড় হয়ে সব জানতে পারবি, বুঝবি, কিন্তু বাবা ডাকতে পারবি না কোনোদিন। চিৎকার করে ডাকলেও সাড়া দেবে না, তোর বাবা যদি শুনতেও পায় সাড়া দিতে পারবে না, সাড়া দিলেও তুই শুনতে পাবি না। এও এক অভিশাপ। প্রত্যেক মানুষের এ-জাতীয় কোনো না কোনো অভিশাপ থাকে। কারো মা থাকে না, কারো বোন, কারো দিদি নেই, কারো বড় ভাই, কারোবা ছোট  ভাই-বোন বা মাসি-পিসি। কেউ গৃহহীন, কেউ নগরবাসী, কারো এক জীবনে হয়তো শহরেই যাওয়া হয়নি, সমুদ্র বা পাহাড় দেখেনি, হয়তো সারাজীবনে ভালোবাসা কী বুঝতে পারল না, কেউবা পেয়েও হারাল, একজনের জীবনে হয়তো আছে হারানোর হাহাকার, সব থেকেও কিছু না থাকার যাতনা… পৃথিবীতে কত রকম দুঃখ-বেদনা যে আছে তার হিসাব রাখাও কঠিন। অনির্বাণ, টুটুরে, তোর বেদনার পরিমাপ তুই বড় হয়ে বুঝতে পারবি। তাই তোর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় শৈশব। এখন তোর সেই বয়স, সেই স্বপ্নসময়। এখন তা তুই নিজে-নিজে উপভোগ করে নে…।

গতরাতে তার খুব ইচ্ছে হয়েছিল বউদির সঙ্গে নিভৃতে কিছু বলে। রাতের খাওয়ার পর থেকে ছটফট করেছে, মনে-মনে উত্তেজনা অনুভব করেছে, বলতে না পারার মনের দুঃখে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, সংযত করেছে নিজেকে। আলার কথা, নিজের কথা এবং বউদির কথাও শুনবে বলে অপেক্ষা করেছে। কত রকম পিছুটান যে মানুষের থাকে! ভালোবাসার কথা, গোপন বাসনা, বাসনা-জয়ের লড়াই আছে, রিপুর কাছে পরাজয় আছে। ওর কাছে বউদি একই আধারে দেবী ও মানবী দুই-ই, বাস্তবে ও কল্পনায় মিলেমিশে একাকার রহস্যময়ী নারী। আলাকে নিয়েও অনেক কথা আছে, নারীর হৃদয়ে কী কথা লুকোনো থাকে দিনে-রাতে-সন্ধে-সকালে! সে বউদির হাতে বড় হয়ে উঠেছে। সাঁতার, পড়া, গাছপালার পাঠ, মনের রহস্যের নীরব পাঠ, না-বলা কথা কী করে বলতে হয়, নিজেকে কীভাবে আড়াল করতে হয় আর লুকিয়ে-লুকিয়ে প্রকাশ করা যায় – কতকিছু! নারী হৃদয়ের গোপন পাঠ কি কম জানার… তার কত রহস্য, কত গোপনীয়তা! সারারাত ঘুমুতে পারেনি। আবার এই জটিল ব্যূহচক্র থেকে মুক্তি মিলবে ভেবে স্বস্তি পেল যেন একটু। আলার ভালোবাসা কতখানি আছে – সব কথা যদি সারারাতেও বলা যেত! অনেক করুণায় সিক্ত থাকে নারীর হৃদয়, অপার স্নেহছায়া থাকে মেয়েদের সুপুষ্ট হৃদয়ে, সুধার ভান্ড থাকে জমা উর্বর হৃৎকমলে…।

খুব ভোরে যখন দোয়েল ডেকে উঠল, তান ধরল, তখন রোহণ সাড়া দিলো। ম্লান জ্যোৎস্নার মায়ায় একা-একা বাঁশবাগানে গিয়ে সে তার কৈশোর-যৌবনের শুরুর স্বপ্ন খুঁজে এলো। পুকুরঘাটে নেমে মুখ ধুয়ে নিল। সাঁতার কেটে এক চক্কর ঘুরে এলো। মানুষের শরীরে একাত্তর ভাগ পানি বলেই কি সাঁতারে এতো আনন্দ, অবগাহনে এতো সুখ! জীবজগৎ এতো জলকাতর কি এ জন্যই!

নদী-কাকি, শেফালির মা, আলী ও রমেশ কাকা সবাই উঠল। শুধু ওঠেনি টুটু। এ-সময় সে আধো ঘুমে ও জাগরণে মায়ের দুধ খায়। তখনো ডাকছে দোয়েল, বুলবুল, শালিক। ডাকছে, নাকি গাইছে? তখনো ম্লান জ্যোৎস্না চারদিকে। সে জাউ ও চিংড়ি ভর্তা খেল হু-হা করে। চিংড়ি মাছ সেদ্ধ করে মেখে এরকম ভর্তা ঝালই তার প্রিয়। শেফালির মা এটা জানে, নীল রঙের কাঁচা লঙ্কা পুড়ে কচলে সরষের তেল দিয়ে মেখে নিলে আর কি চাই! বউদি এসে দেখে গেল। ভর্তা তুলে দিলো পাতে। প্রতিদিন তুলে দিতে হয় না, আজ যে বহুদিন থেকে আলাদা একটি দিন। যে-নারী স্বামী হারিয়ে একা সে আজ থেকে আরো একা হয়ে যাচ্ছে। সে তার নিজের কক্ষে আসতেই মনে হলো জীবনের সবকিছু যেন কেউ টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে তার কাছ থেকে। চিঠি লিখতে বলবে কি? কত ছোট রোহণ, তবুও মনে হচ্ছে বড় এবং অনেক কিছু তার সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায় বড়র মতো। অনেক কিছু একদিন ভাগাভাগিও করেছে, এতোদিন তাকে আজকের মতো এই অভাববোধের মুখোমুখি হতে হয়নি বলে এতোকিছু মনেও আসেনি। বুকের ভেতর আজ টানাটানি চলছে উতল হয়ে। এতোদিন রোহণের অভাববোধ নিয়ে একবারও এভাবে ভাবেনি। আজ যেন সব ওলটপালট করে দিচ্ছে। অনির্বাণ ঘুমুচ্ছে। ও জেগে থাকলে কোলে নিয়ে এ-সময়ের বুকের ভার লাঘব করত, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে অনেক বেদনা ভাগাভাগি করে মায়েরা। আর পারল না, রোহণ বিদায় নিতে আসতেই একেবারে ভেঙে পড়ল চন্দ্র। দুহাতে আলিঙ্গনে বেঁধে হুহু কেঁদে দিলো। রোহণ হঠাৎ যেন একলহমায় অনেক বড় হয়ে গেল। সান্ত্বনা দিতে লাগল গভীর আশ্বাসে। বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধায়, ভালোবাসা ও সম্ভ্রমে। অথবা ওরা যেন দুটি ভাই-বোন, অথবা যেন মা ও সন্তান, অথবা গাছের কাছে আশ্রয় নিতে আসা কোনো শালিক, অথবা একজন ঢেউ অন্যজন ঢেউ-কবলিত নৌকো বা জাহাজ। রোহণ শান্ত করল চন্দ্রমল্লিকে। পশ্চিমের জানালা দিয়ে একফালি ম্লান জ্যোৎস্নার অবশেষ উঁকি দিয়ে দেখছে ওদের। পাহারা দিতে-দিতে সেই মলিন জ্যোৎস্না রোহণকে নিয়ে চলল নদীর ঘাটে। আলী ও রমেশ কাকা গেল ঘাট পর্যন্ত। খেয়াঘাটের মাঝি তখন নদীর ওপারে। আলী কাকা ডাক দিতেই একটা সম্পান আসতে লাগল দাঁড়ের শব্দ তুলে। নদীর বুকে খুব কাছ দিয়ে সাদা বক উড়ে যাচ্ছে খাবার খোঁজার নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সন্ধেয় এই পথে ফিরে আসবে রাতের আবাসে। ওদের পাখায় ধাতব মৃদু গুঞ্জন উঠছে, আর ফেলে-ফেলে যাচ্ছে সেই গান।

সাম্পান এসে রোহণকে নিয়ে তুলে দিলো দোভাষীর লঞ্চ তাজমহলে। ভাটার টান পড়েছে কর্ণফুলীতে। ভাটা শেষ না হতেই শহরে পৌঁছতে হবে। নইলে বেতাগী গ্রামের পাশে অল্প পানিতে লঞ্চ আটকে যাবে।

বাড়ি থেকে একা-একা অনেকদিনের জন্য কোথাও যেতে আনন্দ-বিষাদ যেমন চেপে ধরে, তেমনি একরকম শূন্যতা নিয়ে চলেছে সে। ভোরের সূর্য উঠছে দাপট দেখিয়ে। পেছন থেকে নীরবে ডাকছে বউদি, অনির্বাণ ও শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত দিনগুলো, ভিটের বিশেষ বিশেষ জায়গা। আলেয়া আর আসেনি, সেও আগের মতো অমলিন দিনগুলো নিয়ে ছুটে যেতে পারেনি। অনাবিল দিনগুলো আগেই কোথায় কেন জানি বেপথু হয়ে গেছে। আলী কাকার প্রৌঢ় ও বিষণ্ণ মুখ দেখে রোহণের মনে হয়েছে, সে একা, যা ফেলে যাচ্ছে তা সে আর কোনোদিন আগের মতো ফিরে পাবে না। আবার মনে হলো, সে মুক্ত, তার এই স্বাধীনতা চাই, একাকিত্ব দরকার এবং এতোদিনে এই প্রথম সে একা হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবু বুকটা ভারি হয়ে রইল। মুক্তির আনন্দে গা ভাসাতে পারল না। তাহলে কি যাকে সে মুক্তি বলছে তা মুক্তি নয়? একটি পিঁপড়ে এবং একটি গ্রহ-নক্ষত্রকেও…!

বাবা নেই, দাদা নেই। চাষবাস তেমনি চলছে। আলী ও রমেশ কাকা, নদী-কাকি ও শেফালির মা সবাই রইল ঘরে। শুধু রোহণ চলল। সেও একা নয়, সমস্ত ভাবনা-বিহবলতা লঞ্চে চড়ে চলেছে তার সঙ্গে সঙ্গে…।



পঞ্চম অধ্যায়

বিজ্ঞানে ভর্তি হলো রোহণ। মন চলে যায় বাংলা ও ইংরেজি ক্লাসে। ইংরেজির অধ্যাপক শামসুদ্দীন আহমদ নামজাদা সাহিত্যিক। তাঁর গল্পের বই পড়ে নিয়েছে রোহণ। বাংলার অধ্যাপকের কাব্যখ্যাতি মুগ্ধ করে। সহপাঠী মীনাক্ষীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বউদির ইচ্ছে রোহণ অধ্যাপক হোক। পদার্থবিদ্যা ও অঙ্কের সূত্রগুলো প্রথম থেকেই গিলতে শুরু করে দিয়েছে। স্মৃতি ও বাড়ির পরিবেশ যতই পিছুটান দেয় ততোই সে মরিয়া হয়ে পড়ায় ডুবে যায়। একরকম জেদ টেনে নিয়ে চলে। পড়া ও খেলার মাঠে সে জেদের বশে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।



প্রায় প্রবল খরা চলছে দেশে। জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহে রীতি অনুযায়ী বর্ষার মৌসুমি বায়ু এসে বৃষ্টি হওয়ার কথা। বিশেষ কোনো বছর তা দু-চার দিন পথে দেরি করতে পারে। পুরো বসন্ত ও গ্রীষ্মে মাত্র দুবার দুর্বল কালবোশেখি হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি হয়নি।       ঝড়-ঝঞ্ঝা এসে ধরণী ঠান্ডা করে দিয়েছিল। বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে দিন দিন। কমতে কমতে পঁচিশ ভাগে নামল। দুঃসহ গরম। মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন হোস্টেল আগুন হয়ে ওঠে। তখন রোহণের ইচ্ছে করে গ্রামে ছুটে যেতে, বাঁশবাগানের নিচে গা এলিয়ে শুয়ে পড়তে, নদীতে সাঁতার অথবা চিৎসাঁতারে ভেসে থাকা অথবা নদীর পাড়ে রাতে শুয়ে-শুয়ে আকাশের তারা গোনা বা উল্কাপাত দেখা ও গোনা। হয় না, তা আর হওয়ার নয়, পারে না সে। পড়ায় ডুবে যায়। উপন্যাস পড়ে পাঠাগার থেকে নিয়ে। বহু পুরোনো ও নতুন বইয়ে ঠাসা কলেজ পাঠাগার। অনুবাদ সাহিত্য পড়ে। রসায়ন আস্তে-আস্তে প্রিয় হয়ে ওঠে। আইনস্টাইনের বেহালা বাজানো ও রবীন্দ্রনাথের ছবি অাঁকায় মুগ্ধ। আইনস্টাইনের বেহালা শোনার কোনো উপায় নেই, রবীন্দ্রনাথে চিত্রকলা দেখার সুযোগ আছে কলেজেই। বই নিয়ে সে দেখল, নতুন এক জগতে ঢুকে যাওয়া যেন।

প্রবল গরমের এক বিকেলে রোহণ সহপাঠী মীনাক্ষীর বাসায় গেল। ওর মা-বাবা, ভাই-বোন ভরা ঘর। ওদের মাঝে নিজেকে খুব ভালো লাগল। মীনাক্ষীর মা তরমুজের রস দিলো বরফে ঠান্ডা করে। মীনাক্ষীর বোন এনাক্ষী রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার বই দেখাল। রজনীগন্ধার ডাঁটিটা বাঁকা করে দিয়েছেন বলে শিল্পী-কবিকে দুষল। শেষে মীনাক্ষী এসে যোগ দিয়ে বলল, ওটাই শিল্প, সোজা দৃঢ় উন্নত গ্রীবার রজনীগন্ধা সবাই দেখে। ডাঁটিটা কাঠিতে বেঁধে না দিলে বাঁকা হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ শিল্প করে তুলেছেন বাঁকাটিকে।

এনাক্ষী মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। সপ্রতিভ ভঙ্গিতে সে রোহণের সঙ্গে কথা বলল। ওদের পরিবারে প্রথম দিন এভাবে মিশতে দেখে মীনাক্ষী একসময় বলল, তুমি তো দিগ্বিজয় করে নিলে।

মীনাক্ষীও চন্দ্রমল্লির মতো কখনো-কখনো নিজেকে প্রকাশ করে, আবার সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে গুটিয়ে নেয় নিজের আবরণে। এণাক্ষীর চোখ-দুটি আলার মতো রহস্যে ভরা, চিবুক ও ঠোঁট একেবারেই যেন আলা। হাতপাখার হাওয়ায় গরমে পুড়ে রোহণ বুঝতে পারে ওরা দুবোন আলা ও বউদিকে মনে করিয়ে দেয়। মীনাক্ষীর মা রোহণের মা-বাবা-দাদার মৃত্যুর ঘটনাবলি শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। বলে, তুমি আমার ছেলের মতো এ-বাড়িতে এসো, কোনো সঙ্কোচ মনে রেখো না। রোহণ এতোদিন এতো কথা মীনাক্ষীকেও বলেনি। সবাই বসে শুনছে। এণাক্ষীকে দেখে রোহণের একবার মনে হলো, সে এসব শোনার জন্য প্রস্ত্তত ছিল না। তাই সে আস্তে-আস্তে চুপ করে গেল। সারাঘরে পাখার শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। রোহণ অপেক্ষা করে আছে ওদের কথা শোনার জন্য। কে প্রথম আরম্ভ করবে কেউ জানে না। রোহণও এই প্রথম তার পারিবারিক বিপর্যয়ের কথা বলে এই পরিস্থিতিতে পড়েছে। মীনাক্ষী মাথা নিচু করে আছে। মা অাঁচল দিয়ে চোখ মুছল। এণাক্ষী তাকাল রোহণের দিকে, যেন গ্রহান্তরের আগন্তুক। এ-সময় ওর বাবা এসে পড়লে আস্তে-আস্তে সবাই কথা শুরু করে।

মীনাক্ষী মাঝে-মাঝে কেন নিজেকে গুটিয়ে রাখে রোহণ তা একদিন আবিষ্কার করল। ওর বাঁ পায়ে একটা খুঁত আছে। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে সে, সব সময় নয়, মাঝে-মাঝে। সমাজে এরকম মেয়েরা খুব দুর্ভাগা। কোনো মা-বাবা দেখে-শুনে এরকম মেয়েকে ঘরের বউ করে নিতে চাইবে না। কোনো ছেলেও দুর্ঘটনা বা করুণাবশত ছাড়া প্রেমেও পড়বে না হয়তো। ওর শ্যামল রঙের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও শ্রী মানানসই হলেও ওই সামান্য খুঁত ওকে সবসময় সবার থেকে দূরে ঠেলে দেবে। মীনাক্ষীও সে-সম্পর্কে সচেতন। যাদের শরীরে কোনো খুঁত আছে তাদের নাকের ওপর সম্ভাবত একটা অদৃশ্য আয়না থাকে এবং অবাস্তব ওই আয়নায় নিজের শরীরের দোষটা ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে দেখতে পায়। সে কখনো ভুলতে চাইলেও তাই ভুলতে পারে না। অন্যরা ভুলে গেলেও সে নিজে ভোলে না। করুণাবশত কিনা রোহণ জানে না, মীনাক্ষী প্রথম থেকেই ওর বন্ধু হয়ে যায়। হয়তো গ্রাম থেকে এসে কলেজের বৃহত্তর জীবনের কোলাহলে পড়েই সে ওর মাঝে বন্ধুত্বের প্রশ্রয় পায়।

বন্ধুত্ব হয়ে যায় অজিতের সঙ্গে। সে শহরের একটি আশ্রমে থাকে। পড়ায় খুব মনোযোগী। প্রতিটি ক্লাসে সে মনোযোগী। ক্লাসের পর সোজা আশ্রমে চলে যায়। কথায়-কথায় সে আশ্রমবাসী সন্তের মতো ব্যবহার করে। এমনকি কীভাবে বীর্য ধারণ করতে হয় বা ঊর্ধ্বরেতঃ হতে হয় তাও একদিন রোহণকে ব্যাখ্যা করে শোনাল। ওটা তার আশ্রম গুরুর শিক্ষা। কিন্তু একদিন সে খুব   চিন্তিত হয়ে পড়ে গুরুর আচরণ দেখে। আশ্রমে মাঝে-মাঝে উৎসব হয়। সেই উৎসবে অনেক মানুষ আসে। অন্যান্য সময় আশ্রম নির্জন থাকে। পূর্ণিমার এক রাতে আশ্রমনিবাসী মন্দাকিনীকে গুরুর ঘরে অসংযত অবস্থায় দেখতে পায় সে। অজিত বলল, সেদিন আমার পেটের অসুখে বারবার ঘর-বার করছি। কী করব বুঝতে না পেরে ভাবলাম গুরুর কাছে যাই। গিয়ে দেখি গুরুর ঘরে আলো নেই। চাঁদের আলো ঢুকে পড়েছে জানালা দিয়ে। রাত তখন গভীর। সবাই ঘুমিয়ে। জানালায় যেতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। গুরুর কোলে বসে আছে সেবিকা মন্দাকিনী। মশারির ভেতরে মন্দাকিনী। গায়ে কাপড় নেই এবং তার পরিপূর্ণ নগ্ন বুক চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। দুটি পূর্ণ চাঁদের মতো। এতো সুন্দর শুভ্র বুক সেই প্রথম দেখলাম। আকাশের চাঁদের মতো সুন্দর বললেও কিছুই বলা হয় না, আস্তে-আস্তে রাহুর মতো মুখ বাড়িয়ে একটি চাঁদ গ্রাস করে নিল। আমি চোখ ফেরাতে না পেরে জানালা থেকে আড়ালে গিয়ে তারপর কী হয় দেখতে লাগলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলাম না। আমি ছুটে চলে এলাম আমার ঘরে। রাতে আমাদের নিয়ম ছিল কৌপীন পরে ঘুমানো। পেটের অসুখের জন্য ওটা তখনো পরিনি। আমার অসুখও তখন উধাও হয়ে গেছে। তারপর অজিত প্রশ্ন করল রোহণকে, আচ্ছা বলো তো, গুরুজিকে আমি কি আর আগের মতো শ্রদ্ধা করতে পারব?

রোহণও বিজ্ঞের মতো বলে দিলো, গুরুজনদের অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করতে হয়।

অজিত গোঁসাই সেদিন থেকে রোহণের আরো ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেল। তবুও রোহণ নিঃসঙ্গ। তেমনি নিবিড় বন্ধু আরো  দু জন। মুনীর ওর হোস্টেলের বন্ধু, সে ভালো ফুটবল খেলে। আর অজিত রোহণকে বলল কৌপীন পরে ফুটবল খেলতে, তাতে অন্ডকোষ খুব নিরাপদ থাকবে।



ষষ্ঠ অধ্যায়

মীনাক্ষীকে রোহণ পায় বাংলা ও ইংরেজি ক্লাসে। সে মানবিক ও রোহণ বিজ্ঞান বিভাগের। আস্তে-আস্তে গরমের দাবদাহ সহনীয় হয়ে ওঠে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা নোনা হাওয়ার জন্য। দোতলায় বাংলা ও ইংরেজি ক্লাস হয়। বেশ বড় কক্ষ। দক্ষিণের জানালাগুলো দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসে। রোহণ মাঝে-মাঝে মীনাক্ষীকে দেখে, হঠাৎ তার মনে হয়, সে বেশ বিষণ্ণ। বউদিকেও সে মাঝে-মাঝে এরকম দেখেছে। টুটু যেদিন থেকে গর্ভে আসে সেদিন থেকে এই বিষণ্ণতা দেখেছিল। কিন্তু মীনাক্ষীর কেন! মাঝে-মাঝে ক্লাসে আনমনা হয়ে যায় মাছের মতো ওর চোখ-দুটি। তখন সে পার্শ্ববর্তী সহপাঠীর সঙ্গেও কথা বলে না মনে হয়। রোহণ তখনো অাঁচ করতে পারেনি ওর কোনো অসুখ। আগে সে বরাবর ঝলমলে ও বেশি কথা বলত এবং নিয়মিত ক্লাস করত। কিন্তু এখন যেন দিন-দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। ক্লাস যখন থাকে না ওরা পাঠাগারে গিয়ে বসে। ছাত্রীদের জন্য বসার আলাদা জায়গা থাকলেও ওরা একসঙ্গে বসে পড়ে। এক জনের রসায়নের বই থাকলে আরেক জনের যুক্তিবিদ্যা। আনা কারনিনার চেয়ে মীনাক্ষীর প্রিয় অপরাধ ও শাস্তি। তলস্তয়ের ফাদার সিয়ের্গি মীনাক্ষীর ও অজিত গোঁসাইর খুব ভালো লেগেছে। রোহণ একদিন আবিষ্কার করল, উৎফুল্লতা ওর কিছুটা আরোপিত। উৎফুল্ল হয়ে কথা বলতে-বলতে একটু পরেই সে চুপ মেরে যায় অথবা কথা বলতে-বলতে খেই হারিয়ে ফেলে। ম্লান হয়ে যায়।

একদিন ক্লাস শেষে হাঁটতে-হাঁটতে রোহণ ওকে এগিয়ে দিচ্ছে বাসার দিকে। খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ের মোড়টা পর্যন্ত পৌঁছতে বেশ সময় কেটে যায়। রাস্তার দু পাশে পাহাড়। ফুটপাতে নির্বিঘ্নে পাশাপাশি হাঁটা যায়। বঙ্গোপসাগরের পাঠানো মনোরম হাওয়া গরমকে অনেকখানি সহনীয় করে তুলেছে। দু পাহাড়ের মাঝে হাওয়া ঢুকে মাতামাতি করতে-করতে ওদের শরীর থেকে মনও ছুঁয়ে দিলো। মীনাক্ষী হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। রোহণের খুব ভালো লাগল ওর হারানো হাসি ফিরে এসেছে দেখে। বইগুলো দু হাতে বুকে চেপে ধরে মীনাক্ষী হাঁটছে। একটা ঢাকনাহীন ম্যানহোল। সামনে পড়তেই সে রোহণের বাহু ধরে টান দিয়ে বলল, তোমার উচিত নয় অলিকে কোনো কথা দেওয়া।

কী কথা?

তোমার উচিত হবে না সমবয়সী কাউকে বিয়ে করা।

তুমি এসব জানলে কী করে? সমবয়সীকে বিয়ে করলে কী হয়? অথবা বড়কে?

মেয়েরা তাড়াতাড়ি অনেক বেশি বোঝে।

আর?

তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায় মেয়েরা। শরীরের মধ্যে শরীর ধারণ করে বলে।

আর?

মেয়েরা নিজের চেয়ে বিদ্যাবুদ্ধিতে কাউকে বড় মনে না করলে তাকে বিয়ে করতে চায় না।

ভালোবাসলেও না?

ভালোবাসা ও বিয়ে এক নয়।

হঠাৎ তোমার মনে এসব এলো কেন?

তোমার পারিবারিক অবস্থা বলছে, তুমি তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে। কিন্তু অলিকে বিয়ে করো না।

সঙ্গে-সঙ্গে রোহণের মনে পড়ে গেল বউদির মায়ের সেদিনের কথা। বউদি অলির চেয়ে বয়সে বড়, এক ছেলের মা। কিন্তু সুন্দর সুকোমল একটি হৃদয় আছে ওর। তবুও রোহণ কী করে তাকে বিয়ে করে? আবার ভাবে, কেন করবে না। করা যায়।

মীনাক্ষীর দিকে তাকিয়ে সে চুপ করে গেল। বিষণ্ণ এক খন্ড মেঘ মীনাক্ষীর সারা মুখে ছায়া ফেলেছে। ইস্পাহানি পাহাড়ের পথ ছেড়ে ওরা আরো নির্জন সার্সন সড়কে ঢুকছে। ওই নির্জন ও গাছপালাঘেরা পথে একটিও গাড়ি নেই। হওয়ায় মীনাক্ষীর চুল আরো এলোমেলো ও উতল হয়ে উঠেছে। এ সময় মনে হয় ওর বিষণ্ণতা ঢাকা পড়ে গেছে মুখে।

তখনই রোহণ বলল, তোমার কী হয়েছে বলো তো?

কই? কিছু হয়নি তো? – তারপর আরো সপ্রতিভ হয়ে বলল, কেন একথা বলছ? তোমার মুখে বিষাদের ছায়া দেখলাম, আবার ঢাকা পড়তেও দেখলাম যেন।

ও কিছু না।

কোনো অসুখ? – উদ্বেগের কাছাকাছি গিয়ে রোহণ বলল যেন।

এবার সে নিজেকে আড়াল দিলো না। রোহণের দিকে চোখ তুলে নিঃসঙ্গপ্রায় গলায় বলল, তুমি ঠিক ধরেছ। বলে কপোলের চুল সরিয়ে দিল নিঃসঙ্গ হয়ে।

কী কষ্ট তোমার?

আমার জ্বর, শীত-শীত করছে।

ওর হাত ধরে দেখল রোহণ। খুব সামান্য তাপ। হাত ছেড়ে উদ্বেগ-বিদীর্ণ সহানুভূতিতে বলল, ওষুধ খাও?

খুব সামান্য। হয়তো জ্বরই নয়। বলে তুচ্ছ হাসি জানাল যেন কাউকে।

তবুও। অবহেলা করছ? সামান্য জ্বরকে অবহেলা করতে নেই। বড় জ্বর থেকে ছোট জ্বর বেশি বিপন্নতা ডেকে আনে।

তাতেও সে কিছু বলল না। খাওয়া-দাওয়া এবং দু বছর আগে ধরা পড়া অন্ত্রের ঘা সম্পর্কে কিছুই জানাল না। নিয়মিত তরল জেলুসিল খাওয়া, খাওয়ায় অরুচি, সারা শীত-গ্রীষ্ম গায়ে-গায়ে জ্বর বয়ে বেড়ানো – কিছুই না। রোহণও ওর বিষণ্ণ মুখ নিয়ে বেশিকিছু ভাবেনি। ওই না ভাবনা নিয়ে বলল, মা-মাসিকে বলো।

চট্টেশ্বরী মন্দিরের পাশেই ওদের বাসা। পাহাড় আর নির্জনতার মাখামাখিতে চমৎকার পরিবেশ। ওদের চার কামরার ঘর। বসার ঘর তো আছেই। আলাদা রান্নাঘরও। আবার সে অলির কথা তুলল। আড়চোখে চেয়ে স্বস্তিদায়ক গলায় বলল, চিঠি দেয় সে?

না।

বাড়িতে যে একদিনের জন্য গেলে দেখা করোনি?

দেখা হয়েছে। কিছু বলেনি।

কিছুই না?

শুধু পায়ের পোড়া দাগটা কতখানি আছে, মিলিয়ে গেছে কিনা দেখল।

তোমার শহর-জীবন, পড়াশুনোর খোঁজ?

না। আর কিছু নয়। সে বিজ্ঞান নিয়েছে। বেশি কিছু জানতে পারিনি। পড়াশুনো, সহপাঠী বা যেসব বিষয়ে আগে ওর সঙ্গে আলোচনা হতো সেসব কোনো কিছু নিয়ে সে মুখ খোলেনি। সে নিজেকে এতো বেশি গুটিয়ে নিয়েছে যে, আমি সে-জট খুলতে পারিনি।

আলেয়ার কথা বলতে-বলতে রোহণও বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। তার ওপর ছায়া পড়েছে ফেলে আসা সার্সন সড়কের নির্জন নিবিড়তা ও গাছপালার হু-হু সরসর বকুনি। মীনাক্ষীও আর ওকে ডাকল না ঘরে যেতে। রোহণও ভারাক্রান্ত মনে ফিরে চলল। সার্সন সড়কের পথ না ধরে সোজা চকবাজারের দিকে পথ ধরল, ওদিকে কলেজ আরো কাছে মনে হয় ওর। সেই প্রথম বার ওদের ঘরের খোলামেলা পরিবেশ ঝলমল মনে হয়েছিল। আজ সেই মীনাক্ষী ক্লান্ত ও অসুস্থ। আগে জানতে পারলে সে কিছুতেই ওকে হেঁটে আসতে দিত না, রিকশা নিত।



সপ্তম অধ্যায়

কলেজের ফুটবল দলের সেরা একজন হয়ে উঠল রোহণ।        আন্তঃকলেজ ফুটবল প্রতিযোগিতায় ওদের কলেজ একের পর এক জয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রবল গরমের পর প্রবল বর্ষা নামল ঘনবর্ষণ নিয়ে। কদিন ধরে একটানা বৃষ্টি চলছে। কয়েক ঘণ্টার জন্য বৃষ্টি থামলেও সূর্য দেখা যায় না। আমন ধানের চাষ শুরু হয়েছে। উঁচু জমির জন্য প্রথম আষাঢ়ে বীজতলা তৈরি করা দরকার। শহরের উন্মুক্ত বড়-বড় নালা বৃষ্টির পানি নিয়ে ছুটছে পাহাড়ি নদীর মতো। কূলের অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। রোহণদের কাছেই চকবাজার। সেখানে কোমর সমান পানি। সেই পানি এতো নোংরা যে তাদের কোনো পূর্বসূরি নেই। রিকশাযাত্রীরা পা তুলে আসনে বসে আছে। চালকের প্রায় কোমর পর্যন্ত অশীল পানি। তারপরও আকাশের গর্জন থামে না। বর্ষণও না।

বাড়ি থেকে চিঠি এসেছে, আলী কাকা অসুস্থ। এক রাতের জন্য হলেও বাড়ি যাওয়া সম্ভব কিনা চন্দ্রমল্লি জানতে চেয়েছে। এদিকে পরীক্ষারও বেশি দিন বাকি নেই। রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও অঙ্ক পড়ছে অধ্যাপক জগৎ চৌধুরীর কাছে। ফাইনালে উঠেছে কলেজ ফুটবল দল। বজ্রপাত হচ্ছে ঘন-ঘন, আকাশ ফালা-ফালা করে। বেশ কিছুদিন ধরে মীনাক্ষীদের বাসায় যায় না রোহণ। আম পাকতে-পাকতে কাঁঠালেও পাক ধরেছে। অনির্বাণ কেঁদে-কেঁদে কাকে যেন খোঁজে। বৃষ্টি আর বৃষ্টিতে বাঁশগুলো ঝাড়ের চারদিকে নুয়ে পড়েছে অনেকখানি। পুকুর টইটম্বুর, পুকুরের মাঝখানের বাঁশ ডুবে যেতে আর দেরি নেই। দাঁড়াশ সাপ নির্ভয়ে পুকুর পাড়ি দিচ্ছে। কালো জাম পেকে বৃষ্টিতে ঝরে যাচ্ছে, পাখিদের খাওয়ারও সময় দেয় না বৃষ্টি। চারদিকে শুধু বৃষ্টির সুস্বর আর নগরবাসীর দুর্ভোগ। চট্টগ্রাম শহরের বিখ্যাত নালাগুলোর দুপাড়ের বাসিন্দাদের সরে যেতে বলছে কর্তৃপক্ষ। চাষিরা আষাঢ়ের পনেরো তারিখ হয়ে গেল উঁচু ধানজমির বীজতলায় বীজ ছিটোতে পারেনি। এদিকে বীজধান অঙ্কুরিত হয়ে গেছে, কিন্তু বীজতলার জমি তৈরি হলেও বৃষ্টিতে ছিটানো যাচ্ছে না। বৃষ্টির ওপর বৃষ্টি পড়ছে।

রোহণের কলেজ ফুটবল দল ফাইনালে উঠেছে। বেশ কিছুদিন ধরে রোহণ মীনাক্ষীদের বাসায় যেতে পারছে না। এরকম অনেক কাজ ঘাড়ে এসে পড়লে ওর ভালো লাগে। বউদির চিঠির উত্তর দিয়েছে। শুধু মন খারাপ আলী কাকার অসুখের জন্য। অনেক নোট নিয়েছে প্রয়োজনীয় প্রশ্নের। ঘুম কমে গেছে।

ঠিক সে-সময় এনাক্ষী একদিন হোস্টেলে এসে জানিয়ে গেল, মীনাক্ষীর অসুখ জটিল হয়ে উঠেছে। অঝোরে আবার বৃষ্টি নামল বিকেল থেকে। আধভেজা হয়ে রোহণ মীনাক্ষীদের বাসায় গিয়ে পৌঁছল। পরীক্ষা এসে পড়ল বলে ক্লাস বন্ধ হয়ে গেছে। এজন্যও মীনাক্ষীর সঙ্গে কিছুদিন ধরে দেখা হয় না। অনেকদিন পর ওর সঙ্গে দেখা হওয়ায় সে বিমূঢ়। মীনাক্ষী তো নয়, যেন অন্য কেউ তার সামনে দাঁড়িয়েছে। সুন্দর চোখ-দুটি ক্লান্তি ও বিষণ্ণতায় মাখামাখি হয়ে তার সামনে উপস্থিত। ঝলমল চঞ্চল দৃষ্টির লেশমাত্র তাতে নেই। শুকিয়ে কালো কালো হয়ে গেছে, গায়ের উজ্জ্বল শ্যামল আলোছায়ায় কে যেন কালি লেপে দিয়ে গেছে। রোহণকে দেখার সঙ্গে-সঙ্গে বলল, তুমি ভিজে গেছ। তারপর আর একটুও অপেক্ষা না করে তাড়াতাড়ি ও-ঘরে উড়ে গিয়ে একখানা লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি নিয়ে এসে কাপড় বদলে নিতে বলল। যাওয়ার সময় ঘরের পর্দা টেনে দিয়ে গেল। সংলগ্ন স্নানঘরে ঢুকে রোহণ কাপড় বদলে নিল। ওটা মীনাক্ষীর ঘর। বেরিয়ে বইপত্র নাড়াচাড়া করতে লাগল। একটু পরেই সে হাতে করে সরষের তেলেমাখা মুড়ি এনে দিয়ে বলল, খেয়ে নাও। ইস্, তুমি নিজের চেহারার দিকে কয়দিন তাকাও না বলো তো? কী চেহারা করেছ? সারাদিন কি ফুটবলই খেলো শুধু? রাতে ঘুমোও না, সারারাত পড়া করো শুধু!

ওর বকবকানি ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে সে দেখে এরই মধ্যে মীনাক্ষী চুল পরিপাটি করে এসেছে, শাড়ি বদলে উজ্জ্বল হয়েছে। মা এসে বলল, কতদিন তুমি এদিকে আসো না! কেন বলো তো? পরীক্ষার পড়া? বাড়ির খবর ভালো তো?

ছোট ভাই বিদ্যুৎ এসে বলল, এই মরশুমে কয়টা গোল দিলে? আমি বড় হয়ে ফুটবলার হবো। মারাদোনা আমার প্রিয়, প্রিয় দেশ আর্জেন্টিনা। বলতে-বলতে সে আবার তেমনি চলে গেল। এণাক্ষী এসে কিছু না বলে এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল। মা, ভাই বা মীনাক্ষী কেউই অসুখের কথা বলল না একবারও। মীনাক্ষীর বাবা বাইরে। রোহণ মুড়ির সঙ্গে সরষের তেলের স্বাদ নিচ্ছে। নাক দিয়ে ঝাঁঝ বের হচ্ছে। সঙ্গে আদা ও পেঁয়াজ কুঁচিও আছে। বাদামও। বৃষ্টিও ঝরছে অঝোরে, ওর শক্তি একটু কমছে না। এই হলো চট্টগ্রামের আদিম বৃষ্টি…।

আস্তে-আস্তে বৃষ্টির বাড়ির অন্দরমহল থেকে যেন মীনাক্ষী বলল, পরীক্ষার প্রস্ত্ততি কেমন হলো?

মুড়ি খেতে-খেতে সে উত্তর দিচ্ছে এটা-ওটা। কোনোটিও হয়তো ভালো করে দেওয়া হয়নি। মনে-মনে ভাবছে, মীনাক্ষীর অসুখ গুরুতর, নাকি পড়তে-পড়তে অমন কালশিটে মেরে গেছে? একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলেছে সে। ওর মা চলে গেছে চা করতে। এণাক্ষী দুম্ করে বলল, তুমি কত দিন আসো না বলো তো?

রোহণ আস্তে-আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলল, তোমার সেই আলসার কি বেড়েছে?

কে বলল বেড়েছে? রোজ ওষুধ খাচ্ছি। – মীনাক্ষী যেন সামান্যও দ্বিধার ধারে-কাছে না গিয়ে বলল।

তাহলে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?

না, ভালো হয়নি। দিদি প্রায় সময় শুয়ে-শুয়ে পড়ে বুকে বালিশ দিয়ে অথবা চিৎপাত হয়ে। ডাক্তার বলেছে ঢাকায় নিয়ে যেতে। বাবা ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত, সময় করতে পারছে না যেতে। – এণাক্ষী অভিমান ও গাম্ভীর্য নিয়ে বলল।

মীনাক্ষী, মনে হচ্ছে তুমি নিজেকে খুব অবহেলা করছ। ওষুধ খেলেও যখন ব্যথা সারে না তখন ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার। কবে ঢাকা যাচ্ছ? কেন অবহেলা করছ বলো তো? – রোহণ উদ্বেগ ও সহানুভূতি নিয়ে বলল বৃষ্টি নিয়ে ভাবতে-ভাবতে।

মীনাক্ষী সম্পন্নতায় রোহণের দিকে তাকিয়ে রইল। সেখান থেকে ফিরে বলল, আমি আর বাঁচব না। খুব বেশি হলে তিন কি চার মাস।

কী বকবক করছ? এরকম হতাশার কথা তো তোমার মুখে কখনো শুনিনি?

এ-সময় এণাক্ষী আস্তে-আস্তে চলে গেল, যেন রিলে দৌড়ের কাঠিটা রোহণের হাতে তুলে দিয়ে গেল।

ডাক্তার বলেছে আমার অপারেশন দরকার। এখানে নয়, ঢাকায় হবে।

আলসারের অপারেশন?

না, আলসার নয়।

ঠিক তখনই চা নিয়ে ঢুকল এণাক্ষী এবং চা রেখে একটিও কথা না বলে কারো ভালোলাগা অসংবৃত না করে চলে গেল।

রোহণ কিছু খুঁজে না পেয়ে বলে দিলো, টিউমার?

না। গলব্লাডার, হৃৎপিন্ডের কিছু। – যেন অভিজ্ঞতার বাক্সো খুলে খুঁজে-পেতে বলল।

হার্ট আমার ভালো। – তারপর হাসতে-হাসতে বলল, কাউকে হৃদয় দিয়ে বসিনি যে উৎপাত সহ্য করতে হবে।

কাউকে না ভালোবাসা সুস্থতার খাঁটি লক্ষণ নয়। ভালোবাসাও বোধহয় অসুস্থতা নয়।

চমৎকার বললে। তাহলে ভালোবাসতে হয়। তুমি বাসবে? – বলেই ঝটপট হেসে ছুড়ে মারল তীর, কাল ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বা বারান্দা থেকে যাকে প্রথম দেখতে পাই তাকেই ভালোবাসা জানাব।

কাগজ কুড়োনির ছেলে, তরুণ মেথর বা যুবক ফেরিওয়ালা হলে? তবে তো রূপকথার গল্প হয়ে যায়।

ঠাট্টার কথা নয়। সত্যিই। কিছুদিন ধরে শুধুই মনে হচ্ছে বুকটা কেবল শূন্য প্রান্তর, কী যেন নেই, কিছু একটা যেন পাওয়ার আছে। আমি যদি কবিতাচর্চা করতাম এ-সময় চমৎকার কবিতা লিখে বসতাম। আমার বিশ্বাস কবি-সাহিত্যিকেরা এ-রকম সময়েই জীবনের সেরা লেখা লিখে গেছেন। একে ‘হৃদয়ের উর্বরতা’ নাম দেওয়া যায়।… কিছুই ভালো লাগে না অথচ সবকিছু শূন্যসুন্দর মনে হয়। বিশ্ব বিষণ্ণতায় মন ভরে আছে অথচ একটি ঘাসফুলের মাঝেও প্রফুল্লতা আছে যেন। কিছু একটা করার জন্য মন ছটফট করে, কাউকে সব কিছু খুলে বলতে ইচ্ছে হয়, অথচ কী কথা তা জানি না। বুকের ধুকপুক নিজে শুনতে পাই, ইচ্ছে করে ও-ঘরে যাই, মাকে বলি, এণাক্ষীকে বলি, বিদ্যুতের সঙ্গে বকবক করি, বাবাকে বলি সমুদ্র দেখতে যাব – কিন্তু কিছুই করা হয় না, শুধু  শুয়েই থাকি। শুয়ে-শুয়ে আকাশ-পাতালে তোলপাড় তুলি… আমার মনে হয় ভালোবাসতে পারলে মুক্তি পাব, একজন যুবককে সব বলতে চাই, হৃদয়ের এই উর্বরতার ভার দিতে চাই… ভাগবাটোয়ারা… নক্ষত্রভরা রুপোলি রাতের আকাশ…।

কেউ কি প্রত্যাখ্যান করেছে?

ভালোই বাসিনি তো প্রত্যাখ্যান কে করবে!

তাহলে দুঃখ কিসের? কিসের অপারেশন তাও তো বললে না।

শুনবে?

তুমি আমার বন্ধু, হৃদয়ের বোন, আমার সহপাঠী, আমার…

রোহণের মুখের কথা কেড়ে দিয়ে বলল, শুনবে?

এভাবে শূন্য গহবর থেকে বলছ কেন? কী হয়েছে তোমার?

তুমি খেলোয়াড়, সহ্য করার শক্তি তোমার রয়েছে। তোমাকে দেখে শক্তি খুঁজে পাই। তুমি আমার সঙ্গে-সঙ্গে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেছ কিনা জানি না, আমি কিন্তু সাহস খুঁজে পেয়েছি, প্রেরণার উসকানিও বলতে পার। আমার মা কি চোখে দেখেছে জানি না, বোন ও ভাইও না। শুধু বাবা জানে। বাবাও আমাকে বলেনি। ডাক্তার বলেছে। অপারেশন করা দরকার বলে দিয়েছে। আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, আর এও জানি যে আমার আয়ু মাত্র তিন মাস। – আচ্ছন্নতার শেষ প্রান্ত থেকে যেন সে বলল।

রোগের কারণ বা রোগ ধরা পড়লে বাঁচবে না কেন?

দেরি হয়ে গেছে বলে। দেখছ না কালো হয়ে গেছি! শুকিয়ে যাচ্ছি!

তুমি বরাবর শ্যামলা, ফর্সা ছিলে কবে? – ওকে জাগিয়ে তোলার জন্য এবং সন্দেহমুক্ত করার জন্য বলল রোহণ।

তুমি যা-ই ভাবো না কেন, আমার এরকম কালশিটে রং কখনো ছিল না। তোমার সঙ্গে পরিচয়ের দিন তুমি ঝলমলে চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিলে, এরকম দেখতে হলে ওভাবে তাকাতে না। বন্ধু হতে বলতে না।

মোটেই না। তুমি আমাকে চিনতেই পারনি। ঝলমলে চোখে তাকিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তুমি একটুও মূল্য দাওনি তার। আমার আগ্রহ ও প্রশংসার মর্যাদা দিয়েছিলে কি?

মোটেই ভালোবাসা বা ভালো লাগা ছিল না তোমার চোখে। তুমি গ্রাম থেকে এলেও তোমার চোখে আনাড়িপনা ছিল না। তুমি সেদিন সূচনা বন্ধুত্বই চেয়েছিলে এবং আমিও সম্ভবত বুঝতে ভুল করিনি।

মীনাক্ষীর কথাই হয়তো ঠিক। কিন্তু আজ রোহণ তা আর মানছে না। ওকে এখন জাগিয়ে তোলা দরকার, ওর নিজস্ব ভালোবাসা দরকার। রোহণ সত্যকে পাশে ঠেলে দিয়ে মধুর মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলল, আমার এতোদিনের বকেয়া দাও। দু বছর হতে চলল, এতোদিন নিজেকে আড়ালে রেখেছিলাম, আর নয় – বলতে বলতে মীনাক্ষীর হাত ধরতে যেতেই সে হাত সরিয়ে নিল।

মীনাক্ষী যেন কৃষ্ণবিবর থেকে মুখ তুলে বলল, তুমি তো কোনোদিন এভাবে কথা বলোনি! তুমি ভুলে ভেসেও ভালোবাসার কথা উচ্চারণ করোনি।

তুমিই বন্ধু বলে, ভাই বলে, সম্পর্কের সূচনা সীমারেখা টেনে দিয়েছ। আমি সবসময় তার বেশি কিছু আশা করেছিলাম। শুধু এই কয় মাস সময় পাইনি তোমার মনের খোঁজখবর নেওয়ার।

এ-সময় রোহণ মীনাক্ষীর হাত তুলে নিল বন্ধুত্বের প্রতিদান দিতে। এবার মীনাক্ষী হাত সরিয়ে নিল না, কিন্তু জানালার ভেতর দিয়ে চোখ চলে গেল বহুদূর, বোধ হয় আকাশের কোথাও সেই কৃষ্ণবিবরে। সেখান থেকে সে বলল, তোমার হাত কী ঠান্ডা!

রোহণ বুঝতে পারল মীনাক্ষীর গায়ে জ্বর, আঙুল ও হাত কাঁপছে হাওয়ায় আন্দোলিত পদ্মপাতার মতো। ওর আর সন্দেহ রইল না মীনাক্ষীর কথায়। রোহণ ফের বলল না যে ওর নিজের হাত ঠান্ডা লাগার কারণ মীনাক্ষীর গায়ে জ্বর আছে বলেই। এবং বলল, বৃষ্টিতে ভিজেছি তো তাই ঠান্ডা। তোমার হাত থেকে একটু উত্তাপ নিই। আমাকে একটু উষ্ণতা দাও। শীতের দিনে কেউবা আগুন বা সূর্যের কাছে চায়, আমি তোমার কাছে চাইছি।

খোঁড়া পা ও অসুস্থতার জন্য করুণা ঢেলে দিচ্ছ না তো?

আমাকে ভুল বুঝো না যেন।

সঙ্গে সঙ্গে মীনাক্ষী তাকাল রোহণের দিকে। রোহণ তখন ভাবল, যদি আমি ভুল বুঝে না থাকি তাহলে বলছি – মীনাক্ষী যেন আড়মোড়া ভেঙে বাঘিনীর মতো জেগে উঠল। তীক্ষ্ণ চোখ বুলিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরীক্ষা করে নিল, পরখ করে দেখল রোহণ তার বন্ধু নাকি প্রিয়তম।…

ওর এই রূপ দেখে রোহণ শিউরে উঠল। মীনাক্ষী ভুল করে ভাবল রোহণ বুঝি ভালোবাসার ভারে কেঁপে উঠল।

এতো কিছু ঘটে যাওয়ার পরও মীনাক্ষী বলতে ভুলল না যে দুরোরোগ্য রোগ তার মধ্য বাসা বেঁধেছে।



মীনাক্ষীর বাবা এসে তখন ঘরে ঢুকল। রোহণকে বলল, তোমাকে ডাকতে পাঠিয়েছিলাম আমি। মীনাক্ষীকে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। তোমার তো সামনে পরীক্ষা, তোমাকে তাই যেতে বলব না। তুমি ভালো ছাত্র, তোমার পড়ায় ক্ষতি হওয়া উচিত নয়।

রোহণ তাড়াতাড়ি বলল, না, না, আমি যাব। ওর পাশে থাকতে চাই আমি। আমার দ্বারা যদি ওর উপকার হয়!

কখ্খনো না, তুমি যেতে পারবে না। তোমার বাড়িতে যাওয়া দরকার আগে। আলী কাকার অসুখ, তোমাদের চাষবাসের কী অবস্থা তা তোমার নিজে গিয়ে দেখে আসা দরকার। তারপর তোমার সামনে পরীক্ষা। – মীনাক্ষী বলে দিলো।

ঠিক তাই। আলী কাকা খুব অসুস্থ। নদী-কাকি হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। বউদি চিঠি দিয়েছে যেতে। অনির্বাণ হাঁটছে। বাড়ির পাশের নদীতে ভাঙন শুরু হয়েছে হঠাৎ করে। এদিকে পরীক্ষারও দেরি নেই। মীনাক্ষীর বোধহয় পরীক্ষাই দেওয়া কঠিন হবে। দু দিনের জন্য হলেও রোহণের বাড়ি যাওয়া দরকার। রোহণ তাড়াতাড়ি বলল, আপনাদের ঢাকায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসব না হয়। –  এক নিশ্বাসে রোহণ সব বলল।

মীনাক্ষী কিছুতেই রাজি হলো না। জোর গলায় বলল সে, না, এখন নয়, এখন তুমি যেতে পার না।

বাইরে তখনো বৃষ্টি। অাঁধার ঘনিয়ে এসেছে। মীনাক্ষীর বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে রোহণের হাত ধরে বলল, অবুঝ হয়ো না। আমি যখন ডাকব তখন যেও। তোমাকে দেখার খুব ইচ্ছে হবে যখন, তখন তুমি যেও। আমি তোমার ভেতরের তোমাকেও ডাকব। – বলতে-বলতে সে রোহণের হাত তুলে নিয়ে গালে চেপে ধরল। আবার বলতে শুরু করল, ডাকলে যাবে তো? যেও। যাবে তো?… ও আমার প্রিয় বন্ধু! ও আমার…

বলতে-বলতে ওর চোখে অশ্রু নেমে এলো। রোহণ তাড়াতাড়ি রুমাল খুঁজতে পকেটে হাত দিলো। প্রায় ভেজা রুমাল। ওই দিয়ে চোখ মুছে দিতে-দিতে বলল, এই প্রথম তুমি আমার ইচ্ছেয় বাধা দিলে না। কী সুন্দর তুমি!

তারপর রোহণ বোধহয় সত্যি কথাটা বলল, তোমাকে ভালোবাসি মীনাক্ষী…।

চোখে চোখ রেখে সে বলল, আজ বিশ্বাস করছি। কিন্তু… আমার যে দিন ঘনিয়ে এলো। কেন এতোদিন পর এতো আকুল করে বললে! এতো অবেলায়!

কিছুই ফুরোয় না, ভালোবাসা তো ফুরোবার ধন নয়।      জন্মান্তরেও সে প্রবহমান। কখনো তো কিছুই ধ্বংস হয় না, আর যদি হয়ও সঙ্গে-সঙ্গে আবার জন্ম নেয় অন্য একরকম সুপ্রসন্ন হয়ে। পৃথিবীর কোনো শক্তির বিনাশ নেই, একেবারে ফুরিয়ে যায় না, নবজন্ম হয়।



‑অষ্টম অধ্যায়

বৃষ্টিশেষে আকাশে তারা উঠেছে যেন একেকটি বল্লমের তীক্ষ্ণধার ফলা। ঝিঁঝি ও ছোট ব্যাঙ ডাকছে একটানা। নদীতে ঢল। মোটরলঞ্চ তাজমহল যাত্রী নিয়ে উজানপথে গজরাতে গজরাতে সারাপথ এলো। কূলে উঠেই রোহণ দেখল আকাশে অনেক তারা। গ্রামের আকাশে একসঙ্গে অনেক তারা দেখা যায়। মিথুন রাশি পশ্চিমের স্রোতের টানে ঢলে পড়েছে। তাদের পা-জোড়া দিগন্তে প্রায় ডোবার অবস্থায় এসে পড়েছে। তার দক্ষিণে শূনী মন্ডলের তারা প্রভাস দিগন্তের সামান্য ওপরে জ্বলজ্বল করছে। দক্ষিণ-পশ্চিমে আকাশজুড়ে বিশাল হ্রদসর্পের রাজত্ব। আকাশের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং আয়তনে সর্বাপেক্ষা বড় এই তারামন্ডল। আরবি জ্যোতিষে একে সাপরূপী শয়তান বলে। হিন্দু পুরাণের শ্রীকৃষ্ণ কালীয় সাপ দমন করে তাকে আকাশে এই হ্রদসর্প করে রেখেছেন। তার মাথা গিয়ে ঠেকেছে পশ্চিম আকাশের মধ্য রেখায়, ঠিক মাথার ওপরে, তার লেজের ওপরে দাঁড়কাক ‘করভাস’ বসে আছে। আকাশের তারাকেও মানুষ মনের মাধুরী দিয়ে রচনা করেছে।

বৃষ্টিশেষে মেঘহীন আকাশের তারার আলোয় পথ দেখে রোহণ গ্রামে ফিরছে। মাঝে-মাঝে হাঁটুর নিচে পর্যন্ত কাদায় ডুবে যায়। পাড়ার ঘর থেকে কুপিবাতির আলো এসে পড়ে চোখে। বউ-ঝিয়েরা এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যেতে অাঁচলে আগলে নিয়ে যায় কুপিবাতি। ডাকাডাকি শোনে। মাকে ডাকছে ছেলে, আরেক মা বকছে মেয়েকে। কুকুর ডেকে ওঠে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। তারার আলোতেও সে বুঝি দেখতে পায় গ্রামের মানুষের আশা ও দুর্দশার গলিতসুন্দর রূপ। একটু পরেই হয়তো ছোটরা খেতে বসবে। শীর্ণ বা বলশালী হাতে মা পরিবেশন করবে ছেলেমেয়েদের, স্বামীকে। তারপর যা থাকে সে নিজে খেয়ে নেবে থালা চেটেপুটে। তবে      দু-মুঠো হলেও ভাত হাঁড়িতে রেখে দেবে। তাতে পানি দেবে এক খোরা, পরদিনের পানিভাতের জন্য। সকালে হয়তো সবাই পানিভাত পাবে না। প্রতিদিন সকালে পেট পুরে পানিভাত খেতে পারাও একরকম বিলাসিতা। দু-চার মুঠো ভাতের সঙ্গে পানি মিশিয়ে পেট পুরে খেতে পারাটাও সৌভাগ্যের – আমার সন্তান যেন থাকে পানিভাতে বলার মতো।

রোহণের আয়ের উৎস নিজেদের জমি ও কৃষি। ফসল না হলে অস্তিত্ব বিপন্ন। এ-বছর খরায় রবিশস্য ভালো হয়নি। আলী কাকা ও রমেশ কাকার মাস-মাইনের টাকা বকেয়া পড়ে গেছে। ছোট পল্টুকেও খাওয়া-দাওয়া বাদে বছরে ছয়শো টাকা দিতে হয়। কাপড়-চোপড় তো আছেই। নদী-কাকিরা আছে। গোলার ধান বেচে সে-বছর জিহানের অসুখ ও শেষকৃত্যের খরচ মেটাতে হয়েছিল। তখন খরার সমস্যা ছিল না। চন্দ্রমল্লি মাঝে-মাঝে যেন বিরক্তির বিরক্তি প্রকাশ করে। এদিকে নদী এগিয়ে আসছে ভিটের দিকে। হালের একটা গরু খুরা রোগে মরে গেলে আরেকটি কিনতে অনেক টাকা বেরিয়ে গেল। সুখের সংসারেও এরকম উটকো খরচ পা ছড়াতে আসে। দুঃখের সংসারের কথা আর কে বলবে।

উঠোনে পৌঁছেই অনির্বাণকে গলা ছেড়ে ডাক দিলো রোহণ। রমেশ কাকা বেরিয়ে এলো। শেফালির মা বের হলো। সবশেষে বউদি চন্দ্রমল্লি প্রায় ছুটে এলো। পুকুরে গিয়ে কাদা ধুয়ে নিতে নেমে রোহণ একেবারে স্নান সেরে নিল। আলিঙ্গনে বেঁধে নিল শৈশবের পুকুর ও স্মৃতিস্বপ্ন। অথবা পুকুরই কোলাকুলিতে অস্থির করে তুলল। ঘাটে হারিকেন টাঙানো রইল প্রহরীর মতো। মাঝপুকুরে বাঁশটি ডুবো-ডুবো ও স্মৃতির চোখে দেখছে। একবার ইচ্ছে হলো তাকে ছুঁয়ে আসে, দোনামনা করে গেল না, আগামীকালের জন্য জমা রেখে উঠে এলো কূলে। গামছা, সাবান, লুঙ্গি পাঠিয়ে দিয়েছিল বউদি। নির্ভার হয়ে গেল শরীর, জোনাকিদের সঙ্গে অনেক-অনেক স্মৃতি ঝিকিমিকি খেলে গেল আগু-পিছু বিবেচনা না করে। পুকুরপাড়ের গাছপালার ছায়ারা ফিসফিস করে কথা বলছে যেনবা!

অনির্বাণ ঘুমে কাদা। মুখের কাছে ডান হাতের বুড়ো আঙুল। আঙুল চোষার অভ্যেস এখনো পুরোপুরি ছাড়তে পারেনি। ওর দুষ্টুমির ফিরিস্তি দিয়ে চলেছে বউদি। একটি জোনাকি ঢুকে পড়েছে ঘরে। এর অর্থ ঘরে টাকা আসা। কোথা থেকে আসবে টাকা? বর্ষার তরকারি ও কাঁঠাল থেকে? চা নিয়ে এলো নদী-কাকি। গরুর ঘন দুধ ও ঘন লিকারের কড়া চা। চা খেতে-খেতে শুনল আলী কাকার রোগের কথা। একজ্বরে পড়ে আছে আলী কাকা। ডাক্তার মুতসুদ্দি দেখে গেছে, ওষুধ দিয়েছে কিন্তু কোনো ফল হচ্ছে না। ওর বউ এসেছিল নিয়ে যেতে। সবাই অপেক্ষা করে আছে রোহণের জন্য। বউদির মাও সে-কথা বলল, মনে-মনে আপদও মনে করল কি!

রোহণ আলী কাকার কপালে হাত দিতেই নড়ে উঠল। বোজা চোখ খুলে ম্লান হেসে নড়ে উঠল। অমনি বিষণ্ণতা ও মালিন্য ঠেলে ঝকঝকে চোখে প্রথমে জানতে চাইল রোহণের পড়ার খবর। কী অদ্ভুত মানুষ! চিরকাল এই পরিবারের মঙ্গল কামনা করে গেল     সন্তানহীন দুঃখী মানুষটি। নিজের ভেতরের হাহাকার ঢেকে রাখে বহুরূপী সেজে, পুথি পড়ে, চাষবাসে মন-প্রাণ ঢেলে দিয়ে। রোহণের অনুমতি ছাড়া নিজের ঘরেও যাচ্ছে না। বউ নিতে এলো তাও গেল না। সন্তানহীন বউ এতো বলল দ্বিতীয় বিয়ে করতে, শুনল না। মাঝে-মাঝে রমেশকে মনের হাহাকার প্রকাশ করে। একটির পর একটি মৃত সন্তান প্রসব করে গেল বউ, অনেক চিকিৎসা করল। দোয়া, পানিপরা, তাবিজ, স্বপ্নে পাওয়া ওষুধ – কিছুই বাকি রাখেনি। বউকে ভালোবাসে পাগলের মতো, মৃত সন্তান প্রসব করে বলে কোনোদিন বউকে ভুলেও বকাবকি করেনি। উলটো নিজের কাঁধে দোষ তুলে নিয়েছে, আপন বীর্যের দোষ দিয়েছে। বলে আরেকটি বিয়ে করলেও একই কান্ড ঘটবে। খোদা নারাজ তো বান্দায় কী করবে? মাঝে-মধ্যে খোদাকেও রেয়াত করে না, কিন্তু বউকে এই নিয়ে অভিযোগ নয়। নিজেকে গালমন্দ করে, বউকে জানায় আদর-সোহাগ।

শবেবরাতের রাতে তিনটি মৃত সন্তানের কবর জিয়ারত করে, এ পর্যন্ত কোনো বছর ভুল করেনি। শেষ তিনটি সন্তানের কবর খুঁটি পুঁতে নির্দিষ্ট করে রেখেছে। আগের ছয়টির কবরের নিশানা ঠিক রাখতে পারেনি। সন্তানদের পর যায় মা-বাবার কবরে। সামর্থ্য অনুযায়ী দান-খয়রাত করে, সারারাত মোনাজাত করে কাটায়। তখন মুখে কী প্রশান্তি! এমনিতেও সবসময় হাসিমুখে কথা বলে। রোহণের বাবার আমলের মজুর ভূমিহীন চাষি। পরের জমির চাষি। এখন অসুখে পড়েও রোহণের কথা ছাড়া নিজের ঘরে যাবে না। বলে, অন্নদাতাকে অমান্য করা যায় না। মীনাক্ষীও চিঠিতে লিখেছিল আলী কাকাকে দেখতে আসা বেশি দরকার। সেও নিজের থেকে পরের রোগের ব্যাপারে বেশি চিন্তিত। বউদির মা বলেছে রোহণকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ-অবস্থায় আলীকে বউয়ের কাছে রাখাই ভালো, সে-কথাও বলে দিলো।

রোহণও একে-একে একটি-একটি মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। বাবা গেল, দাদা গেল। এখন আলী কাকার পালা? তারপর কি মীনাক্ষী? হঠাৎ এরকম ভাবনা এলো বলে তার নিজের ওপর খুব রাগ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে ধরল।



অনেকদিন পর নিজের পড়ার টেবিলে বসে জানালার বাইরে অন্ধকার দেখার সময় পেল। খাওয়া হয়ে গেছে, বউদি নিজে বসে খাওয়া বেড়ে দিয়েছে। ওর প্রিয় চিংড়ি ও মৌরলা মাছ আছে। কাঁঠাল বীজ পুড়ে ভর্তা। তাতে পোড়া লঙ্কা, সরষের তেল, পেঁয়াজ ও রেঙ্গুইন্যা বাখর পাতা। আলু দিয়ে হাঙর শুঁটকি। অর্ধেক খাওয়ার পর চন্দ্রমল্লিও বসল। অনেক দিন পর একসঙ্গে খেতে বসল। শেফালির মা তরকারি তুলে দিচ্ছে পাতে। খাওয়ার পর গিয়ে বসেছে টেবিলে। সবার শেষে খায় নদী-কাকি ও শেফালির মা। ওরা খেয়ে হয়তো শোবার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। মাটির হুঁকোতে ওরা তামাক খায়। রমেশ কাকাদের আলাদা হুঁকো আছে। আগুনের মালসা আছে আলাদা-আলাদা। সকাল-দুপুর-সন্ধে তিন বার হুঁকোর পানি বদলায়। তামাক খেতে খেতে রাজ্যের কথা বলবে। খুব যত্ন করে ঢেঁকিতে কুটে তামাক তয়ের করে রাখবে হপ্তা দুয়েকের জন্য। চন্দ্রবউদির পরে মা ভাত খেয়ে এসে মেয়ের সঙ্গে ঘ্যানঘ্যান করছে।

খেয়ে এসে নিজের টেবিলে বসেছে রোহণ। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, কর্ণফুলী পেরিয়ে সেই বৃষ্টি-ছোঁয়া ঠান্ডা হাওয়া আসছে দক্ষিণ থেকে। মেঘের ডাক শোনা যাচ্ছে সেই দূরে। কামিনী ফুল গাছের ঘন সবুজ পাতা ফুল নিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখছে। সুগন্ধ বিলিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে ওকে! রোহণও তার পরিবার এবং নিজের কাছে ফিরে অনুভব করছে নিজেকে। বহু বছরের এবং ছেলেবেলার সঙ্গী কামিনী গাছকে দেখছে। কত ফুল ফুটেছে! ওর ঝাঁকড়া ডালে! শক্ত গাছ। মন আকুল করা রাতে ফোটা ফুল। সাদার চেয়েও সাদা, সুগন্ধের চেয়েও সুগন্ধ, মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকুল হয়ে যায় সে। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখল। বাসি ফুলের পাপড়ি গাছতলায় বিছিয়ে থাকে অবহেলায়, কেউ তাকে আদর-সম্ভাষণ জানায় না। কিন্তু গাছে ফুটে যখন সুরভি ছড়ায় তখন তার দুর্দান্ত সম্মোহনী শক্তি। জানালার কাছে এবং রাতের বান্ধবী বলে রোহণ কলেজের লাইব্রেরি ঘেঁটে তার পরিচয় ও অন্ধিসন্ধি বের করে ছেড়েছে। লোকে এর গন্ধে মাতাল, কিন্তু ফল দেখে না। কড়ে আঙুলের মাথার সমান ফল সবুজ থেকে পাকলে কালো হয়ে যায়। রোহণ দেখেছে। এর ছাল সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবে মুন্ডা জাতির লোকেরা ব্যবহার করে শুনেছে। শহরে ফুলসজ্জায় এর ডাল ব্যবহার করে। ফুলদানিতে ব্যবহার করেছে রোহণ নিজেই। রোহণ স্মৃতিসমুদ্রে ডুবে যায়। বইয়ের আলমারিটা টেবিলের কাছেই আছে। ওখানে তার কত স্মৃতি লুকোনো, কত স্বপণ – বইয়ের গল্প ও উপন্যাসগুলো একটু টোকা দিলেই বেরিয়ে পড়বে। না, সে তা করবে না, সে অসহায় এখন। পেছনে এসে দাঁড়াল বউদি। শিউরে উঠল রোহণ। কৈশোর-যৌবন উন্মেষের স্বপ্নযাত্রার দুর্দান্ত সঙ্গী চন্দ্রমল্লি। পথপ্রদর্শক ও একান্ত আশ্রয়। মানুষকে কোথাও না কোথাও যেতে হয়, সেই যাত্রায় সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। বউদি তার সেই মহান সঙ্গী চন্দ্রমল্লি। সবকিছুর হাতে-খড়ি বউদির  কাছে, চাওয়াও তার কাছে, অভিমান-অভিযোগ সবই। দাবি ও বৈধ-অবৈধ আবদার ওই একজনের স্নেহের ছায়ায়। ঘরের প্রতিটি কক্ষ, পুকুর, নদী, ভিটের আনাচ-কানাচ সর্বত্র তার বউদি। এমনকি স্বপ্নেও। শুধু বউদির মা মাঝখানে এসে সব গোলমাল পাকায়।

মীনাক্ষী ঢাকায় পৌঁছে গেছে। পেছনে বউদি। রোহণের মন বলছে খারাপ সময় এসে পড়েছে। আলী কাকা, মীনাক্ষী, চাষবাস সব কিছুতে মন্দ হাওয়া।

তুমি কি খুব হতাশ হয়ে পড়েছ? ডাক্তার বলেছে আলী কাকা সম্পর্কে ভয়ের খুব কিছু নেই। প্যারাটাইফয়েড, তাহলেও কিছুদিন ভোগাবে! এখন বলো তোমার কথা! – বউদি বিষণ্ণের প্রান্তঘেঁষা হাসি দিয়ে বলল। সঙ্গে আছে দেখা হওয়ার নির্জন খুশির ঝলকও।

তাহলে কিছু দিন ভোগাবে বলছ? – তারপর বলল, মীনাক্ষীর কথা তো তোমাকে আগে বলেছি। ওর ক্যান্সার হয়েছে।

ক্যান্সার? বলো কী?

আজ ঢাকায় গেছে। অপারেশন হবে। আমাকে ওর মা-বাবা আশা করেছিল সঙ্গে যাব বলে। মীনাক্ষী যেতে দেয়নি পরীক্ষা এগিয়ে আসছে বলে। তার চেয়ে আলী কাকাকে দেখে যাওয়া বেশি জরুরি মনে করেছে। আর চাষবাস ও তোমাদের দেখাও। আমার মনে হচ্ছে ও আর বাঁচবে না।

কী করে বুঝলে?

ওর গায়ের রং কালো হয়ে গেছে। আমি যতদূর জানি এটা ওর রোগের শেষ ভালো লক্ষণ। ও একেবারে শুকিয়ে গেছে। মেয়েরা শাড়ি পরে থাকে বলে সহজে বোঝা যায় না শরীর কতখানি ভেঙে পড়েছে।

মেয়েদের সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছ দেখছি।

খোঁচাটা গায়ে না মেখে একটু চুপ করল রোহণ। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল একটা বইয়ের ঘটনাবলি। …এক মহিলার পেট-কামড়ি ছিল। বিয়ের সঙ্গে-সঙ্গে সেই রোগ সেরে গেল। বছরখানেক পর স্বামীর প্রতি তার আকর্ষণ কমে যেতে থাকে। সঙ্গে-সঙ্গে মাথা-কামড়ি শুরু হতে থাকে। এতে স্বামী বিরক্ত হয়ে অন্য এক নারীর প্রতি ঝুঁকে পড়তে থাকে। মহিলা এ খবর জানতেই মাথা-কামড়ি একেবারে উধাও। বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবার সেই পুরোনো পেট-যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। এক বছর না যেতেই মহিলা ক্যান্সারে মারা গেল। একজন স্বামী মানুষের পক্ষেও বোধহয় বোঝা মুশকিল মেয়েদের শরীরে কিসে কী হয়। বুঝতে পারার আগেই হয়তো দেখা গেল বউ বা প্রেমিকা গর্ভবতী হয়ে গেছে, অথবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। অথবা তার চেয়েও গুরুতর অন্যকিছু, অথবা…

অথবা কী?

আর একটা ঘটনা পড়েছি, মেয়েদের দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার একটা রহস্যময় ব্যাপার। এক লোক তার বউকে রেখে অন্য মেয়ের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করে। কান্ডটি করে ঘরে ফিরতে-না-ফিরতেই দেখে বউয়ের হাত থেকে চিনেমাটির চমৎকার ফুলদানিটা পড়ে গিয়ে খানখান। ব্যাপারটা ছিল নেহাত দুর্ঘটনা হয়তো। কিন্তু লোকটি যেদিনই প্রেম-ভালোবাসা বা চুমো খেয়ে আসে সেদিনই বউয়ের হাত থেকে একটা-না-একটা কিছু পড়ে ভেঙে যায়। বউটি এই অনিচ্ছাকৃত ঘটনার জন্য খুব কষ্ট পায়, আর বারবার নিজের হাত দুখানাকে দায়ী করে। তারপর লোকটি যেদিন থেকে ওই প্রেমিকা মেয়েটির সঙ্গে দেখা করা ছেড়ে দিলো সেদিন থেকেই সব ঠিক হয়ে যায়, বউটির হাতও পয়মন্ত হয়ে গেল।

দ্বিতীয় ঘটনাটি বলতেই চন্দ্রমল্লি বলল, তাহলে দেখো, তুমিই ভেবে দেখো।

রোহণ অনেকটা নিজেকে বলার মতো আওড়ে নিল, কে জানে!

বউদি তখন হঠাৎ বলল, তুমি মীনাক্ষীকে ভালোবাসো?

সঙ্গে-সঙ্গে রোহণ যেন স্তব্ধ আকাশ। মীনাক্ষীর শেষ অনুরোধ নেমে এলো স্মৃতি থেকে, অবুঝ হয়ো না লক্ষ্মীটি। আমি যখন ডাকব তখন এসো, তোমাকে দেখার যখন খুব ইচ্ছে হবে আমি ডাকব, তখন তুমি এসো… ও বন্ধু আমার… আমার প্রিয় রোহণ…। তারপর বউদিকে বলল, যখন বুঝতে পারলাম মীনাক্ষীর ক্যান্সার হয়েছে এবং বাঁচার সম্ভাবনা নেই তখন ওকে সাহস দেওয়ার জন্য ভালোবাসার কথা বলেছি। হ্যাঁ, এখন মনে হচ্ছে ওকে একরকম ভালোবাসি।

সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রমল্লি উঠে দাঁড়াল। তখনই হাওয়া উঠে নামল অঝোর বৃষ্টি। রোহণও তাড়াতাড়ি উঠে জানালা-দরজা বন্ধ করে দিলো যেনবা বৃষ্টিটা ওকে ভয় দেখাতে নেমে এসেছে। এসে চেয়ারে বসল, ওর চোখের সামনে ঝলমল বিষণ্ণ মীনাক্ষী আরো নিবু-নিবু হয়ে এলো।

তুমি অলিকে ভালোবাস? – ওর বউদি তেমনি বাইরের    ঝড়-বাদলার মতো ঝটিতি বলে বসল। ঘর গমগম করে উঠল অদৃশ্য শব্দে।

আবার ও-কথা কেন? তুমি তো সব জানো।

না, সব জানি না। তবে জানার অধিকার যদি বলো, তাহলে আছে। – তারপর রোহণের পিঠের ওপর গিয়ে বলল, দেখি, তোমার পায়ের পোড়া দাগটা কতটুকু আছে?

পায়ের দাগের সঙ্গে কী সম্পর্ক? রাস্তার ভিখিরিও দাতাদের আকর্ষণ করার জন্য নুলো হাতটা বের করে নাড়ে-চাড়ে, ইচ্ছে করে খঞ্জ পা বা পোড়া দাগ দেখিয়ে বেড়ায়।

তুমি কি সেদিন ইচ্ছে করে পা পুড়িয়েছ? অ্যাডভেঞ্চার?

যদি বলি হ্যাঁ, করুণা যাঞ্ঝার ছলচাতুরী!

তাহলে মীনাক্ষীকে কথা দিতে গেলে কেন? – চন্দ্রমল্লি আদালতের মতো জেরা শুরু করল যেনবা। আবার নিজের মাঝে ফিরে প্রশ্ন করল, মৃত্যুপথযাত্রীর প্রতি এতো দয়া কেন?

অলি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার দরকার আছে কি? এতো দিনেও কি কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারনি?

তুমিওবা এতো হেঁয়ালি করছ কেন উত্তর দিতে?

হেঁয়ালি কোথায়? আমি কি কখনো তোমার কাছে নিজেকে আড়াল করেছি? মীনাক্ষীর মা-বাবা-ভাই-বোন আমাকে কাছে টেনে নিয়েছে। একবার ভেবে দেখো ওদের কথা, ওদের মানসিক অবস্থা? অথচ ওরা আমার কে?

তাহলে বলো, আমাকে কি ভালোবাসো?

কী রকম?

মীনাক্ষীর মতো, অলির মতো?…

যদি বলি হ্যাঁ, আর যদি বলি না?

একটি বলো।

তাও তোমার অজানা নয়। কেন ভেতর থেকে টেনে আনতে চাও! অমোঘ সত্য!

তখন চন্দ্রমল্লি নিজেকে অরণ্যের নির্জন সংযমে বেঁধে নিয়ে কিনা কে জানে, হাসতে হাসতে বলল, এরকম বৃষ্টি নেমে এলে আমি খুব আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ি। সবকিছুর মাঝে ঘুরেফিরে নিজেকে ভাবতে ভালো লাগে। কেমন বৃষ্টি একবার কান পেতে শোনো, শোনো।

রোহণ জানে কথাটা মিথ্যে নয়। ওর প্রিয় বউদিটি শিল্পী হতে পারত, লিখতে পারত, গলা সাধলে গায়ক, উচ্চতর পড়াশুনো করলে অনেক ওপরে উঠতে পারত। অত্যন্ত অনুভূতিশীল মনটি আছে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিহীনতাও!

মাসিমা ভালো আছে তো? শরীর ও মন? – রোহণ দুম করে বলল।

রোহণের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে উত্তর দিলো, ভালো আছে। তবে আমি ভাবছি মাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দেব। বাবাকেও দেখাশুনো করা দরকার। বাবার রক্তচাপ এই বাড়ে এই কমে। বোধহয় ওষুধ ঠিকমতো খেতে ভুলে যায়। তুমি কি বলো।

তোমার ইচ্ছেই বলবতী। এসব ব্যাপারে তোমার ওপর আমি কী বলব। অনির্বাণকে একা সামলাতে পারবে তো?

মা এটা-ওটা সবকিছু নিয়ে মাথা ঘামায়। তাছাড়া বাবার ব্যাপারটাও ভাবা দরকার। আর মা…

ঠিক এ-সময় ভেতরের দরজায় ঠুকঠুক টোকা পড়ল। বউদি সেদিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করে চলে গেল দরজা খুলে দিতে। খুলে দিলো দরজা। মুখ বাড়িয়ে বউদির মা হাসতে-হাসতে বলল, ঝগড়া করছিস?

কোনো উত্তর না দিয়ে চন্দ্রমল্লি দরজা বন্ধ করে হুক লাগিয়ে দিলো।

রোহণ বলল, বললে না, কিছুই বললে না যে তুমি?

বউদি হঠাৎ বলে বসল, আমি জানি না কী বলব…।

রোহণ ভাবল, এ-প্রশ্ন যদি তাকে করত তাহলে সে কি উত্তর দিতে পারত? তার কৈশোর, বউদির প্রথম আগমন, বন্ধুত্ব ও স্নেহের সুন্দর দিনগুলো, সেসব দিন হারিয়ে গেছে এবং স্মৃতিভারে করুণ মধুর হয়ে আছে তেপান্তরের মাঠে, একই সঙ্গে নিষ্ঠুর সুন্দর – সব একে-একে পলকে মনে পড়ে গেল। এর উত্তর কি দেওয়া যায়?  সে-কথা শুধু রোহণকে বলার তাও কি বলা চলে! না-বলাটাও যে আবার বলা।

সম্ভবত চন্দ্রমল্লিও পাশ কাটিয়ে নিজের মনে আয়েশ করছে। রোহণ আরো ভাবল, অতীতের বেদনা খুঁড়তে গিয়ে কী লাভ? তারচেয়ে চুপ থাকাই কি ভালো নয়? সে নিজেই তো অনেক প্রশ্নের উত্তর জানে না। অলি… আলা… আলেয়া তার শৈশবের সঙ্গী, বউদিও শৈশব-কৈশোরের বন্ধু। বউদির হাতে সে বড় হলো, সব শিখিয়েছে, মাও সন্তানকে বড় করে। তাই বলে ছেলে বড় হওয়ার পর কি সবকিছু অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলে? সে এখন বড়, স্বাধীন সিদ্ধান্ত তাকে এখন নিতে হয়, সে এখন জগতের বাসিন্দা, সে বুঝতে পেরেছে মীনাক্ষীকে ভালোবাসার কথা বলার দরকার ছিল, ঠিক ওই সময় সে যদি মীনাক্ষীকে ভালোবাসার বিশ্বাস না দিত কী হতো? মীনাক্ষী কাঙালের মতো ভালোবাসা চেয়ে বসেছিল, ওর জন্য তা দরকার ছিল যা মনে করেছিল। এর আগে মীনাক্ষী তার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে তর্ক করেছে, নিজে-নিজে যুক্তি খাড়া করে বিরত রাখতে চেয়েছে। ওর জায়গায় রোহণ হলেও তাই করত। মানুষ ঘটনাচক্রেও বোধহয় প্রেমে পড়ে। নির্জন পরিবেশ মানুষের মনে প্রভাব বা আক্রমণও চালায়। একজন তরুণ ও একজন তরুণীকে পরিবেশের উসকানিমূলক নীরবতাও ঘনিষ্ঠ করে তুলতে পারে। সে সময় তারা প্রকৃতির নিয়মে চুমো খেতে পারে, আরো নিবিড় হতে পারে, দৈহিক মিলনের সুখভোগ করতে পারে,  এমনকি ন্যায়-অন্যায়ের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়েও তারা নিজেদের বিরত রাখতে পারে, আবার নাও পারতে পারে। প্রকৃতির নিয়ম এই। সামাজিক নীতি অন্য রকম, সেখানে ন্যায়-অন্যায় আছে, আইনকানুন আছে। একজন মানুষ কারুর না কারুর প্রেমে পড়তে পারে। সে একজনকে ভালোবাসলে অন্য জনকে ভালোবাসবে না, বা আরেক জনকে ভালোবাসলে অন্য জনকে বাসবে না – সেটাই স্বাভাবিক। আবার ভালোবাসে একজনকে অথচ দৈহিক সম্পর্ক হচ্ছে অন্য জনের সঙ্গে ভালোবাসার ছলনা করে – এরকম ঘটতে পারে। ন্যায়নীতির দন্ডে তার বিচার বসে সামাজিকভাবে, সেখানে প্রাকৃতিক নিয়মে চলে না, সেখানে প্রকৃতির চেয়ে মানুষের তৈরি সামাজিক আইন বড়।

মীনাক্ষীকে জেনেশুনে বললেও রোহণের মনের কোণে কি ভালোবাসার মতো কিছু ছিল না? তা না হলে মৃত্যুপথযাত্রীকে কেন ভালোবাসার কথা বলা! সেখানে দেহ তো বড় ছিল না, তবুও কেন ভালোবাসা? তাহলে কি প্রত্যেক মানুষের মধ্যে কিছু-কিছু রহস্যময়তা আছে, তার ব্যবহার ও মানসিকতায় রহস্যময়তা বা  অন্তদ্বর্নদ্ব রয়েছে অথবা দোলাচল, অথবা দৃঢ়তার অভাব বা ন্যায়নীতিহীনতা? ভোগ, বাসনা?

অনেকক্ষণ ওরা চুপ করে রইল। এর মধ্যে দু জনের মনে ঝড় বয়ে চলল। এই চুপ থাকাটা সম্ভবত দরকার ছিল না। এই প্রথম ওরা ধৈর্যের পরিচয় দিলো দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে। রোহণ আগে কোনো সময় এরকম চুপ করে থেকে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে পারেনি। চন্দ্রমল্লিও দূরে সরে রইল অদূরে গিয়ে।

চন্দ্রমল্লি আস্তে-আস্তে নিজের বিবর থেকে বের হচ্ছে। রোহণ যে তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে এখন, অপরিহার্য অংশ। স্বামী নেই, শ্বশুর-শাশুড়িও আগে থেকে নেই। আছে প্রিয় থেকেও প্রিয় রোহণ, যেন শুধু ওর জন্যই শ্বশুরবাড়িতে থাকা; পুকুর ও বাঁশঝাড়ের নির্জন ঐকান্তিকতা, বৃষ্টি ও কুয়াশার মাখামাখি, সবই রোহণকে পাশে নিয়ে ওর জীবনের অংশ হয়ে গেছে। অপরিহার্য। এখন সে কলেজ হোস্টেলে থাকে। থাকুক না, মাসে-মাসে তো দেখা হয়, এসে হৃদয়-মন ভরে দেয়… আস্তে-আস্তে সে বিছানা থেকে উঠল, রোহণের সামনে ঘরময় ঘুরল অসঙ্কোচ অধিকারে। একবার রোহণের চুলে থাবা মেরে এলোমেলো করে দিলো, টেবিলের      যে-বইটা পড়ছিল, যেখানে বুকমার্ক রাখা ছিল সেটা আরেক জায়গায় সরিয়ে দিলো। ঢাকা দেওয়া গ্লাস থেকে দু ঢোখ পানি খেল উঁচু করে, মুখ না লাগিয়ে। মুখ লাগালেও ক্ষতি নেই, রোহণ ওসব একটুও মানে না। একবার জানালা খুলে দেখল বৃষ্টি কেমন ফুঁসছে। খিলানো ছাদের মাটির ঘরে দরজা-জানালা না খুলে বৃষ্টির মত্ততা ঠিকমতো বোঝা যায় না। জানালা খুলতেই হাওয়ার বাড়িতে এলোমেলো হয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ল মুখে এবং রোহণের দিকে মুখ ঘুরিয়ে আড়চোখে চন্দ্রমল্লি তাকাল যেন বাঘিনী সম্ভাব্য শত্রুর উপস্থিতি দেখে নিচ্ছে। রোহণ তখন জ্যাক লন্ডনের সেরা গল্পের বইটির কোন পাতায় বুকমার্কটি ছিল খুঁজছিল মধুর বিরক্তি নিয়ে। চন্দ্রমল্লি তখনো কিছু না বলে হারিকেনের কাছে এসে আস্তে-আস্তে নিবিয়ে দিতে লাগল। তার শেষ আলোয় ওর মুখ জ্বলজ্বলে লাল ও বিপন্ন দেখাচ্ছিল। সেই পরিচিত অন্ধকারে একটুও না হাতড়ে রোহণের কাঁধে হাত রাখল। জড় পদার্থের মতো রোহণকে টেনে তুলল কোনো কিছু না বলে, আগলে ধরে বিছানায় নিয়ে চলল, অসুস্থ শিশুর মতো যত্ন সুরভি দিয়ে পালঙ্কে বসিয়ে দিলো, দু হাতে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলো, পা দুখানি ধরে ঠিকঠাক করে রাখল হাসপাতালের শয্যায় সেবিকা যেমন করে রাখে। মাথাটি তুলে বালিশ পরিপাটি করে দিলো। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি – প্রায় শরীরটা পুতুলের মতো সম্পন্নতায় এদিক-ওদিক করে অন্ধকারেও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বিছিয়ে রাখল। স্কুলশেষে ফুটবল খেলে এসে স্নান, পড়াশুনো ও খেয়েদেয়ে আবার পড়তে বসে একসময় টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ত সে। চন্দ্রবউদি ধরে নিয়ে শুইয়ে দিত, কখনো ঘুম ছুটে গেলে ঘুম পাড়িয়ে দিত, আর স্মৃতির গায়ের মল্লিকা ফুলের সুগন্ধ নিতে-নিতে রোহণ ঘুমিয়ে পড়ত। সেই স্মৃতির গায়ে সে মুখ ঘষছে। সুন্দর স্বপ্নও মনে পড়ছে… সেই এক জলদেবী রোহণকে বঙ্গোপসাগরের নিচে ওর রাজ্যে নিয়ে চলেছে। জলের নিচে বলে নিশ্বাস নিতেও কোনো কষ্ট নেই। হাত ধরে হাসিতে কুটিকুটি হয়ে ওর ঘরে নিয়ে চলেছে। ফুলে-ফুলে ভরা ওর শয্যায় শুতেই জলদেবী বলল, আমাকে চিনতে পারলে না? ভালো করে আবার দেখো তো? রোহণ তো চারদিকে তাকিয়েও কিছু চিনতে পারে না! এতো সুন্দর তরল পালঙ্ক, বিছানায় এতো ফুল এতো ফুল, রোহণ তো আগে কোনো দিন দেখেনি! সে বিস্ময়ের সীমা শেষ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চিনতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেও পারল না। ঝলমল চোখ-দুটি চেনা মনে হলেও অচেনা রয়ে গেল। জলদেবী       বোধ্য-অবোধ্য হাসিতে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলল, এবার দেখো তো! রোহণ নিজের উতল দুরুদুরু বুকের শব্দ শুনতে-শুনতে কাহিল হয়ে ‘হ্যাঁ’ কি ‘না’ বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না। কপট অভিমানে জলদেবী মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, এতো ভুলো মন তোমার? এখনো চিনতে পারলে না? আমি তোমার অনির্বাণের মা… গো…! রোহণ জেগে গেল। ভালো করে চেনা হলো না। অনির্বাণের মা বলল কিন্তু চেহারায় মিল খুঁজে পেল না। স্বপ্ন এরকমই তো হয়। অথবা  জেগে-জেগে স্বপ্নবিলাস। সেই স্বপ্ন থেকে জাগতেই দেখে বউদি তাকে তার বিছানার অন্ধকারে শুইয়ে রেখে চলে যাচ্ছে। দরজা খুলে চলে গেল, রোহণ একা, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত। বাইরে তেমনি সেই বিখ্যাত বৃষ্টি চলছে, ওর সুবিবেচনা মতো, অথবা কারো ভালোবাসা-মাখা সুসিদ্ধান্ত অনুযায়ী।…



নবম অধ্যায়

ঘুম ভাঙল অনির্বাণের চেঁচামেচিতে। রোহণের বিছানায় উঠে দাপাদাপি করে ওকে জাগিয়ে দিলো। বউদির মা হাসতে-হাসতে বলল, একদম তোমার মতো হয়েছে দেখতে। রোহণ সেই গূঢ় ইঙ্গিতটার ধারেকাছে না গিয়ে বলল, আমাদের পরিবারের একমাত্র বংশধর, আমাদের মতো না হলে চলবে কেন? তারপর গূঢ় খোঁচাটার জবাব দিতেই হয়তো বলে দিলো, পাড়া-পড়শি কারো মতো হলে লোকে কী বলত! সঙ্গে-সঙ্গে বউদির মা মুখ কালো করে চুপ।

ততোক্ষণে অনির্বাণ রোহণের বুকের ওপর বসে র-কে ল করে আধো আধো কথা বলছে। যেন চর্যাপদের ভাষা, কিছু বোঝা যায়, কিছু যায় না, অনুমান করে নিতে হয়। তারপর রোহণের হাতখানা নিয়ে লাগল। আবার বলল, আমাল গা-লি।

ও হ্যাঁ, তাই তো? তোমার গাড়ি। সঙ্গে-সঙ্গে উঠে ব্যাগ থেকে ছোট-ছোট দুটি গাড়ি বের করতেই সে কী খুশি! … গা…লি, গা…লি…

কাকডাকা ভোর। বৃষ্টিতে সব ধুয়ে-মুছে চকচক করছে। উঠোন, গাছপালা, উঠোনের দূর্বাঘাস, ঘরের চাল পরিপাটি সৌন্দর্যে ঝকঝক করছে। দোয়েল ডাকছে। শেফালির মা গেছে জাউ রাঁধতে।     নদী-কাকি দুধ দোয়াতে গেছে গোয়ালে। রোহণ অনেকদিন পর দুধ দোয়ার শব্দ শুনতে অনির্বাণকে নিয়ে গোয়ালে ছুটল। দুধ দোয়ার শব্দসংগীত, বালতিতে কবোষ্ণ দুধ ও ফেনা আর সুঘ্রাণ।

রোমাঞ্চ জাগে চারদিকে। ঊর্ধ্ব ও অধঃতেও।

পুকুর টইটম্বুর। পেয়ারা গাছে পেয়ারা, ওদিকে কাঁঠাল।   দেখে-দেখে অনির্বাণ হইচই জুড়ে দিলো। ওর ভাষায় বলেই চলল কথা। সে শুধু বকর-বকম করছে, তাতেই তার চলবে। মনোযোগী শ্রোতা দরকার তার। তার মধ্যে রোহণ খুঁজছে পাকা কাঁঠাল। গন্ধ পেয়ে, রং দেখে দূর থেকে বুঝতে হবে। গাছের ওপরে কোনটি পেকেছে। টুটু ওরফে অনির্বাণকে কোলে নিয়ে তা তো হওয়া সম্ভব নয়। গোলার পাশের গাছে হাত বিশেক ওপরে একটি কাঁঠালের ওপর মাছি উড়ছে দু-তিনটি। ব্যস, ওটাই নজরবন্দি। পল্টুকে ডাকল। সে তখনো বিলে যায়নি। ঘরের কাজগুলো সেরে রমেশ কাকাদের জন্য পান্তাভাত নিয়ে যাবে। ষোলো-সতেরো বছরের ছেলে। কাজের মাঝেও সে অনবরত গান গায়, অথবা আপন মনে কথা বলবে। বুদ্ধকীর্তন তার প্রায় মুখস্থ। কীর্তনে দোহার হয়ে গায়। সে দড়ি ও দা নিয়ে এলো। টুটুকে ওর কোলে তুলে দিয়ে রোহণ গাছে উঠতে গেল। পল্টুর খুশি তখন দেখে কে। ওর সঙ্গে সে বকর-বকর করেই চলল। টুটুও কি কম? পল্টুকে থামিয়ে দিয়ে সে নিজের কথা চর্যাপদের ভাষায় বলবেই। আর পল্টুকে শুনিয়ে ছাড়বে। কোনো ছাড় সে দেবে না। পল্টুও তাই, কিন্তু তাকে তো ছোট মনিবকে মানতে হবে।

অনেকদিন পর রোহণ গাছে উঠল। অনেক বাল্যস্মৃতি এসে ভিড় করল চোখের সামনে। চুরি করে গাছে উঠতে শেখা, উঠে কাঁঠাল খাওয়া, ওই গাছে বসেই। তারপর বোঁটার কাছ থেকে খাওয়া কাঁঠালটি ঝুলছেই। খাওয়া অংশে কাঁঠালের ভুঁতি আবার ঢেকে দিয়েছে। কাঠবেড়ালি ওরকম কাঁঠাল খায় না। ও খাবে কাঁঠালের কোয়া শক্ত থাকতে। এমনকি কাঁচাও। কাঁঠালের বীজও খেয়ে দেখে।

দড়িতে বেঁধে কাঁঠাল নামিয়ে দিলো। সুগন্ধে ভরে গেল রোহণের মন ও স্মৃতি। ছেলেবেলার জানালা খুলে চলে আসা স্মৃতিরা সব জোনাকির ঝিকিমিকির মতো।

রান্নাঘরে নিয়ে কাঁঠাল ভেঙে খেতে শুরু করল রোহণ। দেখে টুটুও শুরু করল, সে কোনোদিন চেখে দেখেনি, ওর মাও হয়তো একবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। খুব নরমও নয়, আবার খুব শক্তও নয়, তেমন কাঁঠাল অনেকের প্রিয়। কাঁঠালের বোঁটার দিকেরগুলো একটু নরম হলে নিচের দিকে থাকে একটু শক্ত। একটি কাঁঠাল তাই সব রকম খাদ্যরসিকের মন জোগায় একই সঙ্গে।

বউদি ঘুম থেকে উঠে এখন আর আগের মতো পুকুরঘাটে বা বেড়া দিয়ে ঘেরা স্নানঘরে স্নান করে না। স্বামীর মৃত্যুর পর আবেগ সংযত করে নিয়েছে। রোহণকে দূরেও ঠেলে দেয় না, কাছেও টানে না নিজের থেকে। কিন্তু সব অস্ত্র তূণে ভরা আছে বোঝা যায়। বর্ষায় খরতর নদী নয় আবার ভাদ্রের ধীরস্থির কূলভরা নদীও বুঝি নয়। সব আছে আবার নেইও। মৌন হিমালয় যেন, সবকিছু আছে জমাট স্তূপ হয়ে, দূর থেকে দেখে তার সুখ-দুঃখ-অভিমান কিছু বোঝার উপায়-অন্ত নেই। রোহণ সেখানে হিমশিম খেয়ে ফিরে-ফিরে দেখে।

জিহানের মৃত্যুর তৃতীয় বছর পার হতে যাচ্ছে। ভিক্ষু ফাং (নিমন্ত্রণ) করে দানধর্ম করা হবে। নদী-কাকি এসব আগেই ঠিক করে রেখেছে। আগামীকাল সেই দিন। বর্ষা বলে চার জন ভিক্ষু নিয়ে সঙ্ঘদান হবে। মা-বাবার মৃত্যুর বেদনা সহনীয় হয়ে গেছে কিন্তু ভাই হারানোর বেদনা এখনো গভীর হয়ে বাজে। ধুকপুক করে জানিয়ে দেয় আগ্নেয়গিরির সুপ্ত ক্ষত। আলেয়াকে কিছু বলতে চায় রোহণ। সঙ্ঘদান হবে শুক্রবার। পরদিন সকালে রোহণ চলে যাবে। কত স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে যায়!

সকালে জাউ খেল দুধ দিয়ে। অনির্বাণেরও কি অভ্যেস হয়ে গেল? ওকে আখের গুড় একটু বেশি দিতে হলো। মিছরির মতো কড়কড়ে গুড়। বউদি তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে আর বলল, তোমার হাতে কী সুন্দর খেয়ে নিল। আমি ওকে জাউ খাওয়াতেই পারি না। ও খেতেই চায় না।

খাওয়ানোর আগে ওকে উৎসাহ দিয়ে তৈরি করে নিয়েছি। নিজেও খেয়েছি তৃপ্তি ভরে ওকে দেখিয়ে-দেখিয়ে। – রোহণ হাসি বাড়িয়ে বলল।

আমার ওসব রোচে না।

রোহণ আর কথা বাড়াল না। তখন কাঁঠাল এনে দিলো শেফালির মা। গাছপাকা বলে মিষ্টিও খুব। বেশি নরম হয়ে গেলে কাঁঠাল ভালো লাগে না। পাকা ও শক্ত কাঁঠাল অনেকের প্রিয়। অনির্বাণের হাতে তুলে দিলো রোহণ। সে মায়ের দিকে      তাকিয়ে-তাকিয়ে খাচ্ছে। রোহণ শেফালির মাকে বলল আলী কাকাকে জাউ দিতে, সকালের ওষুধ খাইয়ে দিতে। ঠিক তখন আলীর বউ এলো। লম্বা ঘোমটা দিয়ে সে তার স্বামীর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে। আলী মুখ ধুয়ে নিল। গায়ে জ্বর নেই। থার্মোমিটার দিয়ে দেখল রোহণ। ওর অনুমান ঠিক, জ্বর নেই। ঘোমটার তলা থেকে তৃপ্তির নিশ্বাস নিল বউ। ওকে আশ্বাস দিয়ে রোহণ ভয় নেই বলল। তেমনি ঘোমটার ভেতর থেকে শোনা গেল, আমার কাকা রোহণের জন্যই জ্বর ভালো হয়ে গেছে। ওর এই বিশ্বাসের ওপর রোহণ কিছু বলল না। মানুষ কত অল্পে সুখী হয়, কী দৃঢ় আস্থা বিশ্বাসভাজনের ওপর।



আস্তে-আস্তে আলেয়ার ভাবনা রোহণকে গ্রাস করে নিল। কিন্তু যতই ভাবে ওর বাড়িতে যাবে নিমন্ত্রণ জানাতে ততোই সেই আগের কথা মনে পড়ে যায় – অনির্বাণের সঙ্গে তোমার চেহারার গভীর মিল। রোহণ আস্তে-আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। গ্রামে ওর সমবয়সী বন্ধু খুব কম। যে দু জন ছিল তারা পড়াশুনা ছেড়ে চাকরি নিয়েছে পাটকলে। ওদের সঙ্গে দেখা হবে না। ওরা আট মাইল দূরে চাকরি করে। সকালে বের হয়, ফেরে রাতে। দু জনেই বিয়ে করেছে। আলেয়াদের বাড়ির পাশে রোহণের বন্ধু সুবীরের বাড়ি। কিছুই না ভেবে সে সুবীরের বাড়ির দিকে চলল। পথে যদি আলেয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সে-আশাও মনের কোণে নেই বলা যাবে না। আলেয়ার সঙ্গে বোঝাপড়া হওয়া দরকার। ওকে নিমন্ত্রণ করে আসা যায় আগামীকালের জন্য। রোহণ একবার ভেবেছিল এ-সময় বাড়িতে আসবে না। আর কদিন পরেই পরীক্ষা। দু দিনও এখন খুব মূল্যবান উপকারী। পদার্থবিদ্যা পড়লেও হতো।

পড়ায় মন বসছে না। বাড়িতে এলে এই হয়। পড়াও বোধহয় স্থান পরিবর্তন চায় না। বৃষ্টিও মন উতলা করে বসে, এখনই বুঝি নামবে, মেঘ জমছে থমথম করে। আকাশ অনেক নিচে নেমে এসেছে। লোকে বলে এটা বৃষ্টির সুবাসিত সুলক্ষণ। গর্ভিনীর মতো সুখভার নত।

আলেয়ার বাড়ির ঘাটা পার হতেই নামল উর্বর বৃষ্টি। সামনে মস্তবড় পদ্মপুকুর। নামল বর্ষার বিখ্যাত বৃষ্টি বৃষ্টি। পদ্মপুকুরের পাড়ে উঠে ছাতা নিচু করে ধরল। বৃষ্টির সঙ্গে সম্মুখ সমর, সেই সঙ্গে সোমত্ত হাওয়ার সঙ্গেও। ছাতাসহ সে গিয়ে পড়ল আলেয়ার ওপর। ভিজতে-ভিজতে আসছে আলেয়া। সে সুবীরদের বাড়ি থেকে বের হতেই নামল বৃষ্টি। ওদের দু বাড়ির মাঝখানে পদ্মপুকুর। আলেয়া ভেবেছে সামান্যই তো পথ, ঘরে পৌঁছে যেতে পারবে বৃষ্টির     ফাঁক-ফোকড় দিয়ে, তাই সুবীরের বাড়িতে ফিরে যায়নি। তখন এই সম্মুখ সমর।

একেবারে ভিজে গেলে। আর কি আসবে আমার ছাতার নিচে? – রোহণ না ডেকেও পুরোনো স্মৃতি মনে করিয়ে দিলো।   ভিজতে-ভিজতে আলেয়া চকচকে চোখে চেয়ে রইল যেন আকাঙ্ক্ষিত অপরিচিত রাজপুত্র কেউ। রোহণ ছাতাটা বাড়িয়ে ধরল, কিন্তু স্কুলজীবনের মতো টেনে নিতে পারল না।

অমনি অলি বলে বসল, তুমিই তাহলে ভিজে যাচ্ছ।

তোমার সঙ্গে কথা বলব, এসো। স্বপ্নবেলার মতো।

অলি কোনো উত্তর না দিয়ে ওর বাড়ির দিকে পা বাড়াল, রোহণ যেন ছত্রধর হয়ে পাশে-পাশে চলল। পুকুরে পদ্মপাতা মাথা তুলে আছে। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে পাতারা সুন্দর দৃশ্য বানিয়ে চিত্রিত হয়ে চলেছে। অমনি রোহণ মনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা একজন হয়ে বলে দিলো, দেখো দেখো, কী সুন্দর! পদ্মপাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে অমনি পিছলে যাচ্ছে! রাজকন্যের যেন অভিষেক।

অলি মুহূর্তের জন্য বুঝে বা না-বুঝে দাঁড়িয়ে রোহণের দিকে চোখ তুলে তাকাল। ওরও তেমনি পদ্মকলি চোখ হয়ে গেল। রোহণ তখন আবার বলতে পারল না একটু আগে বলা স্বতঃস্ফূর্ত কথাগুলো। অলির চোখের বিষণ্ণ সৌন্দর্যের মাখামাখিতে সে পথহারা হয়ে গেল। বৃষ্টির হামলায় রোহণের গা ভিজে চলেছে, অলিও। রোহণের মনে হলো ওর সামনে অলি নয়, মীনাক্ষী অসুখ শরীরে ওর পাশে বিষাদমাখা খুশিতে ও অপার দোলাচলে ভিজছে। অথচ ও জানে মীনাক্ষী ঢাকায়। পিজি হাসপাতালে বৃষ্টি নয়, রোগের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে যুঝছে। পদ্মপাতার সৌন্দর্য তখন আড়ালে চলে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে গেল, আর সেই ভাবনাতেই বলে দিলো, এসো, ভিজলে তোমার অসুখ করবে।

অমনি অলি তখন সম্পূর্ণ অলি হয়ে বলে দিলো, স্কুলজীবন থেকে আমি শুধু ভিজছি। বৃষ্টিতে ভেজা আমার সুঅভ্যাস হয়ে গেছে। তাছাড়া মেয়েদের এতো সহজে অসুখ হয় না শুধু বৃষ্টিতে ভেজার জন্য।

ওর কথার অনেক রকম উত্তর দেওয়া যায়। মেয়েদের শরীর সলজ্জ অনেক রকম রোগ লালন করে যায় বলতে পারত। কিন্তু স্কুলজীবনের কথা মনে করিয়ে দিতেই সে চুপ মেরে গেল। সে ভিজে-ভিজে ফুটবল খেলে, ইচ্ছে-খুশিতে অনেক সময় ভেজে, কিন্তু এই অনেকদিনের মধ্যেকার এমন একটি দিনে অন্য কোনো উত্তর দিতে চাইল না। পদ্মপাতায় বৃষ্টি-সৌন্দর্যের কথাও ভুলে গেল। মীনাক্ষীও অদৃশ্য হয়ে গেল স্মৃতিবিভ্রমে। গভীর সৌন্দর্যে-বিষাদে ভরা ওর চোখ-দুটিও স্বাভাবিক হয়ে ভাসছে। শুধু চোখের ওপর থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিবিন্দু মুছে নিয়ে অলি বলল, বাজারে যাচ্ছ? আগামীকাল দাদার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী, সেজন্য বাড়িতে এসেছ? তা বাজারে যাচ্ছ যাও।

বৃষ্টিতে ভিজে অলি সুন্দরী হয়ে উঠেছে পদ্মপাতার মতো। ওর বুকের সুন্দর স্ফীতি শাড়ির ওপর ভেসে আছে। রোহণের মনে হলো পদ্মপাতা ও কলিতে যে সৌন্দর্য এইমাত্র দেখেছে সেই সৌন্দর্য অলির বুকে ও মুখে ফুটে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে সে অন্যরকম ও নতুন এক আকর্ষণ অনুভব করল। অলিও কথা বলতে-বলতে চোখ নামিয়ে নিল সুঠাম গর্বে। বৃষ্টিরও বিরাম-বিশ্রাম নেই। হঠাৎ প্রচন্ড শব্দ করে বাজ ডাকল। অলি থরথর কেঁপে স্কুলজীবনের মতো জাপটে ধরা ও না-ধরার মাঝামাঝি ভাসতে লাগল। রোহণও অাঁতকে উঠে একই ছাতাটিকে স্কুলবেলার মতো সঙ্কোচের বিহবলতায় ভেসে চলল। তাও অল্প সময়ের জন্য, দু দন্ড পরেই ওরা তাড়াতাড়ি সামলে নিল। সঙ্গে-সঙ্গে অলি প্রায় আদেশের সুরে বলল, যাও, নিজের কাজে যাও। – বলেই সে পিছল পথে শক্ত করে তোলা পা ফেলে, আর কিছু নিজেকে বলতে না দিয়ে টেনে নিয়ে চলল নিজেকে। রোহণ অনিবার্য ভাবনা-ভার নিয়ে আবার পদ্মপাতা ও কলির দিকে দেখল, কিন্তু আগের দেখা সেই সৌন্দর্য খুঁজে পেল না। বৃষ্টি তখনো খেলে চলেছে, কুয়াশার মতো উড়ছে বৃষ্টিবিন্দুর অবশেষ, হাওয়ারা পুকুরের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিচ্ছে বৃষ্টি। বাজও পড়ল আবার প্রচন্ড শব্দে – কিন্তু তখন কিছুই আগের মতো নেই, রোহণ ও অলি তখন পুকুরের দু প্রান্তে। শুধু তারা নিজেদের অজান্তে একে অপরের দিকে তাকাল একবার। পুকুরে জল বেড়ে পদ্মকলি ডুবিয়ে নিচ্ছে।

রোহণ বাজারেই চলল। প্রবল বৃষ্টিতে ওর পথ চলার আনন্দ আর নেই, তবুও সেই বহুদিন আগের গ্রামের বৃষ্টিতে ভেজা দিনগুলোর স্মৃতি তো আছে। তার সেসব দিনের সহচর গাছপালা, নদী, চোখ জুড়ানো বিল, গোপাট তো আছে! পথের ধারে ও বাজারের চায়ের দোকানে বসে কেমন কাটিয়েছিল তা আজ আর একবার দেখে আসবে না হয়। অতীতও থাকে, স্মৃতিও উসকানি পেয়ে বাড়বাড়ন্ত হয়। অলিকেও স্কুলজীবনের স্মৃতিকাতর মনে হলো বুঝি!



দশম অধ্যায়

সকাল থেকে বৃষ্টির বৃষ্টিখেলায় একটু হাওয়াও আছে, আবার প্রবলও। সকাল থেকে রান্না ও গোছানোর কাজ চলছে। ভিক্ষুসঙ্ঘকে দানসামগ্রী দিতে হবে। সূত্রপাঠ হবে। গ্রামের আত্মীয়স্বজন কয়েকজন আসবে। বৃষ্টির জন্য কম করা হয়েছে নিমন্ত্রিত। জিহানের শক্তি যেন রোহণের ওপর ভর করেছে, সে যেখানে যায় তার হাঁটাচলা ও কথাবার্তায় একটা ছায়া যেন সঙ্গে-সঙ্গে চলে। হাসপাতালে দাদাকে যে-রকম শুয়ে থাকতে দেখেছে চকিতে      সে-রকম করে জিহান যেন তার বিছানায় শুয়ে আছে দেখতে পেল। চন্দ্রমল্লির মুখ বিষাদে ম্লান, হয়তো সেও কিছু দেখতে পাচ্ছে, স্মৃতি ভর করেছে মনে। তবুও রোহণ গা ঝাড়া দিয়ে সব করছে। অনির্বাণকে বুকে চেপে ধরে, দাদা বেঁচে থাকলে এরকম করে কোলে নিত। দেখে সবার বুক ভরে যেত। পূর্বপুরুষেরা অতীত থেকে চেয়ে সুতৃপ্ত হয়ে উঠত।

১০টায় বৃষ্টি একবার ধরে এলো। আস্তে-আস্তে ভিক্ষুরা এলেন একসঙ্গে। রীতি অনুযায়ী রোহণকে তাঁদের পা-ধোয়ার জল ঢেলে দিতে হয়। তারপর ঘরে গিয়ে বসলেন। তাঁদের বসার জন্য ঘরের একটি খাট সরিয়ে নেওয়া হলো। পাটির ওপর শতরঞ্চি দিয়ে বিছানা হয়েছে।

বুদ্ধ-বন্দনা, পঞ্চশীল ও পিন্ডদানের পর ভিক্ষুরা সমবেত সুরে ত্রিপিটক থেকে সূত্র পাঠ করছেন, ‘মাতা যথা নিযং পুত্তং আযুসা’ – মা যেমন স্বীয় গর্ভজাত একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে, এইরূপ সকল প্রাণীর প্রতি অপরিমেয় মৈত্রীভাব উৎপাদন করবে।…

বাইরে আবার বৃষ্টি। ঘরের ভেতর পাটি পেতে বসেছে সবাই, টানা বারান্দায়ও। অলি এসেছে। সে হাত জোড় করে চোখ বুজে সূত্রপাঠ শুনছে। পেছনে তাকাতেই রোহণ দেখে বউদির চোখে অশ্রুধারা। অনির্বাণ ভিক্ষুদের সূত্র শুনছে, মাঝে-মাঝে         এদিক-ওদিকে দেখছে। সবার মতো হাঁটু ভেঙে করজোড় বসেছে। নতুন আরেকটি সূত্র শুরু হয়েছে, ‘বনপুপ্পগুম্বে যথা ফুস্সিতগ্গে গিম্হান মাসে’… অর্থাৎ গ্রীষ্ম ঋতুর প্রথম মাসে বনের বৃক্ষ-লতাদিতে বনজ পুষ্পরাজি প্রস্ফুটিত হলে যেমন বনভূমি অতিশয় শোভা ধারণ করে…

সারাঘর সুরেলা সূত্রপাঠে গমগম করছে। বৃষ্টিও যেন সমস্বরে সূত্রপাঠ শুনছে। রোহণের মনে হলো, তার অনুপস্থিত দাদা এসেছে ঘরে, তাকে হাতে ধরে বলছে, চারদিকে তোর চোখ রাখিস, সবকিছু যথাবিহিত করবি, তুই এখন গৃহকর্তা… তোকেই রক্ষা করতে হবে ঘর, চন্দ্রমল্লিকে দেখিস, অনির্বাণকে বড় করে তোল, সবই তোর, তুই-ই রক্ষাকারী…। শুনে সে আবেগে মথিত হয়ে ওঠে। মনে করে তার দাদার মৃত্যু হয়নি, অনুপস্থিত মাত্র।

বয়স্ক আত্মীয়েরা সামনে। তারপর দানীয় জিনিস এবং মুখোমুখি ভিক্ষুসঙ্ঘ। প্রতি বছর এভাবে মৃতব্যক্তির জন্য দান করাই রীতি। রোহণ মা-বাবার জন্য একসঙ্গে প্রতিবছর একবার সঙ্ঘদান করে।

মৃত্যুর পর মানুষ কোথায় যায়? মানুষ বলতে আত্মা। জন্মের আগে মানুষ কোথায় থাকে? একটি ছোট শিশুকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তুই কোত্থেকে এসেছিস? তাহলে সে আকাশ-পাতাল ভেবে, অথবা কিছু না ভেবে বা ভেবে না পেয়ে তক্ষুনি একটা জবাব দিতেও পারে। সে বলতেও পারে, আকাশের তারার দেশ থেকে এসেছে, কিংবা মা-বাবা থেকেও শুনে-শুনে বলতে পারে, সে হাসপাতাল থেকে এসেছে। রোহণ খুব ছেলেবেলায় বাবাকে জিজ্ঞেস করত, বাবা, এক শ বছর আগে আমি কোথায় ছিলাম? তার উত্তর একটা পেলেই আবার প্রশ্ন করত, এক শ বছর পরে কোথায় থাকব? ধর্মবিশ্বাস মানুষকে এ-জাতীয় প্রশ্ন থেকে মুক্তি দিতে পারে হয়তো। কিন্তু শিশু-যুক্তিবাদীর মন কি সে উত্তরে তুষ্ট থাকে? মানুষের জীবনে এর চেয়ে জরুরি বিষয় আছে। তা হলো সৎকর্ম। ভালো কাজ করে যাওয়া। জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দিক সৎকর্ম।… আস্তে-আস্তে সূত্রপাঠ শেষ হয়।

এবার ভিক্ষুসঙ্ঘকে পিন্ড বা অন্নদান। সবাই উঠল। অলি উঠে বারান্দায় গেল। ভিক্ষুদের হাত ধুয়ে দিতে হবে। ওটা রোহণের কাজ। গৃহকর্তাকে ও-কাজ করতে হয়। অনির্বাণ সারাঘরে হাঁটছে। সে জানে না এতো সব আয়োজন কার জন্য। বড় হয়ে সে জানতে পারবে বাবা ডাকার অধিকার তার নেই। এই ঘর, ভিটে, গাছপালা, পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ অনেক প্রাণী পৃথিবীতে থাকবে, কিন্তু তার বাবা ডাকার অধিকার থাকবে না। এ-সময় রোহণ একবার আলেয়াকে দেখতে পেল বারান্দায়। রোহণ, নাকি ভিক্ষুসঙ্ঘকে দেখছে সে? ওর চোখে হয়তো জিহানের স্মৃতি ভেসে উঠেছে, জিহান ওকে খুব পছন্দ করত, ওকে ভায়ের বউ করে আনবে বলেছিল। হয়তো সে-কথাটি অলির মনে পড়তে পারে। ভেতরে গিয়ে ভিক্ষুদের জন্য বাটিভরা কী যেন এনে দিলো। মাথা ও দৃষ্টি আনত করে সে আবার বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। ঘরের একপাশে বয়স্করা বসে আছে। তারপর কখন কোনদিকে অলি চলে গেল রোহণ জানতেই পারেনি।

চন্দ্রমল্লি বলল রোহণকে, আমি জানতাম সে থাকবে না।

কী করে বুঝলে?

ওর চোখ-মুখ বলেছে।

গত দু দিনের কথা মনে পড়ল রোহণের। সেসব কথা সে আর বলল না বউদিকে। তখন ভিক্ষুরা চলে যাচ্ছেন। অতিথিদের খাওয়াতে হবে, অনেক কাজ। তবুও রোহণ তার দাদার উপদেশ স্মরণ করিয়ে দিতে বউদিকে বলল, তুমি বারণ করলে না কেন? আমাদের উচিত অতিথিদের প্রতি সমান দৃষ্টি রাখা।

তাহলে সত্য কথা বলব?

বলো।

সে আমাকে সহ্য করতে পারে না কেন?

আরো অনেক বেশি কি তুমি সহ্য করছ না?

সেই কি আমার পাওনা! আমার ভাগ্য…

রোহণ আর কিছু না বলে চুপ করে গেল। কারণ তারপর অনিবার্যভাবে যেসব কথা উঠে আসবে তার ভার আরো কঠিন। কঠিনকে সব সময় ভালোবাসা আরো কঠিন।



একাদশ অধ্যায়

কলেজে এসেই রোহণ প্রথমে দেখে বিশাল জগতের দুয়ার তার চোখের ওপর খুলে গেছে। পাঠাগার, খেলাধুলোর জগৎ, গুণী শিক্ষকমন্ডলী তাকে উৎসাহিত করে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে। শুনতে পেল, জ্ঞানই জগৎ ও জীবন বদলে দেয়, পৃথিবীর চালিকাশক্তি জ্ঞান, আরেক দিকে মীনাক্ষী। ওর বাঁ পায়ের সামান্য খুঁত রোহণকে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা পুরে দিলো।

মীনাক্ষী বলে, ওর বাঁ পায়ের সামান্য খুঁত ওকে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। সে বুঝতে পারে মানুষ সব সময় তার খোঁড়া পায়ের জন্য তাকে দয়া দেখায়। ওর এক আত্মীয় এই সুযোগ নিয়ে তাকে ভোগ করতে চেয়েছিল। সেই থেকে সে পুরুষের চোখের ভাষা বুঝতে শেখে। এমনকি কোন শিক্ষক তাকে কী প্রস্তাব দিয়েছে তাও বলে দিলো। ক্লাসশেষে একবার সে দর্শনশাস্ত্রের শিক্ষকের কাছে গিয়েছিল। শিক্ষক তাকে বলল, এখন তো আমার সময় হবে না, তুমি বরং সময় করে আমার বাসায় এসো।

পরদিন সে শিক্ষকের বাসায় গিয়ে দেখে শিক্ষক একা, বউ ও ছেলেমেয়ে গ্রামের বাড়িতে। মীনাক্ষী কিছু মনে করেনি। একসময় সে বুঝতে পারল শিক্ষকের চোখের ভাষা। সঙ্গে-সঙ্গে সে নিজেকে শক্ত করে নিল, ভেতরের শক্তির আরাধনা শুরু করল। তারপর শিক্ষক যখন তাকে চুমো খেতে এগিয়ে এলো সেও তার গালে কামড় বসিয়ে দিলো। শিক্ষক প্রায় চিৎকার করে ছিটকে পড়ল, সেই সুযোগে মীনাক্ষীও পালিয়ে এলো।

সেই মীনাক্ষী হাসপাতালে শুয়ে আছে। শোয়া থেকে উঠে মাঝে-মাঝে হাঁটে, হাঁটতে-হাঁটতে সে আবিষ্কার করল তার বাঁ পা ভালো হয়ে গেছে, তাকে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে না, ব্যথা উধাও। সে খুব অবাক হয়ে গেল। এদিকে ক্যান্সার, অন্যদিকে পায়ের ব্যথা উধাও। কী আশ্চর্য! ডাক্তারকে জানাল সে। ডাক্তার কোনো হদিস না পেয়ে মীনাক্ষীর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর ডাক্তার তার পায়ের খুঁতের পুরো ইতিহাস জেনে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। মীনাক্ষী বলল, চলতে-ফিরতে তার পায়ে একটু-একটু ব্যথা লাগত, তারপর দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা বয়ে বেড়াতে-বেড়াতে ওটা তার সহ্য হয়ে যায়, যেন ওটা আর ব্যথাই নয়, যেন ব্যথাটা শরীরের স্বাভাবিক অংশ। বারো-তেরো বছর বয়স থেকেই এর সূত্রপাত। তারপর কখনো কমে কখনো বেড়ে একসময় স্থায়ী হয়ে যায়। এখন হাসপাতালে এসে এই উন্নতির ফলে মীনাক্ষী জীবনের প্রতি আশাবাদী হয়ে ওঠে।

সবকিছু জানিয়ে রোহণকে সে চিঠি লিখল। এই তার প্রথম চিঠি। আবেগ ও যুক্তি দিয়ে, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা ঢেলে সে লিখেছে – আমি ভালো হয়ে উঠছি, আমি সুন্দর হয়ে ফিরে আসছি। আমার পা ভালো হয়ে গেছে, আমার বিষণ্ণতার হাওয়া, আমার আর হীনম্মন্যতা নেই। আমি আবার কলেজে যাব, কলেজের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলোতে এখনো অল্প ফুল আছে নিশ্চয়ই। তোমাকে তখন আসতে মানা করেছিলাম, এখনো করছি। ভালো করে পরীক্ষা দাও। আমি দেব আগামী বছর। একটি বছর জীবনের অনেকখানি হলেও কখনো-কখনো কিছুই নয়।… তোমার একখানা ছবিও আমার কাছে নেই, তবুও তোমার জ্যোতির্ময় বন্ধুত্বপূর্ণ দীর্ঘ শরীর ইচ্ছে করলে দেখতে পাই। আমার অনুভূতিতে তুমি মিশে আছ।… অজিত ও মুনির তোমার খুব বন্ধু জানি –  এতো কম বন্ধু তোমার…

মীনাক্ষীর ভালো খবর পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠল রোহণ, ফুটবল খেলায় জয়ের গোল করার মতো। পরীক্ষা এসেই পড়ল। পরীক্ষার সময় ওর হৃদয় খুব উর্বর হয়ে ওঠে, তীব্র অনুভূতি কাজ করে, ওটা তাকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। তখন মনে হয়, সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে সে। চবিবশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টা পড়াশুনা করলেও ক্লান্তি নেই, তার মধ্যে ঘণ্টা দুয়েক চলে যায় ভাবনা ও পাগলামোগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখতে। মাঝে-মাঝে গল্প লিখতে ইচ্ছে করে। গল্পগুলো শেষ পর্যন্ত খসড়া হয়ে পড়ে থাকে। আবার এ-সময় সময়টা যেন চল্লিশ মিনিট এক ঘণ্টা হয়ে যায়। সময় আগুপিছু এতো দ্রুত ছুটে যায় যে দৌড়েও ধরতে পারবে না মনে হয় তার। অলি সামনে এসে দাঁড়ায়, অনির্বাণ আছে, মা-বাবা-বউদি-দাদা ছুটে আসে, আবার ছুটে বেরিয়ে যায় তার পরীক্ষার সময়ের ক্ষতি হবে বলে। সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু দেখে না। হাউস টিউটর ঘনঘন এসে খোঁজখবর নেয় বলে আড্ডা ও হইচই কমে যায়। কলেজ ছুটি বলে পরীক্ষার্থী ছাড়া সবাই চলে গেছে বাড়িঘরে। বলতে গেলে রোহণ পড়া-পাগল হয়ে গেছে, ফুটবলের মাঠে-মাঠে যেমন ফুটবলের জন্য হয়ে যায়।

মীনাক্ষী যে এদিকে ভেতরে-ভেতরে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে যাচ্ছে কে জানত! ওর সুস্থতা যে দপ করে জ্বলে ওঠা তাও-বা কে বুঝেছে! তরুণ ইন্টার্নি ডাক্তার রায়হান ওর পা এবং রোগ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে বুঝি। মীনাক্ষী বুঝতেই পারেনি ওর পায়ের সঙ্গে ক্যান্সারের কোনো জটিল সম্পর্ক থাকতে পারে। এই নিয়ে রায়হান প্রতিদিন কথা বলে চলে। মীনাক্ষীও ওকে সবকিছু বলে : রোহণ নামের সঙ্গে মিল আছে বলেই হয়তো ডাক্তারের সঙ্গে মিত্রতা হয়ে গেল। দুনিয়ায় মানুষ কত সামান্য অনুষঙ্গেই না সুখ খুঁজে পায়!

মীনাক্ষী লিখেছে – প্রথম-প্রথম আমার খুব লজ্জা হতো। পা, পেট দেখতে দেওয়া অস্বস্তিকর না? বুক তো নয়ই। হোক না ডাক্তার, কাউকে এভাবে শরীর দেখানো খুব বিশ্রী ব্যাপার। মা ওদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। ডাক্তার রায়হানের মধ্যে অন্য একজনের ছায়া দেখতে বা অনুষঙ্গ খুঁজতে ভালোও লাগল। ডাক্তারও কী নির্লজ্জ রে বাবা! অমনি বলে বসল, আমার পা সুন্দর। পাশে মা কী যেন নিয়ে টুকটাক শব্দ করছে, তারই ফাঁকে ডাক্তার কথা বলছে না, যেন চুরি করছে। আমারও তো কোনো কাজ নেই, না পড়াশুনা, না পরীক্ষা – মনটা খালি উড়ুউড়ু থাকে। গল্পের বই পড়ি, মন মিশে যায় গল্পের চরিত্রের সঙ্গে। নিজেকে ওদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অলস মনের কী যে সুখ তুমি হয়তো কোনোদিন বুঝেও বুঝতে পারনি। ডাক্তার আসে, আমি তখন হয়তো উপন্যাসের কাহিনি ও নিজেকে নিয়ে গড়া কল্পরাজ্যের স্বপ্নে। রেজারেকশন উপন্যাসের মাসলোভার মতো অবস্থা আমার যেন হতে পারত। হলে? এক জায়গায় মাসলোভা সম্পর্কে আছে, ‘দুদিন আগে ওর কোঁকড়া চুল যেমনভাবে কপালে বিন্যস্ত ছিল, আজো তেমনি ঠিক তেমনিভাবে বিন্যাস করা। ওর মুখে অস্বাস্থ্যের লক্ষণ প্রকট, চোখ-মুখ কেমন যেন ফোলা-ফোলা ফ্যাকাসে, তবু সে-মুখ আকর্ষণীয়, সম্পূর্ণ প্রশান্ত; কেবল ফুলো-ফুলো চোখের পাতার আড়াল থেকে বিশেষ করে ঝলক দিচ্ছিল লক্ষ্মীটেরা কালো চকচকে চোখদুটি।’ আমার বুকের ভেতর তখন ধড়াস-ধড়াস করছে।      এ-সময় কারো সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে! কার সঙ্গে বলব। নেখলিউদভ্ ফুসলে যার সতীত্ব নাশ করেছে সেই মাসলোভা বহুদিন পরে অভিযুক্ত হয়ে আদালতে এসেছে। তারই বিচারে আজ নেখলিউদভ্ জুরিমন্ডলীর একজন সদস্য। নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ এবং মাসলোভার দুর্ভাগ্যের ভার লাঘব করার উদ্দেশ্যে তিনি তাকে বিবাহ করবেন বলে মনস্থ করলেন। নেখলিউদভ্ সেই মাসলোভার সম্মুখীন। এ-সময় মনটা কেমন করছে তুমি বলতে পারো? তারপর ধরো স্বপ্নের কথা। স্বপ্নের জালে আমি লক্ষ রাজপুত্রকে দেখতে পাই। তুমি রাগ করো না, আমি সত্য কথা বলে যাচ্ছি। তোমাকে ছাড়া আর কাকেইবা এতো অকপটে সব স্বীকার করতে পারি! এখন অভিমানবশত না বুঝলেও একদিন আমার কথা ঠিক অনুভব করতে পারবে। একজনের অনুভব আরেক জন হয়তো সঙ্গে-সঙ্গে হৃদয়দম নাও করতে পারে। ওটা দোষের কিছু নয়। আমি এতো আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি যে সবকিছু     ঠিক-ঠিক বোঝাতে পারছি কিনা তাও জানি না। তুমি যখন আসবে তখন হয়তো বুঝে নিতে পারবে। ডাকলে আসবে তো? তোমার ফুটবল, আলী কাকা বা বাড়ির অন্য কারুর ওজর দেখাবে না তো? ডাক্তারকে যদি প্রশ্ন করি, বলধা গার্ডেন দেখতে যেতে পারব? অমনি সঙ্গে-সঙ্গে বলে, এখন নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ফোটার সময় নয়। শীতের সময় যেও। আমি সব বুঝেও চুপ মেরে থাকি। পুরুষের মন তখন কোথায় ঘুরে বেড়ায় ধরা মুশকিল। তবে একটা সময়ে ঠিক-ঠিক ধরা যায়। কখন বলো তো?

মায়ের কথা কিছুই বললাম না। ওসব তোমার ভালো নাও লাগতে পারে। লাগলেও এখন ওসব লেখার সময় নয়। তোমার কাছ থেকে পরীক্ষায় স্টার নম্বর আশা করছি। তুমি পারবে। দেবে তো? খুব ভালো ফল আশা করছি তোমার থেকে…। পরীক্ষার পাশের নম্বর তুলে তুমি সোজা আমার কাছে চলে আসবে। তখন আমি চট্টগ্রামে থাকব। মনে থাকবে তো?… মনে রেখো। ভালো থেকো। আমার উষ্ণতা…



দ্বাদশ অধ্যায়

পরীক্ষার আগেই মুনির প্রেমে পড়ল মর্জিনার। পাঁচ দিন মাত্র বাকি পরীক্ষার। মুনির গেল কলেজে। মর্জিনাও। রসায়নের প্র্যাকটিক্যাল খাতা জমা দিতে। মুনির বলল, কলেজ থেকে বের হতে গিয়ে ভূতে পেল আমাদের। নইলে অমন সময়ের টানাটানি অসময়ে দু জনে একা হলাম কী করে? পঞ্চশরের কবিতা পড়েছিলাম কবিতার ক্লাসে। সে-ই বুঝি আশেপাশে ওঁৎ পেতে ছিল।

প্রথম দিনেই ওরা চুমো খেল। দিনের শেষে এক রিকশায় ফিরছিল। বৃষ্টি পড়ছিল অঝোরে, কিন্তু কোনো রাগটাগ কারো প্রতি ছিল না। রিকশার পর্দার আড়ালে বসে ভূতে পাওয়ার মতো   কেঁপে-কেঁপে স্বপ্নের কথা বলছিল, নানা কিছু প্রতিজ্ঞা করছিল, চুমো খেল, হাতে হাতে আদর খেলছিল। একবার গেল নিয়াজ স্টেডিয়ামে, সেখান থেকে গেল পরীর পাহাড়ে। বৃষ্টিও খেলায় মেতেছিল আর ওরাও রিকশা থেকে নামতে পারছিল না। পাহাড়েও উঠতে পারে না রিকশা, খাড়া পথ। তাতেও অখুশি নয় ওরা। বৃষ্টির জন্য রাস্তায় লোক চলাচল কম, রিকশাও। মুষলধারে বৃষ্টি। মর্জিনা বলল, এবার চলো, রাস্তায় রাত কাটিয়ে দেবে নাকি!

রাত বাড়ে কেন? – মুনির কোনো কিছু না ভেবেই যেন বলল।

ওর কোনো জ্ঞানগম্যি ও তালমাত্রা নেই – মর্জিনা বলল।

বৃষ্টির আছে। সে খুব সদয় এখন আমাদের প্রতি।

তবুও যেতে হয়। ঘরে মা-বাবা আছে। পরীক্ষা আছে। বৃষ্টিতে গেছি ভিজে। ফিরতে হয় এখন।

প্রেমে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজলে অসুখ করে না। – বলে মুনির হেসে উঠল। মর্জিনাও সংক্রামক হাসিতে যোগ দিলো।

কাল আমরা কোর্টে যাব। আজ থাক। – মর্জিনা হাসি থামিয়ে বলল।

কী – রেজিস্ট্রি করবে নাকি! তাহলে চলো চলো।

রিকশাওয়ালা ভিজতে-ভিজতে বলল, এইবার কডে যাইয়ম। তোঁয়ারার মতিগতি ভালা না লাগের অাঁর।

চলো চলো, লালখান বাজারে। – মুনির বলে দিলো।

তোঁয়ারারে ভূতে পাইয়ে মনে অয়। – রিকশাওয়ালা সন্দেহ করে বলল।

ভূতে পাওয়ার কথায় ওরা হেসে উঠল বৃষ্টির শব্দ মান্য করে।

হ্যাঁ, ভূতেই পেয়েছে। প্রেমে পড়লে অনেক কিছুর মধ্যে ভূতের হালও হয়।

বাড়িতে ফিরে মর্জিনার কী হাল হয় কে জানে! মুনির তো যাবে হোস্টেলে। বৃষ্টি তো সদয় হয়ে এই কান্ড শুরু করেছে। নইলে ওরা এভাবে পরস্পরের এতো কাছাকাছি আসার সুযোগ কোথায় পেত? বৃষ্টিই এভাবে অভাজনকেও মুখোমুখি করে দেয়। দীর্ঘ খরা হয়েছিল বোধহয় এজন্যই, ওদের অনুভূতিতে ঝড় এনে দিয়েছে। ধরণিকে রসসিক্ত করে, উর্বর করে। ধরণিও শিহরিত হয়।



ভেজা কাপড় বদলাতে-বদলাতে মুনির রোহণকে বলল, মীনাক্ষীর চিঠি পেয়েছিস? সে কেমন আছে রে?

রোহণ আবার ওর দিকে চোখ না তুলে বলল, তুই আগে নিজেকে সামাল দে। অসময়ে ভিজে-ভিজে কোথা থেকে এলি?

আছে। অনেক কিছু আছে। কাল আমার সঙ্গে কোর্টে যেতে হবে।

কোর্টে কেন? কী করেছিস? মারামারি, রাহাজানি? তুই তো অমনটি না।

সে অনেক কথা। এখন শুধু এটুকু জানলে কি চলবে যে মর্জিনা ও আমি কাল বিয়ে করতে যাচ্ছি!

আরো জানতে হবে। কবে থেকে কী করে এসব হলো জানা চাই। এতো অল্পে আমি তুষ্ট নই।

মুনির কাপড় বদলে তোয়ালে দিয়ে মাথা ঘসতে শুরু করল, তাহলে শোন…

রাত গড়িয়ে চলল। বৃষ্টি থামল। বাতি নিবিয়ে দেওয়ার পরও ওর বলা থামে না। আবার বৃষ্টি নামল। অন্যদিন কথা বলতে-বলতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। রোহণ শ্রোতা, ওর কথা বা প্রশ্ন শোনার সময় তার নেই। না বলতে পেরে একসময় তারও তন্দ্রা নেমে আসে। কথা বলতে-বলতে ঘুম এসে গেলে রোহণের কথা হয়ে যায় এলোমেলো। কথার মাঝে নানা অসংলগ্ন কথা চলে আসে, আর সেসব যখন বলতে থাকে তখন তার মনে হয় ঠিক-ঠিক বলছে, কিন্তু শ্রোতা তখন খেই ধরতে পারে না। ঘুমের চোখে চিন্তার সঙ্গে মুখ তাল মেলাতে পারে না, মনের আগে শরীর ঘুমিয়ে পড়ে বলেই কি এরকম হয়, এজন্যই কি এলোমেলো হয়ে যায়। তখন মুনির প্রশ্ন করলে সে আলগোছে বুঝতে পারে তার ঘুম ও জাগরণের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে, চিন্তা ও বলার মাঝে ফাঁক থেকে যাচ্ছে। তবুও ঘুমের সেই সময়টিতে কথা বলা রোহণের খুব ভালো লাগে। ঘুমের কোলে পুরোপুরি চলে যাওয়ার আগের সময়টুকু ওর খুব প্রিয়। মুনিরও   সে-রকম কিনা রোহণ জানে না। মুনির প্রেমে পড়েছে, আগ্রাসী সেই ভালোবাসা ওদের ছত্রখান করে দিয়েছে কি! ওরা বিয়ে করবে কাল। রোহণেরও ঘুম পেয়েছে। মুনির বলেছে, মর্জিনাই প্রস্তাব দিয়েছে বিয়ের, পরীক্ষার আগেই। তোকে কোর্টে যেতে হবে।

শুনতে-শুনতে রোহণও জাগরণের ঘুমে স্বপ্ন দেখছে… মীনাক্ষী ভালো হয়ে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে। পিজি থেকে বেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেড়াচ্ছে ওরা। উদ্যানের দক্ষিণপ্রান্তে গাছপালার ঘন অরণ্য যেন, কদম ও চাঁপাগাছ বিশাল মহীরূহ হয়ে আকাশ ঢেকে দিয়েছে, মাঝে-মাঝে অচেনা লতাগুল্মে চলার পথ বন্ধ, ঘন সবুজে পাখির ডাকে ওরা বলাবলি করছে, এ কোথায় এলাম। মীনাক্ষী বলল, তুমি তো ভালোবাসো বলেছ, দাও এবার চুমো। বলে সে রোহণের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল চোখ বুজে, আবার মেলে, আবার আধবোজা চোখ-মুখ তুলে ধরল, যেন চিত্রার্পিত। সেই ঘননিবিড় অরণ্যে সে চুমো উৎসব করল। মীনাক্ষীকে দু হাতে ধরে ঝোপের পাশে বসিয়ে ফিরতেই দেখে সামনে চন্দ্রমল্লি। সেও হুড়মুড় করে বলে বসল, এবার আমাকে আমার প্রাপ্য দাও, তুমি মীনাক্ষীকে দিয়েছ, আমাকেও দাও। বলতে-বলতে বৃষ্টির মুখভঙ্গিতে সামনে দাঁড়াল যেন তখুনি না খেলে সে ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়বে। পৃথিবীর যাবতীয় সুষমা লুকিয়ে প্রকাশিত থাকে চুম্বনোদ্যত দুটি ওষ্ঠে, মানবদেহের সমস্ত সৌন্দর্য উপচে পড়তে চায় উদ্যত চুম্বনে, লাবণ্য ঝরে পড়ে জ্যোৎস্না-বৃষ্টির মতো আকাঙ্ক্ষিত চুম্বনের যাঞ্চায় – বাসনা, কামনা, লাবণ্য ও অমলিন সুখ মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে দুটি ওষ্ঠে… ততক্ষণে সোহরাওয়ার্দীর অরণ্য কোথায় উধাও হয়ে গেছে… রোহণ তখন বউদির ঘর থেকে পাশের নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখে সামনে অলি। অলি তখন একটুও সময় খরচ হতে না দিয়ে বলল, তোমার আর কী বলার আছে? এখানে সবাই আছে, ও ঘরে মীনাক্ষী ও বউদি, ওদের কি বললে? কী কথা হলো ওদের সঙ্গে?

কিছু না।

কিছুই না?

না।

তাহলে চুপচাপ চুমো খেলে? কার সামনে কাকে? আদর করলে? গায়ে হাত দিলে? আমি তোমার হাত গুঁড়িয়ে দেব, মুখ থেঁতো করে দেব… বলতে বলতে অলি রোহণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, মারতে শুরু করল। কিল, ঘুষি, চড় এবং কামড়ে ধরল রোহণের বাঁ কান। রোহণ ধড়ফড় করে জেগে উঠল। স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে-ভাবতে পাশ ফিরে শুতেই ঘুমের দেবতা হিপনোসের কোলে চলে গেল। হিপোনোস মানুষের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল। তার দুটি পাখা আছে, চোখের পলকে উড়ে গিয়ে পরিশ্রান্তকে ফুঁ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেন।

পরদিন মর্জিনা ও মুনিরের বিয়ে হয়ে গেল। কোর্টে মুনিরের পরিচিত উকিল ছিল, ম্যাজিস্ট্রেট ছিল। ঝড়-বাদলায়ও পরীর পাহাড় ডুবে ছিল সারাদিন। সকাল থেকে শহর বৃষ্টির শামিয়ানায় এতো সুআচ্ছন্ন ছিল যে, গাড়ি পাওয়াই ছিল সমস্যা। সব বাধা ঠেলে মর্জিনা ঠিক সময়ে কোর্টে হাজির। রোহণের চোখের সামনে সব ঘটে গেল। মাত্র একটি দিনের ফাঁকে মর্জিনা-মুনির আইনত স্বামী-স্ত্রী।

সেই বিখ্যাত বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কোনোমতে দুটি বেবিট্যাক্সি নিয়ে ওরা ছুটল হোটেল সফিনায়। একটাতে মর্জিনা-মুনির, অন্যটিতে রেবেকা, অজিত ও রোহণ। সফিনার চার তলার      রেস্তোরাঁয় বসে বিবাহোত্তর ভোজ চলল। কাচের বড়-বড় পাল্লা দিয়ে বাইরে বৃষ্টির হামলা দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির ছাঁট উড়ে যায় কুয়াশার মতো। হাওয়ার সঙ্গী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাচের পাল্লায়। বাজ পড়ে যেন ওদের বিয়ের উৎসবে মেতেছে। মর্জিনা কেঁপে ওঠে। রেবেকা বলল, তাহলে তোরা বিয়ে করেও এই গর্জনশীল বর্ষায় আলাদা থাকবি। পারবি!

মর্জিনা কিছু না বলে বাইরের দিকে তাকাল যেন উত্তরটা ওই বৃষ্টিতে ভিজছে। মনির হাসল যেন চন্দ্রচূড়।

অজিত ফ্যালফ্যাল তাকাল রোহণের দিকে। রোহণ একে-একে মর্জিনা-মুনিরের দিকে তাকিয়ে বলল, এখন ওদের অজ্ঞাতবাস শুরু হলো।

অজ্ঞাতবাস অন্য ব্যাপার – রেবেকা বাংলার ছাত্রীর মতো বলল।

দু জন দু জনের কাছ থেকে অজ্ঞাতবাস – রোহণ সঙ্গে-সঙ্গে বলল।

শুনে মর্জিনা ছাড়া সবাই হেসে দিলো। রোহণের মুখে তখন চিংড়ির গরম দুর্দান্ত পাকোড়া। ভিনিগার-মাখা পেঁয়াজ মুখে দিয়ে রোহণ ফের বলল, আলাদা-আলাদা বাস।

অজিত বলল, প্রকৃত ব্রহ্মচর্য।

ওদের আলাপে মিলন-ফুলশয্যার গন্ধ চলে আসছে বলে হোক, নিঃসহায়তা আছে বলেই হোক, প্রসঙ্গ পালটানো দরকার হয়ে পড়ল। হঠাৎ বাজ পড়ার শব্দে সে সুযোগ এসে গেল। কাচের পাল্লার বাইরে বৃষ্টির প্রলয় ঘটে যাচ্ছে। গরম কাটলেট চলে এলো, সঙ্গে পুদিনা বাটা, কাসুন্দিও এসেছে। মর্জিনার খুব প্রিয় পুদিনা। রেবেকা বলল, আমারও ভালো লাগছে। অজিত বলল, এরপর মিষ্টিমুখ হবে তো? বিয়ে বলে কথা।

না, মিষ্টির বদলে কেক বা আইসক্রিম। আইসক্রিম জিতে গেল। কিন্তু বৃষ্টি আর লাজলজ্জা ভুলে থামে না। তিনটি ঘণ্টা কেটে গেল কোনদিকে। আর ওদের সকলকে অবাক করে ঢুকে পড়ল পুলিশ এবং বলল, আপনাদের মধ্যে কে মুনির?

সবাই অপ্রস্ত্তত হয়ে গেল। এতো তাড়াতাড়ি এবং বৃষ্টির দুর্যোগে কী করে মর্জিনার অভিভাবক টের পেয়ে গেল, ঠিক-ঠিক হোটেলেও কী করে চলে এলো বুঝতে পারল না। সবাইকে চুপ করে থাকতে দেখে পুলিশের প্রধান বলল, তাহলে আপনারা সবাই চলুন।

রেবেকাও বলে দিলো, তাই চলুন।

রোহণ এগিয়ে গিয়ে বলল, আমরা সবাই বড়, মুনিরের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ দেখিয়ে দিন অথবা বলুন।

পুলিশ অফিসার মুনিরের বিরুদ্ধে নারী অপহরণের অভিযোগ জানিয়ে বলল, আপনাদের বক্তব্য আদালতে বলবেন, আমার কাজ আমাকে করতে দিন।

মর্জিনা বলল, আমি ছোট নই, আমার সার্টিফিকেট আছে, আমি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছি।

অফিসার বলল, সেটা আদালতে প্রমাণ হবে। এখন চলুন।

মুনির নিজের পরিচয় দিতে এগিয়ে গেল এবং পুলিশ তাদের নিয়ে চলল। রোহণরাও তাদের তুলে দিতে নিচে চলল। পুলিশের গাড়ি ওদের নিয়ে গেল। রোহণরাও মুনিরের পরিচিত উকিল ও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ছুটল। ওদের জামিন নিতে হবে দরকার হলে। আর যদি হাজতবাস হয়, মর্জিনাকে যাতে তার বাবা নিয়ে যেতে না পারে তার ব্যবস্থা দরকার। ওদের সব আনন্দ এক নিমেষে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল।

পরদিন দুপুর ১১টায় বৃষ্টি হার মানল। কোর্টে অনেক লোক। মর্জিনার বাবার উকিল আর্জি পেশ করল। মুনিরের উকিলও বক্তব্য জানাল। বিচারক ম্যাজিস্ট্রেট বিচার নিষ্পত্তি করে বললেন, মুনির ও মর্জিনার বিবাহ আইনত সিদ্ধ। এখন তারা মুক্ত এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বাধীনভাবে বাস করতে পারবেন।

রোহণদের জীবনে এ-এক বিশাল অভূতপূর্ব ঘটনা। কোনো যুবক-যুবতী এভাবে বিয়ে করলেও তারা নিজ চোখে দেখেনি। আদালতে এভাবে দাঁড়িয়ে কাউকে নিজের বিয়ের পক্ষে এভাবে বলতে শোনেনি। মর্জিনা ও মুনিরকে নিয়ে ওরা এজলাস থেকে বেরিয়ে এলো। অজিত সঙ্গে আছে। আরো কিছু ছাত্র আছে। ওরা সবাই এতোক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিল। আদালত থেকে বেরিয়ে     চিন্তায় পড়ল এখন কোথায় যাবে মর্জিনা ও মুনির। রোহণ ও মুনির হোস্টেলের বাসিন্দা। মুনিরের বাবা এখন না মানলেও পরে হয়তো মেনে নেবে। মুনিরের ম্যাজিস্ট্রেট-আত্মীয় বলল, আমার বাসায় থাকতে পার তোমরা। কী, থাকবে?

শেষে ঠিক হলো মুনির হোস্টেলে থেকে পরীক্ষা দেবে। মর্জিনা পরীক্ষা দেবে ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় থেকে। আগে পরীক্ষা, তারপর সংসার।



ত্রয়োদশ অধ্যায়

পরীক্ষাশেষে রোহণ বাড়িতে এলো। মর্জিনা, মুনির, অজিত, রেবেকা, সুনন্দ আর সামনে নেই, আছে মনে। মীনাক্ষীর চিঠি পেয়েছে রোহণ। সে লিখেছে, আমাকে কদিন তোমার কাছে থাকতে দেবে?…

ঠিক সে-রকমই মর্জিনা বলেছিল মুনিরকে। রোহণ আরো ভাবছে, অলি যেন অভিমানে নীরবে বলছে, কই, তুমি কথা রাখবে না? তুমি-না একদিন বলেছিলে, আমার জন্য যদি প্রাণ দিতে হয় তো মন থেকেই দেবে? কই, তোমার দাদার কথা রাখলে না তো!

বউদি যেন বলছে, ভাই, তুমি আর মোহে পড়ো না। ভেতরের সাপটাকে শান্ত থাকতে দাও। বুকের সাপকে বেশি খুঁচিও না। মনের অন্ধকার কোণে আলো ফেলে বেশি কিছু খুঁজতে যেও না। তোমার বাইরের জগৎটাকে আগে সামলে নাও।





এদিকে বর্ষার প্রবল বৃষ্টির দিনে চাষের কাজ চলছে। কর্ণফুলীতে বেশি পানি নেই বলে এই কদিনের বৃষ্টিতে বান হয়নি এখনো। অনির্বাণ শুক্লপক্ষের চাঁদের মতো দিন-দিন বড় হচ্ছে। বরবটি ও ঢেঁড়সের আগা লকলক করে বেড়ে চলেছে। গ্রামের নিবিড় জগতে নতুন জীবন খুলে যেতে বসেছে। ঝিঙে-ধুদুলে বিকেলেই ফুল ফুটে যায়। বৃষ্টির জন্য ওরা সন্ধে কখন নামে বুঝতে না পেরে আগেভাগে ফুটে হলুদ রং নিয়ে দুলতে থাকে। পাখিরা আগেভাগে রাতের আশ্রয় এলাকায় চলে আসে। আখ বাড়ছে তুরতুর করে। খাড়া একটি কাঠির গিলে পুঁই ও শিমতলার কী জৌলুস! গোবর সার পেয়ে স্থলপদ্ম ও কলাবতী ফুলের ঝাড় নবযৌবন পেয়ে গেছে। বাতাবির সঙ্গে পাতি লেবুর কলম করে বিয়ে দিয়েছে। তাদের ও মর্জিনা-মুনিরের সংসার ভালো চলুক। ভিটের শেয়ালেরা ঠিক-ঠিক আছে। ওদের সঙ্গে রোহণের সখ্য হয়ে গেছে। দেখলে অমনি পালিয়ে যায় না। বাঁশের নতুন শিশুরা মাথা তুলে দু-তিন হাত বেড়ে গেছে। বাঁশতলায় ঘাস বা আগাছা ঘোর বর্ষায়ও হয়নি। পুকুরে এখন পোনা ফেলবে কিনা ভাবছে। বান হলে সব পালাবে। আবার কখনোবা অনেক মাছ ঢুকে পড়ে। সরবতি লেবুগাছটির ডালপালা চারদিকে পড়ে মাটিতে ঠেকেছে, তলাটা যেন একটি ঘর। ধরেছেও প্রচুর। মাথা নিচু করে উঁকি মেরে ভালো করে দেখল খুঁটির ঠেস দেবে কিনা। বড় হয়ে একেকটি লেবু আট-নয়শো গ্রাম পর্যন্ত হয়। শহরে এর ভালো চাহিদা। গাছের তলায় কুবা পাখি জোয়ারের সময় কুমকুম শব্দে ডাকে। কী লাল তাদের চোখ, যেন সবসময় রেগে আছে। এদিক-ওদিক বিশেষ যায় না। ব্যাঙ, কেঁচো, ঝিঁঝি যা পায় খায়।

মাঝে-মাঝে হঠাৎ ইচ্ছে করে পড়াশোনা ছেড়েছুড়ে জীব-উদ্ভিদ জগতের রাজ্যে মিশে যায়। প্রকৃতির জগৎই তো মুক্তির জগৎ। মানুষ তো শুধু পুরুষ নয়, পাশাপাশি আছে নারী, নারী-পুরুষের যৌবন ও জৌলুস পৃথিবীকে শাসন করে। শীতের করাল থাবা মানুষের রক্তমাংসের ওপর দিয়ে চলে যায়, গ্রীষ্মের খরতাপ দগ্ধ করে দিয়ে যায় মানুষের শরীর, তাতে মানবদেহ আরো তপ্ত ও রাঙা হয়ে ওঠে, যেন বলে এই আমার হাত, এই আমার হাতিয়ার, আমি ভয় পাই যদিও ভেঙে পড়ি না।

একটা পেয়ারা পেয়ে খেতে-খেতে দেখে পাশের জংলা থেকে শেয়ালটা ডাঁট মেরে দেখছে। অমনি তার ভাবনা উধাও। মনে প্রশান্তি নেমে এলো, যেন বিশ্ব ওর চারপাশে ঘুরছে। আর বলল যেন বাচ্চা ছেলেকে বলছে, কিরে, একটা পাকা পেয়ারা চেখে দেখবি? বলেই একটা পাকা পেয়ারা ওর দিকে আস্তে করে এগিয়ে দিলো, যেন বুঝতে পারে যে তাকে আক্রমণ নয়, খেতে দিচ্ছে। সেও দিব্যি একটু শুঁকে নিয়ে মুখে তুলে নিল। যেনবা এক টুকরো মাংস!

এমন সময় পেছন থেকে কাঁধে হাত রেখে বউদি বলল, মানুষ ছেড়ে এবার শেয়ালের সঙ্গে ভালোবাসা? মানুষ এতোই অপাঙ্ক্তেয় বুঝি!

তখন রোহণের মনে হলো বউদি ‘মানুষ’ কথাটি বলল নিজেকে আড়াল করার জন্য। শেয়ালটাও তেমনি বসে বসে দেখছে ওদের। তখন রোহণ বলল, ও কেমন পেয়ারা খায় দেখলে তো? বলেই আরেকটা দিলো।

বউদি তার ধারে-কাছে না গিয়ে বলল, মীনাক্ষী সম্পর্কে কিছু ভেবেছ? ওর চিঠি পড়ে মনে হয় দিন ঘনিয়ে এসেছে।

সঙ্গে-সঙ্গে ওর মনে হলো, মীনাক্ষী এতোদিনে একবারও লেখেনি ওকে যেতে। যাওয়ার সময় রোহণ ওকে কথা দিয়েছিল ডাকলেই শুধু যাবে। ‘মানুষ’ বলতে মীনাক্ষীকেই ইঙ্গিত করেছে বউদি! অমনি রোহণের মনে হলো গাছপালা, চাষবাস, শেয়াল চুলোয় থাক, ওকে যেতে হবে মীনাক্ষীর কাছে। আর বলল, তোমার কথা যেন ঠিক না হয়, তোমার অনুমান মিথ্যে হোক, আমি কাল সকালেই ঢাকা যাব।

তারপর সেই শেয়াল, পাকা পেয়ারা, মেঘ-আকাশ, ডাকতে থাকা চাতক ও মৌটুসি, কাঠবেড়ালির থকথক ডাক, কুরকালের তীক্ষ্ণ চিৎকার, হঠাৎ গর্জে ওঠা আকাশ একে একে সবাই তাকে চমকে দিলো। বউদিকেও হঠাৎ মনে হলো পথহারা শিশুরা যেমন পরস্পরের সঙ্গীকে খুঁজে বেড়ায়, নদীর ঘূর্ণিজল যেমন ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়ে নিজেকে খোঁজে, তেমনি সে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে বা খুঁজছে।

মেঘ ডেকে বৃষ্টি নামল। শরীরটাকে চাঙা করতে রোহণ পুকুরে নেমে গেল। পুকুরের এমাথা থেকে ওমাথা সাঁতার কেটে-কেটে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ল এবং চিৎ-সাঁতার দিয়ে মাঝপুকুরে ভেসে রইল তখন চকিতে মনে পড়ে গেল সাঁতার শেখার সেই দিনগুলোর কথা। সেই বউদি ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে ভিজতে-ভিজতে। দেখে নিজেকে খুব ভিখিরি মনে হলো। আস্তে-আস্তে পুকুরের অগ্নিকোণে গিয়ে বুকজলে দাঁড়িয়ে গায়ের ময়লা সাফ করা শুরু করল রোহণ। বউদি কিছু না বলে একটুও সাঁতার না কেটে, একবারও রোহণের দিকে না দেখে একটিমাত্র ডুব দিয়ে ভেজা শাড়ি গায়ে সামলাতে-সামলাতে চলে গেল। পুকুরের মাঝখানের বাঁশটি নেই। সঙ্গে-সঙ্গে রোহণ ভাবল, একটি বাঁশ ওখানে পুঁততে হবে। রোহণ শরীর ও মনের ময়লা সাফ করতে-করতে দুটি আধফোটা রক্তশাপলা তুলে নিয়ে ঘরে চলে এলো। বুকের ভেতরটা রক্তে মাখামাখি হচ্ছে। অনৈসর্গিক ঝড়-বাদলার অনুষঙ্গে।

‘মানুষ’ বলতে চন্দ্রমল্লি নিজেকে বোঝাতে চায়নি তো?



চতুর্দশ অধ্যায়

ভোরবেলা। সবে আলো ফুটে বের হচ্ছে। আলো এতো নরম ও দৃশ্যমান অদৃশ্য যে, বর্ণনার ওপ্রান্তে বসে আছে যেনবা। সেই আলো সচরাচর দৃশ্যমান থমথমে মেঘের মতো স্থির হয়ে আছে, যেন কোনো গরিব ঘরের রূপসী তার শতচ্ছিন্ন অাঁচল দিয়ে শরীরের অপার বৈভব লুকোচ্ছে। অথবা সূর্যের অগ্ন্যুৎপাতকে শক্তিশালী উপগ্রহ ক্যামেরায় বিশাল করে দেখালে যেমন চলমান দেখায়, খুব পাতলা ও গতিশীল দেখায়, সে-রকম মিহি আলোর ওড়না, ধীর সঞ্চরণশীল। শেফালীর মা উঠেছে, নদী-কাকি উঠে প্রতিদিনের মতো গোয়ালঘরে গেছে গাই বের করতে। বউদি কিছু বলবে বলে ঘরে ঢুকে ভোরের ওই না-ফোটা আলোর মতো আবার তেমনি কিছু না বলে বিষণ্ণ মুখে চলে গেল। অনির্বাণ ঘুমোচ্ছে।

ভোরের আলো ফুটে বের হচ্ছে পিচ্ছিল সূক্ষ্ম আলো-অাঁধারি ধাঁধা থেকে। একেবারে চোখের সামনে টুপটুপ ফুটে-ফুটে বের হচ্ছে, নোট কাগজের টাকা গোনার মতো করে, শান্ত জলে ঢিল পড়লে যেমন চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, অথবা একটি মাত্র ছররা গুলির শব্দে নির্জন বনভূমি যেমন শব্দতরঙ্গে খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে। চন্দ্রবউদি শেষ পর্যন্ত কিছুই বলল না। অলির সঙ্গে দেখা হলো দূর থেকে দুটি গ্রহের মতো, কিন্তু গ্রহণ হলো না,      চন্দ্রগ্রহণ-সূর্যগ্রহণ যেমন হয়। তাই দেখা হয়েও হলো না বলা চলে। তবুও রোহণকে ছুটতে হলো ঢাকার পথে। দোভাষী বা মনছব আলীর লঞ্চ ধরতে হবে, চট্টগ্রামে যাওয়ার একমাত্র পথ ওই লঞ্চ। মীনাক্ষীর চিঠিতে তার অসুখের কোনো কথা থাকে না এখন। শহরে পৌঁছে ওদের বাসায় যেতে হবে, এণাক্ষীও হয়তো যেতে চাইতে পারে। মীনাক্ষীকে কেমন দেখতে পাবে সে জানে না, ওর ভালোবাসা কেমন আছে তাও চিঠির বাইরে জানে না। চিঠি, নাকি মুখের কথা সত্য!

সাময়িক আবেগ থেকেও চিঠি লিখতে পারে একজন। সেই সাময়িকতা তো স্থায়ী নয়, অথচ তা চিঠিতে লেখা হয়ে গেছে। তখনো কি চিঠি চিঠিই থাকে? বাসায় এণাক্ষী আছে, ওর বাবা কাজে বেরিয়েছে। মা ঢাকায়, এণাক্ষীকে সব খুলে বলল রোহণ।

আমাকে নেবে না? যদি কিছু হয়ে যায়? দিদিকে দেখতে পাব না কোনোদিন! এণাক্ষী অহিংস আক্রমণে বলল। রোহণেরও মনে হয় যেন খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু এণাক্ষীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আমি তো যাচ্ছি? তোমাকে অবশ্যই জানাব। বলেই সে স্টেশনের দিকে ছুটল চলন্ত দ্বীপের মতো।



মর্জিনা ও মুনির বাড়িতে উঠেছে। মুনিরের মা-বাবা প্রথমে বিরোধিতা করলেও পরে মেনে নিয়েছে। মর্জিনা একদিনেই    শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করে নিয়েছে। অজিত আশ্রমেই আছে। রেবেকা সিলেটে গেছে মা-বাবার কাছে।

রোহণ মীনাক্ষীকে একরকম কথা দিয়েছে। ওর সামনে গেলে অনেক কিছুই বলতে হবে। মর্জিনা-মুনিরের সব কথা – সেই বাদল দিনের অভিযান ও ধরা পড়ে কী অবস্থা হয়েছিল সব-সব। আর মীনাক্ষী যদি মর্জিনার মতো তাকে বিয়ে করতে বলে? এসব ভাবতে-ভাবতে রাত ৯টায় ঢাকায় পৌঁছল। নবাবপুরে সুশোভন হোটেলে উঠল। কাপড়-চোপড় বদলে নিয়ে মাথার নিচে বালিশের ওপর দু হাত দিয়ে চিৎপাত। দুটি বড়-বড় টিকটিকি যেন কুমিরছানা। পোকা ধরে খেতে-খেতে এদিক-ওদিক হাঁটছে যেন ঠিক অলস কুমিরছানা। পেট প্রায় ঢোল, তবুও সামনে পোকা পড়লে ছাড়ছে না।

সারারাত ঘুম হয়নি। স্বপ্নের অত্যাচার যেন মিছিল করে ধেয়ে আসছে। সেই বারবার ছেলেবেলায় ফিরে যাওয়া স্বপ্ন, সে প্রথম দিন থেকে চন্দ্রমল্লির মুগ্ধ ন্যাওটা। কী ভালো ছিল দিনগুলো, নতুন বউয়ের গায়ের গন্ধটা ভাসমান সুন্দর মাদকতাময়। সারাঘর ফুরফুরে হালকা। পাশ দিয়ে আসতে-যেতে গাল টেনে দিত যেন উড়ন্ত পাখির ছোঁ মারা, আবার হাতে ধরে পড়া শিখিয়ে দেওয়া, স্কুলের জামা-প্যান্ট হাতে তুলে দেওয়া, বইপত্র গুছিয়ে রাখা… কত কী। সেও কারণে-অকারণে পেছন-পেছন ঘুরঘুর করত। ঘুম পাড়াত মায়ের মতো সোহাগ বাড়িয়ে। ঐশ্বর্যময় সেই বয়সে এখনো   ফিরে-ফিরে যায়, যেন সত্যিই ফিরে গেছে মনে করে কোলে চড়ে বসে, মা-মা করে ডাকে। বউদি নাস্তানাবুদ হয়ে যায়, আচ্ছন্নতায় ডুবে যায় – বড় থেকে ছোট হয়ে যায়, খুব পছন্দ তার সেই ছেলেবেলা। দুর্দান্ত ঐশ্বর্যময় ছেলেবেলায় অনেকক্ষণ হারিয়ে যায়, ঘুমিয়ে পড়ে বউদির সঙ্গে, যেন বউদির ছেলে, বউ বলেও ডেকে নেয় মন ভরে। শরীর-মন ভরে যায় ব্যাকুলতায়। পুকুরে সাঁতার শেখা, ভয়ে আকুল হয়ে অাঁকড়ে ধরা, কিছুতেই বুকছাড়া না হওয়ার স্মৃতিদুর্গে চলে যায়। শৈশবানুবন্ধে ঢুকে পড়ে…। ঘুম থেকে জাগার সময় স্বপ্নে দেখে, একটা সাদা রাজহাঁস তার থেকে বড় একটা ডিমে তা দিচ্ছে। অজগরের ডিমের চেয়েও বড় সাদা ফুটফুটে ডিম। হয়তোবা তুলতুলে নরমও। ছেলেবেলায় ওর কেবলই মনে হতো একটি পরী ঘরের চালে বসে তাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পরীদের যেমন নিজের দেশের একটি ভাষা আছে, তেমনি স্বপ্নেরও নিজস্ব অর্থ আছে, স্বপ্নে যা দেখছে তার বাইরেও আছে একটি অর্থ, যেখানে স্বপ্ন ঘটে যাচ্ছে সেই অচেনা পরিবেশ, আসলে নকল একটি পরিবেশ – এজন্যই স্বপ্নের অর্থ বোঝা যায় না, স্বপ্নের ঘটনাও বেশ আজগুবি বা একেবারে অন্যরকম। কোনো-কোনো সময় মাথামুন্ডু ধরাই যায় না। বুঝতে না পারলেও বা কী আসে-যায়, স্বপ্নের অচেনা পরিবেশ অনেক লোভনীয় – আশ্চর্য সুন্দর। ভয়ের হলেও খুব আকর্ষণীয়।

স্বপ্নছিন্ন হয়ে উঠে ডাল-রুটি-ডিম খেতে নিচে নামল। ডিমটার খোসা খুলে দিয়েছে, কড়া সেদ্ধ নয়, বেশ তুলতুলে নরম, মনে হলো থালায় রুটির পাশে দেবে বসে আছে। অমনি তার স্বপ্নের ডিমের কথা মনে পড়ে গেল, ডিমটাও বেশ বড়। সে স্বপ্নের নরম ডিম খেয়ে চলল, একটু  নুন দিয়ে কুসুমটা সামান্য নরম থাকবে, সাদা অংশ শক্ত। লাল কুসুম হাঁসের ডিমের – খুব প্রিয় তার।



মীনাক্ষীকে দেখে মন ভরে উঠল। গায়ের সেই কালচে ভাবটা নেই। রোহণের হাত টেনে নিয়ে বলল, পরীক্ষার সময় আমার কথা খুব ভেবেছিলে? পরীক্ষা ভালো দিয়েছ তো?

তুমি ভালো আছ? তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মাসিমা আপনি ভালো আছেন তো?

মীনাক্ষীর মা নানা কথার পর উঠে বারান্দায় গেল। সেখানে দড়ি টেনে কাপড় শুকোতে দিয়েছে। অন্তর্বাসগুলো শাড়ির আড়ালে চলে গেল।

প্রতিদিন ভাবছি তুমি আসবে বলে। – সে নড়েচড়ে ভালো করে শুয়ে পড়ে বলল।

পরীক্ষার পর বাড়িতে গেলাম। কাল রওনা দিয়েছি। এণাক্ষীও আসতে চেয়েছিল। তারপর শুরু করল মর্জিনা-মুনিরকাব্য। মীনাক্ষী হেসে বাঁচে না। আবার গম্ভীর হয়ে যায়। মীনাক্ষীর মা ওদের একান্তে কথা বলতে দিতে পাশের কোনো রোগীকে দেখতে গেল। দেখে মীনাক্ষী খুব  হাসল খই ফোটার মতো।

রোহণ ওর কোলের কাছে বসল। ও বালিশে হেলান দিয়ে  এবার আধশোয়া হয়ে বসেছে, চুল খোলা, শাড়ি-ব্লাউজে ঢাকা বিধ্বস্ত প্রায় শরীর, মুখে লাবণ্যের অনেকখানি ধরা আছে। প্রায় জোড়া ভুরু, জোড়ার দিকে ঝুঁটি শালিকের মতো খাড়া, খুব মানানসই ও দুর্লভপ্রায়।

রোহণের ডান হাতখানা শাড়ির নিচে পেটের ওপর টেনে নিয়ে বলল, কী বিশ্রীভাবে কেটেছে দেখো।

রোহণ ওর চোখের ভুরুর সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে সেলাইয়ের দাগ গুনতে লাগল। ওপরের দাগগুলো ব্লাউজের ভেতরে। মীনাক্ষী ম্লান-কম্প্র হাসিতে ঢুকে গিয়ে বলল, সব দাগ গুনতে চাও?

পরে গুনে দেখব না হয় – রোহণ দীর্ঘ নিশ্বাস চেপে বলল।

পরে যদি সময় না পাও?

রোহণের ভেতরটা ধক্ করে উঠল। তাড়াতাড়ি সেটা চেপে ধরে বলল, ভালো হয়ে উঠে সুযোগ দেবে না বলছ তো?

অমনি সে হাতখানি টেনে নিয়ে বুকের প্রান্তে চেপে ধরল জোরে, একটু থেমে বলল, অমন করে বললে কেন?

রোহণের হাত বুকের প্রান্তে ওঠানামা ধকধক শব্দ গুনছে, নিশ্বাসের শব্দও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে, যেন নদীর ঢেউয়ের ওঠানামা, অথবা শীতঘুম থেকে প্রথম বর্ষায় ওঠা ব্যাঙ যেমন শরীর ফুলিয়ে-ফুলিয়ে ডাকে।

ঢিলেঢালা ব্লাউজের নিচে ওর স্তন-স্তবক আশ্চর্য নিটোল। গায়ের কালচে রং উধাও। মীনাক্ষী সোজা হয়ে বসে রোহণের কাঁধে মাথা  রেখে যেন নির্ভার হয়ে কোথাও উড়ছে। রোহণ ওর পিঠে সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর বলছে, তুমি ঠিক ভালো হয়ে উঠবে।

মীনাক্ষী ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলল, এখন একটি কথাও নয়, চুপ করে আমাকে একটু ভালোবাসো। কতদিন পর তোমাকে দেখছি বলো তো!

একটু পরেই আবার বলল, তোমার দু হাতে একটুও শক্তি নেই। তুমি আমাকে ধরে রাখতেই পারবে না।

রোহণ ধরে রইল, কাঁধে ওর মাথা। পিঠের অনাবৃত অংশ স্বাভাবিক ফর্সা, কালিমা কেটে গেছে, মুখ হাত থেকেও কম মসৃণ নয়। আগে কোনো দিন রোহণ ওকে এভাবে দেখেনি। সান্ত্বনা দিতে লাগল হাত বুলিয়ে। ত্বকের লাবণ্য ফিরে এসেছে দেখেও ভয় কাটে না। ক্যান্সারের বীজ যদি আবার অন্য দিকে বেড়ে ওঠে? কিছুদিন বা কয়েক বছর পর যদি আবার দেখা দেয়? এরকম প্রায়ই দেখা যায়। ডাক্তার বলল, দশ বছর বাঁচবে, অথচ দেখা গেল ছয় মাস এক বছর না যেতেই রোগীর দিন শেষ। মাগো, তেমন যেন না হয়। ওরা একসময় আকাশের মতো মূক হয়ে গেল।



ডাক্তার বলল, কাল-পরশু যে কোনো দিন ঘরে যেতে পারবে। এ কদিন এদিক-ওদিক হাঁটাহাটি করুক। পার্কেও হেঁটে আসতে পারে। এখন মুক্ত। ডিম্বাশয়ের বাইরের অংশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কখন আবার পরীক্ষা করতে হবে ব্যবস্থাপত্রে লিখে দেব। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

মীনাক্ষীর মনে দ্বন্দ্ব রয়েই গেল। বেশিদিন যদি না বাঁচে মা  হবে কী করে! তবু আবার ভাবে, দশ-কুড়ি বছর তো কম নয়। মানুষ আস্তে-আস্তে অনেক কিছু ভুলে যায়। মরবে সে-কথাও ভুলে যায় দৈনন্দিন জীবনে। মীনাক্ষীর মনে এলো সেই কথা। ভোলা ও      না-ভোলা সব।

ডাক্তারের কাছ থেকে বেরিয়ে এসে রোহণ গেল মীনাক্ষীর কাছে। হাসিখুশি মন নিয়ে বলল, চলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটা ঘুরে আসি। ডাক্তার বলেছে।

মা বলল, যা, ঘুরে আয়। কাছেই তো। বলতে বলতে একখানা সবুজ শাড়ি বের করে দিলো। বলল, চুলটা অাঁচড়ে নে। যেন নিজেই অভিসারে চলেছে সদম্ভে। রোহণ দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে মোড়ের  দিকে তাকাল। মানুষের জীবন কখনো-কখনো অল্পতেই একটা বাঁক নিয়ে শেষ হয়ে যায়। মীনাক্ষী আশা ও উদ্দীপনা নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। ভালো নম্বর নিয়ে স্কুল পাশ করে এসেছে। ইতিহাস ও ইংরেজিতে লেটার পেয়েছিল। ওর স্বপ্ন ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনার্স পড়া। অপারেশনের ক্ষত শুকিয়ে গেছে দশ দিনে এবং ব্যান্ডেজ খুলে দিয়েছে সেদিনই।

এরই মধ্যে সতেরো দিন কেটে গেল। নিবিড় পরীক্ষার জন্য এতোদিন রেখে দিলো ডাক্তারের পরামর্শে। এ কয়দিন হাসপাতালে হাঁটাহাঁটি, নিজে নিজে স্নান করা, সবই করেছে।

ওরা হাত ধরাধরি করে লিফটে উঠল। শুধু দু জন। মীনাক্ষী বলল, পাতালে নেমে যাচ্ছি বুঝি! রোহণ বলল, সমুদ্রের পাতালে মুক্তো-মাণিক্য থাকে। মাটির পাতালে হীরে। মানুষকে কোথাও না কোথাও যেতে হয়। যায়। অন্ধ ভিখিরিও বসে-বসে ভিক্ষে    করতে-করতে কোথাও না কোথাও যায় মনের চোখে। বস্ত্তও যায় মানুষের ঘাড়ে করে, হাওয়ায় উড়ে। বস্ত্ত গাড়িও যায় বস্ত্ত তেলের সাহায্যে। নক্ষত্রেরও নিজস্ব গতি আছে। রোগ ও রোগীর কারণে হাসপাতালে যায় মানুষ। ডাক্তারও যায় রোগীর কাছে। সুস্থ মানুষের মন সহানুভূতিশীল হয় রোগীর প্রতি। হাসপাতাল হলো রোগীর বাড়ি। সেখানে না গেলে বোঝা যায় না মানুষের শরীরে রোগ কতভাবে বাসা বাঁধে। মানুষ কত  অসহায় আর রোগের কত ভালোবাসা জীবদেহের প্রতি, আবার, ডাক্তার মানুষই রোগকে ছিন্নভিন্ন করার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়।

মীনাক্ষী বলল, কতদিন পর বের হচ্ছি হাসপাতালের     সহৃদয়-হৃদয়-সংবেদী জেলখানা থেকে, যেন আমি কত বিপজ্জনক এক অপরাধী। কী আমার দোষ! – তারপর আকাশের দিকে দেখে মাছের চোখ দিয়ে আকাশকে উদ্যত ভুরু হেনে  বলল,         দেখো-দেখো, কী সাফসুতরো আকাশ আর নীল। এক টুকরো মেঘ যাচ্ছে যেন গাদাগাদি করা এক পাল মেষ। শিমুল তুলোর মতো ফুলে-ফুলে উপচে পড়ছে দেখো। কাঁপছে থরথর।

সামান্য পথ হলেও রোহণ রিকশা নিল মীনাক্ষীর শক্তি সংহত রাখতে। হাতে ধরে তুলল ওকে। নম্র, কোমল ও পলকা ভঙ্গিতে সে বসল। রিকশার হুড তুলতে দিলো না, ওকে ধরে বসতে হলো তাই রোহণের, একটু ঝাঁকুনিতে যাতে পড়ে না যায়। চারুকলা কলেজের সামনে যেতেই দেখে কামরুল হাসানের ছবি প্রদর্শনী চলছে।

চলো দেখে যাই। – মীনাক্ষীর প্রফুল্ল চোখ বলল।

রোহণ আগে নেমে হাত বাড়িয়ে দিলো। আস্তে-আস্তে ভেতরে চলল যেন সাঁকো পার হচ্ছে। ভেতরে গিয়ে দেখে কামরুল হাসান লম্বা পাতলা পাকা চুল মাথায় দাঁড়িয়ে, গ্যালারির মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে। ছবির রমণীর বড়-বড় টানা চোখ। পটের বিবির মতো, অল্প রেখা কিন্তু দুর্দান্ত গতিশীল।

পরিমিত রেখা ও গাঢ় রঙের রমণীদের স্তনও সুপুষ্ট ভারী। আঙুল, হাত, পা নিটোল পরিণত। দৃষ্টি বাড়িয়ে তাকিয়ে আছে টানা বড় চোখে। কারো গায়ে শেমিজ-ব্লাউজ নেই। গায়ে পাড়াগাঁর উজ্জ্বল রঙের শাড়ি। শিল্পীর শরীরও সে-রকম পেশিবহুল, গোলগাল ও বড় চোখ। কলাগাছ, বক, ঢেঁকি, গরু, মাচা ও আঙিনা অল্প রেখার টানে ফুটে উঠেছে। গতিময়।

তোমার সঙ্গে এসে দুর্লভ অভিজ্ঞতা হলো। শিল্পী ও শিল্প দু জনকেই দেখা হলো। – তারপর ফিসফিস করে মীনাক্ষী বলল, চলো, শিল্পীর সঙ্গে কথা বলি।

দুরুদুরু বুকে দু জনে এগিয়ে গেল ওরা। রোহণ শ্রদ্ধাসম্ভাষণ জানিয়ে বলল, আমরা হাসপাতাল থেকে এদিকে এসে দেখলাম আপনার প্রদর্শনী চলছে। আপনাকে দেখে আরো সুখী হলাম। আমাদের অভিনন্দন জানাই।

মীনাক্ষীর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কী হয়েছে মা তোমার? সঙ্গে-সঙ্গে তিনি দু জনের মুখ কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ক্যান্সার রোগের কথা সামনাসামনি বলা যে কতখানি অসুখকর সেই প্রথম ওরা অনুভব করল।

মীনাক্ষী সামলে নিয়ে বলল, আমার অপারেশন হয়েছে। আজ সতেরো দিন ব্যান্ডেজ খুলেছে। আজ প্রথম বের হলাম। পিজি হাসপাতাল থেকে।

ছবি প্রসঙ্গে আর যাওয়া হলো না ওদের। তিনি তাড়াতাড়ি দু জনকে নিয়ে বারান্দায় গেলেন, সেখানে তাঁর বসার চেয়ার-টেবিল আছে। বললেন, বসো। তিনি কথা বলতে-বলতে সুভ্যেনির নিয়ে পেছনের মলাটের সাদা পাতায় মীনাক্ষী ও রোহণের মাঠে ছোটার ছবি এঁকে দিলেন মাত্র গুটিকয়েক রেখায়। কাঁধে থলের মধ্যে ছিল রং-তুলির বহর। মীনাক্ষীর সবুজ শাড়ি আর রোহণের শার্ট-প্যান্টের রং প্রায় হুবহু করে এঁকে দিলেন। ছবির নিচে লিখে দিলেন, ‘জীবনের জয় হোক’। তারপর নিজের স্বাক্ষর দিলেন। মধুপূর্ণিমা ও সেদিনের দিন-তারিখ দেখেই ওরা বিস্মিত হয়ে দু জনে দু জনের দিকে তাকাল।

শিল্পীও সে মুহূর্তে ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আজ তোমরা হাসপাতালের বারান্দায় বসে মধুপূর্ণিমার চাঁদ দেখো। –    বলতে-বলতে সুভ্যেনিরসহ ছবিটি মীনাক্ষীর হাতে তুলে দিলেন। তারপর থলে থেকে দুটো মর্তমান কলা বের করে বললেন, খাও। আর নিজের জন্য একটি বের করে খেতে লাগলেন।

একটু পরেই এলো কয়েকজন বয়স্ক লোক। কামরুল হাসান তখন রোহণদের বিদায় জানিয়ে উঠে গেলেন। আর ওরা ভাবল, ওরা এতোক্ষণ এক মহীরূহের ছায়ায় বসে ছিল। সেই মহীরুহ ওদের ছায়া দিয়ে, কথা বলে, আশিস জানিয়ে চলে গেলেন, ভয় নেই, পৃথিবী চিরকাল ভালো মানুষের বাসযোগ্য থাকবে। মীনাক্ষীর মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে গেলেন, দীর্ঘজীবী হও মা, কিছু ভালো কাজ করে যেও। ভয় নেই ভালোবাসা মানুষকে সুন্দর করে। দীর্ঘজীবী।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা কলেজের লিচুগাছের নিচে ঘাসের ওপর বসল। শিল্পীর ছবি ওদের আচ্ছন্ন করে আছে। ঘুরেফিরে ওরা শিল্পী ও ছবির জগতে চলে যায়। ছবির রমণীরা ওদের মুগ্ধ করে রেখেছে। বড়-বড় চোখে উঁকি মেরে দেখা, বলিষ্ঠ পায়ে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া, নববধূকে সাজানো… কত রকম ছবি। শিল্পীর কথায় ওরা দু জনে মধুপূর্ণিমার প্রসঙ্গে চলে যায়, সেই আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের কলহের কারণে স্বেচ্ছানির্বাসনে গিয়েছিলেন পারিল্যেয় বনে। সেখানে বানরেরা তাঁকে মধু এনে দিয়েছিল। সেই স্মৃতি মনে করে বৌদ্ধরা এখনো মধুদান করে এই ভাদ্র পূর্ণিমায়। এজন্য ভাদ্র পূর্ণিমার নাম সেই থেকে মধুপূর্ণিমা। আর আজ সেই মধুপূর্ণিমা শিল্পীর মুখে শুনে মুগ্ধ।

আকাশে তখন ভাবনার রুপোর থালা চাঁদ উঠে আসছে গাছপালার ফাঁক দিয়ে। অমনি ওরা উঠে দাঁড়াল সম্মান জানাতে। কী মধুর অলৌকিক সময় কেটে গেল সেই সকালে, কিছু সময়ের জন্য, ওদের জীবনে। এই দিনটি বহুদিনের মধ্যে একটি বিশেষ দিন হয়ে থাকবে জীবনে।

মীনাক্ষী তখন সেই সন্ধেয় বের হয়ে রোহণের হাত ধরে  চলতে-চলতে বলল, ওর আশীর্বাদ নিশ্চয়ই ফলবে, সত্যবাদীদের বাক্য কখনো বৃথা যায় না। ওরা হাসপাতালে ফিরে এলো। দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামল।

এত বড় শিল্পীয় আশীর্বাদ কখনো বৃথা হতে পারে না। – রোহণ আচ্ছন্নের মতো বলতে লাগল। বকুলপাতারা হাওয়ার দোলায় শব্দ করে সমর্থন করে গেল।

দিনের শেষ পাখি শহুরে পাতিকাক ডাকছে, তাদের কলোনি বড়-বড় অশ্বত্থ গাছে। পেঁচাও পাখি। ওদের কেউ-কেউ শতাব্দীর পুরোনো  অশ্বত্থ গাছের কোটরে হয়তো আছে। ওখানে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। শাহবাগের মোড় থেকে উত্তর দিকে বিখ্যাত কৃষ্ণচূড়ার সারি চলে গেছে, ওরা দু জন এক হয়ে দেখল, আবার কখন এই সময় পাওয়া যাবে কে জানে! ওরা সবচেয়ে কাছে থেকেও কি নিশ্চয়তা দিতে পারে? তাই ওরা রাস্তায় নামতেই অশ্বত্থের ঘন ডালপালার আড়ালে ঢাকা পড়লেও চাঁদ যেন নীরবে হাসল শুধু। ওরা দু জনও এগিয়ে চলল একটু ফাঁকা আকাশ যদি দুটি গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায়! রোহণ উৎফুল্ল মীনাক্ষীকে আরো কিছু সময় প্রফুল্ল দেখতে চায়, আগামীকালও চায়, বহু মাস বছর যুগ দেখতে চায় মীনাক্ষী, চন্দ্রমল্লি বউদি, নিজেকে এবং নদী-কাকিদের সকলকে। রোহণের জগৎ ওদের ঘিরে। আলী কাকা রোহণকে কী উৎসাহই না দিত! একজন সাধারণ চাষিমজুরও বোঝে মানুষ মানুষের কাছে থেকে শক্তি পায়, একজনের কাছ থেকে আরেক জনের কাছে শক্তির সংক্রমণ ও রূপান্তর ঘটে। একটু আশ্বাসে আলী কাকার বউ কী শক্তিমতী হয়ে যায় তা রোহণ দেখেছে। মীনাক্ষীও চকচকে হয়ে ওঠে একটু উসকানি পেলে। চন্দ্রবউদি ও অলিকে সে দেখেছে চাঁদের দিকে চেয়ে হাসতে। এ-সময় একটু ফাঁকা পেয়েই মীনাক্ষী গেয়ে উঠল, ‘ও চাঁদ, তোমায় দোলা দেবে কে!…/ কে দেবে কে দেবে তোমায় দোলা -’। সেদিনের সকাল ও সন্ধে দুলে চলল।



পঞ্চদশ অধ্যায়

ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনের প্রথম শ্রেণির ওপরে-নিচে মিলে তিন জনে বসা বা শোয়া। বিকেল ৩টার ট্রেন। রাত ১০টায় পৌঁছবে। ডাক্তার বলেছে, মীনাক্ষীর আয়ু দশ বা কুড়ি বছর। মীনাক্ষী এসব জানে না।

ওপরে-নিচে দুটি টানা আসন। ওপরেরটা জাহাজের মতো ঝুলন্ত, দরকার হলে গুটিয়ে রাখা যায়। রোহণ জানে ওপরে ওকেই উঠতে হবে, মা-মেয়ে নিচে।

শেষে মীনাক্ষীর মা নিজে থেকে ওপরে উঠে পড়ল। বিছানার চাদর ও বালিশ পাতল। নিচে ওরা কিছুক্ষণ ওপরে-নিচে থাকা নিয়ে ভাবল। মা জানে, মীনাক্ষীর জীবন আর কতদূর। ডাক্তার যেখানে দশ-কুড়ি বলেছে সেটা পাঁচ-সাতও হতে পারে। রোগী ও পরিবারকে আশার সাহস জোগানোও তাদের পেশার অন্তর্গত হয়তো। আবার রোগীর মা-বাবা হয়তো হৃদয় দিয়ে অাঁচ করে নিতে পারে। কে জানে এজন্যই মীনাক্ষীর মা হাসপাতাল থেকেই বিষাদের গর্তে পড়েছে কিনা! অথবা রোহণের সঙ্গে এভাবে মিশতে দেওয়া ঠিক হচ্ছে কিনা ভাবছে কি? আবার মনে হয়, রোহণের সঙ্গে মেয়েকে এতো ঘনিষ্ঠ হতে তো দেখেনি, সেজন্যই হয়তো এতো ভাবনায় সতর্কতা। মেয়ের মুখে হাসি দেখতেই কি এই স্বাধীনতা বিতরণ। প্রিয় এবং রুগ্ণ সন্তানকে হাসিখুশি দেখতে মায়েরা কত কিছুই না করে! রোহণও কি মীনাক্ষীকে উৎফুল্ল করার জন্য এতো করছে তাহলে!

ভৈরব সেতু পার হওয়ার পরই মা ওপরে ওঠেন। এক পশলা ভাদুরে বৃষ্টি হয়ে গেল। চা খেয়েছে দু দফা, মা-মেয়েকে হরলিক্স করে দিলো। রেলের বেয়ারা এসে কাপ গরম পানি এনে দিলো।

পায়ের দিকে তাকিয়ে মীনাক্ষী বলল, পায়ের ব্যথাটা একটুও নেই। কবে যে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। যেদিন পেরেছি সেদিন ভাবলাম, ব্যথাটা যাবে কোথায়? এতোদিনের ব্যথা তো আর অমনি-অমনি চলে যেতে পারে না। নিশ্চয়ই লুকোচুরি খেলছে। আমার বহুদিনের নিত্যসঙ্গী না বলে কি চলে যেতে পারে। তাই বলছি কবে যে চলে গেছে বুঝতেই পারিনি। মনে-মনে ভাবল, ভালোবাসাও নাকি এরকম হয়!

শুনতে শুনতে রোহণ ওর পায়ে হাত দিতে যেতেই মীনাক্ষী হাউহাউ করে উঠল, খবরদার, পায়ে হাত দেবে না। এই নাও আমার হাত। অথবা মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। হাত-দুটোও আদর পাওয়ার যুগ্যি। মহাজনেরা বলেছেন, চুলও আদর পাওয়ার অধিকারী।

প্রথমে মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, তারপর যদি পা দুখানি…।

আবার? খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি। বলতে-বলতে রোহণের হাত কোলে তুলে নিল বাচ্চা খোকার মতো… একসময় সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল। নীল আলোর বাতিতে ওকে ফ্যাকাসে ও সুন্দর মনে হচ্ছে। ট্রেনের দোলায় দুলে-দুলে ঘুমুচ্ছে। ওর ছোট্ট বুক শাড়ির নিচে কোনোমতে শুয়ে আছে। আগে কত বড় ছিল! মানানসই বুক নারীর বড় সম্পদ। ঘুমের মধ্যে সে একবার হাসল কামরুল হাসানের নারীর মতো। রোহণের ডান হাতটি বুকের প্রান্তে টেনে নিল। ওর নিষ্পাপ হাসি ও হাত ধরে রাখা কোনোটিই ওর নিয়ন্ত্রণে নেই যেন, আবার নেইও বলা যায় না। ঘুমিয়ে না পড়লে রোহণ হয়তো ওকে চুমো খেত, খুব ইচ্ছেও হয়েছিল আলিঙ্গন করতে, অনাবিল সুন্দর আদর জানাতে। কুপেতে আর কেউ নেই। সুস্থ মীনাক্ষীর মীনাক্ষী হলে জ্বালাতনও করত হয়তো। এদিকে ওর মা হওয়ার অঙ্গই আজ সর্বাত্মক আক্রমণের প্রান্তবর্তী প্রতিবেশী। রোগের একটু দয়ামায়ার অবশেষ নেই। বুকের হাড় পাঁজরের ওপর রোহণের হাত পড়ে গেল মীনাক্ষীর শিথিল হাত থেকে, ও ঘুমিয়ে পড়েছে। রোহণ হাত সরিয়ে নিতে-নিতে বোধহয় ওকে আরো ভালোবেসে ফেলছে। সেই প্রথম দিন ওকে খেলাচ্ছলে রোহণ বলেছিল, ভালোবাসি, আর এখন নিজেই ডুবে যাচ্ছে। কী অমোঘ নিয়তি, কী করুণ আবেগে মিশে যাচ্ছে রোহণ। মীনাক্ষী যদি বেঁচে ওঠে তাহলে কী হবে? আর ও যদি অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুর বাসরঘরে চলে যায় তখন কী হবে? এখন সে খুব সম্পন্নতায়    দুলে-দুলে ঘুমুচ্ছে।  খুব স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে। চোখও নিশ্চিন্তে বুজে আছে। ঠোঁটের কোণে কিছু এক নিশ্চিন্তিতে হাসি এসে লেগে গেছে, তাতে ভাবনাহীনের আভাও আছে।

কুমিল্লায় গাড়ি থামলেও মা-মেয়ের কেউ  জাগল না, যেন অনেকদিনের ঘুমহীনতাকে ঢাকায় ফেলে ঘুমুতে-ঘুমুতে ছুটে চলেছে। জানালা দিয়ে কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদের চাঁদ উঠছে রূপবান মুড়া ফেলে, যেন অন্ধকারে প্রত্নপুরাণ প্রান্তর জেগে ওঠে, মীনাক্ষী একবার অলি হয়ে ওঠে, আবার চন্দ্রবউদি, আবার অচেনা কোনো তরুণী। কী অমোঘ সেই দ্রুত সরে-সরে যাওয়া চলচ্ছবি। ট্রেনের হুইসেল বাজছে জ্যোৎস্না সন্ধে পাড়ি দিতে-দিতে, যেন চাঁদের সঙ্গে ছুটছে অনন্তের দিকে, জানালা ভরে গেছে সেই গৌরবে। তখন রোহণের মনে হলো, সৌন্দর্যও বিশ্লেষণ দাবি করে, সুখও বিশ্লেষণ করলে সুখের মাত্রা বেড়ে-কমে যায়। একা-একা সৌন্দর্য উপভোগে যেন কোনো সুখ নেই মনে হলো তার। আবার মনে হলো, সঙ্গীর বিরোধিতা ও মতান্তরে সৌন্দর্যের হানি হয়… অথবা ঘাটতি, অথবা অবহেলা বা ব্যক্তিত্ব আরোপিত হয়। প্রকৃত ব্যক্তিত্ব আরোপে সৌন্দর্য পরিপূর্ণ বিকশিত হয়। কামরুল হাসানের ছবিতে যেমন হয়।



ষোড়শ অধ্যায়

মর্জিনা, মুনির, রেবেকা ও অজিত দেখতে এলো মীনাক্ষীকে। অনেকদিন পর সবাই এক হওয়ার সুসময় পেয়ে গেল। জ্ঞানশূন্য করার সময় অ্যানেসথেসিয়া টানতে-টানতে মীনাক্ষী একসময় শূন্যে উধাও হয়ে যাওয়ার অনুভূতিতে পড়েছিল। আকাশের ওপারে আরেক আকাশে চলে গেল আস্তে-আস্তে নিবিড় নীলের রাজ্যে ভাসতে-ভাসতে, আর কখন যে নীলের অন্ধকারে মিশে গেল সে নিজেও জানে না। সে এমন এক শূন্য অনুভূতি যা বোঝানো প্রায় অসম্ভব। মৃত্যু নয়, অথচ সে এক অচিন্ত্যনীয় শূন্যতা। তারপর ঢোক গিলে সে আবার বলল, তাহলে অজ্ঞান হওয়ার অর্থ নীল মহাসাগরে হারিয়ে যাওয়া। অন্তত আমার তাই মনে হলো। কে কেমন করে অজ্ঞান হয় আমি জানি না, আমি ওভাবেই ঘুমের রাজ্যে ছোট্ট এক শিশুর মতো হারিয়ে গেলাম। সত্যি, নিজেকে একসময় ন্যাংটো শিশুর মতো মনে হয়েছিল। তারপর আর কিছুই জানি না। আমার মনে হয়, যাদের এরকম শল্যচিকিৎসা হয় তাদের চেতনাহীন হওয়ার অনুভূতি লিখে রাখলে একটা  কাজ হয়। ভালো কাজ এরকম চেতনা থেকে উৎসারিত হওয়া সম্ভব।

তোর পেট ডাক্তার দেখল, ধরে-ধরে কাটাকুটি করে ফেলে  দেওয়ার জিনিসটা ফেলে দিলো – মর্জিনা গাঁইগুঁই করে বলে দিলো, যেন মীনাক্ষী একটা গাছের গুঁড়ি।

আর বলিস না দোহাই মীনাক্ষী, বলতে লজ্জা হচ্ছে না? – রেবেকা যেন সে-রকম সময় এলে নিজেকে বেশ ঢেকেঢুকে রাখতে পারত, তেমন করে বলল।

ওমা, কিসের লজ্জা? ডাক্তার কি চোখ বুজে কাটবে। হাতে না হয় মোজা পরা যায়, চোখেও চশমা দিলে তো হয়ে গেল। – মর্জিনা বিস্ময়ের হাসি দিয়ে বলল। অজিত বলল, ডাক্তারের কাছে মৃতদেহ ঘাঁটা যেমন,  জ্যান্ত কাটাও তা। দীনু ডোমেরও তাই হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় দীনু ডোম ট্রাক থেকে লাশ খালাস করার সময় ও তোলার সময় কেঁদেছিল। ছেলেমেয়ের নানা রকম বিকৃত লাশ দেখে অমন দীনু অঝোরে কেঁদেছিল। ঠিকমতো   খেতে-দেতে পারেনি, শুধু ওয়াক্-ওয়াক্ করত, অথচ মুখ দিয়ে একদলা কিছু বের হতো না। একাত্তরের পর ওই দীনুই শুকিয়ে কাঠিকাঠি হয়ে গিয়েছিল। মিটফোর্ড, রাজারবাগ এখনো তার কাছে দুঃস্বপ্নের  বিভীষিকা, অথবা বিভীষিকার স্বর্গ।

আমাদের আলোচনা বীভৎসতায় চলে যাওয়া ঠিক নয় বোধ হয়। দীনুও অনুভূতিশীল মানুষ। তারপরও আমাদের বাঁচতে হয়। – মর্জিনা একাত্তরের প্রান্তর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বলল। রেবেকা তখন কথা ঘোরানোর জন্য অথবা অন্য কোনো ছলে মর্জিনার  কানে-কানে বলল, তোদের দিন কেমন কাটছে রে?

এক কিল মেরে বলল, শাশুড়ির নানা রকম বাতিক, শূচিবায়ু। সকালে পান্তা খাওয়া আর রোজ ভোরে গোসল। আর ঘর মোছা।

প্রতিদিন?

হ্যাঁ, খোদার তিনশো পঁয়ষট্টি দিন।

আমার মায়ের কড়া নিয়ম প্রতিদিন ডিম পোচ খেতেই হবে এবং দুটো।

আর মর্জিনাকে একটাও না। – মর্জিনা বিড়বিড় করে বলল যেন নিজেকেই শোনাতে।

এই, আমি চুরি করে তোমাকে একটা খাইয়ে দিই। পারিবারিক গোপনীয়তা এভাবে ভাঙা উচিত হচ্ছে কি?

শাহনামা অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আমি লিখেছি, কেউ বলবে? – রেবেকা বলে দিলো।

অশুদ্ধ না হলেও চুক্তি ভাঙা হয়ে যাবে। – বলে মুনির গম্ভীর হয়ে গেল কেন যেন!

কাবিননামায় ওটা লেখা আছে কি? – রেবেকা জানতে চাইল।

অজিত তখন জানতে চাইল, আচ্ছা, কাবিননামায় কী-কী লেখা থাকে? দেনমোহর কত… বউকে কয় ঘণ্টা আদর-সোহাগ… আর কী-কী থাকে?

তোর তাতে কী লাভ? তোদের তো কোনো কিছু লেখাপড়া থাকে না। তা অতো ইচ্ছে করলে আমার বাড়িতে গেলে দেখতে পাবি। – মুনির মর্জিনার দিকে না তাকিয়ে বলল। অজিত তাড়াতাড়ি বলল, না, না,  ঠাট্টা নয়। তিরিশ বছর পর কি দেনমোহরের পুরো টাকা দিতে হয়? তখন ওই টাকার মূল্য তো অনেক কমে যাবে।

তুই ঠিক বলেছিস। তবে এসব বিধিনিষেধ ভালোর জন্যই করা। – মুনির বলল।

দেখ না, আমাদের মেয়েরা এক কাপড়ে বাপের বাড়িতে চলে যায়। এমন হওয়া অনুচিত। – বলতে বলতে অজিত উদাস হয়ে গেল। মন্দাকিনীর কথা মনে পড়ে গেল তার। রেবেকা ও মর্জিনা চুপ করে শুনে গেল। ঠিক সে-সময় এণাক্ষী গরম গরম ভুট্টার খই নিয়ে ঢুকল। রেবেকা তখন রোহণের দিকে একটা বাটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, তুমিই যখন চুপচাপ রইলে তো ধরো এটা শেষ করো।

বাটি তো নয়, গামলার মতো পাত্র। অন্যটা আরো বড়। সঙ্গে অষ্টগ্রামের পনির।

খইয়ের সঙ্গে পনির? – রোহণ বলল।

এণাক্ষী বলল, খেয়েই দেখো না। না হয় আনারসের সঙ্গে খেয়ো। এখুনি এনে দিচ্ছি। কাটা হয়ে গেছে।

হ্যাঁ, আনারসের সঙ্গে জমবে। তারপর খইয়ের সঙ্গে মুখে দিয়ে রোহণ বলল, বাঃ, চমৎকার তো দেখি!

অজিত বলল, এটা কি তোমার আবিষ্কার?

রেবেকা বলল, আমিও কোনোদিন শুনিনি।

মীনাক্ষী খেয়ে দেখে বলল, বেশ তো! তারপর এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, এটা আবার কবে শিখলি?

মুনির ও মর্জিনা কাড়াকাড়ি শুরু করল। এতেও যে এতো সুখ ও স্বাদ থাকে আহা!

দেখতে-দেখতে ভুট্টার ছোটোখাটো চারটি পাহাড় উড়ে গেল। নিয়ে এলো আনারস। জলডুবি আনারসের মরশুম প্রায় শেষ।  ছোট-ছোট পাতলা দু টুকরোর মাঝখানে পনির দিয়ে সরু কাঠিতে গেঁথে দিয়েছে। আহা স্বাদ!

অজিত বলল, আনারসের পরে দুধ-চা নয়।

মর্জিনা বলল, আমার ওই রং চা চলবে না।

মুনির তাড়াতাড়ি বলল, তোমার ওই এক কথা। অন্য সময় দুধ চা খেও। কিন্তু আনারসের পরে নয়।

রেবেকা শুধু হাসল। ওই হাসি বিষাদিনী সৌন্দর্যের।

অজিত হাসতে-হাসতে বলল, আনারসের সঙ্গে দুধের শত্রুতা মুক্তিযোদ্ধার ও রাজাকারের মতো।

মীনাক্ষী জানে বলে চুপ করে রইল।

মর্জিনা বলল, কেন কেন?

অজিত দীর্ঘ ফিরিস্তি দিলো। আমের পর কলা খেতে নেই। আমসত্বের সঙ্গে কদলী চলে। পানের বোঁটা খেলে রক্তদুষ্টি হয়, বিশেষ করে শিশুদের, বরং ওদের পানপাতা দেওয়া চলে। কচ্ছপের মাংসের সঙ্গে লেবু খেলে শ্বেতী হয়। মিঠাপানির রুই-কাতলার সঙ্গে রসুন নিষিদ্ধ, তবে পচা মাছের সঙ্গে রসুন বেটে দেওয়া চলবে। ফলের পর জল চলবে না, কাঁঠালের সঙ্গে চলবে। নারকেলের নাড়ু ও তালের রসের সঙ্গেও চলে ইত্যাদি…। মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের প্রসঙ্গ ইচ্ছে করে তুলল না।

মর্জিনা বলল, তুমি তো নিষেধের অভিধান দেখি। আর…

অজিত অমনি বলে দিলো, আমরা কি এতো জানতাম যে মর্জিনা ও মুনির ভালোবেসে দুম করে বিয়ে করে বসবে? এতো চটজলদি?

মনিরও বলে বসল, আমরা কি জানি আর কে কার সঙ্গে এরই মাঝে প্রেমে ডুবসাঁতার খেলছে? অথবা প্রজাপতি সাঁতার!

রেবেকা প্রায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলে দিলো, কাকে লক্ষ্য করে বললে ভাই?

মীনাক্ষী গম্ভীর খেয়ে বসল! রোহণও রেবেকার সঙ্গে হাসিতে যোগ দিয়ে বলল, নিকষ অন্ধকারে পাখি ওড়ালে না তো? কালো বেড়াল?

একে-একে সবাই ঐশ্বর্যশালী হাসিতে ডুব দিলো। এণাক্ষী তখন ছোলা সেদ্ধ নিয়ে এলো বিট নুন মেখে আর গোলমরিচ। এবং তিববতিদের মাখন-চা।

মাখন দিয়ে আবার চা হয় নাকি? – মর্জিনা চোখ বড় করে বলল প্রশংসায়।

সবাই এক চুমুক চেখে দেখার জন্য একে-একে কাপ তুলে নিল।

সাবধান খুব গরম, আমি ফুটন্ত পানিতে কাপ ধুয়ে এনেছি। বলে মুচকি হাসল এণাক্ষী।

আস্তে-আস্তে একে-একে দু-এক চুমুক খেয়ে চুপ একেবারে। কেউ যেন প্রথমে হাঁড়ি ভাঙতে চাইছে না।

রোহণ প্রথমে মুখ খুলল, শাবাশ এণাক্ষী। গাঢ় স্বাদ। মুখে অনেকক্ষণ লেগে থাকবে। চিনি একটু বেশিই চাই। শীতের আগে থেকে শুরু করলে ঠোঁট ফাটা বন্ধ হবে মাখনের জন্য।

এণাক্ষী চিনি আনতে গেল। একে-একে মর্জিনারা মুখ খুলল। রেবেকা বলল, খুব শীতের দিনে খুব ভালো জমবে।

তখন এণাক্ষী ঢুকে বলল, এটা শীতের দেশের জন্যই। মাত্র গতরাতে রাহুল সাংকৃত্যায়নের তিববতে সওয়া বছর বইয়ে পড়ে জানতে পারলাম। সকালে বানিয়ে একবার খেয়েছি। আগে কোন পত্রিকায় যেন বানানোর নিয়মকানুন পড়েছিলাম, তখন খাওয়া হয়নি। রাহুলজি খাওয়ালেন।

রোহণ বলল, বইটি আমি এখনো পড়িনি।

এণাক্ষী রোহণের দিকে তাকিয়ে সকলকে বলল, সমস্ত প্রশংসা আমার প্রাপ্য নয়, বুঝলে তো? বইয়ের মালিকের পাওনা।

তাকে কেন? বই হলো লেখকের, তারপর ক্রেতা রোহণের। চা বানিয়েছ তুমিই।

কই দেখি বইটা? – মীনাক্ষী চাইল।

বই নিয়ে আসতেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। এণাক্ষী শূন্য গ্লাস ও থালা নিয়ে চলে গেল।

বই খুলে সবাই খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু কোন পৃষ্ঠায় আছে, আলাদা পরিচ্ছেদ আছে কিনা, থাকলে সেই পরিচ্ছেদের নাম কী কেউ জানে না। মীনাক্ষী ডাক পাড়ল, এণা, এদিকে আয়। পৃষ্ঠাটা খুলে দিয়ে যা। ডাকার সঙ্গে-সঙ্গে এণাক্ষী এলো না। হয়তো দরকারি কোনো কিছু করছিল ওদিকে।

তখনই রেবেকা বলল, আজকের দিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সত্যি, কতদিন পর এমন দিনের দেখা পেলাম। বিশ্বাস হচ্ছে আমি ভালো হয়ে উঠেছি। – মীনাক্ষী প্রায় সেই  হারানো উদ্দাম দিনগুলোর মতো বলল।

ওর কথায় সবাই কথার খেই হারিয়ে ফেলল, যেন  কবেকার এক চাঁদ হঠাৎ এক টুকরো কালো মেঘ এসে ঢেকে দিলো। সেই প্রথম-প্রথম মীনাক্ষীই ছিল দলের মধ্যে সবচেয়ে হল্লাবাজ। আজ সে বিছানায় শুয়ে-বসে সবার খাওয়া দেখছে, মাঝে-মাঝে দু-একটা টুপটাপ মুখে নিচ্ছে – একদিন কত ঝিলিমিলি ছিল ওর কথায়। রবীন্দ্রসংগীত গাইত, ‘বিদায় করেছ যারে নয়ন জলে,/ এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে  গো \’। আজ বিষণ্ণতার জ্বলন্ত প্রান্তরে খুশিমনে সে দেখছে সকলকে। সকলের আনন্দ-মন নিয়েও সে তার নিজের  ছোট হয়ে আসা জগৎটিকে দেখছে। সেখানেও দেমাগের গোলাপ আছে।



সপ্তদশ অধ্যায়

বাড়িতে আসার পর রোহণের কাজ বেড়ে গেল। চাষের খরচপত্র লাভ-লোকসান সামনের মরশুমে রবিশস্যের চাষ করবে কিনা, নানা ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ দরকার। আলী কাকা আবার অসুখে পড়ল। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে হলো। তার বাঁচার আশা    দিন-দিন কমে আসছে। প্রতিদিন গিয়ে দেখে আসতে হয়। যকৃত নষ্ট হয়ে গেছে। জন্ডিস দেখা দিয়েছে। সঙ্গে মধুমেহ রোগ। রক্তে শর্করা কমানো যাচ্ছে না। আলীর বউ ঘোমটার আড়াল থেকে তাকিয়ে থাকে। রোগীর দিকে বোবার মতো। আস্তে-আস্তে কুয়াশা শুরু হয়েছে। সন্ধে পড়তেই রোহণকে বের হতে হয়। কাগজকলের গুবগুব শব্দ শোনা যায়। সীতা পাহাড় চাঁদের কাছে গল্প শোনে। আত্মস্মৃতি বলে যায় ওরা।

হাসপাতাল থেকে ফিরতে-ফিরতে রাত হয় রোহণের। অনির্বাণ ঘুমিয়ে পড়ে। রমেশ কাকারা খবর শোনার জন্য ঘিরে ধরে। সবার মুখে কালো ছায়া। চন্দ্রবউদির ভাইও বুঝতে পারে। সে এখন বোনের কাছে থেকে কলেজে পড়ে। সেও প্রায় রোহণের সমবয়সী, প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে। ওর নাম অভি। সেও বুঝে নিয়েছে আলী কাকার দিন ফুরিয়ে এসেছে।

ধানের শিষের বিন্দুবিন্দু কুয়াশা সকালের প্রথম রোদে মুক্তোবরণ হয়ে উঠেছে। ঠিক সে-সময় আলী কাকা হাসপাতালে শুয়ে থেকে শেষ নিশ্বাস ছেড়ে দিলো। খবর পেয়ে রোহণ ছুটল। হাসপাতালের নিয়মমাফিক কাজ শেষ করে নৌকোয় তুলে দিয়ে রোহণ ফিরে এলো। মৃতদেহ আসতে-আসতে দুপুর গড়িয়ে গেল। রোহণের জীবনে একটি অমোঘ আঘাত আলী কাকার মৃত্যু।

নদীর ঘাটে গিয়ে চন্দ্রমল্লি, শেফালির মা ও নদী-কাকিরা শেষবারের জন্য দেখল আলী কাকাকে। পাড়ার লোকদের সঙ্গে অলিও ছিল। অভির সঙ্গে সে কথা বলল, কিন্তু রোহণের দিকে ফিরেও তাকাল না। রোহণের মন আলী কাকায় আচ্ছন্ন, আলেয়ার অবহেলা সে আচ্ছন্নতাকে যেন বাড়িয়ে তুলল। নৌকো আবার চলতে লাগল। নায়েবউদ্দীন, সুলতান, কমল, বাঁশি ও সুজাউদ্দৌলা সঙ্গে আছে। দু জন মাঝি নৌকো বাইছে। আর দুটো বাঁক পার হলে আলীর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছবে নৌকো। কবরস্থানে কবর খোঁড়া চলছে। চিল্লা কবর হচ্ছে। শেষ বার গোসল শেষে সুগন্ধি      আতর-লোবান দেবে গায়ে যত্ন করে। শেষ বারের মতো আতরের গন্ধে স্নিগ্ধ হবে। নওশার সাজন হচ্ছে।

ঘরের উঠোনে জিওল গাছের কাঁটা ডালের তিনটি খুঁটি মাটিতে গেড়ে তার ওপর পানির ডেকচি বসিয়ে খড়কুটোর আগুনে সে-পানি গরম করল। পানিতে কয়েকটি বরই পাতা ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘরের উঠোনে পর্দা দিয়ে ঘিরে লোকের চোখের আড়ালে গোসল করাচ্ছে। শরিয়তের বিধানমতে নারীকে নারীরা, পুরুষকে পুরুষেরা গোসল দেয়। প্রথমে লাশকে ঢিলা ও কুলুপ করিয়ে অজু করানো হলো। তারপর ওই গরম পানিতে গোসল দেওয়া হলো।

২২ হাত লং ক্লথ কাপড় দিয়ে তিন প্রস্ত কাফন তৈরি হলো। খিরকা বা কামিজ পাঁচ হাত, দু প্রস্ত চাদর ষোলো হাত, ধোয়ামোছার ১ হাত মিলে মোট ২২ হাত। পাঁচ হাত কাপড়ের মাঝখানে ইংরেজি টি অক্ষরের মতো করে কেটে দেওয়া এক টুকরো কাপড় মাথায় গলিয়ে খিরকার দু প্রান্ত পায়ের দিকে টেনে আলীর সারা শরীর আবৃত করে দিলো। দেখতে তা কামিজের মতো হয়ে গেল। ওই ষোলো হাত কাপড় কেটে সমান মাপের তিন টুকরো করা হয়। তার এক টুকরোকে দৈর্ঘ্যে চিড়ে টুকরো করে অন্য দু টুকরোর সঙ্গে সেলাই করে জোড়া দেওয়া হয়। তখন চাদর দুখানি ৫ x ৩ হাত হয়। এই চাদর দুখানির ওপর খিরকা পরানো মৃতদেহ রেখে তা দিয়ে আবৃত করা হয়। চিরুণি দিয়ে মৃতদেহের চুল ও দাড়ি অাঁচড়ে দেয়। চট্টগ্রামে প্রাচীন কবি নশরুল্লাহ খন্দকারের বর্ণনায় আছে  –

তবে অঙ্গ সব মুছিয়া বসনে।

সুগন্ধি চন্দন শিরে দাড়িতে যতনে\

সজিদার টামে টামে কাফুর লাগাইবা।

ন থাকিলে কাফুর সুগন্ধি তথা দিবা\

কাঁকইন ফিরাইবা মাথায় দাড়িতে।

নওখ কিবা কেশ ন কাটিবা কদাচিত\

তারপর কাফনের চাদর দিয়ে আলীর লাশ আবৃত করা হলো। কাপড়ের সরু চিলতে দিয়ে মাথা ও পায়ের বাইরে কাফনের চাদর গুটিয়ে মুঠো করে দু দিকে গিঁট দেওয়া হলো। সিনায় হালকা করে একটি বাঁধ দেওয়া হলো।

রোহণ এই আলী কাকার কাছেই এসব শুনেছে, লাশ নারীর হলে খাটের ওপর সেই নারীর বিয়ের শাড়ি দিয়ে পর্দা করা হয়। তখন নারীরা বিবাহিত জীবনের সুখ-স্মৃতির স্মারকরূপে মৃত্যুর পর বিয়ের শাড়ি দিয়ে তার লাশবাহী খাট ঢেকে কবরস্থানে নেওয়ার আশা পোষণ করত। আলী কাকার কথাগুলো এখন মনে করছে রোহণ। নিজের অভাব-অভিযোগের কথা কখনো বলত না, যেন নিজের কোনো দুঃখ নেই, হা-হুতাশ কিছু নেই, সব চিন্তা রোহণের পরিবারের জন্য। এরকম মানুষ হারিয়ে রোহণ মুষড়ে পড়ল। লাশ দাফনের সমস্ত খরচ সে দিয়েছে।

রোহণও চলল। প্রথমে লাশের খাট নিয়ে চার জন বাহক চল্লিশ কদম গুনে চলবে। চল্লিশ কদম যাওয়ার পর সামনের দিকের ডান পাশের বহনকারীকে কদম গুনতে হয়। সে নিজের কাঁধে প্রথম দশ কদম গণনা করে অন্য তিন জন বহনকারী স্থান পরিবর্তন করে। বাকি তিরিশ কদম গণনা করে চল্লিশ কদম গোনার কোঠা পূর্ণ করে। তারপর থেকে বাকি পথ মরদেহ বহন করে চলল স্বাভাবিকভাবে। তখন বহনকারী চার জনের বেশিও হতে পরে, অন্যান্য যে-কোনো মানুষ তাতে যোগ দেয়। রোহণ শুনল মৃত ব্যক্তির নাতি-নাতনিরা দাদার মরদেহের শিহরে ছাতা ধরে এবং মৃত ব্যক্তি জীবিত থাকতে সেই আশা পোষণ করে যায়। বৌদ্ধদের মধ্যেও এই রীতি আছে। উত্তর শিথানে কবর দেওয়া হয়। উত্তর শিথানে বৌদ্ধদের মতদেহ দাহ করা হয়।

কবরস্থানে পৌঁছার মাঝপথে মঞ্জিল করতে হয়। মাঝপথে অল্পক্ষণের জন্য রাখাকে মঞ্জিল করা বলে। তারপর আবার চলতে থাকে। কবরস্থানের পাশেই গ্রামের মসজিদ। সেখানে জানাজা পড়া হবে। দাফনে যোগদানকারীরা কাতারবন্দি হয়। কাতার বেজোড়সংখ্যক হতে হয় সবাই জানে। কবর খননকারীরা কবরে খন্তা রেখে জানাজায় যোগ দিতে এসেছে। শয়তান এসে যাতে কবর অপবিত্র করতে না পারে সেজন্য খন্তা বা কোদাল রেখে আসে। মৌলভির নেতৃত্বে নামাজ আদায় হলো। নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে-সঙ্গে জানাজায় যোগদানকারী একজন লোক অন্যদের প্রশ্ন করে, আলী নামের মৃত লোকটি কেমন ছিল?

সঙ্গে-সঙ্গে প্রায় সবাই সমস্বরে বলে উঠল, বড় ভালো ছিল, বড় ভালো ছিল।

রোহণ বুঝতে পারল তার আলী কাকা আল্লার দরবারে নেক্কার (ভালো) প্রমাণিত হবে। আর বাস্তবেও তার আলী কাকা ভালো লোকই তো। ছেলেবেলা থেকে সে দেখে আসছে, বলতে গেলে আলী ও রমেশ কাকার কোলে-পিঠেই সে বড় হয়েছে। ওর আবার কান্না পেয়ে গেল।

তারপর আবার চলল আলী কাকার মরদেহ। পৌঁছল কবরস্থানে। দোয়া পাঠ করে মৃতদেহ কবরে স্থাপন করা হলো। মুখ পশ্চিম দিকে সামান্য কাত করে কেবলামুখী করে দেওয়া হলো। মেয়েদের লাশের কবরের ওপর পর্দা ধরে লাশ কবরে স্থাপন করা হয়। রক্ত সম্পর্কের বাইরের পুরুষেরা নারীর লাশ ছুঁতে পারে না। এ-সময় পবিত্র কোরানের আয়াতের অংশ পাঠ করে মাটির তিনটি ঢেলাতে ফুঁ দিয়ে কবরের চিল্লার মধ্যে আলীর পাশে রাখল চার জন লোক। ওরা আলীর আত্মীয়। রোহণেরও খুব ইচ্ছে হয়েছিল তেমন কিছু করতে। কিন্তু সে নিজেকে নানা কিছু ভেবে বিরত রাখল।

তারপর কবরের চিল্লার ওপর প্রথমে বাঁশের টুকরোর আবরণ, তার ওপর বাঁশের বেড়া দিলো। তারপর দিলো মাটি। পবিত্র কোরান শরিফের আয়াতাংশ পড়ল, ‘তোমাকে এই মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল। আজ আবার তুমি এই মাটির বুকে আশ্রয় নিলে। শেষ বিচারের দিন তোমাকে এই মাটি থেকে পুনরুত্থান করা হবে…।’

কবরে মাটি পূর্ণ করে দেওয়া হলো। রোহণও দিলো এক মুঠো তার হৃদয়-মন দিয়ে। তারপর কবরের চার কোনায় জিওল গাছের চারটি পুষ্ট ডাল পুঁতে দিয়ে কবর চিহ্নিত করে দিলো। কবরের মাঝখানে একটি খেজুর গাছের ডাল পুঁতে দিয়ে তার আগার কিছু অংশ ছিঁড়ে দেওয়া হলো। রোহণের চোখে তখন অশ্রু তার আলী কাকার জন্য, পরিবারের শ্রেষ্ঠ হিতৈষী আপনজনের জন্য, আর জানাল প্রার্থনা।

কবর খোঁড়ার শুরুতে রাখা তিন জায়গায় তিন কোপ মাটি কবরের শিথান, মধ্যে ও পায়ের দিকে সেগুলো যথাবিহিত রাখল কবরখোদকরা। এটাই নিয়ম। তারপর কবরের ডান পাশে একজন দাঁড়িয়ে এক বালতি পানি কবরের উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে তিন বারে সব পানি ঢেলে দিলো। তাকে বলে কবর আবদুরুজ করা। তারপর কবরের ওপর কিছু কলাই বীজ ছড়িয়ে দিলো। বিশ্বাস সে, এই বীজ গাছ হয়ে যতদিন জীবিত থাকবে ততোদিন তারা মহান আল্লাহর জিকির করবে এবং তার পুণ্যফল মৃত ব্যক্তিটি পাবে। তার কবরের ওপর রসুনের কোয়া ছেঁচে ছিটিয়ে দেওয়া হয় যাতে শেয়াল, গোরখোদনী প্রভৃতি প্রাণী মৃতের গন্ধ না পায়। সবশেষে জানাজায় যোগদানকারীরা কবর জেয়ারত করে একজন মৌলভির নেতৃত্বে। দাফনে যোগদানকারীরা বাড়িতে ফিরে আসে।

তখন মৃতের আত্মীয়েরা কবর তলকিন করায়। মনকির ও নকির ফেরেশতা দু জন কবরের ওপর উপস্থিত হয়ে মৃতকে তার ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। সদ্য কবর দেওয়া মৃতকে ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তর শিখিয়ে দেওয়াকেই কবর তলকিন বলে। এ-সময় মৌলভি কবরের ডান পাশে বসে কবরের মাটির মধ্যে ডান হাতের অনামিকা গেড়ে মৃতকে সম্বোধন করে আরবিতে বলেন, হে পরান আলী খানের ছেলে জীবন আলী খান, তুমি কলেমা পাঠ করো। মৌলভি তখন নিজে তিন বার কলেমা তৈয়ব বা শাহাদাত পাঠ করেন। তারপর বলেন, তোমার কাছে উপস্থিত মনকির ও নকির ফেরেশতাদের দেখে ভয় পেয়ো না। তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দাও, তোমার সৃষ্টিকর্তা কে? এক আল্লাহ। তোমার ধর্ম কী? ইসলাম আমার ধর্ম। তোমার নবী কে? হজরত মুহাম্মদ (সা.) আমার নবী। কবর তলকিন করার সময় মৌলভি কবরস্থ লাশকে প্রশ্নোত্তর আরবি ভাষায় শিখিয়ে দেন। রোহণ এই প্রথম জানল তার আলী কাকার নাম জীবন আলী খান। এসব বিষয় সে আগে কোনোদিন জানার সুযোগ পায়নি। সেই বিশেষ দিনটি আলী কাকার জন্যই পেল। তাই সে ভাবল, চারদিন্যা অনুষ্ঠানের খাওয়ার দাওয়াতের ব্যবস্থা সে করবে, টাকা দিয়ে সাহায্য করবে। আলী কাকার জন্য ওর মন আরো আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আলী কাকার বউ বিষণ্ণ ও কৃতজ্ঞতার চোখে ওকে দেখেছে। কবরে মাটি দেওয়ার সময় আত্মীয়রা প্রতিটি মুঠো মাটি দিলো যেন সোনার রেণুর মতো যত্নে। আস্তে-আস্তে তার শরীর মাটির নিচে চলে গেল। রোহণের অনেক বছরের সঙ্গী কল্যাণকামী চিরতরে চলে গেল। রোহণের কত আবদার মিটিয়েছে, গল্প ও পুথি শুনিয়েছে। স্কুলে যাওয়ার সময় সামনে পড়লে দোয়া পড়ত বিড়বিড় করে। সেই ছেলেবেলার আলী কাকা চিরতরে চলে গেল। অন্ধকার নামতে-নামতে কবর দেওয়া শেষ। দূরের টিলায় সন্ধের শেয়াল ডেকে উঠতেই রোহণ চমকে ওঠে। চুপি-চুপি সুজাউদ্দিনকে বলে দেয় বাঁশের চটির ফলাগুলো যেন শক্ত করে পুঁতে দেয়। মসজিদে তখন উদাত্ত সুরে আহবান আসে, ‘নামাজের জন্য এসো, কল্যাণের জন্য এসো…।’

অাঁধার নেমে আসে। খলের মধ্যে সুরমা তৈরির সময় যত ঘষে ততোই সুরমা ক্রমশ কালো হতে থাকে, তেমনি অাঁধারও আস্তে-আস্তে গাঢ় হতে থাকে। জোনাকি বের হয় মিটিমিটি আলো নিয়ে। ঝিঁঝি ডাকে। পিঁপড়েরাও কি এ সময় ডাকে? পেঁচার ডাককে রোহণ এখন আর অমঙ্গল মনে করে না। ওর গলাটাই এরকম বিষণ্ণ, কর্কশ ও ভয় জাগানিয়া। আসলে ওসব তার বৈশিষ্ট্য, দোষের নয়। তার আলী কাকাও নির্দোষ।



অষ্টাদশ অধ্যায়

অলির সঙ্গেও দূরত্ব বেড়ে গেল অনেক। একদিন গ্রামের পথে দূর থেকে দেখতে পেতেই সে অন্যদিকে মুখ করে চলে গেল, যেন দেখেইনি সে-রকম। দৈবাৎ মুখোমুখি হয়ে গেলে সে মুখ কালো করে দ্রুত সরে যায়। তার নির্লিপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রোহণও তখন কথা খুঁজে পায় না। আশ্বিনী পূর্ণিমার উৎসবের দিনও তার সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। কত মানুষ পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে! কীর্তন গাওয়ার সময় কত হইচই। আকাশ প্রদীপ উঠেছে বিহারে। রোহণদের বাড়িতেও। রঙিন কাগজে মোড়া আকাশ প্রদীপ জ্বলজ্বল করছে বাঁশের আগায়। কুড়ি হাতের মতো লম্বা ভাইজ্যা বাঁশের আগায় চাকা বসিয়ে দড়ি দিয়ে হারিকেন তুলে দেয়। হারিকেনের চারদিকে বাঁশের চটির খাঁচা বানিয়ে রঙিন চিনে কাগজে মুড়ে দেওয়া হয়। আশ্বিনী পূর্ণিমা থেকে কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত প্রতিদিন সন্ধেয় এই আকাশ প্রদীপ তোলা হয়। অনির্বাণ একবার কাকা রোহণের কাছে থাকে, আবার মামা অভির কাছে যায়। চন্দ্রমল্লিও উচ্ছল হয়ে উঠেছে। অলিই শুধু রোহণকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আকাশের তারারা চাঁদের আলোয় আরো দূরে চলে গেছে মনে হয়। আকাশ-প্রান্তরে রুপোর গোল ঘণ্টার মতো মনে হয় চাঁদটাকে। রোহণের ইচ্ছে করে ওই ঘণ্টার গায়ে হাতুড়ি পেটায়, বাড়ি খেতে-খেতে সে চিৎকার করে উঠুক, বাজুক অবিরাম।

অলি, আলা বা আলেয়াও উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছে। কেমন দিয়েছে সেটুকুও তার জানা হয়নি। ওর বাড়িতে গিয়েও দেখা হয়নি। রোহণের যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সে কী একটা ছুতো করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর চোখের সামনে দিয়ে পাখির মতো যেতে-যেতে যেন বলল, আর কেন, আবার কেন ডাকা, কথা বলতে চাওয়া!

দিনগুলো পালটে গেল ফুৎকারে। আলার বাড়িতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা হলো। ছোট ভাইবোনও সামনে এলো। কিন্তু ওদের কাছে তো যাওয়া নয় রোহণের। ওরাও তা বোঝে হয়তো। মা বলেই দিলো, কী জানি বাবা, ওকে বললাম, শুনল না। আলার সেই বেরিয়ে যাওয়ায় রোহণের চোখ খুলে দিলো। এতোদিন বুঝেও বুঝতে চায়নি। প্রত্যেক মানুষের বুকের ভেতরে বোধকরি নিজস্ব একটা নরক আছে। সেই নরকে অদ্ভুত রকম পৃথিবী আছে, লোক-লোকান্তর আছে। তার কোনায় কোনায় অহং আছে, কামনা-বাসনার ঝড়-ঝাপটা আছে। সেই পৃথিবীর কোনো এক কক্ষে তরুণ হৃদয়ের কোনো না কোনো তরুণী আছে। প্রত্যেক যুবক যৌবনের সেই নারীকে খুঁজে বের করতে চায়। সেখানে একাধিক নারী থাকলেও তার মধ্য থেকে একজনকে মাথায় ঘোমটা পরিয়ে বরণ করে নিতে চায় একান্ত করে। কিন্তু সেই যুবকের রহস্য কেইবা জানতে পারে? তার মনের বিভিন্ন কক্ষের অর্গল কে খুলবে? কার ছবি তার হৃদয়ে অাঁকা, কাকে সে ভালোবাসে? আলেয়া, চন্দ্রমল্লি, মীনাক্ষী? কে সে? কে বলে দেবে? নাকি বুঝেও বোঝে না। তবুও মনে হয় সেই কোনো এক কক্ষে আলেয়া বসে আছে। সন্ন্যাসিনীর মতো বসে আছে যেনবা, খুব চুপচাপ। কুহেলিঘেরা অথবা।

কে জানে!

রোহণের মন যেন বলে উঠল, চলো। আর নয়। জীবন বসে থাকে না। এতো সময় কোথায়? এতো মঙ্গল? মঙ্গল তো একটি উপায় মাত্র। চলো, এবার চলো।

তবুও কিছুক্ষণ বসে থাকতে হলো।

আর পারল না। নিজেকে তৈরি করে নিতে-নিতে সে ভাবল, যা একদিন ছিল তা হারিয়ে গেছে, নাকি বদলে গেছে? সময় পেরিয়ে গেছে? সেই সময় আর কোনোদিন আসবে না, তা আজ মেনে নিতে হবে…।

আলার মা এসে বলল, আমি ওকে বলব তুমি অনেক্ষণ ওর জন্য বসেছিলে। এটা তার অন্যায় হয়েছে।

রোহণ স্পষ্ট বুঝতে পারছে আলার মা তাকে করুণা করছে। করুণারই যোগ্য সে।

আলার মা আবার বলল, আজকের এই ব্যবহারের জন্য তুমি ওকে ক্ষমা করে দিও বাবা। ও অবুঝ, নয় কি?

রোহণ নির্বিকার অথবা অজান্তে বলে দিলো, হ্যাঁ।

তুমি বাবা অনেক বড়। তোমাদের আলীর জন্য তুমি অনেক করেছ। গ্রামের লোকে বলাবলি করছে।

রোহণ সে প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলল, কাকিমা, আমি আসি।

যাবে? আবার এসো।



হেমন্তের আমেজ লুটিয়ে পড়েছে ধানক্ষেতে। গাছপালা চুপচাপ, বিকেলের মিষ্টি রোদে নিশ্বাস নিচ্ছে। একটু পরেই কুয়াশা নামতে শুরু করবে – পাড়াগাঁয় কুয়াশা নামে। অলিদের উঠোনের পাশের মাধবীঝাড়ে লাল-সাদা ফুল ফুটেছে। সন্ধেয় খুব সুগন্ধ দেবে। সেই ঝাড় ফেলে ঘাটায় বেলফুলের বিখ্যাত ঝাড়। ওই লতার গোড়া সুপুরিগাছের মতো মোটা। একটা পেয়ারা গাছে উঠেছে। ওর জন্য পেয়ারা গাছের পাতা দেখাই যায় না। ঘাটাও ওর ছায়ায় ডুবে আছে। সেখানে আলার সঙ্গে দেখা। আলেয়া কথা না বলে মাথা উঁচু করে পাশ কেটে চলে যাচ্ছিল। রোহণ বেলফুলের ঝোপের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বলল, আলা, তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলবে না?

সে মাথা ঘুরিয়ে বিষণ্ণ মুখে শুধু বলল, মীনাক্ষীকে তুমি কবে বিয়ে করছ?

রোহণ যেন রাগী গলার প্রান্তে গিয়ে বলল, পারলে সে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসত। সে অসুস্থ, রোগী ও দুঃখী। তোমার কথা বলে।

করুণা করে? আমিও কি তার করুণার পাত্র?

আমরা সবাই একে অপরের বা কারু না কারুর করুণার যোগ্য। তোমার মধ্যে এই গুণ থাকা সত্ত্বেও দেখাতে চাও না। এজন্য তুমি ভালো। তোমার মধ্যে জটিলতাও নেই। তবুও তুমি ভান করছ। সম্ভবত তুমি ক্ষমাও করতে জানো, করতেও পার।

তুমি তো তা চাও না।

আমি কি চাই, না চাই, আমিও জানি না।

তুমি তো কখনো মাথা নোয়ানোর মতো নও।

তুমি একদিন তা চাইতে।

মীনাক্ষী একদিন বলেছিল, মেয়েরা চায় তাকে যে ভালোবাসে সে যেন পৃথিবীর কোনো বিরুদ্ধ শক্তির কাছে মাথা নত না করে, কিন্তু তার কাছে করবে। আলার ব্যবহারে রোহণের সে-কথা মনে পড়ে গেল।

আলেয়া বলল, তাহলে তুমি সত্যি কথা বলতে ভয় পাও কেন?

রোহণ হঠাৎ ওর প্রশ্নের অর্থ বুঝতে পারল না বলে মুখের দিকে চেয়ে রইল।

আলেয়াও বুঝতে পেরে একটুও দেরি না করে বলে দিলো, অনির্বাণকে যে তোমার ছেলে বলে লোকে।

তুমি কী মনে করো সেটাই বলো।

তুমি আমার উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছ।

যদি বলি না!

তাহলে মিথ্যা বলা হয়ে যাবে।

সে-সময় রোহণের মনে হলো, সে খুব উঁচু এক পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাশের খাদগুলো তাকে খুঁটে খুঁটে দেখছে, সে তাই দেখে আরো ভাবছে – আমি কেন এখনই সব স্বীকার করব? আলেয়া যদি ওই একটি কথার জন্যই আমাকে এড়িয়ে চলতে চায় তো চলুক। ও এখন আমার সত্য বিশ্বাস করবে না, মানবেও না। ও এখন নারীর ঈর্ষার বশবর্তী। ওর পছন্দমতো না হলে ‘না এবং হ্যাঁ’ কোনোটিই গ্রাহ্য হবে না। তাই আলেয়া যদি আমাকে আগের চোখে না দেখে থাকে তো না দেখুক। আসলে সে আমাকে ভ্রষ্ট বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে। এখন সে সত্য বিশ্বাস করবে না, মিথ্যাই বিশ্বাস করবে।

তাই রোহণ বলল, আমি কিছুই বলব না। তাহলে!

আমারও ওই একটি ছাড়া আর কিছুই জানার নেই।

তুমি মীনাক্ষীর কথাও জানতে চেয়েছ।

আমি কিছুই জানতে চাই না। কিছুই না। – বলতে বলতে আলেয়া হঠাৎ চলে গেল।

তখন রোহণ সেখানে একটি উলঙ্গ শিশুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ সে বালক বয়সের সেই দিনগুলোতে চলে গেল যেন। শিশুর মতো নিজের মনে নিজে দাঁড়িয়ে রইল কোনো বন্ধুর জন্য, যার সঙ্গে কিছু কথা ছিল, খেলাধুলো বা গাছে চড়ার কিছু আনন্দ। সেই সঙ্গী এতোক্ষণ ধরে আসেনি বলে ঘরে ফিরে যেতে শুরু করবে যেন। বন্ধুটা একদম বোঝে না, কথা দিয়ে কথা রাখে না। অথচ সে নিজে কখন থেকে ওর জন্য এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছে। না পেরে সে ফিরে চলল ছেলেবেলা নিয়ে। বেলফুলের লতা কিসের ভারে যেন দুলে উঠল। পায়ের ভারে মাটিও কেঁপে-কেঁপে উঠল বুঝি! কিন্তু সে তো একটা শিশুমাত্র, ছেলেবেলার রোহণ, রোহণ…।

অবসন্ন বিকেল ছুটছে মাথা কুটে সেদিকে আর খেয়াল নেই, হেমন্তের বিকেলের ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে বড় রোহণের কোনো অনুভূতি তার মধ্যে নেই। সে বালক রোহণ হয়ে গোত্তা মেরে এক দৌড় দিলো তার ভিটের সেই বিখ্যাত বাঁশবাগানের তলায়, যেখানে তার প্রিয় বউদি আছে স্নেহ ভালোবাসার ডালি নিয়ে… কুরঙ্গ মৃগের মতো।



ঊনবিংশ অধ্যায়

হেমন্ত শেষে শীত এলো। ধান উঠছে গোলায়। নতুন আর একজন মাসকাবারি লোক রাখল রোহণ। তার নাম মহীন্দ্র। মুলো ও বেগুন বেচা শুরু হয়েছে। টমেটো, শিম, বরবটিও।

মীনাক্ষী ঘর থেকে বের হতে শুরু করেছে। একদিন মায়ের সঙ্গে চলে এলো রোহণের গ্রামে। অনির্বাণ কথা বলতে শুরু করেছে পুকুরের এক জায়গায় কই মাছের মতো অনবরত টুবটুব খই ফোটানোর মতো। সে কাকা রোহণের সঙ্গে রাস্তায় বের হয়। মীনাক্ষী বসে বাঁশবাগানের নিচে। বিকেলে সেখানে চা, মুড়ি, খই, মটরশুঁটি ভাজা খেতে-খেতে গল্প জমায়। চন্দ্রমল্লি বসে। শেফালির মা চিতই পিঠে বানায়। নদী-কাকির একটুও অবসর নেই। ভিটেয় ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস ও বীটের চাষ করেছে রোহণ। নিজের হাতে সেখানে পানি দেয়। ছোট-ছোট গাজর হয়েছে। মীনাক্ষীও পানি দেয়, বুড়ো আঙুলের সমান গাজর তুলে কাঁচা খায়। চিনা লাল মুলো খাওয়ার যুগ্যি হয়ে ওঠেনি। মীনাক্ষী নিজের অসুখের কথা ভুলে বসেছে। বাঁশতলা অনেকদিন পর মুখরিত হয়ে উঠেছে। মীনাক্ষী ঝলমল রূপ খুলে গল্প করে। ওপাশে মহুয়া গাছে একটি দোলনা বেঁধেছে। তার পাশে বাতাবিলেবু ছাড়া অন্য কোনো গাছ নেই। গরমের দিনে বাতাবি ফুলের গন্ধে চারদিক ঝমঝম করে। মীনাক্ষী সময় পেলেই দোল খায়। চন্দ্রবউদির সঙ্গে খুঁটিনাটি কী সব বলাবলি করে। অনির্বাণকে কোলে নিয়ে দোল খায় মীনাক্ষী। সুযোগ পেলে অনির্বাণ হাঁটে, হামাগুড়ি দেয় দিগ্বিদিক না দেখে। আকাশ প্রদীপ তোলে মীনাক্ষী। আর কাউকে হাত দিতে দেয় না ওতে। গুনগুন গায় ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে’, ‘ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না’ গান দুটি। আর কোনো গান খুঁজে পায় না। সারারাত আকাশ প্রদীপ জ্বলে। মাঝরাতে উঠেও দেখে মীনাক্ষী। ঊনত্রিশ বছর বয়সে সিদ্ধার্থ গৌতম গৃহত্যাগ করে অনোম নদীর তীরে আষাঢ়ী পূর্ণিমার এই দিনে উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন তিনি নিজের ঝাঁকড়া বাবরি চুল কেটে আকাশের দিকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কথিত আছে, দেবতারা সেই চুল নিয়ে গিয়েছিলেন দেবলোকে, হিমালয়ের দেবভূমিতে। সেই স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য এই আকাশ প্রদীপ তোলা।

মীনাক্ষী বলে, এতো আনন্দ সে তার জীবনে কখনো পায়নি। তারপর অভিকে বলে, তুই আমাকে সীতা পাহাড়ে নিয়ে যাবি?

সে তো অনেক দূরে। সীতাপাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছতেই তো চার-পাঁচ ঘণ্টা হাঁটতে হবে। গাড়ি বা নৌকোয় করে গেলেও সেই চার-পাঁচ মাইল হাঁটতে হবে। ঝোপঝাড় ও বুনো পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হবে। পারবে দিদি? – অভি বলল।

মীনাক্ষী বলে, আমরা ভাতের পুঁটলি নিয়ে যাব। পাহাড়িদের বাড়িতে না হয় এক রাত কাটাব!

আসলে পাহাড়ে ওঠা তো সহজ নয় দিদি। – অভি আর্দ্র গলায় বলে।

মীনাক্ষী একদিন রোহণকে বলে, পাহাড়ে কী করে যাওয়া যায়?

রোহণ অন্যভাবে একদিন ব্যবস্থা করল। সীতা পাহাড়ের পরেই চিৎমরম। সেখানে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার আছে। কর্ণফুলীর বাঁ তীরে কাঠের নির্মিত বৌদ্ধবিহার। কাঠের খিলানো মাচার ওপর প্রশস্ত হলঘর। চন্দ্রমল্লি, অভি, অনির্বাণ, মীনাক্ষী ও মা আর রোহণ বাসে করে চলে গেল। কাপ্তাই সড়ক থেকে দীর্ঘ খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয় সাম্পানে ওঠার জন্য। তারপর নদী পেরিয়ে তেমনি দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সারি-সারি তিনটি যাত্রীনিবাস ফেলে মূল বিহারে পৌঁছল ওরা। অনেক শ্রামণ ও ভিক্ষু আছেন সেখানে। অনেকগুলো কুকুর থাকে সারা বছর, আর প্রচুর পায়রা, সারাদিন ওরা বকবক করে। বড় বড় মোটা বাঁশের ঝাড় ও গছপালায় ঘেরা নিবিড় পরিবেশ। অদূরে পশ্চিমে সীতা পাহাড় উত্তর থেকে এসে কর্ণফুলী পার হয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। বহুকালের পুরনো বুদ্ধমূর্তি আছে। সবাই বলে, এখানকার বুদ্ধ সদাজাগ্রত। এখানে কেউ চুরি করে না, চুরি করলে আপনাতেই ধরা পড়ে যায়। আর একাগ্রচিত্তে কেউ কিছু প্রার্থনা করলে তা সফল হয়। পরিচ্ছন্ন মনে না চাইলে প্রার্থনা সফল হয় না। – ‘মনো পূববঙ্গমা ধম্মো, মনো শেট্ঠা, মনো মায়া।’

রোহণ চুপি চুপি মীনাক্ষীকে বলল, তুমি কী বর চাইলে?

মীনাক্ষী করুণ অমলিন চোখে তাকাতেই রোহণ বিস্মিত, এমন দৃষ্টি রোহণ কোনো দিন মীনাক্ষীর চোখে দেখেনি। চন্দ্রমল্লি ততক্ষণে রোহণকে দেখে নিয়েছে। অনির্বাণ হামাগুড়ি দিচ্ছে আবার দাঁড়াচ্ছে। মীনাক্ষীর মা প্রার্থনা করছে। অভি এক শ্রমণের সঙ্গে কথা বলছে। দুটি মারমা তরুণী ওদের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলছে। মারমা ভিক্ষু শিষ্যদের ধর্মব্যাখ্যায় মগ্ন।

মীনাক্ষীকে জিজ্ঞাসা করে অব্দি রোহণের বুকে তোলপাড় চলছে, কেন সে জানতে চাইল তার মনের কথা! সে অসুস্থ। বাঁচবে কি শিগগির মরবে, কয় বছর তার আয়ু ডাক্তার বলেছে, তা সে জানে না, অথবা তার মা কোনো অসতর্ক মুহূর্তে বলে দিয়েছে কিনা তাও জানে না। তার আপাত হাসিখুশি আচরণের আড়ালে হয়তো বেদনার পাহাড় লুকিয়ে আছে ঘাপটি মেরে। মীনাক্ষী যেন বলতে চাইছে, আমার বুকের ক্ষতটা বা সাপকে শান্ত থাকতে দাও, বুকের ক্ষতটাকে কেন খোঁচা দিচ্ছ? অথবা হয়তো মনে-মনে লজ্জা পেল, নাকি একটু রাগ হলো। এও হয়তোবা ভাবল, তুমি যাকে বিয়ে করতে পারবে না তাকে নিয়ে এত উঠেপড়ে লাগলে কেন?

রোহণ মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে উঠে ভাবল, এই বুঝি মীনাক্ষী উত্তর দিয়ে বসল! অথবা কী করে তাকে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত করা যায়!

মীনাক্ষী আস্তে-আস্তে মুখ খুলল, তুমি তো সব জানো। কিন্তু জানার… আর বলতে পারল না। ঠিক সে-সময় অনির্ধাণ হামা দিয়ে ছুটে এসে ওর কোলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রবল বেগে, বনের গাছপালায় যেমন প্রথম ঝড় ঝমঝম শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মীনাক্ষী মনের অর্গল খুলতে গিয়েও খুলল না, শেষ পর্যন্ত একটা পর্দা বাকি থেকে গেল। রোহণও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টি চিরকালের জন্য বুকে গেঁথে গেল। চন্দ্রমল্লির দৃষ্টিও। পাহাড়ে ঝড় উঠলে ছায়া যেমন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও আশ্রয়ের আশায় মেতে ওঠে, ওদের দুজনের দৃষ্টিও সেভাবে যুদ্ধ চালিয়ে ওপরের সমাধিঘরের দিকে চলল। চলল ওরা।

সমাধিঘরের টিলার ওপর থেকে পশ্চিম দিকে সীতা পাহাড় গাছপালার বন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বনের সবুজ মিশে গেছে আকাশের নীলে। চোখ জুড়িয়ে যায় পাহাড়ের সৌন্দর্যধারায়। সূর্য পাহাড়ের পশ্চিমে চলে যাচ্ছে দিনকে টেনে নিয়ে। এখন ওদের ফেরার সময় হয়েছে। দূর থেকে দু চোখ ভরে দেখে-দেখে ওরা ফিরে চলল ঘরের পানে। নীড়ে ফেরা পাখির কাকলি ফেলে…। ওরাও ফিরছে ঘরে।



বিংশ অধ্যায়

দ্রুত ছুটে চলল দিন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। মর্জিনা ও মুনির প্রথম বিভাগ পেল। রেবেকা ও অজিত দ্বিতীয় বিভাগ। অলি দুটিতে লেটার নিয়ে প্রথম বিভাগ। রোহণ চারটিতে লেটার নিয়ে স্টার। শুধু স্টার আর কিছু নয়। একবার ওর মনে হয়েছিল, কুড়ি জনের মধ্যে ওর জায়গা হবে। হলো না। এতেই চন্দ্রবউদি ভীষণ খুশি। অমনি হইহই করতে-করতে কী করবে বুঝতে না পেরে আলিঙ্গনে বেঁধে চুমো খেতে-খেতে কত কথা বলে গেল! বউদির গায়ে সেই আগের মিষ্টি সুরভি পেল রোহণ। বুকে শুনতে পেল আনন্দধ্বনি। ঝলমল হৃদয়ের সেই আশ্চর্য কারুকার্যখচিত প্রতিধ্বনি, সেই চাঁদের আলোয় বসন্ত আসার গান, ফুল ফুটেছে ও মিষ্টি হাওয়া বয়ে চলেছে অনুভূতি। তক্ষুনি অনির্বাণ এসে খুশির আভাস পেয়ে মা-মা বলে দু জনের পা আলিঙ্গনে বেঁধে দাঁড়াতেই বুকে তুলে নিল মা। আদরে-আদরে ভাসিয়ে দিলো অনির্বাণকে।

নদী-কাকি ও শেফালীর মা ছুটে এলো হইচই শুনে। আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।



আবার হোস্টেল-জীবন শুরু হলো রোহণের। মীনাক্ষী পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে। অজিত আস্তে-আস্তে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ল। এভাবে সে রাজনীতিতে নিজেকে জড়াবে কোনোদিন ভাবেনি। হাশেমের সঙ্গে পরিচয় হলো। সে প্রতিদিন মিছিল নিয়ে বের হয়। রেবেকাও ছাত্রীদের নিয়ে যায় মিছিলে। চারদিকে কী যেন এক যোগসাজশ চলছে। কিন্তু পড়াশুনো ও খেলা ছাড়া ছাত্ররাজনীতি কোনো দিন টানতে পারেনি রোহণকে। মুনির মাঝে মাঝে ডাকে, আয় আয়। মর্জিনা ছায়ার মতো যায় মুনিরের পাশেপাশে। এনএসএফ নামে সরকারি ছাত্রদলটি দিন-দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ওদের হাতে হকিস্টিকের অস্ত্র।

ফুটবল ও ক্রিকেট দুটিতেই রোহণের সমান সুনাম। বাড়ির চাষাবাস ধকল কাটিয়ে উঠেছে মহীন্দ্র আসার পর। রমেশ কাকার সঙ্গে কাজে বোঝাপড়া হয়ে গেছে। এক বছরে অনেক ধারদেনা হয়ে গিয়েছিল। পরের বছর মুলো-বেগুন-আলু ভালো হওয়াতে মুশকিল আসান হয়ে গেল। দুঃখের দিনও বসে থাকে না।

কিন্তু মীনাক্ষীর রোগের নতুন একটি উপসর্গ দেখা দিলো। শুঁটকি, কাঠকয়লা, ধোঁয়া ও ধুলোর গন্ধ পেলেই তার মাথা ধরে। এক বার ওরকম হলে কয়েক ঘণ্টা এমনকি রাত পর্যন্ত চলতে থাকে। তাতেও সে থেমে থাকেনি। পরীক্ষা দিলো সে। সে বছর অভিও ছিল। দু জনেই দ্বিতীয় বিভাগে পাস করল। এণাক্ষী কলেজে ভর্তি হয়েছে। অধ্যাপক মালাকারের চাকরি চলে গেল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছাত্রছাত্রীদের বামপন্থী রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করা। অজিত ও হাশেম এতো সংগ্রাম করেও রক্ষা করতে পারল না। কমিউনিস্ট খুব ভয়ঙ্কর জীব সরকারের কাছে। দিন-দিন সংগ্রাম নতুন রূপ নিচ্ছে। এনএসএফ মিছিল বের করে হাতে হকিস্টিক নিয়ে। ছাত্ররাজনীতিতে এটি সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র। পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। শেখ মুজিবের ছয় দফা জোরদার বলশালী হয়ে উঠছে। ভাসানী ছয় দফা সমর্থন করে আন্দোলনে নেমেছেন।



সেদিন রোহণ যেতেই এণাক্ষী ধরে বসল, তুমি আগের মতো তেমন করে আসো না কেন? কি হয়েছে তোমার?

শোনো এণাক্ষী সোনা, তোমার দিদি দুঃখ পাচ্ছে কষ্ট পাচ্ছে রোগে, তাই তুমি আমাকে নির্দয় বলছো? নাকি অন্য কিছু?

তুমি নির্দয়ই তো।

যুগ-যুগ ধরে মেয়েরা ছেলেদের নির্দয় বলেছে তাই না?

তুমিও দিদিকে ছেড়ে চলে যাবে?

এণা, তোমার জীবন সবে শুরু হচ্ছে। আমার সমস্যা অনেক গভীর ও জটিল।

দিদিও কি তোমাকে বোঝে না? তুমিই বোঝো শুধু?

এণাক্ষীর মেজাজ কেন যেন সেদিন সপ্তমে চড়া। রোহণের মনে হলো সে এরই মধ্যে কারু প্রেমে পড়েছে। আর তা বোধহয় ভুলতেও দেরি হবে না। ঠিক তখনই মীনাক্ষী এলো। রাস্তা দিয়ে ছাত্রদের মিছিল যাচ্ছে। সবার হাত আকাশের দিকে মুঠো করে তোলা। পেশাদার ভাড়াটে গুন্ডাদের মতো গোঁফ-দাড়ি না থাকলেও জঙ্গি ওরা। হাতে পোস্টার নাচছে, ফেস্টুন দুলছে, রঙিন ব্যানার মাথা তুলে আছে। রাস্তার দু পাশে দাঁড়িয়ে লোকজন দেখছে। জয় বাংলা শুনছে।

তুমি কত দিন পরে এলে বলো তো? – মীনাক্ষী বলল প্রায় অভিযোগ করে।

মিছিল থেকে আসিনি আমি। ও পথ আমার নয়। ও পৃথিবী আমার দখলে বা আওতায় নেই জেনো।

তখনই এণাক্ষী মিছিল দেখতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ওকে লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি রোহণ বলল, বাড়িতে গিয়েছিলাম।

আলেয়া কেমন আছে? – মীনাক্ষী খুব আস্তে-আস্তে বলল।

জানি না।

আমার কথা কিছু জানতে চেয়েছে?

না।

চন্দ্রবউদি তেমনি হাসিখুশি আছে তো?

না।

কথা বলতে-বলতে রোহণ টেবিলের বইপত্র দেখছে। নতুন গল্পবই এসেছে। ফুলদানিতে নতুন রজনীগন্ধা। আছে পোড়ামাটির কালো হাতি। পৃথিবীর মানচিত্র-খচিত কলমদানি। মাটির ছোট্ট টবে অর্কিড।

এতগুলো প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ শুনে দুঃখিত হয়েও বুঝি কোনো লাভ নেই, মানুষ পৃথিবীতে বারবার জন্ম নিলেও এক জন্মের কথাই সে মনে করতে পারে, বর্তমান জন্মই সে চোখের সামনে দেখে। তাই মন খারাপ করে কোনো লাভ নেই। তারচেয়ে আলোচনাই ভালো। কথা বলাই উত্তম। – রোহণ কী মনে করে এতসব বলে গেল যেন।

দার্শনিক আলোচনা হয়ে গেল।

মোটেই না।

মীনাক্ষী জানালা দিয়ে পেয়ারা ও কলাগাছ দেখিয়ে বলল, গাছের পেয়ারা খাবে?

সত্যিই?

তবে এই অসময়ে… সন্ধেয় পেয়ারা না খাওয়াই ভালো। বাবা বলে সন্ধেয় পেয়ারা না খেতে।

মীনাক্ষীর রোগ নিয়ে রোহণ ওর সঙ্গে আলোচনা করে না। সে মনে করে কখনো-কখনো রোগ নিয়ে আলোচনা করলে অসুস্থ মানুষ মনে-মনে দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার জানতে না চাইলেও কেউ-কেউ তাকে অবহেলা করছে বলে মনে করে। মীনাক্ষীকে শক্ত করে তোলার জন্য কোনো বিশেষ বিষয়ে আলোচনায় ডুবে যেতে চায় সে। তাতে সে ডুবে যাবে ও ভুলে থাকবে রোগের কথা।

রাজনৈতিক আন্দোলন গড়িয়ে চলেছে ঢেউ তুলে। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে আওয়াজ তুলছে মিছিল। শেখ মুজিবকে সমর্থন জানাচ্ছে। রাজনৈতিক ঝড় এগিয়ে আসছে। রোহণের পরীক্ষাও এগিয়ে আসছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, অঙ্ক সব নিয়ে ওকেও ছুটতে হচ্ছে। মীনাক্ষী গল্পবইয়ে ডুবে যাচ্ছে।

রোহণ বলল, চলো তোমাকে হোমিওপ্যাথের কাছে নিয়ে যাই। আমি খোঁজ নিয়েছি। একজন বিজ্ঞানের অধ্যাপক হোমিও পাশ করে চেম্বার খুলেছে। তার সুনাম শোনা যাচ্ছে।

ঠিক তখনই মীনাক্ষীর মা এলো বাইরে থেকে। এণাক্ষী ভুট্টার খই নিয়ে এলো। গরম-গরম। মা খুশি হয়ে বলল, তুমি আজ এখানে খেয়ে যেও। রোহণ সে-কথার কোনো জবাব দিলো না। তারপর একথা-ওকথা বলে একসময় মা ও-ঘরে চলে গেল।

অমনি মীনাক্ষী বলল, না, তুমি আজ খাবে না। তাড়াতাড়ি চলে যাবে। পরীক্ষা তোমার সামনে। বললেই তুমি খেতে রাজি হয়ে বসবে কেন! এতে আমার মনে হয় তুমি ছোট হয়ে যাচ্ছ।

তুমি বললেও খাব না!

না। অত সস্তা নয়। তোমার পৌরুষ যেন না বিকোয়। অথবা বিবেচনা।

এণাক্ষী চা নিয়ে ঢুকল। হাসতে-হাসতে বলল, আজ আর কিছু নেই। দোকান থেকে মিষ্টি আনতে পারতাম। দোকানের খাবার এনে দিলে তোমাকে অবহেলা করছি ভাবতেও পার হয়তো, তাই…।

সূক্ষ্মভাবে দেখতে গেলে তা ঠিক হয়তো। কিন্তু কিছু বলল না, শুধু হাসল একটু।



একবিংশ অধ্যায়

রোহণের ছোট মামার বদলির চাকরি, স্কুলপরিদর্শক। রোহণ চট্টগ্রামে পড়তে যাওয়ার পরপরই মামা বদলি হয়ে পঞ্চগড়ে চলে গেল। সেই থেকে আর দেখা হয় না। বড় মামা নেই। কতদিন মামাবাড়ি যাওয়া হয় না, কতদিন ছোট মামাকে দেখে না। পদ্মপিসির কাছে যায়। গেলেই নানা কথার ফাঁকে পড়াশুনো ও জমিজমা ঠিক রাখতে বলে। ঠিক সময়ে খাজনা দিবি। নিজের জমির আল যেন ঠিক থাকে, জমির পাড়ে গিয়ে দাঁড়াবি। জমির সিট, খতিয়ান যত্ন করে রাখবি।

রোহণ অল্প বয়সেই চাষবাস ও ঘর সামলানো ইত্যাদি   দেখতে-দেখতে এক রকম একঘেয়েমি এসে গেছে। আবার ভালোও লাগে। মাঝে-মাঝে জেদ চেপে যায়। ফসল ভালো হলে খুব আনন্দ হয়, উপভোগ করে সৃষ্টির আনন্দ। মামা চিঠি দেয় মাঝে-মাঝে। এক টুকরো উঁচু-নিচু জায়গায় মাদার গাছ অর্থাৎ পারিজাত গাছ রুয়েছে। সেটা নদীর ভাঙনের মুখে পড়বে বলে ভয় হয়, মনটা দমে যায়। কাঁটা মাদার বেশ বড় গাছ হয়, পলতে মাদার বা পারিজাত একটু ছোট হয়। কাঁটা মাদার লাকড়ির জন্য আদর্শ গাছ, দ্রুত বাড়ে, প্রতি বছর ডাল কেটে খড়ি হয়। পৌষ-মাঘ মাসের দিকে কেটে শুকিয়ে লাকড়ি ঘরে তুলে রাখে কাজের লোকেরা। ব্যস, বর্ষাটা নিশ্চিন্ত।

বড় মামার মেজ ছেলে রোহণের বয়সী। সে কাউকে না জানিয়ে সাহা পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করে শহরের এক হোটেলে উঠেছে। একদিন সেতু এসে রোহণকে ধরে নিয়ে গেল হোটেলে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে একটি মেয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। রোহণ তো সেতুর চেয়ে পাঁচ মাস ছোট, তবুও রোহণ কী বলবে? তবু বলল, তাহলে এখন কী করবি তুই? কোথায় উঠবি ঠিক করেছিস? বাড়িতে যাবি না?

একটা ঘর ভাড়া করব। চাকরি খুঁজব।

চাকরি? কে দেবে?

দেখি। চেষ্টা তো করে দেখি। ততদিন ছেলেমেয়ে পড়াব, গৃহশিক্ষক। তোর হাতে কেউ থাকলে বল। মাধ্যমিক পড়াতে তো পারবই।

তুই বি.এ. দিবি তো?

দেব। উচ্চ মাধ্যমিকও পড়াতে পারব।

ওদিকে নতুন বউ উঠে টিন থেকে নারকেলের নাড়ু বের করে দিলো। বলল, মিষ্টিমুখ করো।

রোহণ বলল, তাহলে তো খাইয়ে দিতে হবে। এসো বউদি।

করুণা বউদির চাঁপাকলির মতো আঙুল। নখ পালিশ লাগানো। টানা চোখ, সুন্দর মুখশ্রী। রোহণকে খাইয়ে দিলো। রোহণও রীতি অনুযায়ী একটি মুখে তুলে ধরে বলল, বউদি নাও।

খেয়ে নিয়ে করুণা বলল, তুমি আমার প্রথম দেওর। বয়সে তুমি আমার  বড় হলেও বউদির অধিকার আমি ছাড়ব না। এই দিনটির কথাও আমি কোনোদিন ভুলব না। মাঝে-মাঝে এই অধম বউদিটির খবর নিতে ভুলো না যেন।

ভুলে গেলে কান ধরে দন্ড দিও।

সেটা কোনো শাস্তিই নয়। আমি অন্য শাস্তির কথা ভাবছি।

কী শাস্তি দেবে?

কথাই বলব না সাত দিন।

না না, অন্য কোনো শাস্তি। এটা তুমি তুলে নাও।

নিলাম। কিন্তু অন্য কী শাস্তি দেব সেটাও তোলা রইল। এখন বলব না।

তাহলে তো এখন থেকে শাস্তি ভোগ শুরু হয়ে গেল।

আচ্ছা বিপদে পড়ে গেলাম তাহলে।

করুণা হেসে দিলো। সেই অমলিন হাসিতে বিষাদের ছায়া লুকোতে পারল না। অথবা রোহণ হয়তো ভুল দেখে থাকবে। ওর মনে পড়ল ছোট মামার চিঠির কথা। সেতুকে বলল। সেতু দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল, কিছুদিন আগে আমাকেও লিখেছে। পরীক্ষার পর বেড়াতে যেতে বলেছে।

ওদের কথার মধ্যে করুণা চুপ করে রইল। সেতু দুটো নাড়ু খেল। আস্তে-আস্তে ওরা আলোচনায় ডুবে গেল। করুণাকে গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়ানো এবং প্রতিদিনের দেখা থেকে প্রণয় হয়েছে তা নয়। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী সে। গরিব মা-বাবা ওকে ধরে-বেঁধে বড়লোকের আধপাগলা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে বসেছিল। টাকা দিয়ে তারা করুণাকে কিনে নিতে চেয়েছিল। করুণাকে সে করুণাবশত বিয়ে করেছে।

আস্তে-আস্তে রোহণ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তাহলে ভালোবাসা ছাড়াই সেতু এই ঝুঁকি নিল! শুধু ছাত্রী বলে। ছোট কাকাকে সব জানিয়ে চিঠি লিখেছে সেতু। রোহণকেও বলল লিখতে। ছোট কাকা যদি দাঁড়ায় তাহলে সুরাহা হতে পারে। কিন্তু সেতু ও করুণার ধর্ম আলাদা। এর সমাধান কী?

ওদের কথাবার্তায় করুণা অংশ নিল না, বরং সে আগের সম্পন্নতা খুইয়ে বসল। তবুও মাঝে-মাঝে হাসিমুখ করে তাকায়। বৃথা। মানুষের মনের বাইরে ও গভীরে বাস করে পারিবারিক পরিবেশের শেকড়, ধর্মের প্রবল ছায়া। করুণা তাই দিয়ে মনে-মনে বলে, ধর্ম ও সমাজের চেয়ে মানুষ বড়। এতোদিন সে          পড়তে-পড়তে সেতুর সঙ্গে কি মনে মনে একরকম অনুরাগী হয়ে পড়েছিল? আর হঠাৎ তা প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল? সেতুকে এক বার বলতেই রাজি হয়ে গেল কেন? এর পরিণতিতে কী হবে ভালো করে ওরা ভেবেছিল কি? সেতু ভেবেছে অর্থের জোরে করুণার জীবনটা এভাবে ছারখার হয়ে যাবে তার চোখের সামনে? সেতুর প্রতি করুণার কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় এখন মন আচ্ছন্ন। তবুও কোথায় যেন কিছু একটা আছে। দ্বিধা ও সংশয় ছায়া ফেলে। ছায়ায়-ছায়ায় ভালোবাসাও বৃদ্ধি পায়।

সেতু বলল, পরে আমি তোকে জানাব। হয়তো আজই আমি কোথাও উঠে যাব। একটা বাসা পাওয়ার কথা কৈবল্যধামের দিকে। আমার গ্রামের এক বন্ধু ওদিকে কাজ করে। সে বলেছে বাসা ঠিক করেই আমাদের নিতে আসবে। তোকে পরে জানাব।

বিয়ের উপহার হিসেবে সেতুর হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে ফিরে এলো রোহণ। মনে-মনে সেতুকে বাহবা দিলো। মনে-মনে বাহবা দেওয়া আসলে খুব সহজ।





দ্বাবিংশ অধ্যায়

পরীক্ষা শেষ হলো। রাজনৈতিক আন্দোলন আরো তীব্র হয়েছে। ছোট মামার চিঠির উত্তর এলো। ‘সেতু যখন বিয়ে করেছে দায়িত্ব তার। সে নিজের পায়ে দাঁড়াক, তারপর কী হয় দেখা যাবে।’

সেতুরা কৈবল্যধাম চলে গেছে। সেতু পরীক্ষা দেয়নি। মীনাক্ষী সব শুনে খুশি হলো খুব। পারলে সে নিজে গিয়ে ওদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসে। কিন্তু ওর অসুখ যেন আবার ওঠানামা শুরু করেছে। রোহণও তখন স্থির করল মীনাক্ষীকে সে বিয়ে করবে। সেতু যেন পথ করে দিলো রোহণকে।



শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থের দিক থেকে সম্পন্ন পরিবারের বলে মীনাক্ষীর সঙ্গে রোহণের বিয়েতে কোনো বাধা রইল না। কিন্তু চন্দ্রবউদির মা খুব বোঝাল রোহণকে। পড়াশুনো ও চাকরি-বাকরি ইত্যাদি বলে বিরত করতে চেষ্টা করল। তার মনে-মনে ইচ্ছে নিজের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়। সমাজে বউদির সঙ্গে এবং বয়সে একটু বড় হলেও বিয়েতে বাধা হয় না। এই ব্যাপারে সমাজের মুখ্য বিষয় পাত্রপাত্রীর ইচ্ছা।

রোহণ চন্দ্রবউদির কাছে গেল। বউদি তখন মাকে অন্য ঘরে যেতে বলল। তারপর কী বলে রোহণের সঙ্গে কথা শুরু করবে খুঁজেই পায় না। অভিমানে তার গলা বন্ধ হয়ে আসছে। যে চন্দ্র নিজের হাতে দেওরকে কৈশোর থেকে বড় করে তুলেছে, বলতে গেলে শিক্ষাদীক্ষা থেকে সমস্ত কিছু শিখিয়েছে-পড়িয়েছে, মা-বাবা ও ভাইয়ের দুঃখ ভুলিয়ে বড় করে তুলেছে, নিজের স্বামীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েছে, আশ্রয় মেনে নিয়েছে তাকে, তার বিবাহে সে পেছনে পড়ে থাকবে? বউদির মতামতই তো চূড়ান্ত হওয়া উচিত রোহণের। সেই রোহণ তাকে না বলে অন্য মেয়েকে পছন্দ ও নির্বাচন করতে পারে কি? একবার গলা ছেড়ে ডাকতে ইচ্ছে করছে রোহণকে, এমনকি মৃত স্বামীকেও, দরকার হলে সে স্বামীর সঙ্গে বোঝাপড়া করবে। চন্দ্রমল্লি অমনি নিজেকে সংযমে বাঁধতে শুরু করল। সে জানে মীনাক্ষী বেশিদিন বাঁচবে না, রোহণকে সুখও দিতে পারবে না। রোহণের বোঝা, দায়িত্ব, অন্তর্মুখী মনের গভীরে প্রবেশ ইত্যাদি কী করে মীনাক্ষী নেবে? চন্দ্র একবার ভাবল, যাক বিয়ে করুক, দু দিন পরে বুঝতে পারবে মীনাক্ষী একজন মৃত, তার পক্ষে রোহণের কোনো চাহিদাই পূরণ করা সম্ভব নয়। চন্দ্রমল্লি নিজের স্বামীকে দিয়ে চিনতে পেরেছে রোহণকে, দু জনের মধ্যে অদ্ভুত মিল, অত্যন্ত অভিমানী, পুরুষ মানুষের অভিমান যে আছে তা নারীরা মানতেই চায় না। অভিমান যেন নারীর একচেটিয়া সম্পদ। না, চন্দ্র নিজের স্বামীকে দিয়ে বুঝেছে, সেই শুদ্ধ সুন্দর মানুষটি অজ্ঞাত রোগের কাছে হেরে গেল। তার ভাইটিকে রেখে গেল তার পত্নীর হাতে, বলেছিল, দেখো আমার ভাইটিকে, ও কাছে থাকলে আমার অভাব তুমি অনুভবই করতে পারবে না, সে একদম আমার মতো মানসিক দিক থেকে, হয়তো বস্ত্তগত দিক থেকেও সে-রকম হবে। আমি যেটা পারিনি সেটা সে করবে দেখো তুমি। ওর পড়াশুনো দিকে লক্ষ রেখো – আর মনে রাখবে ওখানে সে একদম আমি। ও যদি সুযোগ পায় বড় কিছু করবেই। এ-ধরনের মানুষ নিজেকে মাঝে-মাঝে টেনে ধরতে পারে না, একজন সংবেদী অভিভাবকের দরকার হয়। আমাকে সেই ছায়া দিয়েছিল বাবা। এখন ওকে দেখবে তুমি এবং তোমাকে তা পারতে হবে। দেখো, একদিন ও অনেক-অনেক বড় হবে তোমার ছায়া পেলে। একদিন সে তোমাকেও অনেক কিছু দেবে। এমনকি তোমার হৃদয়ের অর্গলও ওকে খুলে দিয়ে দেখো। আমি বাঁচব না বলে তোমাকে এতসব বলছি, নয়তো বলার দরকারও হতো না, আমিই সব সামলে নিতাম। ওকে একটু স্বাধীনতা দিও, এটা ওর জন্য খুব দরকার।  মা-বাবা নেই আমি না থাকলে সে খুব দিশেহারা হয়ে যাবে, কিন্তু তা কখনো সে প্রকাশ করবে না বা তার মধ্যে তুমি দিশেহারা ভাব দেখতে পাবে না, দেখতে পাবে না বলেই তোমার পক্ষে ওকে ভুল বোঝাও খুব সহজ হবে। আমার বিশ্বাস ওকে তুমি ফেরাতে পারবে তোমার দিকে। তোমার মাঝে ছেড়ে দিয়েও বেঁধে রাখার মায়া আছে, সেই মায়া মানুষের আকাঙ্ক্ষার। মহৎ মানুষও এরকম মায়াপাশবন্ধন আকাঙ্ক্ষা করে। আমার খুব মনে হয় তুমি রোহণকে পারবে। স্বাধীনতা দিলে সে পরাধীনতা খুঁজতে তোমার কাছে আসবে। আবার পরাধীনতা যখনই বুঝতে পারবে, তখন সে খুঁজবে স্বাধীনতা। এরকম মানুষ পরিবারের উপযুক্ত হয়তো নয় মনে হবে… আসলে মানুষ তো ছিল স্বাধীন পশু, নিজের স্বার্থে দলবদ্ধ হয়েছিল, নিজের স্বার্থে আবার দলকে ছত্রভঙ্গ করে। আফ্রিকার অরণ্য ও   প্রান্তরের দলবদ্ধ পশু গরু, মোষ, জেব্রাদের দেখো। তার বিপরীতে সিংহ, বাঘ, চিতা, হায়েনা, কুকুরদের দেখো! মানুষও সে-রকম দলবদ্ধ হিংস্র ছিল। আমি যতদিন আছি, আমি দেখব। কিন্তু আমার সময় তো ফুরিয়ে এলো বলে। তোমাকে দিয়ে যাচ্ছি ওর দায়িত্ব, শুধু অভিভাবকত্ব নয়, ভালোবাসাও।

চন্দ্রবউদির দিকে তাকিয়ে রোহণ বেপরোয়া বিনয়ে বলল, তুমি অনুমতি দেবে আশা করি। মীনাক্ষীকে বাঁচানোর জন্য…। কিন্তু বউদির চোখ দেখে কথা শেষ করতে পারল না। সেই চোখে নারীর চিরায়ত করুণা ও মমতাই বুঝি দেখতে পেল। তবে অভিমান ছিল কিনা বুঝতে পারেনি, যে-নারী অন্যের না-বলা কথার অর্থ খুঁজে নিতে জানে, হাতে ধরে হাঁটাচলা শেখানোর মতো জীবনের রহস্যের সন্ধান দিয়েছে, সেই নারীর অপার রহস্যের জগৎ দেখতে পেল বুঝি ক্ষণিকের জন্য! চন্দ্রও সেই ক্ষণিকের পৃথিবী থেকে বেরিয়ে প্রান্তিক হাসিমুখে রোহণের বিয়ের অনুমোদন দিলো। আর কী আশ্চর্য এই নিয়ে ওদের আর কোনো কথা হলো না। দু জনেই নিজেদের       না-বলা কথা নিয়ে চুপ হয়ে রইল দুটি নিঃসম্বল দ্বীপের মতো, গায়ে সাগরের ঢেউ অনরবত আছড়ে পড়ছে, ফেনা তুলছে, ঝিনুক-শঙ্খ উঠে আসছে ঢেউয়ের সঙ্গে, ভেজা বালিতে আটকে যাচ্ছে জীবিত ও মৃত শুক্তিরা। অথচ দু জনেই চুপচাপ, নিঃস্ব নিশ্বাস।



ত্রয়োবিংশ অধ্যায়

পরীক্ষার পর মর্জিনা ও মুনির গ্রামে চলে গেল। রেবেকা মিছিল নিয়ে সভায় যোগ দেয়। সে আমানের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজছে মিছিলের আগে-আগে থেকে। অভি পড়াশুনোয় আরো মনোযোগী হয়েছে হোস্টেলে থেকে। অনির্বাণ হাঁটতে-হাঁটতে কথা বলে, আদুরে গলায় কাকাকে ডাকে, রোহণের বুকের ভেতর ভালোবাসা ও আনন্দের খই ফোটে। টেনিস বলের পেছনে ছোটে অনির্বাণ।

আলেয়া আর একবারও কথা বলেনি রোহণের সঙ্গে, পথেঘাটে দেখা হলে চোখ তুলে তাকায় যেন গনগনে সূর্য। পদ্মপুকুর শুধু পুকুর হয়ে পড়ে থাকে পথের পাশে। রোহণ একদিন কলেজে গেল। সেই রাতে অজিত ওর কাছে এসে বলল, আমাকে একটু সাহায্য কর, মন্দাকিনীর আকর্ষণ এড়াতে পারছি না। গুরুজি ফরিদপুর আশ্রমে গেছে কাজে, ততদিন আশ্রমের দায়িত্ব আমার। একদিন ভাবতাম এই আশ্রমের দায়িত্ব পাবো আমি এবং মনের মতো করে গড়ে নেব। এখন ছাড়তে পারলে বেঁচে যাই।

কেন?

মন্দাকিনী তার জীবনের পুরো কাহিনি আমাকে বলেছে। সমাজের অবিচারের ফল ভোগ করছে সে তিলে-তিলে। গুরুজিও তাকে প্রতারণা করেছে। ওর বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক আগে।   সন্তান নেই। সন্তান না-হওয়া যে নারীর জন্য কত বড় গ্লানি ও অভিশাপ তা একমাত্র নারীই বোঝে। উঠতে-বসতে তাকে আঘাত করবে, বাড়ির বেড়াল পর্যন্ত যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। পাড়ার সবচেয়ে অভাজন কুরূপা বউটিও তাকে অবজ্ঞা করবে। শ্বশুরবাড়ির সবাই তাকে খোঁটা দেবে উঠতে-বসতে, আঙুল তুলে দেখিয়ে বলবে, বন্ধ্যা মেয়ে, অপয়া নারী, নারী হয়েও নারী নয়, সন্তান জন্ম দিতে পারে না। সেজন্য তার শাশুড়ি ও শ্বশুর মিলে গুরুজির কাছে পাঠিয়েছিল। গুরুজি যদি কৃপা করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানায় এবং সন্তানবতী হয় তো সে পার পেয়ে যায়। মন্দাকিনী আশ্রমসেবিকা হলো। এক মাসের মাথায় রোগে ভুগে স্বামীও মারা গেল। বিয়ের আগে থেকেই স্বামী অসুস্থ ছিল এবং পৌরুষহীন। আর কেউ না জানুক মন্দাকিনী তা জানে। তবুও মন্দাকিনী মুখ খোলেনি। এখন সে বিধবা। স্বামীর ঘরে তার আশ্রয় নেই। মায়ের কাছেও নেই। মাও ধুঁকে-ধুঁকে মরছে। গরিব, এক বেলাও প্রায় অন্ন জোটে না।

সে আশ্রমে তো আছে।

আশ্রমের সেবিকা হওয়া ছাড়া উপায়ও তার নেই। তোকে বলেছিলাম মনে আছে? সেই পূর্ণিমার রাতের ঘটনার কথা। সেই রাত থেকে গুরুজিও বদলে গেছে। সেও পুরুষত্বহীন। সেটা মন্দাকিনী বুঝতে পারাতে গুরুজির বুঝি টনক নড়ে গেছে। গুরুজি এখন তাকে অন্য কোনো আশ্রমে পাঠাতে চায়। কারণ মন্দাকিনী শুধু খেলনা হওয়ার মতো নারী নয়। মন্দাকিনীকে দূরে পাঠাতে না পারলে গুরুজিরও মুক্তি নেই। গুরুজি তাকে বশে রাখতে পারছে না। মন্দাকিনী বিধবা হওয়ার আগে পর্যন্ত সন্তান চেয়েছে তার কাছে। তাহলে সেই সন্তান তার স্বামীর বলে চালিয়ে দিতে পারত।

আর এখন?

এখন আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। সন্তানহীন নারীর ভালোবাসা যে এত বিচিত্র তা কে জানত! কত তার মায়া, কত মমতা আর অপার সহিষ্ণুতা! করুণাময়ী সে। সে মা হতে চায়, সে ক্ষমতা তার আছে বলে তার বিশ্বাস, অথচ সে অধিকার তার নেই। বিধবা বলে আরো নেই। এখন তুই একটা পরামর্শ দে ভাই।



চতুর্বিংশ অধ্যায়

ছোট মামা ও পিসি রাজি হলো না রোহণের বিয়েতে। পাত্রী অসুস্থ বলে তাদের আপত্তি। গ্রামের আত্মীয়-স্বজনেরাও। রোহণের পারিবারিক সম্পত্তি ও চাষে আয়-রোজগার ভালো বলেই যেন তাদের বিরোধ, মনোভাব। চন্দ্রবউদির সঙ্গে রোহণের সম্পর্ক নিয়ে ওরা নানা কথা বলে। ওরা চায় চন্দ্রবউদি বাপের বাড়িতে চলে যাক। যে নারীর বিয়ের অল্পদিনের মধ্যে স্বামী মারা যায় সে নারী অলুক্ষুণে। আলেয়ার মা-বাবা প্রথম-প্রথম কিছু বলেনি। ওদের আশা রোহণ আলেয়াকে বিয়ে করবে। রোহণের দাদারও সে ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আলেয়া এখন আর রাজি নয়। তবুও মা-বাবার মনে আশা যতদিন ছিল আলেয়া ততদিন কিছু বলেনি। রোহণের পারিবারিক সম্পত্তি অবহেলা করার মতো নয় – হয়তো সেজন্যই।

চন্দ্রমল্লির মা চায় অন্য কিছু। চন্দ্রমল্লি কী চায় তা খুব স্পষ্ট বুঝতে পারে না রোহণ, আবার বুঝতে পেরেও প্রকাশ করে না। আলেয়া সম্ভবত চায় চন্দ্রমল্লি বাপের বাড়িতে চলে যাক। মীনাক্ষী চায় রোহণ তাকে খুব-খুব ভালোবাসুক। রোহণের আত্মীয়-স্বজন চায় সে ওদের কথা শুনুক। ছোট মামাও বোধহয় চন্দ্রমল্লিকে খুব পছন্দ করে না। সেতু চায় রোহণ ওকে কিছুদিন আর্থিক সহায়তা করুক। সে তার বিপন্ন ছাত্রীকে বিয়ে করে ঘরছাড়া এবং প্রায় কপর্দকহীন।

রোহণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চন্দ্রমল্লি হয়তো নিরুপায় অভিমানে বিয়েতে মত দিয়েছে। বিয়ের পরও মীনাক্ষীকে হয়তো শহরে রাখতে হবে চিকিৎসার সুবিধার জন্য। গ্রামের লোকের কথায় রোহণ পিছপা হওয়ার পাত্র নয়। ওদের কথায় চন্দ্রবউদিকেও বাপের বাড়িতে তাড়িয়ে দেওয়ার মানুষ সে নয়। ছোট মামার যুক্তি অন্য রকম – পড়াশুনো শেষ করার আগে বিয়ে করা উচিত নয়, তারপর চাকরি এবং বিয়ে। বড় মামা কলকাতাবাসী, যোগাযোগও খুব কম।

মীনাক্ষীর করুণ মায়াবী চোখ রোহণকে দিশেহারা করে দেয়, বুক ভেঙে যেতে চায়। একলা অন্ধকারে কাঁদে। মীনাক্ষী যদি না বাঁচে? যতদিন বাঁচে ততদিন অন্তত সুখ যদি পায় তার কাছে! চন্দ্রমল্লিকে এই কথাটিই সে বোঝাতে চেয়েছে এবং তার প্রিয় চন্দ্রবউদি এখানেই রোহণের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বামীও তাকে বেঁচে থাকতে বলে গেছে, ভাইটির স্বাধীনতার মূল্য দিতে চেষ্টা করতে, যাতে সে তার নিজের জীবন দিয়ে জীবনকে বুঝতে পারে।

মীনাক্ষীর মৃত্যুর কথা মনে আসার সঙ্গে-সঙ্গে রোহণ অধৈর্য হয়ে পড়ে। বুকের ভেতর দুরুদুরু বাজে, হৃৎপিন্ডে যেন ভাংচুর হতে থাকে। অনির্বাণের জন্য অন্য একরকম অনুভূতি, চন্দ্রবউদির জন্য আরেক রকম। জীবন এতো মায়ায় ভরা কেন! আবার মীনাক্ষী যদি বিয়ের পর ওদের আপন করে নিতে না পারে? সংসারে এরকম কত ঘটে। মীনাক্ষী যদি আলেয়ার মতো বলে বসে, তোমার চন্দ্রবউদিকেই বিয়ে করা উচিত ছিল, কেন করলে না, কেন এর মধ্যে আমাকে জড়ালে? অথবা কটাক্ষ করে যদি শুধু বলে, অনির্বাণ দেখতে একদম তোমার মতো!

আবার রোহণ ভাবে, মীনাক্ষী কি সত্যিই ওসব অভিযোগ নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবে? তাহলে তো মীনাক্ষীর ভালোবাসাও একদিন ফুরিয়ে যাবে, তারপর খিটিমিটি, অভিযোগ ও পালটা-অভিযোগ? সন্দেহ? নারীর সন্দেহ যখন স্বামীর সঙ্গে অন্য একজন মেয়েকে জড়িয়ে হয় তার থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। মীনাক্ষী যদি একদিন সন্দেহের অতল খাদে পড়ে? তবুও রোহণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মীনাক্ষীর মা অপেক্ষা করে আছে, বাবা আশা করে বসে আছে। এণাক্ষীও চায়। বিদ্যুৎ তার ফুটবলের ভক্ত। জগৎসংসার যেন শুধু তার দিকেই চেয়ে আছে।

মীনাক্ষী মাঝে-মাঝে ফ্যাকাশে এবং একেক সময় নিষ্প্রভ মলিন হয়ে যায়। তখন আর চেহারার ওপর মীনাক্ষীর কর্তৃত্ব থাকে না, তখন তাকে একরকম ঘোরগ্রস্ত বিমূঢ় দেখায়, ম্লান লাগে।    সে-রকম সময়ে সে একদিন রোহণকে বলে, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। তুমি আমাকে বিয়ে করো না।

শারীরিক দুর্বলতা মীনাক্ষীকে মানসিকভাবে দুর্বলতার খাদপ্রান্তে নিয়ে যায়। তখন আশ্চর্যজনকভাবে দু জনে দু জনের কাছাকাছি চলে যায়। তখন রোহণ বুঝতে পারে মীনাক্ষী ওর সহানুভূতি চাইছে। এরকম এক বিপন্ন সময়ে রোহণ তাকে কথা দেয়, বলে, বিয়ে করবে।

সেই কথা রোহণকে রাখতে হবে। ভবিষ্যতের স্বপ্নে যে-নারী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে তখন তাকে উদ্ধার করা দরকার হয়ে পড়ে। সেই মুহূর্তে পুরুষের ভূমিকা পৌরুষেয় হওয়া উচিত মনে করে রোহণ ওকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে জীবনের প্রতি। তখন চন্দ্রমল্লি জ্বলজ্বল করে সমস্ত কৈশোর-যৌবন কাঁপিয়ে।



পঞ্চবিংশ অধ্যায়

আষাঢ়ী পূর্ণিমার চারদিন আগে ওদের বিয়ে হয়ে গেল। আষাঢ়ের মেঘহীন চকচকে নক্ষত্রের রাত। স্বচ্ছ ও দীপ্ত। আকাশ, নক্ষত্র ও চাঁদ এক তারে বাঁধা। বৃষ্টি নেই, চারদিক শান্ত। ধানের জমি এক বার চাষ দিয়ে ফেলে রেখেছে। বীজতলায় ধানের চারা বাড়ছে, এক বিঘৎ উঁচু হয়ে সবুজ বিচ্ছুরিত করছে হাওয়ার ঢেউয়ে। উঁচু জমিতে শ্রাবণ মাসের প্রথমে চারা রোয়া হয়ে যাবে। আকাশ একেবারে নেমে এসেছে। মাঝ-আকাশে হারকিউলিস ও বুটিস মন্ডলের মাঝামাঝি অর্ধবৃত্তাকারে সাতটি তারা। সাজানো যেন হাতে ধরে বসানো। সাজানোটা এত সুন্দর যে খুব সহজে চোখে পড়ে এবং একটি রত্নখচিত মুকুটের কথা মনে করিয়ে দেয়। আকাশের মাঝামাঝি থেকে একটু উত্তর দিকে বলে এর নামকরণ হয়েছে উত্তর কিরীট মন্ডল বা করোনা বোরিয়ালিস। এর মাঝখানের তারাটি অন্য তারাদের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল। এর বাংলা নাম কোহিনূর, পাশ্চাত্য নাম জেম্মা। এটি বিষমতারা। সিংহ রাশির মাথা একেবারে পশ্চিম সাগরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তার বুকের তারা বিখ্যাত মঘা বা রেগুলাস পশ্চিম দিগন্তে জ্বলজ্বল করছে, চিনতে কোনো কষ্ট হবে না। তার ওপরে সূর্যপথে কন্যা রাশির চিত্রা, তার ওপরে মাঝ-আকাশে তুলা রাশির উজ্জ্বল তারা বিশাখা ও সৌম্যকীলক, তার ওপরে সূর্যপথে বৃশ্চিক রাশির জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র, তার পুবে দিগন্তের ওপরে ধনু রাশির পূর্বাষাঢ়া ও উত্তরাষাঢ়া নামক বিখ্যাত তারা, এর নাম থেকেই বোঝা যায় আষাঢ় মাসের প্রথম তারিখে এরা ওঠে। সেই আষাঢ় চলছে, বহু পুণ্যের ফলে আজ বৃষ্টি নেই, আষাঢ় মাসে এরকম দিন পাওয়া যায় না সহজে। সপ্তর্ষি ঘুরে পশ্চিম দিকে চলে গেছে এবং ধ্রুবতারার সঙ্গে লঘু সপ্তর্ষি দক্ষিণ দিকে খাড়া হয়ে আছে। তাকে ঘিরে আছে ড্রাগন মন্ডল। এই মন্ডলের প্রথম তারা আলফা ড্রাকোনিস একটি বিখ্যাত তারা। এর পাশ্চাত্য নাম থুবান, আরবি ছোব’আন শব্দ থেকে নেওয়া। হিন্দু জ্যোতিষে একে বলে কংস। মিসরীয় সভ্যতার যুগে অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে এই তারাটি ধ্রুবতারা রূপে আকাশে বিরাজ করত। আকাশের উত্তর বা দক্ষিণ মেরু স্থির নয়। যেমন ১০,০০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শ্রেণীর তারা দেনেব (বক মন্ডলের পুচ্ছ নামক তারা) এবং ১৪০০০ খ্রিষ্টাব্দে অভিজিৎ (বীণা মন্ডলের ভেগা, যেটি আকাশের চতুর্থ উজ্জ্বল) ধ্রুবতারায় পরিণত হবে। বক ও বীণা মন্ডলের তারাগুলো উত্তর-পুব আকাশের দিগন্ত ফুঁড়ে উঠেছে। একেবারে পুব দিগন্তে শ্রাবণের প্রথম তারিখে সন্ধ্যায় উঠবে ঈগল মন্ডলের বিখ্যাত তারা শ্রবণা। এটি আকাশের একাদশ উজ্জ্বল তারা। রোহণ ভাবে।

স্বচ্ছ আকাশ, ঝলমলে, জীবন্ত। আকাশ, তারা, চাঁদ, উল্কাপাত একই সূত্রে বাঁধা জীবন। জ্যোৎস্নায় গাছের ছায়া, পুকুর পাড়ের বাঁশবাগানের ছায়া জলে পড়ে জলরং ছবির মতো ফুটে আছে। টুব করে একটি শুকনো পাতা পড়ে জলরং ছবি মিলিয়ে যায়,  হয়ে যায় দুর্বোধ্য জীবন্ত ছবি, তাও আবার মিশে যায় জলের বুকে, আগের ছবিটি আবার ফিরে আসে। রোহণের কেবলই মনে পড়ছে শৈশবের কথা। এখন সে বাঁশ বাগানের নিচে কল্পনায় এক নারীর কোলে শুয়ে আছে। সেই নারী ওর এবং ওর চুল থেকে ক্লান্তি তাড়িয়ে দীপ্ত করে তুলছে। মনের কালো কালো ছায়ারা আস্তে আস্তে পালিয়ে যাচ্ছে। কালিমারা বেড়া টপকে যাচ্ছে তা দেখছে রোহণ। চোখ বুজে দেখাও তো দেখা, বাস্তবের দেখা থেকেও তা বেশি। শরীরের         এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়া অসংবদ্ধ ক্লান্ত শক্তিরা আবার একত্রিত হচ্ছে। মনের চোখে রোহণ দেখতে পায় আকাশের কিছু কিছু চেনা তারা। বিশাখা, জ্যেষ্ঠা, পূর্বাষাঢ়া ও উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, পূর্ব ভাদ্রপদ ও উত্তর ভাদ্রপদ, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পোষ্যা, মঘা, পূর্ব ফাল্গুনী ও উত্তর ফাল্গুনী এবং চিত্রা চিনে রাখে তারা পরিচিত বই দেখে দেখে। এবং এরকম মুখস্থ করে বলা যায়। মীনাক্ষীকে ফিসফিস করে বলল। ‘আজি যত তারা তব আকাশে’ গানটির পরের পঙ্ক্তি আর কিছুতেই মনে করতে পারছে না মীনাক্ষী। এতে সে আনমনা হয়ে যাচ্ছে বারবার। ‘আন্মনা, আন্মনা’ গানটির পরের পঙ্ক্তিও মনে করতে পারছে না বলে নিজের ওপর মনে-মনে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই বিরক্তি চেপে রেখে বলল, চলো, ঘরে যাই, চাঁদটা খুব বিরক্ত করছে।

ওরা ঘরে ফিরল, কুলায় ফেরা পাখির মতো।

চন্দ্রবউদি অনির্বাণকে নিয়ে সেই যে শুয়ে পড়েছে আর উঠল না। – মীনাক্ষী আলগোছে বলল।

সবার ওপর দিয়ে সারাদিন ধকল গেছে। নদী-কাকি ও শেফালির মা এখনো কাজে ব্যস্ত। – রোহণ বলল কী যেন ভাবতে-ভাবতে।

এমন সময় বারান্দার দিকের দরজা দিয়ে নদী-কাকি ডেকে নিয়ে গেল মীনাক্ষীকে।



এতো ফুল এতো ফুল। একটি ঝাঁকড়া জুইফুলের গাছ। মীনাক্ষী নামক জুইফুলের বৃক্ষ। গলায়, খোঁপায়, কানে, বাহুতে মণিবন্ধে, কোমরে…. যেন ফুলের কল্পবৃক্ষ, একটি স্বপ্ন, মানবী ফুলবৃক্ষ। রোহণ জানতে পারেনি কখন এতো ফুল মীনাক্ষীর বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দিয়েছে, অথবা তার কোনো আত্মীয়, অথবা অথবা অথবা! মীনাক্ষী যখন বারান্দার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল, এতক্ষণ    বারান্দা-ঘরে কী করছে, সেখানে চন্দ্রবউদিও জুটেছে কি না, অথবা অন্য আরেক মীনাক্ষী কিনা ধন্দ লেগে গেল। এরই ফাঁকে বসে-বসে রোহণ ঝিমিয়ে পড়েছিল, তার মধ্যে স্বপ্নের ঘরে ঢুকে পড়েছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন এতো পিচ্ছিল যে ধরতে-ধরতে চলে গিয়েছিল, আবার আরেক টুকরো স্বপ্ন, আবার অন্য এক স্বপ্নচুর – ছোটখাটো এক স্বপ্নমিছিল। সংগতিহীন স্বপ্নের টুকরো কি জোড়া লাগিয়ে মনে রাখা যায়?

শাড়িখানাও নতুন। মাথায় ফুলের মুকুট, যেন ফুলপরী। বাইরের থেকে কে যেন বলল দরজা বন্ধ করতে। কে যেন এক কলি গান গাইল। কোথায় যেন আষাঢ়ের গান বাজছে রেডিও বা কলের গানে। কোথায় যেন বাজ পড়ল, ডেকে চলেছে ব্যাঙ, রয়ে গেল হাওয়ার ঝাপট। মীনাক্ষীর কাছাকাছি গিয়ে রোহণ আর এগোতে পারে না। কোথায় হাত রাখবে ভেবে পায় না।

রোহণ ফিসফিস করে বলল, তুমি কোথায়, ফুলের ঐশ্বর্যে তোমাকে আমি খুঁজেই পাচ্ছি না।

যেন সে স্বপ্নে পড়ল, রোহণ জেগে-জেগে স্বপ্নে দেখছে, মীনাক্ষী যে তার নববধূ সে-কথা সে মালুমহীন ভুলে গেল, জুঁইফুলের স্বপ্নবন্যা তাকে ভুলিয়ে দিলো। রক্তমাংসের জীবন্ত মীনাক্ষী ভাবনা হয়ে সামনে ভাসছে। ওর তখন মনে পড়ে গেল সেসব কথা যা সে কোনোদিন কখনো কাউকে বলেনি, অথবা বলেছে বলে মনে পড়ছে না। অথবা আবেগহীন দয়ালুর মতো বলে থাকলেও তারা রক্তমাংসের শরীর হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। ফুলের অলঙ্কারের আড়ালে মীনাক্ষীকে চিনতেই পারল না। রোহণ তার কলেজের সহপাঠী বান্ধবীদের মধ্যে মুখ খুঁজে খুঁজল, জীবনে যত নারীবন্ধু এসেছিল তাদের মনে করতে চেষ্টা করল, এমনকি চন্দ্রবউদিকেও দাঁড় করাল, না চন্দ্রমল্লি বউদি নয় নয়! তার বদলে ফুলের জড়োয়া ও গল্পের আড়ালে বসে আছে মীনাক্ষী এবং মীনাক্ষী – ভেজা নরম পলকা অধরা। কিন্তু সামনেই তো রয়েছে, অধরা হবে কোন সাহসে! এখনই ছুঁয়ে দিতে পারে রোহণ, চুমোও খেতে পারে। সামনে যে-ই বসে থাকুক ফুলশয্যার রাতে সেই মানবী, দেবী বা অমানবী যে-ই হোক না, সে তার। আর যে-মুহূর্তেই সে ভাবল ‘আমার’ ঠিক তক্ষুনি সে দেখতে পেল ওর চোখদুটি ভেজা, নরম, পলকা ও অধরা। খুব কাছে কিন্তু অনেক যোজন দূরে তেপান্তরের মাঠের ওপারে কোথাও। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে দক্ষিণ দরজায় পরিচিত টোকা পড়ল। রোহণের স্বপ্নও সেই সঙ্গে উধাও। মানুষের স্বপ্ন ছুটে যায় বাস্তবের আর এক স্বপ্নে। বাস্তবতাও কি একরকম স্বপ্ন নয়? কারণ স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর বাস্তবকেই তখন মনে হয় স্বপ্ন, আর স্বপ্নই বরং এতোক্ষণ ছিল বাস্তবতা।

মীনাক্ষী হাসল ভুবনমোহিনী। বিছানায় উঠে বসল সম্পন্ন সৌন্দর্যে আরূঢ় হয়ে। গলার মালাগুলো ঠিকঠাক করল না তো যেন সোহাগ জানাল। ডান হাতের তর্জনী ঠোঁটের ওপর চিত্রার্পিত করে রাখল। রোহণ ইঙ্গিতে ভাবতে চাইল দরজা খুলবে কে? সে সবুর করতে ইঙ্গিত দিলো, আর তাও দুষ্টুমিঠাসা চোখ দিয়ে।

আবার একই রকম পরিচিত সেই বিখ্যাত টোকা – যা রোহণের জীবনে স্বর্ণখচিত হয়ে আছে। মীনাক্ষী এসবের কিছুই জানে না। সে ইশারায় বলল খুলতে।

রোহণ আস্তে-আস্তে দরজার একটা পাল্লা খুলে দাঁড়াল। চন্দ্রমল্লি হেসে জগ আর গেলাস বাড়িয়ে দিলো, সেই ভুবনমোহিনী হাসি যা বহুদিন সে দেখে না। হারিকেনের মণিময় আলো প্রতিফলিত ওর মুখে। তখনই ভারী ও বিষণ্ণতার প্রান্তঘেঁষা হাসি দিয়ে বলল, একটু পরেই তো দরকার হবে। চাওয়ার আগে দিয়ে গেলাম, বউদিকে মনে রেখো অন্তত এর জন্য হলেও। স্মৃতি ঝাঁপিয়ে পড়ল রোহণের বুকে।

দিদি, এসো। – মীনাক্ষী বিহবলতা না রেখে ডাকল।

না ভাই, অন্যসময় ডাকলে আসব। এখন এক জনকে নিয়ে একা থাকার সমৃদ্ধ সময়।

দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গে বউদির গায়ের মাদকতাসম্পন্ন তীব্র সুগন্ধ সে পেল। পরিচিত অপরাজেয় সুরভি। অনেকদিন পর আলমারি খুলে বের করেছে হয়তো বিশেষ প্রয়োজনে। কোন বিশেষ প্রয়োজনে তা ভাবল। অতল জলের তল খুঁজে পেল না। চন্দ্রবউদি আর কিছু না বলে চলে গেল। ওই না বলাটাই বুঝি বলা!

মীনাক্ষী বলল, আগে মনে করোনি কেন? আমাকে লজ্জার অবশেষটুকু দিয়ে গেল।

তুমি জানবে কী করে যে আমি রাতে জল খাই?

দরজা বেঁধে কাছে যেতেই সে রোহণকে আগলে ধরে কানে আলতো করে কামড়ে দিলো। সঙ্গে-সঙ্গে সে ঝমঝম করে জেগে উঠল। মীনাক্ষীও হাসতে-হাসতে গভীর নদীর মতো আগলে নিল। দূরে কোথাও বাজ পড়ল ‘ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্ততি’র মতো। রোহণ আর সুযোগ পেল না জানালা খুলে বৃষ্টি দেখার। আষাঢ়ী পূর্ণিমার প্রস্ত্ততি পর্বের চাঁদ কোথাও ভেসে গেল নাকি দেখা হলো না। সেই সঙ্গে ভিটের ভাউয়া (সোনা) ব্যাঙ ডেকে উঠল উন্মত্ত আবেগে – ওরা ওরকমই। হিংস্র মুখে কড়-কড়-কড়াৎ শব্দ তুলে কোথায় বাজ পড়ল কে জানে! ফুলে-ফুলে ফুলে উঠল মীনাক্ষী, রোহণ ফুলের ঐশ্বর্যে তাকে খুঁজে পায় না, মীনাক্ষী হারিয়ে গেছে ফুলের অলঙ্কারের বৈভবে, ষড়ৈশ্বর্যেও খুঁজে পায় না। ফুলের ঢেউয়ে ফুল্ল শরীর আবৃত, গন্ধে শরীরের সুবাস পরাজিত। মনে-মনে সে চিৎকার করে খুঁজছে মীনাক্ষীকে, হাত ও শরীরের বিভঙ্গে খুঁজছে অন্য একটি দেহবিভঙ্গ, চোখ দিয়ে চোখের ভ্রূভঙ্গি, ওষ্ঠ দিয়ে ওষ্ঠের বিভঙ্গ, কোল দিয়ে কোল, ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসাকে, কোমলতা দিয়ে কোমলতা অথবা কাঠিন্য দিয়ে কোমলতার অন্দরমহল মন্দিরগৃহ উৎসর্জন, উৎসব-সংকেত। বারবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে রোহণ ফুলের বর্মে বাধা পেয়ে। একসময় দলিত-মথিত ফুলের ওপর ওরা নিজেদের আবিষ্কার করল বাতি নেভানোর আগে, তখনো প্রমত্ত বৃষ্টি হচ্ছে অন্ধকারে, দেহের সীমা পার হয়ে গেল অন্ধকারের আলোয়, বোধের সীমানা ছড়িয়ে অবোধ সীমা অতিক্রম করে। মীনাক্ষী পরেছিল রাজশাহীর সিল্কের সোনালি শাড়ি, রোহণের জন্য এসেছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে সিল্কের পাজামা-পাঞ্জাবি।

আবার আরেক স্বপ্নে পড়ল সে। সে ছোট হয়ে গেছে, ওই সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রের হারানো বয়সে পৌঁছে গেল। চন্দ্রমল্লি তাকে ঘুম পাড়াচ্ছে পাশে শুয়ে, জুইফুলের গন্ধ বউদির শরীরে, নিবিড় কোমলতা হাতে, বাইরে সঘন বর্ষণ। হঠাৎ গগনবিদারী বজ্রপাতে মাটির ঘরেও আলো ঢুকে পড়ল ঘুলঘুলি দিয়ে। তখন সে চকিতে দেখে চন্দ্রবউদি নয় মীনাক্ষীকে সে আলিঙ্গনে আকুল করে তুলছে বৃষ্টির উন্মত্ততায়। এখন সে আর ছোট বালক-কিশোর নেই, চকিতে মনে পড়ছে চন্দ্রবউদির একটি প্রিয় গান,



দুলিল চঞ্চল বক্ষোহিন্দোল   মিলন স্বপ্নে সে কোন অতিথি রে।

সঘন বর্ষণ শব্দ মুখরিত      বজ্রসচকিত এস্ত শর্বরী,

মাধবীবল্লরী কাঁপায়         পল্লব করুণ কল্লোলে –

কানন শঙ্কিত          ঝিল্লিঝঙ্কৃত।





ষড়বিংশ অধ্যায়

এসে গেল আষাঢ়ী পূর্ণিমা। আকাশে মেঘের বিরাম নেই, মেঘের বাড়িতে চলছে চাঁদের লুকোচুরি, সঙ্গে আছে তারারা। আষাঢ়ী পূর্ণিমা স্বপ্নের কাহিনীর রাত্রি। আড়াই বছর আগে। এই রাতে কপিলাবস্ত্ত নগরীর রাজপুরীতে সোনার পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছেন রানী মায়াদেবী। স্বপ্ন দেখছেন, সে এক দিব্যস্বপ্ন। –

স্বর্গ থেকে চার জন দেবতা এসে মায়াদেবীর রত্নপালঙ্ক তুলে নিয়ে চললেন হিমালয়ের দিকে। আকাশজুড়ে আশ্চর্য এক আলো, তার মাঝে পুবদিকে সিঁদুরের টিপের মতো সূর্য। তার সব আলো যেন ঝাঁপিয়ে পড়েছে মায়াদেবীর রত্নপালঙ্কে। এক মনোহর স্থানে দেবতারা রাখলেন সেই পালঙ্ক। অপ্সরীরা এসে রানী মায়াদেবীকে মানস সরোবরের স্নিগ্ধ জলে স্নান করাচ্ছেন। বাজল মধুর বাদ্য। নৃত্য, গীত শুরু হলো। সেখান থেকে অনতিদূরে রুপোলি পর্বতের সোনার প্রাসাদে দেবতারা রানিকে নিয়ে গেলেন। পুব-শিয়র করে রাখলেন পালঙ্ক। এমন সময় এলো এক শ্বেতহস্তী – কপালে তার সিঁদুরের টিপ, তৃতীয়ার চাঁদের মতো বাঁকা বাঁকা কচি দুটি দাঁত, যেন হিমালয়ের ওপার থেকে মেঘের ওপর দিয়ে ভেসে এসে দাঁড়াল তাঁর পাশে। শুঁড়ে শ্বেতপদ্ম উঁচু করে ধরা, তারপর আস্তে-আস্তে পদ্মটি রানির কোলে এনে রাখল পরম যত্নে ও অপার আনন্দে। তারপর কয়েকবার আনন্দধ্বনি করে শ্বেতহস্তী কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেল মায়াদেবী দেখতেই পেলেন না। মায়াদেবীর দেহ-মনে সঙ্গে-সঙ্গে অপার এক আনন্দ-শিহরণ খেলে গেল। আহা, কী সুন্দর, তার  কান্তি, কী সুন্দর সেই টিপ আর কী মধুর সেই পদ্মের সুরভি! কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে গেল আর দেখাই গেল না।

স্বপ্ন ভেঙে গেল। ভোরের আলো তখন রানির রত্নপালঙ্কে লুটোপুটি খেলছে। উঠে বসলেন তিনি, খুলে বললেন রাজা শুদ্ধোদনকে স্বপ্নবৃত্তান্ত। রাজা সঙ্গে-সঙ্গে রাজজ্যোতিষী ডেকে স্বপ্নের অর্থ জানতে চাইলেন। জ্যোতিষীরা বললেন, মহারানি পুত্রবতী হতে চলেছেন। আপনার পুত্র কালে যশস্বী মহাপুরুষ হবেন। সূর্যস্বপ্নে মহাতেজস্বী রাজপুত্র, শ্বেতহস্তী স্বপ্নে শান্ত গম্ভীর জগৎ-দুর্লভ এবং জীবের দুঃখহারী মহাধার্মিক ও মহাজ্ঞানী পুত্র লাভ হবে। হে রাজন, আনন্দ করুন, আনন্দ করুন।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা তাই মায়াদেবীর স্বপ্নের রাতে। শুভ বৈশাখী পূর্ণিমায় মায়াদেবী পুত্রবতী হলেন সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্ম দিয়ে।

আর এক আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে সিদ্ধার্থের ঊনত্রিশ বছর বয়সে তাঁর নবজাত শিশুকে পাশে নিয়ে গোপাদেবী ঘুমোচ্ছেন। হয়তো স্বপ্ন দেখছেন, শিশুকে নিয়ে, মায়েরা যেমন সন্তান নিয়ে দেখেন। আর সেদিন সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেছেন সত্যের সন্ধানে, পরম জ্ঞানের অন্বেষণে। আর সিদ্ধার্থের ছেলে রাহুলের জন্ম হওয়াতে রাজা শুদ্ধোদন আনন্দিত, রাজ্যজুড়ে চলছে আনন্দ-উৎসব। আষাঢ়ী পূর্ণিমা স্বপ্নের, স্বপ্ন দেখার রাত। ফাঁকে কোথায় পূর্বাষাঢ়া আর কোথায় বা উত্তরাষাঢ়া। সোনা ব্যাঙ ডাকছে, তাহলে বৃষ্টি নামতে আর দেরি নেই। এখন তাদের মিলন ঋতু। চট্টগ্রাম শহরে যারা আছে তারা কেউ-কেউ ছুটি নিয়ে গ্রামে চলে এসেছে। খুব শৌখিন তরুণেরা দু মাইল দূরে ধোপাবাড়িতে গিয়ে কাপড় ইস্তিরি করে এনেছে, কেউবা ধোলাই করে এনেছে। গ্রামের এই পূর্ণিমাগুলোই তো মিলনমেলা। ঈশান কোণে বিজলি চমক দিচ্ছে, বহু দূরে কোথায় যেন মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। কত দূরে কে  জানে! সে যেন আজ রোহণদের গ্রামে রবাহুত হয়ে উৎসবে না আসে। অন্যদিন অন্য রকম, আজ যে আষাঢ়ী পূর্ণিমা, স্বপ্ন দেখার রাত। গভীর রাতে না হয় এসো, তখন রোহণ ও মীনাক্ষী ঘরে ফিরে যাবে। পাপিয়া যত ডাকুক, কোকিল পিক্ পিক্ শব্দে যত উতলা সুর তুলুক, সবার জন্য সে সুর নয়। চন্দ্রমল্লির জন্য নয়। সবই মীনাক্ষীর জন্য।

বুদ্ধবেদির সামনে বাতি জ্বালানোর তাকের ওপর হাত বাড়িয়ে দেয় সবাই। একে একে। মোমবাতি জ্বালছে। প্রার্থনায় বসেছে অনেকে। একটার গায়ের ওপর আরেকটা মোমবাতি গরমে ঢলে পড়ে দাউদাউ জ্বলছে। একেবারে শেষের দিকে গিয়ে মোমবাতিগুলো বেশি মাত্রায় জ্বলে। সেগুলো নিবিয়ে দিতে হয়। কেউ-কেউ উদ্যোগী হয়ে সেগুলো নিবিয়ে দেয়। গরম হয়ে গেছে হলঘর, মোমবাতির আগুনের তাপে। মীনাক্ষী বাতি জ্বালতে এগিয়ে গেছে বেদির দিকে। পাশাপাশি দুটি মোমবাতি জ্বালল, যুগলবন্দি করে। ওর পাশে রোহণ এক জোড়া জ্বেলে দিচ্ছে। মীনাক্ষী হঠাৎ পেটে জোর ব্যথা অনুভব করল। রোহণকে কিছু না বলে সে তাড়াতাড়ি প্রার্থনা করতে বসে পড়ল। যথাসম্ভব চেষ্টা করল ব্যথা সহ্য করতে, ভুলে যেতে। দু হাত জোড় করে পা মুড়ে বসে ‘মহামঙ্গল সূত্র’ আবৃত্তি করতে শুরু করল। সে ভাবল, সূত্র আবৃত্তি করতে-করতে মন একাগ্র হলে ব্যথাটা সে ভুলে থাকতে পারবে, অথবা ততোক্ষণে হয়তো ব্যথা চলেও যেতে পারে। মৈত্রী ভাবনা শুরু করল –

‘আমি শত্রুহীন হই, বিপদহীন ও রোগহীন হই এবং সুখে বাস করি। আমার মতো আমার আচার্য-উপাধ্যায়গণ, মাতাপিতা, হিতৈষী ও মধ্যস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং আমার অকল্যাণকামী ব্যক্তিগণ শত্রুহীন হোক, বিপদহীন ও রোগহীন হোক, সুখে বাস করুক, দুঃখ হতে মুক্ত হোক এবং লব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক। কর্মই সকলের স্বকীয়।

‘এই বিহারে, এই গ্রামের উপকণ্ঠে, এই নগরে, এই জনপদে, এই বঙ্গদেশে, এই জম্বুদ্বীপে কিংবা এই চক্রবালে যে সমস্ত প্রভুত্বশালী ব্যক্তি এবং সীমান্তরক্ষাকারী দেবগণ আছেন সমস্ত প্রাণী শত্রুহীন হোক, বিপদহীন হোক, রোগহীন হোক, সুখে অবস্থান করুক, দুঃখ হতে মুক্ত হোক এবং লব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক। কর্মই সকলের স্বকীয়।

‘পূর্ব দিকে, দক্ষিণ-পশ্চিম-উত্তর দিকে, পূর্বকোণে, দক্ষিণকোণে, পশ্চিমকোণে, উত্তরকোণে, নিম্নদিকে, ঊর্ধ্বদিকে সকল স্বত্ব, সকল প্রাণী, সকল জীব, সকল ব্যক্তি, সকল দেহধারী, সকল স্ত্রী, সকল পুরুষ, সকল আর্য, সকল অনার্য, সকল দেবতা, সকল মানুষ, সকল অমানুষ ও সকল নিম্ন শ্রেণীর সত্তাগণ শত্রুহীন হোক, বিপদহীন ও রোগহীন হোক এবং সুখে বাস করুক। সকলে দুঃখ থেকে মুক্ত হোক এবং লব্ধ সম্পত্তি হতে বঞ্চিত না হোক। কর্মই সকলের স্বকীয়।’…

মৈত্রী ভাবনা শেষ করতে পারল না। ব্যথাটা কমছে না তাই মাঝখানে শেষ করল মৈত্রী ভাবনা। সে তাকাল রোহণের দিকে, যেন করুণা ভিক্ষা করল। আশেপাশে ও পেছনে বসে অনেকে প্রার্থনা করছে। একজন শ্রামণ শেষ হয়ে আসা ও দাউদাউ করে জ্বলা মোমবাতিগুলো নিবিয়ে তুলে নিচ্ছে একটা পাত্রে। এই মোমগুলো আশ্বিনী পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানোর কাজে লাগবে। ফানুসের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

উঠোনে ছোট ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করছে। যারা মা-বাবার পাশে বসে প্রার্থনা মকশো করছে তারা আর পারল না মহড়া দিতে। উঠে চলে গেল উঠোনে, সেখানে ওদের আনন্দ লুটোপুটি খাচ্ছে। চাঁদের আলো বাচ্চাদের মতো ক্ষণে-ক্ষণে মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে আবার তেমনি বেরিয়ে পড়ছে ছেলেখেলার মতো। ওদিকে শতাব্দীর প্রাচীন বোধিবৃক্ষের তলায় বুদ্ধ-কীর্তন গাইছে জিনভদ্র কীর্তনীয়ার দল। সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনের একটি ঘটনার বর্ণনা,

কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণ। সিদ্ধার্থ একদিন বন্ধুদের সঙ্গে বনে-বনে ঘুরতে-ঘুরতে দেখেন ফুলের মালার মতো এক দল হিমালয়বাসী হংস বলাকা সারি বেঁধে উড়ে চলেছে, ডানার শব্দে নিচে বন মুখরিত, বাতাস আলোড়িত। শীতের আগমনের আগে তারা উড়ে যাচ্ছে হিমালয় ছেড়ে দক্ষিণ দেশের উষ্ণ অঞ্চলে। চলো চলো, আকাশ পাড়ি দিয়ে চলো গরমের দেশে শীতটা কাটিয়ে আসি। গৌতম অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন মুক্তপক্ষ বিহঙ্গদের চলার দিকে, মন আনন্দে ভরে ওঠে, সুদূরের পিয়াসায় আকুল হয়ে ওঠে, চঞ্চল হয়ে ওঠে আবেগ। এই আনন্দের মাঝে হঠাৎ নেমে আসে বিপদের কালো ছায়া, একটি হাঁস তীরবিদ্ধ হয়ে যন্ত্রণায় কাঁদতে-কাঁদতে নিচে পড়ে গেল, পড়ল গৌতমের কাছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বুক, কেঁপে-কেঁপে কাঁদছে পাখি আর চোখে ফুটে উঠেছে করুণ মিনতি। দেখতে-দেখতে আকাশ শূন্য হয়ে গেল, বন নীরব, আনন্দ উধাও। গৌতমের প্রাণ কেঁদে উঠল, বুক ফেটে যায় বুঝি। গৌতম তাড়াতাড়ি মমতা দিয়ে, শুশ্রূষা দিয়ে তুলে নিলেন পাখির গায়ের তীর। আস্তে-আস্তে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল পাখি, গৌতমের চোখের কোণের বিষাদ মিলিয়ে যেতে লাগল। কৃতজ্ঞতায় বুঝি ভরে উঠল পাখির দু চোখ। অমনি এসে উপস্থিত হলো মামাতো ভাই দেবদত্ত। চিৎকার করে দেবদত্ত বলল, আমার শরে আহত পাখি, আমাকে দাও।

গৌতম ক্ষণকাল চুপ করে রইলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, এই আহত পাখিকে শুশ্রূষা দিয়ে ভালো করেছি আমি, এ পাখি আমার।

দেবদত্ত বলল, একে আমি তীরবিদ্ধ করেছি, কাজেই এর ওপর অধিকার আমার। ক্ষত্রিয় ধর্মে আমি একে জয় করেছি।

সিদ্ধার্থ বললেন, প্রাণঘাতীর চেয়ে প্রাণদানকারীর দাবি বেশি। এ পাখি আমার।

সঙ্গী-সাথিরা শুনল দু জনের কথা। কারোও যুক্তি অবহেলার নয়। কেউ কারো দাবি ছাড়তে চায় না। শেষে সিদ্ধার্থ বললেন, ভাই দেবদত্ত, এ পাখি আমার। শাক্যরাজ্যের বিনিময়েও এই হাঁস আমি কাউকে দেব না। আকাশের স্বাধীন পাখি আমি আকাশে ওড়াব।

এই বলে জিনভদ্র খোলবাদককে ইঙ্গিত করে গান ধরলেন,

‘শাক্যরাজ্য বিনিময়ে হংস নাহি দিব,

আকাশের পাখি আমি আকাশে ওড়াব।’

বিচার বসল রাজদরবারে। যুক্তি, বুদ্ধি, তর্ক চলল। গৌতমের এক কথা – প্রাণহরণকারীর চেয়ে প্রাণদানকারীই বড়, মানুষ প্রাণহরণ করতে পারে কিন্তু প্রাণদান করতে পারে না। আমি শুশ্রূষা দিয়ে আহত পাখিকে প্রাণে বাঁচিয়েছি। এই পাখির তোমার-আমার মতো প্রাণ আছে। তোমার ধমনীতে যেমন রক্ত আছে ওর শরীরেও তেমনি লাল রক্ত আছে। আঘাতে তোমার-আমার যেমন যন্ত্রণা হয়, ওর প্রাণেও তেমনি বাজে। ওর মুখে আমাদের মতো ভাষা নেই, মুখ ফুটে মানুষের মতো বলতে পারে না, তবুও তুমি তাকে তীরবিদ্ধ করলে।

দেবদত্ত বলল, তোমার এতো কথার প্রয়োজন দেখি না। এ হাঁস আমি শরবিদ্ধ করেছি। আমার হাঁস আমাকে দাও।

অবশেষে বিচারে প্রাণদানকারীর হলো জয়, গৌতম পাখিটি নিয়ে ছুটে গেলেন বনে, দু হাতে আদর করে আকাশের পাখি আকাশে উড়িয়ে দিলেন। আর        যেতে-যেতে পাখি কেন ফিরে-ফিরে তাকায়?

এই বলে জিনভদ্র সুরে-সুরে গাইলেন,

ওড়া পাখি উড়ে যায়,

পাখি কেন ফিরে চায়,

ছলছল চোখে বিদায় জানায়।

রোহণ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মাইকে শুনল কীর্তনীয়ার কথাগুলো। মীনাক্ষী আস্তে-আস্তে উঠল প্রার্থনা থেকে, যেন এরই মধ্যে আর এক জন্ম পেরিয়ে এলো, জন্মান্তর ঘটে গেল। সেও শুনেছে কীর্তনীয়ার কথাগুলো। এতে একটু ভরসা খুঁজে পেল। প্রাণহরণের অধিকার কারো নেই জানা হয়ে গেল।

গ্রামের লোকজন রোহণের বিবাহিত জীবনের কুশল কামনা করল। মীনাক্ষীকে দেখল, সম্ভাষণ জানাল। রোহণ মনে-মনে অলিকে খুঁজছে, কোথাও পেল না। তবে কি সে আগে চলে গেছে, নাকি এখনো আসেনি? উত্তরপাড়ার সমীর মাস্টার এগিয়ে এসে কুশল জানাল, সে রোহণের দুই ক্লাস বড়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। কর্ণফুলী কাগজকলের অফিস পিয়ন নবীন দূর থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল রোহণকে। মাধ্যমিক পাশ করে চাকরিতে ঢুকে পড়েছে। রোহণের ফুটবল খেলার সাথি, দু জনেই আক্রমণভাগে খেলত। মীনাক্ষীকে বউদি ডেকে হাত তুলে নমস্কার দিলো। মীনাক্ষী কুঁকড়ে থেকেও প্রতি সম্ভাষণ জানাল। ঘরে আসার আমন্ত্রণ জানাল। বুড়ি মায়ার মা এসে বকবক করে অনেক কথা জানতে চাইল। ওপাশে দুই মহিলা কানাঘুষো করে কথা বলতে-বলতে তাকাচ্ছে মীনাক্ষীকে। লাজুক হেসে চুপিচুপি মীনাক্ষী রোহণকে বলল, গ্রামের সবাই কি তোমার বিয়েতে অখুশি!

বুড়ি সোনার মা তখুনি ছুটে এসে রোহণকে বলে বসল, এই হলো তোমার বউ? একেবারে টিংটিঙে; মা-বাবা কি ওকে      খেতে-দেতে দেয়নি? তুমি বাপু খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করে তোলো, না হয় কপালে দুঃখ আছে। মা হওয়ার আগে মেয়েদের মোটা হতে হয়।

নদী-কাকি কাছেই ছিল। বুড়ির মুখের ওপর বলে দিলো, তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে, তবুও তো কথায় শ্রী হলো না দেখছি। মেয়েরা বিয়ের আগে এরকমই থাকে, তাও জানো না দেখছি। না জেনে থাকলে নিজে কেমন ছিলে মনে করে দেখো না। শুনেছি তোমার তেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছে। তখন কি ধুমসি ছিলে?

বুড়ি অাঁতে ঘা খেয়ে গজগজ করতে-করতে চলে গেল। মীনাক্ষী তখন বলল, চলো, ঘরে যাই। চন্দ্রমল্লি দিদি ঘরে একা, শেফালির মাও এখানে। আমাদের পুকুরপাড় অনেক ভালো। তখনো সে জানাল না নিজের কষ্টের কথা। কীর্তন চলছে। সিদ্ধার্থ তখন আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে গৃহত্যাগ করে অনোমা নদীর তীরে উপনীত। প্রিয় সারথি ছন্দককে এক-এক করে রাজপোশাক খুলে দিচ্ছেন। কীর্তনীয়া গাইছেন সিদ্ধার্থের কথায়,

দিও মুকুট জনকেরে, আভরণটি মায়ের তরে

সোনার চাঁদ রাহুলেরে দিও তরবারি।

গোপাকে দিও এই পাদুকা…

লোকজন কেউ-কেউ ঘরে ফিরছে। নদী-কাকি গেল শেফালির মাকে খুঁজতে। আস্তে-আস্তে বিহারের চত্বর ফেলে রোহণরা পথে নামল। নদীর ধারে এসে ওরা একা হলো। নদীর নীরবতা চাঁদের নিচে ছড়িয়ে আছে। বিল থেকে বর্ষার পানি নামছে। ঝিরিঝিরি শব্দ হচ্ছে ঝরনার মতো। পানি পড়তে-পড়তে বিলের কিছু অংশ ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। উঁচু থেকে নেমে আবার ওদিকের চড়াই বেয়ে উঠে পার হতে হয় যানটা। বছর-বছর পানি নামতে-নামতে এই খাদ হয়ে যান সৃষ্টি হয়েছে। বিলের যেখান থেকে পানি নামছে সেই জায়গাটা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। মীনাক্ষী হাত বাড়িয়ে দিলো ধরার জন্য। হাত ধরতেই রোহণ বুঝতে পারে ওর হাতের তালু উষ্ণ ও আশঙ্কা ওখানে। সে বলল, তোমার গায়ে কি জ্বর? হাতের তালু গরম যে!

জ্বর নয় তো! একটু আগেও হাতটা ঠান্ডা ছিল। – তবুও মীনাক্ষী বলল না ওর কষ্টের কথা। মেয়েরা কখনো-কখনো এভাবে নিজেকে ভীষণভাবে আড়াল করে।

মেঘ ভেসে-ভসে যাচ্ছে, কিন্তু আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় চাঁদই বুঝি ভেসে যাচ্ছে। এরকম এক রাতেই সিদ্ধার্থ ঘর ছেড়ে বের হয়েছিলেন সুখের সন্ধানে। মানুষ সুখের সন্ধান করে ঘরে,   স্ত্রী-পুত্র ও মা-বাবা পরিবৃত সংসারে সে সুখী হতে চায়। অর্থ-সম্পদ ও দাসদাসী ভরা সুখের সংসার ছেড়ে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে পড়লেন কপর্দকহীন হয়ে। পরে সেই বাইরেই পেয়ে গেলেন দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়, কার্যকারণ সূত্র এবং নির্বাণতত্ত্ব।





সেই রাতে মীনাক্ষীর জ্বর এলো। চন্দ্রমল্লি মাথায় জলপট্টি দিতে-দিতে বলল, মাথায় যন্ত্রণা আছে এখনো!

মীনাক্ষী রোহণের দিকে তাকিয়ে বলল, মাথায় নয়, এখানে। বলে সে তলপেট দেখিয়ে দিলো।

অমনি রোহণ শিউরে উঠে মীনাক্ষীর চেয়ে দুরন্ত ও দ্রুত অনেক বেশি ভেবে নিল। ডাক্তারের সব কথা একসঙ্গে মনে পড়ে গেল। ডাক্তারের ভবিষ্যদ্বাণী এতো তাড়াতাড়ি ফলতে যাচ্ছে ভেবে অতলে ডুবে গেল। অতল জলের আয়নায় মৃত্যুর ঘনীভূত অন্ধকার দেখতে পেল। অন্ধকারে আশার কিছুই খুঁজে পেল না।

সেই রাতে পূর্ণিমার মনকাড়া মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরি ভরা আকাশ একই সঙ্গে রোহণকে আনন্দ ও বিষাদের শিখরে নিয়ে গেল, হতাশার অতল গহবরে ঠেলে দিলো। অনুমান ও সন্দেহ ওকে জানিয়ে দিলো, মীনাক্ষীকে হারাতে হবে, হারাতে হবে। মীনাক্ষীর জ্বর এসেছে, মীনাক্ষী সুস্থ হয়ে আসেনি হাসপাতাল থেকে।

স্বপ্নের আষাঢ়ী পূর্ণিমাকে জয় করার জন্য মীনাক্ষীর হাতে হাত রেখে রোহণ বলল, কয়দিন ধরে ধকলটা গেছে তো, তাই বুঝি জ্বর এসেছে। বিয়ের কদিন ধরে তুমি ভালো করে খাও-দাওনি বলো তো?

সে-সময় শেফালির মা দুধ নিয়ে এলো। নদী-কাকি এসে দাঁড়াল অভয়দাত্রীর মতো। মীনাক্ষী পূর্ণিমার উপবাস পালন করতে চেয়েছিল। নদী-কাকি করতে দেয়নি। চন্দ্রমল্লি গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সোহাগ-সান্ত্বনা দিলো। অনির্বাণ পাশে বসল, হইচই করল, কাকি কাকি ডেকে উতলা করে তুলল। সবাই খুশিমনে ঘুমোতে গেল তখন।

মাঝরাতে ঘুম ভাঙতেই রোহণ গায়ে হাত দিয়ে দেখে মীনাক্ষীর জ্বর নেই। অঝোরে ঘুমোচ্ছে সে। আস্তে-আস্তে উঠল রোহণ। পানি খেয়ে নিল। আকাশে চাঁদ আছে কিনা, মেঘেরা কোথায় কেমন আছে দেখছে। তৃষ্ণামাখা ইচ্ছে জাগল। আস্তে-আস্তে দরজা খুলে পুবের বারান্দার দরজাও খুলল। সঙ্গে-সঙ্গে এক ঝাপট ঠান্ডা ওর       গায়ে-মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাতদুপুরে পায়রাগুলো গুটুর-মুটুর করছে কি মধ্যরাত্রি ঘোষণা দিতে! স্বচ্ছ অাঁধার। চাঁদ পুরো ঢেকে আছে বৃষ্টিবাহী সোমত্ত মেঘে। উঠোনের অন্ধকারে গিয়ে সে দাঁড়াল। বৃষ্টির আর দেরি নেই, ঠান্ডা হাওয়া বইছে দক্ষিণ থেকে, তার অর্থ দক্ষিণে বৃষ্টি দিতে দিতে উত্তর দিকে আসছে। মীনাক্ষীর হঠাৎ জ্বর ও হঠাৎ চলে যাওয়াতে সে উদ্বিগ্ন। দাদার রোগ দেখেছে রোহণ। বাবা চলে গেছে আগে। আলী কাকা চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। রাতের অাঁধারে, একা বিনিদ্র রাতে অশুভ ভাবনারা কি সুযোগ বুঝে হামলে পড়ে! মাঝে-মাঝে মৃত্যুদৃশ্য ভেসে ওঠে চোখে। ভয়ের স্বপ্ন দেখে। ঘুম ভেঙে গেলে তা হয়ে ওঠে আরো ভয়াবহ। তখন ঘুমও ভালো করে পালিয়ে যায়। কুকুরটা এসে ঘেউ-ঘেউ জুড়ে দিলো। ওকে ডেকে রোহণ চুপ করাল। এরকম সময়ে কুকুরের উপস্থিতি   কখনো-কখনো ভালো লাগে না। তবুও সে সাময়িকভাবে অশুভ ভাবনাকে তো তাড়িয়ে দিতে পারে। আর সত্যিই ভয় তাকে ছেড়ে চলে গেল। অন্ধকারে কুকুরের দৃষ্টি ও ঘ্রাণশক্তি অনেক বেশি, এমনকি নীরব ও অদৃশ্যপ্রায় শত্রুকেও সে অাঁচ করতে পারে। তখন সে একটানা ডাকে। ও-পাড়ার কুকুরের ডাক থেকেও সে বিপদ অাঁচ করতে পারে। তখন সেও ডেকে-ডেকে উত্তর দেয়, এমনকি অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গেও মোকাবিলার প্রস্ত্ততি নেয়।

উঠোনের একপাশে অনেক বছরের পুরোনো নাগকেশরের মোটা গুঁড়ি পড়ে আছে অনেক বছর ধরে। ওতে গিয়ে বসল সে। বৃষ্টি আসা পর্যন্ত বসা যাবে। কুকুরটা পায়ের কাছে শুয়ে পড়েছে। হঠাৎ কিছু একটা শব্দ পেয়ে ডাক দিয়ে তড়াক করে উঠে তেমনি         ডাকতে-ডাকতে উঠোনের দক্ষিণ মাথায় ছুটে গেল। সেদিকে ঘরের মূল দরজা। অন্ধকারেও সে শত্রুর গতিবিধি টের পায়। অমনি রোহণ ভেবে নিল কে সেই শত্রু? চোর, নাকি শেয়াল? তেমন কিছু হয়তো নয়। তাহলে অদৃশ্য কোনো শক্তি? থেমে গেল কুকুরের ডাক। পায়ের কাছে এসে আবার চলে গেল নিঃশব্দে। আস্তে আস্তে চন্দ্রবউদি আসছে উঠোন পেরিয়ে। আবছা দেখা যাচ্ছে, একবার মনে হলো বুঝি মীনাক্ষী। না, সেই পাগল করা পুরনো সুবাস নিয়ে চন্দ্রবউদি।

তুমি ঘুমোওনি! কী ভাবছ একা বসে? চন্দ্র যেন আকাশের ওপার থেকে নক্ষত্রের মতো বলে দিলো।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কুকুরটা ডাকাডাকি করছিল কেন জানি। তারপর আর কিছুতেই ঘুম আসছিল না।

ঘুম আসে না? কতদিন থেকে এরকম চলছে?

পরীক্ষা থেকেই।

পাশ করার পর কী করবে? আরো পড়বে? বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করবে না? চাকরি নেবে? শহরে বাসা নেবে? চাষবাসের পাট চুকিয়ে দেবে?

– এরকম আরো অনেক প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলল। পারিবারিক থেকে ব্যক্তিগত সব ধরনের প্রশ্ন, উদ্বেগ, আশঙ্কা। গভীর-গভীর।

জবাব দিতে-দিতে রোহণ আস্তে-আস্তে নিঃশেষিত হতে চলল যেন খাড়া এক পাহাড় থেকে গড়াতে গড়াতে নিচে পড়ে যাচ্ছে। এতক্ষণ একা থাকলেও হতাশা কেটে গিয়েছিল। সাময়িকভাবে হলেও ঘুম না হওয়ার ভাবনা থেকে মুক্তি পেয়েছিল, এখন আবার সেই হতাশা ও বিষণ্ণতা চেপে থিতু হয়ে বসল। বড় হয়ে উঠল বাসনা, কামনার কৃষ্ণবিবর ও শ্বেতবামন। আকাশের ও-প্রান্ত।

মীনাক্ষীর জ্বর হওয়ার আগে পর্যন্ত রোহণ নিজেকে মনে করেছিল সুখী ও সমৃদ্ধ। চন্দ্রবউদি যখন প্রশ্ন করতে শুরু করল তখন পর্যন্ত মীনাক্ষীর ব্যাপারে হতাশা কাটিয়ে নিজেকে প্রায় সুখী ভাবছিল। আস্তে-আস্তে সব কেটে গেল। রোহণ নিজেকে অসুখী ভাবতে শুরু করল। তারপর আবার মনে হলো, এভাবে চলতে পারে না। এখন মীনাক্ষী জেগে গেলে সে কী ভাববে? তাহলে মীনাক্ষীকে কি সে সত্যিই ভালোবাসে? একথা কি স্পষ্ট নয় যে,               অলি-আলা-আলেয়া মনের কোণে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে না? আবার চন্দ্রমল্লিও তার জীবনকে প্রবলভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে না? খেলার মাঠ থেকে পড়ার টেবিল সবখানে তাকে সে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। হাতে ধরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তার বদলে মীনাক্ষীকে ভালোবাসা তো একরকম দায় বা আরোপিত মহত্বের প্রতিচ্ছবি, এক নিঃসঙ্গ অসুস্থ সহপাঠীর প্রতি মমত্ববোধ। কর্তব্য যতই প্রশংসনীয় হোক না কেন, যতই মহৎ হোক, ভালোবাসার সঙ্গে তার এমন কী সম্পর্ক? মীনাক্ষীর প্রতি সত্যিই কি প্রেম বা ভালোবাসা আছে? নাকি তার প্রতি ভালোবাসা আসলে অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, সহপাঠীর প্রতি কর্তব্যবোধ, অবোধ্য কৃতজ্ঞতা? বরং মীনাক্ষীর দিক থেকে ভালোবাসা তো খাঁটি, তার অসুস্থতার স্বার্থপরতা যতই থাক না কেন, তার মাধুর্য প্রতিনিয়ত উপচে পড়েছে। কিন্তু মীনাক্ষীর প্রতি রোহণের প্রেম বা ভালোবাসা কি সত্যিই আছে? আর কোনটি সত্য তাইবা রোহণ কি জানে!

তাহলে রোহণ কী করবে এখন? মীনাক্ষীকে সবকিছু জানিয়ে দেওয়া এতোদিন পরেইবা কেন? এখন মীনাক্ষীর প্রতি অবহেলা যেমন উচিত নয়, তেমনি বিপজ্জনক। ছাড়াছাড়ি? আত্মঘাতী হওয়া? সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে যাওয়া? এসব কি সম্ভব? না, জঘন্য। নিজের ভাবনায় সে নিজেই অাঁতকে উঠল। কী সব এলোমেলো ভাবছে সে! পাশে বসা চন্দ্রমল্লি জানতে পেলে কী বলবে!

আকাশের মেঘ আকাশে জমে আছে। জমে আছে নয়, চলছে অথচ শেষ নেই। জোয়ারের ঢেউয়ের মতো অনবরত উঠছে আর ভাঙছে, ভাঙছে আর গড়ছে।… উঠোন, বাড়ি, গাছপালা, পুকুর পাড়ের বাঁশবন একে-একে মনের মাঝে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এখন উচিত তার উঠে পড়া, চন্দ্রমল্লির পাশ থেকে উঠে মীনাক্ষীর কাছে যাওয়া, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে যাওয়া, যতই তার হৃদয় ও বালক বয়স নিজের হাতে দোলা দিক, যতই খেলার সাথি থাকুক না কেন, যতই বুকে ধরে ঘুম পাড়াক, সেই আপন হৃদয় থেকে অন্তত এই মুহূর্তে তার চলে যাওয়া উচিত, মীনাক্ষীর কাছে, সে অসুস্থ, তার বিবাহিত পত্নী…।



সপ্তবিংশ অধ্যায়

শ্রাবণের শেষ ও ভাদ্রের শুরুর বানে উঠতি নতুন রোয়া ধান শেষ করে দিয়ে গেল। সবুজ লকলকে ধানচারা চারদিক মাতিয়ে তুলেছিল। বানের পানিতে সব পচে শেষ। বানে ঘর ডুবে যাওয়াতে সবাই গিয়ে উঠল রোহণের মাসির বাড়িতে, পাশের গ্রামে। উঁচু সেই গ্রাম, ছোট-ছোট টিলার ওপর। সবাই নৌকোয় করে একেবারে শেষ মুহূর্তে গেল। বিল, নদী, পুকুর, উঠোন সব ডুবে গেছে; তবুও বৃষ্টির ক্লান্তি নেই। বানের পানির ওপর বৃষ্টি পড়ছে খই ফোটার মতো। তার শব্দ ও চিত্র অাঁকার শেষ নেই, হাওয়া উঠলে দৃশ্য পালটে যায় মুহূর্তের মধ্যে। এতোক্ষণ যদি মণিপুরী নৃত্য চলছিল ধরা হয়, এবার হবে বৃষ্টির গতিশীল কত্থক নৃত্য। ধুমবৃষ্টি। চরাচর ডুবে যাচ্ছে সেদিকে কোনো দৃষ্টি নেই বৃষ্টির, মায়া-মমতা নেই, ন্যায়-অন্যায় বোধও নেই। মানুষ, জীবজন্তু, পোকামাকড়, রাত্রি কারও প্রতি  দায়-দায়িত্ব নেই তেমন বৃষ্টির হামলা চলছে। নুহের প্লাবনে নৌকোয় ওঠার মতো অনির্বাণ, চন্দ্রমল্লি, মীনাক্ষী, রোহণ, নদী-কাকি ও শেফালির মা সবাই উঠল। কুকুরটা চেঁচামেচি জুড়ে দিলো। রোহণ বলল, ওকে নেব না, এখানে ঘরের চালে ঘুরে-ফিরে থাক।   বেড়াল-দুটো যে কোথায় চলে গেল সেই পানি ওঠার শুরু থেকে! বেড়াল এরকম। ওখানে গেলে পাড়ার কুকুরের সঙ্গে কুকুরটা মারামারি জুড়ে বসবে। গোলার পাশে মাচাটায় অল্প লাকড়ি তুলে রেখেছি। ওখানে থাকতে পারবে।

নয়তো আমাদের সঙ্গে মাচায় থাকবে। – রমেশ কাকা বলল।

গোলার ধান শেষ পর্যন্ত বস্তায় ভরে সরিয়ে নিতে হয় নাকি কে জানে! কুড়ি বছর আগে সবচেয়ে বড় বান হয়েছিল, তখনো গোলার মাচার দু হাত নিচে বানের পানি ছিল। সেবার মাটির ঘর টিকে গেছে। গোলার নিচে অল্প শুকনো লাকড়ি ছিল, সেগুলো পাশের মাচায় তুলে রেখেছে, ওখানে কুকুরটাও থাকবে। বানে লাঞ্ছনার আগামাথা থাকে না। পানি নেমে গেলে আরেক দুর্গতির শুরু হবে। জীবন তবু বসে থাকে না। দু দিন পর বৃষ্টির শক্তিও কমে গেল। আকাশে সাদা মেঘ মন্থর গতিতে ভেসে চলল, নিচে চারদিকে পানি আর পানি থইথই।

মাসির পুকুর পাড় থেকে গুমাই বিল দেখা যায়। বিলের পুবদিকে উত্তর-দক্ষিণ জুড়ে পাহাড়। বিলের দক্ষিণ দিকে    চট্টগ্রাম-কাপ্তাই নতুন সড়ক। রাস্তার দু পাশে বানভাসি-লোকেরা আশ্রয় নিয়েছে। গরু-ছাগল এনে রেখেছে গ্রামের মানুষ। দিন-রাত মানুষ গমগম করছে। মুদির দোকান বসেছে। সরকার গরিব-দুস্থদের  চাল-ডাল বিতরণ করছে।

রোহণ একদিন নৌকো ভাড়া করল গুমাই বিলে বেড়াতে যাওয়ার জন্য। নৌকোর অর্ধেকে ছই, অর্ধেক খোলা। মাসি বলল, কতদিন নৌকায় করে গুমাই বিল দেখা হয় না। আজ বড় আনন্দের দিন।

চন্দ্রমল্লি, মীনাক্ষী ও মাসির মেয়ে পারমিতা কোনোদিন যায়নি। খুব খুশি ওরা। রাস্তার পুলের নিচ দিয়ে গিয়ে পড়ল বিলে। মাঝি মুন্সি মিয়া ও তার ছেলে কাসেম নৌকো বাইছে। দক্ষিণ থেকে হাওয়া বইছে, হাওয়ার বেগে তরতর করে ছুটছে নৌকো। ঢেউ খেলছে ছবির মতো।

রোহণ বলল, মুন্সিদা, নাপিতের দীঘির পাড়ে নিয়ে যাও। এসময় ওখানে পাখি থাকতে পারে। শিঙাড়া ও মাখনা পাওয়া যেতে পারে।

দিঘির কাছাকাছি পৌঁছুতেই ওরা দেখে কলমি নতুন ডগা মেলে আকুল হয়ে আছে। কী পুষ্ট, সবুজ ও সরস! তেমনি ডাগর। দুটি জলপিপি উড়ে চলে দিঘির দিকে। রোহণ কোলে নিয়ে সবকিছু দেখাচ্ছে অনির্বাণকে। নৌকোর দু পাশ থেকে শাক তুলছে। দেখতে দেখতে অনেক হয়ে গেল। মীনাক্ষী দিদি দিদি করে আকুল করে দিচ্ছে চন্দ্রমল্লিকে। পারমিতা ‘মাঝি বাইয়া যাও রে, অকূল দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙ্গা নাও রে…’ গাইছে।

কতদিন এরকম কলমি চোখে দেখি না। চোখের দেখাতেও সুখ। মাসি রোহণের দিকে তাকিয়ে বলল। আর নদী-কাকি ও শেফালির মাকে বলল, নাও গো, নাও।

এ সময় দুটি শঙ্খচিল দক্ষিণ থেকে উড়ে চলল কাঁচির দিঘির দিকে। ডাকছে পরিচিত শব্দে। মাসি বলল, জানো চন্দ্র, শঙ্খচিল দেখলে দিন ভালো যায়। খুব পয়মন্ত পাখি। চন্দ্রমল্লিও মনে-মনে ভাবল।

চন্দ্রমল্লি তাই আবৃত্তি শুরু করেছে, ‘হায় চিল, সোনালি চিল তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো…’

রোহণ তাকাল চিল-দুটির দিকে, আবার চন্দ্রবউদির দিকে, আবার মীনাক্ষীর দিকে। মীনাক্ষী ঠোঁট নেড়ে আবৃত্তি করে চলেছে একই সঙ্গে। পারমিতা কলমি তোলা ভুলে গেছে। অনির্বাণ বারবার টলটলে পানি ধরতে চাইছে। রোহণ এক বার দু বার ছুঁতে দিয়ে বকবক করে চলেছে ছেলেমানুষের মতো, কোলের ছেলেমানুষকে ভোলাতে। আকাশের এক টুকরো মেঘকে বলছে হাতি, আরেকটা হচ্ছে ছবি-বইয়ের তিমি, কোনোটা যেন সিংহমশাই। ওতে অনির্বাণ খুব খুশি। সেও বলে চলেছে কোনোটা বেড়াল, কোনোটা তাদের কুকুর, আমগাছ, পুকুর কত কী! আর রোহণের কাছে সেই মেঘ যেমন বাস্তব তেমনি মনোময়, তেমনি আগ্রাসী। বর্ণচোরাও।

নৌকো চলে এলো নাপিতের দিঘির পাড়ে। থামল ঘেস্ করে। মাঝি বলল, নৌকো ভেতরে নিয়ে যাব? এখন শিঙারার সময়।

ব্যস, হইচই পড়ে গেল পারমিতা ও মীনাক্ষীর মাঝে। শিঙাড়া! পানিফল! নৌকো ঘুরে পুকুরের যান-এর দিকে চলল। পুকুরে ঢোকার একটিমাত্র যান ছাড়া পুকুর পাড় পানির থেকে তিন-চার হাত উঁচু। ঘন ঘাসে আবৃত। আর গাছপালা আছে ফাঁকা-ফাঁকা – বট, খেজুর, তাল। একটি করে আম, অশ্বত্থ, হিজল। অগ্নিকোণায় আছে বয়স্ক একটি নিম মহাশয়। বট-তালগুলোও সে-রকম। অনির্বাণকে নিয়ে রোহণ পুকুরপাড়ে হাঁটছে, ছুটছে, বসছে। পুকুরে নৌকো দেখে ডাহুক, জলপিপি, টিট্টিভের মাঝে সাড়া পড়ে গেল। অনির্বাণও ওদের সঙ্গে খুশিতে মেতে উঠেছে। বলছে, দলপিপি, টিট্টিভ, ডাহুক…। অমনি তার আবার ইচ্ছে হলো নৌকোয় উঠবে। মায়েরা কী খাচ্ছে দেখে তারও ইচ্ছে জাগল খাওয়ার। আর কি মানে সে। নৌকোও কূলে আসতে লাগল। মা ওকে দেখাল খোসা ছাড়ানো পানি-ফল, সাদা ধবধবে। নদী-কাকিও দেখাল, বলল, এসো এসো খাবে।

দিঘির এককোণে পদ্ম না? গোলাপি-লাল পদ্ম। এই বিলের মাঝে দিঘি থেকে কে পদ্ম তুলবে? রোহণ চন্দ্র ও মীনাক্ষীকে পদ্ম দেখাল। তারপর নৌকো অনির্বাণ ও রোহণকে তুলে নিয়ে ছুটল পদ্মবনে। সাতটা ফোটা ফুল ও পাঁচটা পদ্মকোরক তুলল। পদ্মকর্ণিকায় আছে বীজ, তুলেই খেতে শুরু করল পারমিতা ও মীনাক্ষী। চন্দ্র একটি পদ্ম মীনাক্ষীর খোঁপায় পরিয়ে দিলো। পাখিরা দিঘির আরেক প্রান্তে চলে গেল। শঙ্খচিল এসে ছোঁ মেরে একটা মাছ তুলে নিয়ে আমগাছে গিয়ে বসল। রীতি অনুযায়ী খাওয়ার আগে ডাক পাড়ল। গর্বিত ভঙ্গিতে চারদিকে তাকাল।

আর নয়, এবার ফেরার পালা। সূর্য থাকতে-থাকতে ঘরে ফেরা চাই।



রমেশ কাকা ও মহীন্দ্র মাচার ওপর টিনের চুলায় ভাত রেঁধে খায়। ভিটের কলাগাছ কেটে মজবুত করে ভেলা বেঁধে তার ওপর তক্তা পেতে দিয়েছে। সারারাত পাহারা দিতে হয়। সারারাত চিৎকার করে পাহারা দেয়। গ্রামবাসী মিলে দুটি নৌকো ভাড়া করেছে, সে দুটিতে করে পাহারাদারেরা পালা করে গ্রাম পাহারা দেয়। নৌকো নিয়ে চোর-ডাকাত আসে। ঘরের টিন চুরি করতে আসে। গোলায় ধান আছে অনেকের। উঁচু পুকুর পাড়ে গরু থাকে। পাহারা দিতে হবে না! এরই মধ্যে রোহণ একদিন নৌকো নিয়ে এসে দেখে গেল মাটির ঘর টিনসহ উটের মতো মুখ গুঁজে পড়ে আছে। ঘরের সামনে পশ্চিম দিকের ছাঁচের নিচে স্থলপদ্ম ও গন্ধরাজ গাছ ছিল, দক্ষিণ দিকে মাধবী ও কামিনী। সব মাটির ঘরের নিচে চাপা পড়েছে। ধানের গোলার এক হাত নিচে পানি। পুকুরের মাছ সব চলে গেছে। বেনো জলে ভেসে আসা মাছগুলোও আবার আশ্রয় নেয় পুকুরে। কলার একটা ছড়া পেকেছে বলল রমেশ কাকা। গত রাতে চোর এসেছিল নৌকো নিয়ে। শেষে পাহারাদার যুবকদের হাতে ধরা পড়ে মাফ চেয়ে নেয়। গরুগুলো আছে পদ্মপুকুর পাড়ে। ওখানে গ্রামের আরো গরু আছে। মহীন্দ্র কলার ভেলায় চড়ে খাইয়ে-দাইয়ে আসে। রোহণ তিন কামরার বেড়ার ঘর করার কথা বলে রমেশ কাকাকে। পানি নামার পরপরই কাজ শুরু করা চাই। পায়রাগুলো কোথায় উড়ে গেছে কে জানে। দু-কাঁদি মহীন্দ্রদের জন্য রেখে আট কাঁদি কলা নৌকোয় তুলে নিল। কাঁকরোল গাছ মরে গেছে। ছোট-বড় সের দুয়েক পেল। লেবুগাছ পানিতে ডুবে আছে,  ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে নাকি পচে ভূত হচ্ছে কে জানে। সববতি লেবুর গাছটি একটু নিচু জায়গায়, অনেক বছরের পুরনো, পাঁচ-দশ দিন ডুবে থাকলে মরবে না কিন্তু লেবুগুলো বানের পানির গন্ধে ভরে যাবে। একেকটা এক কিলোর মতো বড় হয়েছিল। রসুন ও পোড়া শুকনো লঙ্কা কচলে কাঁজি করে খেলে দুর্দান্ত হয়। ভাদ্র মাসের গায়ের গরম কাটে। চাষি-দিনমজুরদের খুব প্রিয় এজন্য। রোহণ খুব পছন্দ করে। চন্দ্রমল্লিও। মীনাক্ষী এখনো সুযোগ পায়নি চেখে দেখার। সামান্য এক চিমটি নুনও দেওয়া যায়। বিট নুন হলে তো কথাই নেই। এসবের মাঝে চন্দ্র এসে হানা দেয়, যেন বলছে, কেন, চন্দ্রবউদি কি এতই অপাংক্তেয় হয়ে গেছে, মনের কোণে একবার খুঁজে দেখো তো?

সঙ্গে-সঙ্গে রোহণ যেন আর্তনাদ করে উঠল স্বপ্নোত্থিতের মতো। রমেশ কাকা ও মহীন্দ্রের চোখেও লাগল বুঝি! কুকুরটা তখন কোথা থেকে সাঁতরে এসে পড়ল। রোহণ তাকে নৌকোয় তুলে নিল। আর উঠেই সে গা ঝাড়া দিলো তার স্বভাব অনুযায়ী। রোহণ এজন্য আজ আর বকা দিলো না। তবে তখন সরসর করে বকে উঠল গোলার পাশের কাঁঠালগাছের পাতারা, তার পাশের আমগাছের নব পত্রিকারা, তার পাশের ঘাটের আমগাছ, আর অদূরে দাঁড়ানো দুর্দান্ত সুউন্নত সুগ্রীব নাগকেশর গাছের নবপত্রিকার লাল আভা। সঙ্গে সঙ্গে রোহণ ছেলেবেলায় ফিরে গেল, সেখানে আছে তার দাদা জিহানের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা তার প্রতি, ছোটো ভাইটির পড়াশুনোর জন্য চন্দ্রমল্লিকে বিশেষ যত্ন নিতে বলে দেওয়া, ঘুমিয়ে পড়লে সহানুভূতি দিয়ে তুলে খাইয়ে আবার বিছানায় নিয়ে ঘুম পাড়ানো…  রোহণ আতুর চোখে বিবশ হয়ে যায়, রোহণ ছেলেবেলায় ফিরে-ফিরে আপনভোলা হয়ে পড়ে। স্মৃতিকাতর।

রোহণ ফিরে আসে মাসির বাড়িতে, সেখানে বানের আক্রমণ একরকম অকেজো।

রোহণ, নদী-কাকি ও শেফালির মা ফিরে এলো ঘরে। বানের পানি নেমে গেছে কিন্তু ভিটেয় আটকে থাকা এক-আধটু পানি, পচা পাতা  ও ঘাসের মিলিত দুর্গন্ধ, বিলের রোয়া ধানচারা যে পচে গেছে তার বেলায় কী হবে? এ-সময় প্রথম দরকার একটু বৃষ্টি। ঘণ্টা     দুঘণ্টা, বৃষ্টি না হলে বিলের পচা অবশিষ্ট পানি বেরিয়ে যাবে কী করে? প্রকৃতির কাজ প্রকৃতিকেই করে যেতে হবে, দুর্গন্ধমুক্ত করবে দু-এক পশলা ভারি বৃষ্টি। এর নাম বানের আদরণীয় বৃষ্টি – রোহণ এই নাম রেখেছে।

বানের তৃতীয় দিন রোহণদের মাটির ঘর পড়ে। গ্রামের তিনটি ছাড়া বাকি আটটি মাটির বাড়ি পড়ে গেছে। চন্দ্র, মীনাক্ষী,       নদী-কাকি ও শেফালির মা শুনে হাউমাউ কান্না জুড়ে দিলো। রোহণ সারা দিন নৌকো নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরল একরকম দিশাহীন কাতরতায়। ঠাকুর্দার আমলের বাড়ি। মীনাক্ষী ও সবাই সান্ত্বনা দিলো; কিন্তু সেই মীনাক্ষীই ভেঙেপড়া ঘরের মতো অসুস্থ। তবে স্বস্তি এইটুকু যে, মীনাক্ষীর আর জ্বর আসেনি। অনির্বাণ মীনাক্ষীকে ধরে-ধরে খুব চুমো খায় আর খলখল হাসে উঁচু থেকে গড়িয়ে পড়া বিলের পানির মতো।

তিন দিন পরে মীনাক্ষীর আবার জ্বর এলো। ৯৯.৯৭ ডিগ্রি। আগের দিন মাথা ঘুরে বমি হলো। চন্দ্রমল্লি বলল, মা হবে মীনাক্ষী। শুনে ওর মনে খুশির হাওয়া লাগল। রোহণকে একলা করে ডেকে বলল, তুমি বিশ্বাস করছ? খুশি ও লজ্জার মাঝামাঝি সেই আনন্দ। এসময় নারীর রূপ বদলে যায়, ভাবনা-চিন্তা বিচিত্র হয়।

মা হবে? কিন্তু সে বলল, আসলে রোগটা আরো ভালো করে গেড়ে বসল। ওর কেবলই মনে হচ্ছে সে মা হতে পারবে না, সে ক্ষমতা তার নেই। সে জানে তার অপারেশন হয়েছে গর্ভাশয়ের পাশেই, সে কী করে মা হবে?

আর ঠিক-ঠিক ওর চেহারা পালটে যেতে শুরু করল। কয়েক দিনের মধ্যে একেবারে অন্য রকম হয়ে গেল। ঠিক ফ্যাকাশে নয়, আবার চকচকে ধারালোও নয়। আগের চেহারার সেই তীক্ষ্ণতাও নেই। এসময় চন্দ্রমল্লি ঝলমলে হয়ে উঠেছিল, আর মীনাক্ষী নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে, যে ভবিষ্যৎকে সে বহন করতে চলেছে তা যেন তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে, বিপন্ন সুন্দর হয়ে পড়ছে। চেহারার মসৃণ ধার ভোঁতা হয়ে পড়ছে, সে যেদিকে তাকায় সেদিকে একভাবে তাকিয়ে থাকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, যেন ঝড়ের কবলে পড়া জাহাজের হালছাড়া সারেং…।

পরদিন আবার বমি হলো। মাথায় পানি ঢেলে শান্ত করল চন্দ্র। রোহণেরও বিশ্বাস হলো মীনাক্ষী মা হতে চলেছে। মীনাক্ষী ভাবী মাতৃত্বের আনন্দের অংশীদার হয়ে রোহণকে অনেক কথা বলল। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, স্বপ্ন, সম্পন্নতা। তবুও যেন রোহণ পুরোপুরি আশান্বিত হতে পারে না।

বান চলে গেছে। ঘরে টিন খুলে ছাদের তক্তা বের করছে কারিগরেরা। মাটির নিচ থেকে পুরোনো খাট-পালঙ্ক ও আসবাব বের করে নিল। চারা রোয়া ধানগাছ বানে পচে গেছে। আবার জমি চাষ দিয়ে চারা কিনে এনে রুতে হবে। বীজতলায় নতুন চারা করে রোয়ার সময় নেই। নতুন চারা করতে অন্তত এক মাস সময়ের দরকার, সে-সময় এখন হাতে নেই। কারিগরেরা দিনরাত কাজ করছে। বেড়া তৈরি হয়ে গেছে। হাট থেকে ঘরের ঠুনি, বাঁশ, বেত কিনে এনেছে। তারিণীচরণ হাটে সব পাওয়া যায়। ততোদিন চন্দ্ররা মাসির বাড়িতে থাকছে। রোহণ ঘরের কাজে দিনরাত খাটছে। ছাদের তক্তা দিয়ে ঢালাও মাচা পেতে নিয়েছে চাষিদের থাকার ঘরে। সেখানে সবাই ভাগাভাগি করে থাকে। মালিক-চাষি এক কাতার হয়ে গেছে।



মীনাক্ষী অন্তঃসত্ত্বা নয়। পরীক্ষা করে বলল থানা হাসপাতালের ডাক্তার। ওর পুরোনো রোগ মাথা তুলছে কিনা তা জানতে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে বলল।

ঢাকায় আন্দোলন চলছে। গণতন্ত্র ও নির্বাচনের আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছে। উত্তাল হচ্ছে ঢাকা। এ-অবস্থায় ঢাকায় নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ভাবছে রোহণ। এ-অবস্থায় বিশ্রী মাথা ধরা শুরু হয়েছে মীনাক্ষীর; দিন-দিন তা বাড়ছে যেন। ভালো ঘুম হয় না, ঘোলাটে স্বপ্ন দেখে, অনাগত ছেলের কান্না শুনতে পায় ঘুমের মধ্যে। কী এক অমোঘ আচ্ছন্নতায় যেন কান্না শুনতে পায় – সব নারীই কি জীবনে এরকম কোনো ডাক বা কান্না শুনতে পায়, যে নারী মা হতে পারবে না জানে সেও কি আচ্ছন্নতার মাঝে আরো বেশি কিছু শুনতে পায়?

এদিকে ঘর তৈরি হয়ে গেল। তিন কামরার দোয়াধারা বেড়ার ঘর। পুরনো তিনটি পালঙ্ক প্রায় ভালোই আছে, বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি। কাঠের দরজাগুলো ঠিকঠাক করে বসিয়ে দিয়েছে। মেঝেতে ছাদের তক্তা বসিয়ে দিয়েছে পরিপাটি করে। উঁচু এলাকা থেকে চারা কিনে এনে ধান রুয়েছে। জমিতে অল্প পলি পড়েছে বলে এক বার চাষ দিয়ে ধান রুতে পেরেছে। বানের পর এরকম জমিতে গোবর বা অন্য সার দিতে হয় না। রমেশ কাকা ও মহীন্দ্র দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে একটু হালকা হয়েছে। চরের জমিতে সরাসরি ধান ছিটিয়ে দিয়েছে। সেখানে এক হাঁটু পলি পড়েছে। এক হাত দূরে দূরে একটি করে অঙ্কুরিত বীজ ধান ছিটিয়েছে। তারপরও চিন্তার শেষ নেই। অন্তত একটি মাস ভালো আবহাওয়া থাকা চাই। ভালো কার্যকারণও।



অষ্টবিংশ অধ্যায়

দিনগুলো খুব দ্রুত ছুটে চলল। অনির্বাণরা ঘরে ফিরে এলো। নদী-কাকিরা এই কয়দিনে অসাধ্য সাধন করেছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এরকম সর্বনাশা বান হয়েছিল বলে জানাল রমেশ কাকা।  সে-বার যে কয়টি মাটির ঘর টিকে গিয়েছিল সেগুলো এবার গেল। তারপরও লড়াই করে আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহে সবাই রোয়া শেষ করল। তাড়াহুড়ো করে বেগুন, লঙ্কা, টমেটোর বীজতলা তৈরি করল। কিন্তু আশ্বিনের শেষে আবার ভারী বৃষ্টি হলো। বৃষ্টি হতে হতে আবার বান, আবার ধান প্রায় শেষ করে দিয়ে গেল। চাষিদের আর কোনো আশাই থাকল না। শুধু চরের জমিতে যারা ধান ছিটিয়েছিল সেগুলো যেন লাফিয়ে বাড়তে লাগল। একটি ধান থেকে গোছা হয়ে গেল। চাষিরা এটা জানে। বৃষ্টি পেয়ে পলিমাটির শক্তি যেন দশ গুণ বেড়ে গেল। এরকমই হয়।

মহীন্দ্ররা সেই ধানের জমিতে আগাছা তুলতে লেগে গেল। এই ধানই এখন একমাত্র ভরসা। নদী-কাকি ও শেফালির মায়ের কাজ আবার বেড়ে গেল। গরুর খুরারোগ দেখা দিলো। পশু ডাক্তারকে দেখিয়েও একটি ষাঁড়কে বাঁচানো গেল না। ক্ষতির ওপর ক্ষতির বোঝা চেপে বসল।

ভিটের শিউলি, ছোট কাঁঠালগাছ, ছোট অশোকগাছটি, লঙ্কাজবা, হাস্নাহেনা, গোলাপ, গন্ধরাজ ও অনেক ছোট-ছোট গাছ ও চারা মরে গেছে। মাধবী ও ঝুমকোর ঝাড়-দুটিও শেষ। বেজি, বাঘডাস, বনবেড়াল ও শেয়াল-দুটি কোথায় পালিয়েছে কে জানে। রোহণ জানে ওরা আবার আসবে। পোষা বেড়াল-দুটি ফিরে এসেছে। পাখিরা ডাকছে গাছে।

বেড়ার ঘরটি ছিল উঁচু। তাও এক হাত ডুবেছে। বেড়ায় বানের দাগ রয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিটের পচা পানি ধুয়ে নিয়ে গেছে। তবুও বানের পচা গন্ধের অবশেষ স্মৃতি অল্প রয়ে গেছে। ভিটের মরা গাছগুলো কেটে এক জায়গায় স্তূপ করে রেখেছে মহীন্দ্ররা। ওগুলো লাকড়ি হবে। রমেশ কাকা বলল, পুকুরে বেনো বড় মাছ ঢুকেছে কিছু।



মীনাক্ষীকে ঢাকায় নিয়ে গেল রোহণ। কিছু ধান বেচতে হলো। নতুন ধান আসার আগে কিছুদিন হয়তো চাল কিনতে হবে। মায়ের সব সোনা-গয়না দুই বউ পেয়েছে। সেগুলো বেচা যাবে না। এক কানি (২০ গন্ডায় এক কানি) জমি বন্ধক দিতে হলো।

মীনাক্ষীর অপারেশনের জন্য দু বার রক্ত দিতে হলো। এক বার রোহণ রক্ত দিলো। মীনাক্ষী আদুরে গলায় বলল, তোমার রক্ত এখন আমার শরীরে। আমি এখন থেকে তোমাকে আরো বেশি ভালোবাসব।

বলে সে হাসল যেন দূরের ঝিলিমিলি নীহারিকা, নক্ষত্রবিদ উইলিয়ম হার্শেল দূরবীন দিয়ে এবং খালি চোখে দেখে হেসেছিলেন যেমন। সেই তার শেষ মিষ্টি ও বিখ্যাত হাসি। ডাক্তার শেষ পর্যন্ত অপারেশনে গেল না। রোহণের আশাও দিন-দিন নিবে যেতে বসেছে বুঝি! কালো হয়ে যাচ্ছে মীনাক্ষী। রোহণের হাত ধরে গর্তে ঢোকা চোখে চেয়ে থাকে সে। মাঝে-মাঝে কোনো কথা বলে না। অনেক কষ্টে রোহণ নিজেকে সংযত রাখে। মীনাক্ষী ভেঙে পড়বে বলে কাঁদে না।

মীনাক্ষী কালো-কালো ছায়ার স্বপ্ন দেখে। জ্যোতির্বিদ উইলিয়ম হার্শেল দক্ষিণ আকাশে ত্রিশঙ্কু মন্ডলের কাছে কয়লার খনি নীহারিকা দেখেছিলেন যেমন। আকাশের ভেতরে যেন একটি বিরাট কালো গর্ত। ছায়াপথের ভেতরে এমন কালো-কালো জায়গা অনেক আছে। মীনাক্ষী জানে এই কালো গর্তের কথা। মোহাম্মদ আবদুল জববারের তারা পরিচিতি বইতে পড়েছে। হঠাৎ সে-কথা তার মনে পড়ে যায়। শিশুর কান্না শুনতে পায়। তাতে আরো নেতিয়ে পড়ে। মা কঠিন নিস্পৃহ হাসিমুখে সব কাজ করে যায়। মায়ের মন তো, কেবিনের বারান্দায় গিয়ে চুপি-চুপি চোখ মোছে। ডাক্তার আগে বলেছিল, মীনাক্ষী দশ-বারো বছর ভালো থাকবে, আর এরই মধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেল!

বাবা ও এণাক্ষী এসে একদিন দেখে গেল। চন্দ্রমল্লি আসতে চাইল রোহণ ফোন করাতে। মর্জিনা, রেবেকা, অজিত সবাই হাসপাতালে ফোন করে খবর নেয়। হেমন্তের সিঁদুরে মেঘের বিকেলে রোদ এসে পড়ে বারান্দার কোলে।

মীনাক্ষী সেদিকে তাকায়। একফালি আকাশ দেখা যায় সেদিকে। বড় একটা দেবদারু গাছ আছে সেখানে। তাতে কাক ও শালিক আসা-যাওয়া করে আর ডাকে। মীনাক্ষী ওদের ডাক শুনে ওদের সঙ্গে শুয়ে-শুয়ে কথা বলে। এক জোড়া কোকিল দম্পতি কিক্-কিক্ ডাকাডাকি করে। ওরা ডাকলে সে রোহণের হাত ধরে। কথা বলে কিছুক্ষণ। কিন্তু উঠে বসে না। কলেজের দিনগুলো মনে করে। রোহণ ফুলশয্যার রাতের ফুলের অলঙ্কারের প্রফুল্লতার কথা শোনায়। জুইফুল এনে রেখেছে থালা ভরে। মালা এনে হাতে পরিয়ে দেয় বালার মতো। মীনাক্ষী হাসে। কিন্তু কোনো সময় মৃত্যুর কথা বলে না। বলে ভালো হয়ে উঠবে। ডাক্তারকে কিছু জিজ্ঞেস করে না রোগ সম্পর্কে। নিজে-নিজে আশাবাদী হয়ে সে কথা রোহণকে শোনায়, দূরের অমলিন হাসি ফোটায় মুখে, সেই হাসি বিষাদের প্রান্তঘেঁষা সুন্দর। কিন্তু রোহণ জানে, দিন আর বেশি নেই ওর জন্য। ডাক্তারেরা শুধু অপেক্ষা করে আছে দুটি নতুন ওষুধ ও ‘রে’ কতখানি কাজ করে তার ফলাফলের জন্য।

রোহণ সারাদিন থাকে আর রাতে হোটেলে চলে যায়। শুধু ঘুমোবার জন্যই যাওয়া। রাতে শুয়ে-শুয়ে ভাবে, মীনাক্ষীকে কি সত্যিই ভালোবেসে বিয়ে করেছে? সে এখন বুঝে গেছে মীনাক্ষী বাঁচবে না। ডাক্তারও আশা ছেড়ে দেয়নি কি! এমনকি দু-তিন দিন পরে নিয়ে যেতে পারবে তেমন ইঙ্গিতও দিয়েছে। সেই দু দিনের আশার আশায় রয়েছে। হতাশার শেষপ্রান্তে পৌঁছেও মানুষ বোধহয় একটু আশা পুষে রাখে। ডাক্তারেরাও করে থাকে। রোহণও করতে শুরু করে। আবার স্বপণও দেখে।…

মীনাক্ষী চেয়েছিল কুয়াকাটা বেড়াতে যায়। বিয়ের পরই চেয়েছিল। মধুচন্দ্রিমা কাটাতে। কিন্তু একের পর এক আপদ এসে পড়ল, ঘটনার পর ঘটনা, বান, চাষ-বাস, কত কি!

চন্দ্রমল্লি ভালোবাসতে শুরু করেছিল। আসলে দুঃখী, অসুস্থ ও অসুখী মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ব বোধ হয় একটু বেশি থাকে। চন্দ্রমল্লি নিজের সঞ্চয় থেকে অনেক টাকা দিয়েছে। কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছে। ডাক্তার বলেছিল, বিদেশে নেওয়ার খুব দরকার নেই। মীনাক্ষীর মা-বাবা সাহস দিয়েছে। ওদের অসুস্থ মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে বলে একরকম কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছে। কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছায় তো কোনো ফল নেই। শুধু কৃতজ্ঞতায় যদি মঙ্গল করা যেত, করুণা ও মমতা দিয়ে যদি বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যেত তাহলে রোহণের চেয়ে কে তা এত বেশি পেয়েছে!



সেদিন সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে নবাবপুর ধরে আসছে রোহণ। সারারাত দুঃস্বপ্নে কেটেছে। কখনো মীনাক্ষীর মতো কালচে হাড় জিরজিরে মেয়ে এক,  কখনো দাদা জিহানের মৃতদেহ, আবার কখনো এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী শিউলি বোঁটার রঙের চীবর গায়ে দিয়ে রোহণের পাশে শুয়ে আছে। আবার সে কোথায় শুয়ে আছে মনেই করতে পারছে না – বৌদ্ধবিহার, কোনো পান্থনিবাস, নাকি শৈলাবাস! রোহণও শুয়ে আছে, মীনাক্ষী শুয়ে আছে, দাদার মৃতদেহ পড়ে আছে। কোথায় কোন চুলোয় সে আছে! কেনইবা মৃতদেহ নিয়ে, অসুস্থ মীনাক্ষীকে নিয়ে অথবা সন্ন্যাসীর সঙ্গে কেন – সে ভেবে কিনারা করতে পারল না। মানুষ মরে গেলে প্রথম কাজ হচ্ছে তার সৎকারের ব্যবস্থা করা। রোগগ্রস্ত মানুষ হলে সেবা করাই প্রথম কাজ। আবার মনে যদি অশুভ ভাবনা আসে তার থেকে রেহাই পাওয়া বা পেতে চেষ্টা করাও উত্তম কাজ। ওসব কাজ ফেলে রাখা যায় না, উচিতও নয়, ন্যায়ধর্ম বিরোধীও। অথচ মৃত মানুষ নিয়ে শুয়ে থাকার স্বপ্ন দেখছে সে – সৎকারের কোনো উদ্যোগই না নিয়ে, কেন?





সকাল থেকেই নবাবপুর রোডে লোকজন নামতে থাকে। সদরঘাটের দিকে মানুষ যেতেই থাকে, সদরঘাট থেকে ফিরতে থাকে একটু কম। ঘাটের বাজার থেকে সবজি, মাছ, ফল, এটা-ওটা তো আছেই। লঞ্চে করে মানুষ আসে; বরিশাল, পটুয়াখালি ইত্যাদি জায়গা থেকে লোকজন আসতেই থাকে। মেথরানি সুন্দরী, ঘোলের সরবত বিক্রেতা, পত্রিকাওয়ালা, মিষ্টির ভাড় কাঁধে ময়রা, খালি রিকশা, মাছের রিকশা, তরিতরকারির ভ্যান বা রিকশা – হরেক পেশার মানুষ। সবার সঙ্গে রোহণও একরকম উড়েই চলেছে। শুধু রাতের স্বপ্ন দিনেও হানা দিচ্ছে বলে ঠিকমতো উড়তে পারছে না। স্বপ্ন থেকে সকালেও মুক্তি নেই এজন্য যে, সে হাসপাতালে যাচ্ছে! হাসপাতালে মানুষ খুশিতে যায় না, দরকার ছাড়া যেতে চায় না, ওই দরকারটাই সুখকর নয়। ওঃ, ডাক্তারদের কাজে যাওয়া, নার্সদের যাওয়া? ওটা তো ওদের পেশা, আবার স্বপ্নবাস্তবতা – দালাল, রক্তদাতা ও বাজে কাজে যারা যায় তাদের তো অনেক খুন মাফ। আর রোহণ যদি লঞ্চ ধরতে যেত, রেলস্টেশনে যেত, আত্মীয়ের কাছে জরুরি কাজে যেত, তাহলে মনটা অন্য ভাবনায় ডুবে থাকত। হেমন্তের ভোরের ঢাকার একরকম রূপ আছে, যে-কোনো শহরের ভোরের রূপ দিনের অন্য যে-কোনো সময় থেকে আলাদা। কিন্তু সেরকম কিছুই রোহণকে নাড়া দিচ্ছে না, সে অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি চিন্তিত, আরো বেশি বিমর্ষ। মীনাক্ষীর অসুখের উন্নতি নেই। মীনাক্ষী ওর চোখের সামনে তিলে তিলে ক্ষয়ে যাচ্ছে,  অথচ কিছুই তার করার নেই। সে মীনাক্ষীকে ভালোবাসে না, বা ভালো না-বেসে শুধু কথা রাখার জন্য কর্তব্য করে যাচ্ছে, তা ভাবতেই পারছে না। গুলিস্তানের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিল সে। সিঁদুর পরা কামানটা দর্শনীয় হয়ে অসহায় পড়ে আছে। ওদিকে তুরতুর করে বেড়ে ওঠা দেবদারু তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। পল্টন তাকে মাথা তুলে বলছে, সারা পথ হেঁটে যাবে? হাসপাতাল এখনো অনেকখানি পথ। অমনি রোহণ নিজেকে নিজে বলছে, বাসে উঠে পড়ো, ফাঁকা বাস।

ঠিক তখুনি মুনির ও অজিতকে সামনে পেয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে। সে যদি চিৎকার করে উঠতে পারত বা ওরা দু জনে যদি চিৎকার করে উঠত তাহলে সে সারারাতের ক্লান্তি ক্ষণিকের জন্য হলেও নিমেষে ঝেরে ফেলতে পারত। কতদিন সে হল্লা করে হাসে না, কথা বলার বন্ধুদের পায় না, ফুটবল মাঠে যায় না, ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে যায় না প্রতিপক্ষের সব বাধা চুরমার করে গোলের দিকে কতবার সে চার-পাঁচ জনকে কাটিয়ে গোল দিয়েছে, গোল দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েছে, বিজয়ী বীরের বেশে মীনাক্ষীর কাছে ছুটে গেছে, চন্দ্রবউদির কথা অক্ষরে-অক্ষরে মানার মতো দুটো গোল করে ঘরে ফিরেছে। কত দিন অজিত ও মুনির ওর সাফল্যে উল্লাস প্রকাশ করেছে! সেই মনির-অজিত সামনে দাঁড়িয়ে। সেরকম কিছু ওরা কেউই প্রকাশ করতে পারল না। অজিত ও মুনির ধরে নিয়েছে মীনাক্ষীর শেষ অবস্থা বলেই রোহণ বিহবল। ওদের ধারণা ওদের। রোহণের মনে হলো, হাজার হাজার মৃত মীনাক্ষী ওর পাশে শুয়ে আছে – হঠাৎ ওর মনের চোখে ভেসে উঠল হঠাৎ মৃত কামানটা গর্জে উঠল, বঙ্গোপসাগরের বরিশাল কামান গর্জনের মতো। আস্তে-আস্তে ওরা তিন জনেই সহজ হয়ে উঠল। ঝলমল বেজে উঠল পল্টন।

মুনির শুরু করল প্রথমে। বলল, মীনাক্ষী কেমন আছে?

ভালো নয়। রোহণ আনন্দ থেকে বিষাদে লাফিয়ে পড়ে বলল যেন।

কী রকম ভালো নয়?

দেখলেই বুঝতে পারবি।

দেখলে তো বাইরেরটা দেখব। ভেতরটা? এজন্য আগেই জানতে চাইছি। – অজিত বলল।

একটু পরে জানলেও ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হবে না। তোরা কেমন আছিস বল। কোথায় উঠেছিস? হোটেলে?

শান্তি হোটেলে। নবাবপুরেই। – মুনির বলল যেন শান্তি হোটেল থেকেই।

আমিও তো সেখানে। আরাফাত হোটেলে। চা-টা খেয়েছিস?

হ্যাঁ। তুই হাসপাতালে থাকিস না?

না। ছোট্ট কেবিন। ভাবছি আজ থেকে থাকব। শাশুড়িকে কোনো আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়ে দেব। আমি দিন-রাত থাকব।

মুনির ত্রিকালদর্শীর মতো বলল, আসলে হাসপাতালেই ফুলশয্যা হওয়া ভালো।

কেন, কেন? – অজিত জানতে চাইল।

বিয়ের দিন থেকেই তো হাসপাতালের সঙ্গে একরকম গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে যায়। ছেলেমেয়ে হওয়া, বউয়ের অসুখ-বিসুখ, বেচারী স্বামীর… অজিত কথা কেড়ে নিয়ে বলল, আসলে সব মেনে নিলেই সমস্যা চুকেবুকে গেল।

ঠিক তখুনি একটা ফাঁকা বাস ওদের দেখে ভোঁ বাজিয়ে দিলো। সঙ্গে-সঙ্গে কন্ডাক্টরের শাহবাগ ফার্মগেট ডাক শুনে ওরা লাফিয়ে বাসে উঠে গেল। বাসের শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কলেজ স্মৃতি চলে এলো উর্দু-হিন্দি সিনেমার পর্দার মতো। ওরা সেই আগের দিনে ফিরে গেল। আস্তে-আস্তে সেই স্মৃতিকাতরতায় পেয়ে বসল। বাস চলল। আকাশে একটা ভুবন চিল উড়ে যাচ্ছে, ওরা রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকে যেন নৈশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী কেউ হবে, এখন একা, নিঃসঙ্গ, রিক্ত ও আশাহীন বুঝি! রোহণের মনে হলো, ওর মনে হওয়াতে তো কারো আপত্তি নেই, ক্ষতিবৃদ্ধিও নেই। এমনকি অন্যের মনে হলেও তা কাউকে প্রভাবিত নাও করতে পারে। আর ভুবন চিল যদি ভেবে থাকে যে, ওর নিঃসঙ্গ ওড়া মানুষকে দুঃখের দরিয়ায় ফেলে দেবে, তাহলেও সে কী করতে পারে? সে কি ওড়া বন্ধ করে দেবে? আর সত্যিই যদি সে একা হয় তাকে তো একা-একা উড়তেই হবে। তেপান্তরের মাঠের নিঃসঙ্গ বটগাছ, নির্জন প্রান্তর, একাকী পাখি, একা চাঁদ মানুষের মনে প্রভাব ফেলে (একা সূর্য সেরকম ভাবনার উদ্রেক করে না)। ফেলে আসা শৈশবও নিঃসঙ্গ, যৌবনও কি একা-একা সাধ মেটাতে চায়, বার্ধক্যেও মানুষ একা হয়ে পড়ে।

অমনি চট্টগ্রাম কলেজের মেহগনি গাছের ছায়ার ভিড়, দেবদারু গাছের আকাশছোঁয়া উচ্চতা, বার্ষিক খেলাধুলো ও যেমন খুশি সাজো – কত কী মনে পড়ে যায়। মীনাক্ষী সেখানে ছিল রোহণের একরকম মুক্তি। রেবেকা ছিল সবার বন্ধু। সেই যে নব-যৌবন তুখোড় উল্লাসে মেতে ফেটে পড়ত তা যেন কোথায় ধুলোয় মিশে পড়ে আছে। ওরা তিন জনই  অনুভব করল হইচই করার দিন বুঝি ফুরিয়ে গেছে, ওরা সবাই একসঙ্গে ক্লান্ত। মীনাক্ষী যদি কঠিন রোগে না পড়ত, মুনির যদি হঠাৎ বিয়ে করে না বসত,  অজিত যদি মন্দাকিনীর সমস্যায় না পড়ত, বোধহয় ওরা ক্লান্ত বর্তমানের কথা ভাবত না, অর্থাৎ ক্লান্ত ভবিষ্যৎ পড়ে আছে তা চোখে পড়ত না, এসব হয়ে যেত অলীক। তাহলে ওরা হাসতে পারত একটানা অনেকক্ষণ, হাঁটতে পারত দিগন্ত পর্যন্ত।

মুনির ভালোবেসে বিয়ে করেছে। অজিত বিয়ে করেনি কিন্তু মন্দাকিনীর কাছ থেকে মুক্তি পায়নি। মন্দাকিনী চলে গেছে ফরিদপুরের আশ্রমে। যাওয়ার সময় সে অজিতকে দিয়ে গেছে কাম ও ভালোবাসার যুগলবন্ধন। শুধু কামও নয়, শুধু প্রেমও নয়, তার মাঝামাঝি এক সরল অথচ জটিল সম্পর্ক।  অজিত পুরোপুরি বোঝেনি, আবার বোঝে না বলে ফেলে দেবে সে উপায়ও নেই। ‘প্রেম’ সম্পর্কে তারা অর্থাৎ সেই সব লেখকেরা কী সস্তা কথাই না বলে গেছে। অনেক বলার পরও তারা এবং মানুষ থেমে থাকেনি, তারপরও অনবরত বলে বেড়াচ্ছে প্রেমের বিশুদ্ধ রূপপ্রকৃতির কথা। আর রোহণ বয়ে বেড়াচ্ছে করুণা। এই করুণার অর্থ মমতা নয়, দয়াদাক্ষিণ্য নয় – এ এক বিশ্বমৈত্রী যার মাঝে বড়-ছোট নেই, উচ্চ-নীচ নেই। মা যেমন একটি মাত্র পুত্রকে নিজের আয়ু দিয়ে রক্ষা করে, সমস্ত প্রাণীতে সেরকম অপরিমিত মানস রক্ষা করবে – এর নাম করুণা। মীনাক্ষীকে ভালোবাসার মাঝে সেই করুণাই কি বয়ে বেড়াচ্ছে রোহণ! ওর কৈশোর-যৌবনের চন্দ্রবউদি ও মীনাক্ষী একত্রে মিশে একাকার, আবার ভাব-কল্পনা ডুবে-মিশে নিরাকার হয়ে গেছে কি!



ঊনত্রিংশ অধ্যায়

মর্জিনার কথা জানতে চাইল মীনাক্ষী। রেবেকা ও সুনন্দার খবর পুঙ্খানুপুঙ্খ শুনতে চাইল। কিন্তু নিজের কথা একটুও বলল না বলে সবাই অবাক হয়ে গেল।

অত বলার মতো শক্তিও  ফুরিয়ে গেছে হয়তো। মুনির ও অজিতকে অনেকদিন পর পেয়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠল বুঝিবা। শেষ দিকে প্রদীপ যেমন মাঝে মাঝে দপদপ জ্বলে সেরকম মনে হলো, মীনাক্ষীর কথা বলা যেন ঠিক সেরকম। কোটর থেকে তার চোখ বেরিয়ে পড়ছে, চোখ-দুটি যে একসময় সুন্দর ছিল তা আর বোঝার উপায় রইল না। আগের চেয়েও কালো হয়ে গেছে।

কালো নয়, কালিঝুলি মাখা। কালোতেও সৌন্দর্য থাকে, রোগে কালিঝুলি মাখা চেহারায় কোনো সৌন্দর্য থাকে না। আবার এলোমেলো সৌন্দর্য বলেও একটা কথা আছে। ক্যান্সারে কালো হয়ে যাওয়ার মাঝে ওসব কিছুই থাকে না। একদিন সে কত লাবণ্যময়ী ছিল। সুন্দরী না হয়েও সে ছিল লাস্যময়ী। সে-সব হারিয়ে এখন সে আস্তে-আস্তে কথা বলছে যেন অবুঝ শিশুটি। প্রতিদিন সে আয়না দেখে, তবুও বুঝতে পারে না যে সে ফুরিয়ে এসেছে। চেহারার এই পরিবর্তন যেন বুঝতে পারছে না, অর্থাৎ সে ঘোরগ্রস্ত, আচ্ছন্নতায় ডুবে আছে। অজিতকে প্রশ্ন করে, মুনিরের কাছ থেকে দুম করে জানতে চায় পরীক্ষার কথা। কিন্তু কোনো কথা শেষ পর্যন্তু শোনার আগে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায় নদীর মতো নিঃসঙ্গ হওয়ায়।

মীনাক্ষী দপদপ করে ফুরিয়ে যেতে লাগল। শরীর শীর্ণ-বিশীর্ণ হয়ে পড়ল, আঙুলগুলো কাঠির মতো সরু। বিয়ের  আংটিটা রেখে দিয়েছে আঙুলে, সোনায় মোড়া লোহার চুড়িটাও আছে। কানের দুল খুলে রেখেছে বালিশে আটকে যায় বলে। সবকিছুর মধ্যে চুল রয়ে গেল অক্ষয় অটুট উজ্জ্বল।

মাথায় একটুও ঘা বা ফোস্কা পড়েনি। ক্যান্সার রোগীর চুল ঝরে যায়, ওর রয়ে গেছে অটুট  অমলিন, ঝলমল করছে চাকচিক্যে, জীবন্ত উড়ছে পাখার হাওয়ায় প্রজাপতি যেন।

মা ওদের রেখে বারান্দায় গেল। মুনির কলেজ-জীবনের নানা কথা শুরু করে দিলো। হাসির কথা, কে কার প্রেমে ডুবুডুবু বকে চলল। অজিতও তাই। মীনাক্ষী ও রোহণ শ্রোতা। রোহণ মাঝে মাঝে অংশ নিচ্ছে যেন একতরফা হয়ে না যায় সেজন্য বুঝিবা। মানুষ নানা অবস্থায় নানা পরিবেশে নিজেদের লুকোয়, প্রকাশ করে, উচ্ছ্বসিত হয়। ঠিক তেমন-তেমন সবই চলছে। তবুও একসময় ক্লান্তি হানা দেয়। একজন রোগীকে নিয়ে একতরফা কত বলা যায়? মীনাক্ষী যদি সবল অংশ নিতে পারত তাহলে অন্যরকম হয়ে যেত। সে শুধু ফুরিয়ে যাচ্ছে, ফতুর হচ্ছে, ওর ঘরে জমা পড়ছে না কিছু। সবাই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে বলেই লুকোতে চেষ্টা করে, চাপা দেয়। এ জন্য ধরাও পড়ে যায়।



অজিত ও মুনিরকে বিদায় দিলো। আরো কিছু সময় থাকতে পারত কিন্তু রোহণ থাকতে দিলো না। বলল, দুপুরের পরে আসতে। মীনাক্ষীর পরিচর্যা দরকার, গা-হাত-পা মুছে দিতে হবে। আজ দেবে বলেছে রোহণ। ভাবতেই কান্না পেয়ে গেল রোহণের। কী শরীর কী হয়ে গেল। পেলব বাহুলতা, সুগোল ঊরু, সুন্দর চিবুক, বুকের ভরা স্ফীতি, পায়ের গোড়ালি ও পাতার লাবণ্য। আলতা পরলে পা জোড়া কী সুন্দরই না দেখাত! রোহণ নিজের হাতে নিখুঁত আলতা পরিয়ে দিত, নিজে টিপ পরিয়ে দিয়ে চুমো খেয়ে নিত টুকটুক করে। লোভীর মতো থেকেছে – এই তো সেদিনের কথা, বিয়েও তো মাত্র কয় মাস আগে হয়েছে। কোথায় গেল সেই শিহরণ,      কামনা-বাসনার বহ্নিসায়র! তবুও মনে হয় মীনাক্ষীর সঙ্গে করুণার বন্ধন ছিন্ন হওয়ার নয়…।

মীনাক্ষী তাকিয়ে থাকে রোহণের দিকে সারাক্ষণ, কিছু কথা না বলে তাকিয়ে থাকা দেখে রোহণের আরো কষ্ট। রোহণ তার পরিহাস প্রবণতাকে জিইয়ে রাখতে চেষ্টা কের। শিল্পী কামরুল হাসানের কথা বলে। অমনি তখন মীনাক্ষীর প্রাণবন্ত ঢেউ জেগে ওঠে… কী সুন্দর সেই দিনটি… বহু দিনের মধ্যে একটি সুসুন্দর দিন। পূর্ণিমার কথা বলে, কীর্তন শোনার স্মৃতিশুভ্র দিন…। গল্প শোনায়…। নিজের হাতে খাইয়ে দেয়। মুখ মুছে দেয় তোয়ালে দিয়ে। আপেল চিবুতে ভালো লাগার জন্য খোসা ছড়িয়ে দেয়। শিশুর মতো আঙুরের পাতলা খোসা তুলে খাইয়ে দেয়। কমলা ও মোসাম্বির রস করে দেয়। কলার সরবত করে দেয় মিকশ্চার যন্ত্রে। চিনে রেস্তোরাঁটা থেকে থাই স্যুপ নিয়ে আসে। খায় তো সামান্য এইটুকু। কী করুণ চামচে চামচে স্যুপ খাওয়ার নির্বান্ধব দৃশ্য! গা মুছিয়ে দেওয়ার সময় মা বারান্দায় চলে যায় ওর কথায়। তখন মীনাক্ষী বলেছে, ওখানে একটু  আদর করো সোনা…। তখন রোহণের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসার উপক্রম। কোনো মতে নিজেকে সামলে সোহাগ জানিয়েছে অনেক যত্নে ও কোমল আদরে। আর কী আশ্চর্য! রোহণও উত্তেজনাময় প্রশান্ত সুখ পেয়েছিল। মীনাক্ষীও আধবোজা চোখ খুলে বলেছে, এরকম ভালো কোনোদিন তুমি বাসেনি কেন!… তারপর বলল, আরেক জন্মে আমি কামরুল হাসানের চিত্রকর্মের নারী হয়ে তোমার কাছে আসব জেনো।…

রোহণের তখন হঠাৎ মনে হলো মীনাক্ষী মৃত্যুর রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে, চোখ ফেটে অশ্রুর বান নেমে আসছে…. নদীপথে… বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাসের মতো বিধ্বংসী হয়ে, সে কিছু একটা ধরার জন্য অবলম্বন খুঁজছে… পাচ্ছে না, পাচ্ছে না…। হঠাৎ দিবাস্বপ্ন টুটে গেল, এক ফোঁটা অশ্রু সে সময় গোপন করার কোনো চেষ্টা করল না। মীনাক্ষী তখন স্বপ্নের আবেশে চোখ বুজে আছে বলে রোহণকে দেখতে পেল না।



মুনির ও অজিতকে দিয়ে মীনাক্ষীর মাকে পাঠিয়ে দিলো লক্ষ্মীবাজারে, সেখানে ওর আত্মীয় থাকে। মীনাক্ষীর কথা বলা কমে গেছে। দুর্ভিক্ষের মতো।

বলতে পারে না তা নয়। ইচ্ছে করে না? কথা খুঁজে পায় না বলে! মাঝে-মাঝে ওর চোখ দিয়ে আপনা-আপনি অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। রোহণ যত্ন করে চোখ মুছে দেয়। কাঁদতে সুখ পায় কিনা জানতেও চাইতে পারে না, চাওয়াও যায় না। সুন্দর দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলে আকাশের ওপার থেকেই যেন হাসে। কী ম্লান ও বিষণ্ণ, কী করুণ ও দুঃখাতুর সে হাসি! রোহণের হাত ধরে বুকে টেনে নেয়, কথা বলে যেন সুদূর গ্রহের ভিন্ন মানুষ। নার্স এসে নিয়মমাফিক গায়ের তাপ দেখে লিখে রাখে পায়ের কাছের ঝোলানো তালিকাপত্রে। ভিটামিন বড়ি দিয়ে যায় খাওয়ার পরের জন্য। ডাক্তার আসে হাসিমুখ নিয়ে। তরুণ ডাক্তার। প্রতিদিন সকালে সেঁক দেয়, এক সপ্তাহ দেবে। তারপর পরবর্তী চিকিৎসা। তখন হয়তো বাড়িতে নিয়ে যেতে বলবে। অথবা বলবে আরো কয়েক দিন রাখবে বলে।

রাতে এক বাটি স্যুপ খেল। হাসপাতালের এক কিশোর এনে দেয়। ও সবসময় হাসিখুশি ও চঞ্চল। মীনাক্ষী আঙুর খায় গুনে গুনে পনেরোটি। রোহণ গোনায় তালগোল পাকিয়ে ষোলো-সতেরোটি করতে চায়। মীনাক্ষীর কোনো ভুল হয় না। খোসা খুলে মুখে দিলে ওর মতো মধুর হাসে, কিন্তু ম্লান। বলে, তোমাকে কোনোদিন খাওয়াতে পারলাম না। পাতলা খোসাটা ফেলে দিলে সত্যিই ভালো লাগে।

তুমি ভালো হয়ে ওঠো, আমি কখনো হাসপাতালে এলে তুমি খাইয়ে দিও।

চাই না এরকম করে খাইয়ে দিতে। অমন খাওয়ার দরকার নেই। শত্রুকেও যেন হাসপাতালে আসতে না হয়, এভাবে খাওয়াতে না হয়।

তাহলে কী করে খাওয়াবে?

কেন? সুস্থ তোমাকে খাইয়ে দেব।

ওতে পেট ভরবে না।

মনও কি ভরবে না?

মনের খবর এত জানো কি করে? তুমি কি মনোবিজ্ঞানী!

মনোসন্ধানী।

ঠিক বলেছ।

আমি জানি তুমি আমাকে নিয়ে কী ভাবছ।

রোহণ তখন বুঝতে পারল মীনাক্ষীর ইঙ্গিত। তাই কথা যাতে সেদিকে না যায় সেজন্য বলল, আসলে মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। হাতের রেখা দেখে জ্যোতিষী অনেক কিছু বলে দেয়, সংখ্যা দিয়ে কেউ-কেউ বিচার করে, কপাল বা মুখ দেখে কেউ-কেউ ভূত ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে। আবার কেউবা কররেখা না দেখে আঙুল দেখে ভবিষ্যৎ বলে, আর কোষ্ঠী বিচারপদ্ধতি তো রয়েইছে। তুমি আবার যেন এরকম কিছু করে বসো না। আমি এমনিতেই দু দিন ধরে আবোল-তাবোল স্বপ্ন খেয়ে যাচ্ছি।

কী রকম!

বলেই রোহণ ঝামেলায় পড়ে গেল। কিন্তু তাকে এক্ষুনি তা উৎরে যেতে হবে। তাই একটা উপন্যাসে পড়া স্বপ্নের চিত্র জোড়াতালি দিয়ে বলে গেল। মীনাক্ষী হাসল। তারপর বলল, তুমি ফুটবল ছেড়ে উপন্যাস লিখতে বসবে নাকি! শুরু করেছ কি! শেষ করতে কত দিন লাগতে পারে!

করিনি। মাথার মধ্যে আছে।

কথা শুনতে-শুনতে ও বলতে গিয়ে মীনাক্ষী নেতিয়ে পড়ল। বলল ঘুমোবে।

রোহণ ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। উঠে ছোট বাতিটা জ্বেলে দিলো বড়টা নিবিয়ে। ওর চুল ছুঁলেই রোহণের শিহরণ জাগে। অনেক চুল। গুচ্ছ করে বেঁধে রেখেছে। মা যত্ন করে অাঁচড়ে দেয় যাতে জট পেকে না যায়। কখনোবা বেণি করে দেয়, কালো নদীর মতো দেখায়।

ঘুম পেয়েছিল ঠিকই। খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঘুমিয়ে পড়াতে রোহণের চিন্তা বেড়ে গেল। ওর এখন কী কাজ? কী করে? মাত্র রাত ৯টা। এত তাড়াতাড়ি ওর ঘুম পাবে না। বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। দুপুরে শোয়নি। তাই শুয়ে পড়াতে ভালো লাগল। বইয়ের কথা মনে পড়ল। সঙ্গে বই আছে, কিন্তু ইচ্ছে হলো না।

সে-রাতেও এলোমেলো স্বপ্ন এলো। মৃত্যুর স্বপ্ন নয়। অনেকগুলো নবজাত শিশু ওর বিছানায় শুয়ে আছে। এক জন দু জন নয়, সাত-সাত জন। সবাই মেয়ে। ওর সঙ্গে হাসছে, খিলখিল হাসি, আবার কথাও বলছে মনে হলো। সবার মুখ চেনা-চেনা – মীনাক্ষীর মতো, আলেয়ার মতো, চন্দ্রমল্লির মতো। ওরা হাসছে, দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে। বোঝা যাচ্ছে ওরা কথা বলছে কিন্তু  সে-ভাষা বোঝার উপায় নেই। কথা বলতে-বলতে হাসছে, রোহণের দিকে তাকিয়ে কী-কী যেন বলছে। সে মরিয়া হয়ে একজনকে কোলে নিতে গেল, অমনি সে বড় হয়ে গেল। আরেক জনকে নিতে গেল সেও টুক করে বড় হয়ে গেল। আরেক জনকে নিতে গেল, সেও। আর এক জনকে, আরো এক জনকে। শেষ জনকে কোলে নিয়ে আর ছাড়ল না। বড় হোক, ছাড়বে না আর। ওর নিজের থেকে তো বড় হবে না, ফুটবল খেলার শরীর, বুকের ওপর তুলে পিঠে থাবা মারতে লাগল আদর করে। মুখ দেখতে গিয়ে ভিরমি খেয়ে গেল – আলেয়া। আরেক জন মীনাক্ষী, অন্য জন চন্দ্রবউদি। ওরা তিন জনেই একে-একে বলল, তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো?

আমাকে!

আমাকে!

আমাকে!

অমনি রোহণ চন্দ্রমল্লিকে বলল, তুমি আমার বউদি, তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ। নিজের হাতে আমাকে সবকিছু শিখিয়েছ, পড়িয়েছ। সাঁতার শিখিয়েছ, ঘুম-ঘুম ঐশ্বর্য ও সুখ দিয়েছ…।

অলি, আলা, আলেয়াকে বলল, তুমি বন্ধু।

মীনাক্ষীকে বলল, তুমি আমার বউ।

চন্দ্রমল্লি বলল, শুধু বউদি? আর কিছু নই?

শুধুই বন্ধু? – আলেয়া বলল।

সত্যিই? তাহলে আলেয়া ও-কথা বলছে কেন? – মীনাক্ষী সন্দেহ ছুড়ে মেরে জানতে চাইল। আপত্তিকর ভঙ্গিতে।

অনির্বাণ তোমার কে? লোকে যে বলে…! – আলেয়া মানবিক বোমা ছুড়ে দিলো।

চন্দ্রমল্লি অমনি বলে দিলো, লোকের কথায় কী আসে যায়? আমাদের সম্পর্ক বহু বছরের। আমি বয়সে বড়, মর্যাদায় বড়। ভালোবাসায় আমার অধিকার আছে। ভালোবাসা তো শুধু বিয়ের জন্য নয়, কথার কথাও নয়। বিয়েই-বা করতে পারবে না কেন?

ওদের কথায় রোহণ শিউরে উঠল। ওদের পাশে আরেক জন দাঁড়িয়ে আছে। ওকে রোহণ চিনতে পারল না। ওর কাছে গিয়ে বলল, তুমিও কি আমাকে ভুল বুঝবে? তুমি কে?

সে বলল, না। তুমি সুন্দর। আমাকে তুমি ভালোবাসবে? – বলেই সে রোহণকে সবার সামনে আলিঙ্গনে সঁপে চুমো খেতে শুরু করল। মধুর সুন্দর অমলিন চুম্বন, ঢেউ জাগানো পবিত্র। সেই চুম্বন  রোহণের খুব চেনা মনে হলো, অমনি স্বপ্ন ছুটে চলে গেল কোন তেপান্তরে।



ত্রিংশ অধ্যায়

মীনাক্ষী কি এখনো বেঁচে আছে? নার্স যখন ডাক্তারকে ডাকতে গেল এবং পাখার নিচে রোহণের শরীর থেকে দরদর ঘাম গলে পড়তে লাগল, তখনো ওর মনের মধ্যে শুধু ঘুরপাক খেতে লাগল, মীনাক্ষী কি বেঁচে আছে? ও ভুলে গেল মীনাক্ষীর নাড়ি ধরে দেখতে, ভুলে গেল নাকের নিচে তর্জনী রেখে নিশ্বাস অনুভব করতে। শুধু হাত ধরে আছে, হাত ধরে জীবিত বা মৃত বোঝা যায় না। হাত প্রায় ঠান্ডা, চোখ বন্ধ, বুকের ওঠা-নামা বোঝা যায় না।  এ সময় চোখের সঙ্গে কি মনও ভুল করে বসে… রোহণ জানে না।

মনে-মনে শুধু জপ করছে সে, মীনাক্ষী, তুমি কি বেঁচে আছ? তুমি কি চলে গেলে? আমাদের সবার সঙ্গে তোমার বোঝাপড়া কি শেষ হয়ে গেল? তোমার নিজের সঙ্গেও কি বোঝাপড়া শেষ করে গেল? পৃথিবীর সঙ্গে দেনাপাওনা মিটে গেল অবলীলায়?

ঠিক সে-সময়, মধ্যরাতে একখানা অ্যাম্বুলেন্স ওঁয়া ওঁয়া  ডাক ছেড়ে হাসপাতাল চত্বরে এসে ঢুকল। মীনাক্ষীর হাত ছেড়ে দিয়ে উঠে যদি দক্ষিণের বারান্দায় সে যেত তাহলে দেখতে পেত বিশাল দেবদারু গাছটি প্রতিদিন এই কান্না শুনতে শুনতে মলিন অন্ধকারে শোকাতুর হয়ে পড়েছে। অ্যাম্বুলেন্সটি কান্না থামিয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। একজন রোগীকে নামাচ্ছে দেখতে পেত। সে কি           সন্তানসম্ভাবা, নাকি মৃত্যুপথযাত্রী? রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হয়নি তো? হার্ট অ্যাটাক? তার চেয়ে জরুরি বিষয় মীনাক্ষী কি বেঁচে আছে? ডাক্তার আসছে না কেন? এতক্ষণ দেরি করে কেন ডাক্তার? সে কি মীনাক্ষীকে ফেলে ডাক্তারকে খুঁজতে যাবে?

রোহণ আবার মনে-মনে ডাকল, মীনাক্ষী, তুমি চলে যাচ্ছো, নাকি চলেই গেলে! চলেই যদি যাবে তো এত মায়া বিলিয়ে গেলে কেন! এত মমতা, এত করুণায় ভরে তুললে কেন হৃদয়!

জবাব দেওয়ার মতো ক্ষমতা বা অবসর মীনাক্ষীর নেই। রোহণের হাতের ওপর ওর শীতল শীর্ণ আঙুল একটুখানি নিশ্বাসের জন্য যেন চুপ করে অপেক্ষা করে আছে। কালসিটে পড়া ত্বকের প্রতিটি রোমকূপ যেন হাপিত্যেশ হয়ে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। কী করুণ অসহায় সেই পড়ে থাকা!

অবশেষে ডাক্তার এলো, মীনাক্ষীর একখানা হাত তুলে নিল, নাড়ি পরীক্ষা করল। গলার ওপরে চোয়ালের নিচে শিরা পরীক্ষা করল দুটি আঙুল রেখে। পাশে নার্স দাঁড়িয়ে আছে উৎকণ্ঠা নিয়ে, দেবদূতীর মতো সাদা পোশাকে। ডাক্তার বলল, আর দেরি নেই।

ইনজেকশন দিতে হবে? – নার্স জানতে চাইল।

দরকার নেই। – ডাক্তার নিস্পৃহ রোবটের মতো বলল।

কোনো ওষুধ দিলো না, কোনো রকম উদ্বেগও প্রকাশ করল না মুখে-চোখে। সবই যেন আগে থাকতে জানা। পূর্বনির্ধারিত। রোহণ অস্থির ছটফট করছে ডাক্তারের দিকে চেয়ে, একজন ডাক্তার কী করে এরকম অবস্থায় নির্বিকার থাকে? তাহলে ওরা কি অনুভূতিহীন, মৃত্যু দেখে-দেখে নিষ্ঠুর হয়ে গেছে? অথবা মৃত্যুর খেলা পছন্দ করে, লুকোচুরি, ছি-বুড়ি খেলা?

ডাক্তার চলে গেল।

রোহণ মনে-মনে বলল, মীনাক্ষী, তোমার সব কথা শেষ হয়ে গেল? আমাকে শেষ কথা বলে যাবে না? শুধু বললে তোমার  ঘুমোতে ইচ্ছে করছে। ঘুম তো ভালো। কিন্তু ঘুম তো মৃত্যুর যমজভাই। ঘুমের দেবতা হিপনোস। রাতের দেবী নিক্স। তাদের পুত্র স্বপ্নের দেবতা মর্ফিউস। তুমি তো আমাকে স্বপ্ন দেখাতে। সেই স্বপ্নের এই পরিণতি! আমাকে তুমি কক্ষচ্যুত করলে আমার ভুবন থেকে! অভিযোগ করে বলছি না। স্বপ্নভঙ্গের কথা বলছি। তুমি জাগো, মৃত্যুর যমজভাইয়ের সঙ্গে মিত্রতা করো না। যে-কোনো ধরনের রোগীর জন্য ঘুম  খুব বড় ওষুধ। এজন্য তোমার ঘুমুতে চাওয়া সুস্থতার লক্ষণ মনে করেছি, এবং তাই আমি জানতাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি যে, তুমি এভাবে আমাকে ভুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। দুর্বল মানুষের শরীর ঘুম খোঁজে আমি জানতাম। তুমি অনেকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শুয়ে আছ, ঘুমুতে ঘুমুতে দিনে নিদ্রাহীনতায় ভুগছ মনে করেছি। আমি এখন বুঝতে পারছি মৃত্যুর যমজভাই ঘুম ডেকে এনেছে মৃত্যুকে। মৃত্যু মানুষকে সম্মোহিত করে, বেপথু করে, ভয় দেখায়, মায়া করে ডাকে, বদলা নেওয়ার জন্য প্ররোচিত করে, বিদ্রোহী করে তোলে, আত্মঘাতী হওয়ার গান গেয়ে যায় কানে-কানে – নিষ্ঠুর করুণ ভয়াবহ প্রশান্ত, অনেক তার রূপ।  আর তুমি তার ছলনায় ভুলে  গেলে।



মীনাক্ষীর  চলে যাওয়াকে রোহণ কী বলবে? যন্ত্রণাকাতর, শোকার্ত? অথবা মুক্তি? অথবা কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি? ভুল করেছে সে? কী বলবে? রোহণ জানে না। এত সহজে তা সমাধান হওয়া সম্ভব নয়। মীনাক্ষীর জীবনের খতিয়ান ও মৃত্যুর পরিমাপ রোহণের জীবনে এত অগভীর নয়। এরকম কোনো মৃত্যুই বোধ হয় এত অবহেলার নয়। মীনাক্ষী মৃত্যু ও রোহণের বেঁচে থাকার মধ্যে কি রকম বোঝাপড়া হবে তা কেউ জানে না। রোহণ শুধু এইটুকু জানে, বোঝাপড়া এত সহজ নয় সম্ভবত। তবুও বোঝাপড়া করতে হবে জীবনের জন্য।

মীনাক্ষী চলে গেল হাসপাতালের শয্যায় একটি ছোট পলকা ঘন শ্যামল ছায়ার শরীর ফেলে রেখে। রাতের নির্জনতম সময়ে টিমটিমে বৈদ্যুতিক বাতির আলোছায়ায়, হাসপাতালের কক্ষটিকে ঝিমুনিতে নিক্ষেপ করে শেষ নিশ্বাসটি প্রকৃতির মাঝে উধাও হয়ে গেল। সকল জীবের প্রাণ এভাবে বা অন্য আর একভাবে প্রাকৃতিক বিশ্ব প্রাণভান্ডারে বিলীন হয়ে যায়, অথবা রূপান্তরিত! পৃথিবীর সমুদয় প্রাণশক্তি সমান, বস্ত্তর শক্তিরও তারতম্য হয় না। প্রাকৃতিক শক্তির আর প্রাণীর প্রাণ যা মূলত একই – কোনো কিছুর সামান্যতম হেরফের হওয়ার উপায় নেই – এরকম বিশ্বাস রোহণের মধ্যে দৃঢ় হয়ে গেল। একটি ছোট্ট পিঁপড়েরও প্রাণের ভূমিকা আছে ধরিত্রী মায়ের কাছে। মানুষের কাছে প্রাণের মূল্যের হেরফের হয় – নইলে সে মৃত্যুকে ভুলতে পারত না, নয়তো প্রাণের সংহার করতে পারত না। তার জন্য কখনো উল্লসিত কখনো উৎকণ্ঠিত উদ্বেলিত হতে পারত না। প্রকৃতির কাছে হয়তো সবই সমান, আর যদি অসমান হয় নিজে  দেওয়া-নেওয়া করে পুষিয়ে নেয়, ঝড়ের পর এজন্য শান্ত হয়ে সব পুষিয়ে নেয়। প্রকৃতি এজন্য কখনো নিষ্ঠুর, কখনো কোমল শান্ত। রাত হেঁটে-হেঁটে পাড়ি জমাচ্ছে ভোরের কোলে।

মীনাক্ষীর শরীরখানি নিয়ে রোহণ ভোর হওয়ার অপেক্ষায় রইল একা।



একত্রিংশ অধ্যায়

আরো কয়টি বছর কেটে গেল। রোহণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কলেজে চাকরি পেল শিক্ষকতার। বালক বয়স ও যৌবনের দিনগুলো হঠাৎ ঝলমল করে ছুটে এলো যেন। এখন তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে চাষবাস রাখবে, কি রাখবে না। চট্টগ্রাম শহরে তার কলেজ। সরকারি চাকরি। চাষ বন্ধ করে দিলে চন্দ্রমল্লি ও অনির্বাণকে শহরে নিয়ে আসতে হবে।

মীনাক্ষীর শেষকৃত্যের স্মৃতিরা ধূসর হয়ে আসতে শুরু করছে জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ধোঁয়ার মতো।

গরমের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে রোহণ। হঠাৎ মনে হলো, সে একেবারে একা, নিঃসঙ্গ। পুকুরপাড়ে বাঁশবাগানের নিচে বসে গাছের পাতা ঝরা, মাছের টুপটাপ শব্দের খেলা দেখতে-দেখতে ভাবছে বাড়ির পাট  তুলে দেবে, জমিজমা বেচে দিয়ে শহরে বাড়ি করবে। মা-বাবা, আলী কাকার কথা মনে পড়ছে। একটি উপন্যাস পড়তে শুরু করেছিল একটু আগে। বইয়ের অক্ষরগুলো মেঘলা আকাশ ও বাঁশবনের ছায়ার জন্য ভালো দেখা যাচ্ছে না। অনির্বাণ এখন খুব নেওটা হয়ে গেছে। সঙ্গে ফুটবল খেলতে চায়। গ্রামের স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওকে শহরে নিয়ে গিয়ে ভালো স্কুলে ভর্তি করে দিতে হবে। এই নিয়ে চন্দ্রমল্লির সঙ্গে আলোচনা দরকার। জমিজমা বেচে দেবে কিনা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বলে চন্দ্রমল্লিকে সব কথা খোলাখুলি বলেনি। ওর মতও থাকা চাই। আবার ঝাঁপিয়ে ছুটে আসে ছেলেবেলা।

এমন সময় চন্দ্রমল্লি এসে বলল, বই পড়ছো? আমি তোমাকে ঠিক বিরক্ত করতে চাই না। চাষবাসের কী সিদ্ধান্ত নিলে জানালে না যে!

রোহণের স্কুলবেলায় এভাবে পড়াশুনোর খোঁজ নিত, পড়া দেখিয়ে দিত। কিন্তু আজ একেবারেই অন্যরকম। এভাবে বই পড়ার কথা জিজ্ঞেস করাতে তার হঠাৎ মনে হলো সে বড় হয়নি,   পনেরো-ষোলো বছরের বালক হয়ে গেছে। আবার চাষের কথা আসাতে আরেক রকম হয়ে গেল। রোহণ বাস্তবতায় ফিরে এসে ঘরের দিকে চলল। চন্দ্রমল্লি তখন আর কিছু বলল না।

ঘরে গিয়ে বসল রোহণ। তলস্তয়ের রেজারেকশন উপন্যাসটি নিল হাতে। তখন আবার মনে হলো, সে বড় হয়নি, বারো-চৌদ্দ বছরের বালক, আর চন্দ্রবউদি নববধূ হয়ে এসেছে। উপন্যাসটি হাতে ধরা, পড়ায় ঠিক মন নেই। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মধুর কৈশোর- যেŠবনের রোমাঞ্চ, স্পন্দন অনুভব করছে। চন্দ্রবউদি থেকে  মায়ের স্বপ্নে চলে যায়। বই পড়ায় মন আর নেই। চোখের  সামনে হাতে ধরা বই খোলা। চন্দ্রবউদি এলো চা খাবে কিনা জানতে। ঠিক বালক বয়সের মতো চেয়ারের সঙ্গে ঘন হয়ে দাঁড়ানো, গায়ে সেই আশ্চর্য সুবাস, বিয়ের পরপর নারীর শরীরে যেমন নতুন গন্ধ লেগে থাকে, ঠিক সেই অনুভূতিতে সে চঞ্চল হয়ে উঠল, অমনি সে তার স্বপ্নরাজ্যে চলে গেল, যে  জগৎ সে চিরতরে হারিয়ে এসেছে। সেখানে সে ঢুকে পড়ল, যেন মা গান গাইছে, বুকের দুধ দিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে, কোলে নিয়ে গাইছে ঘুমপাড়ানি গান…। সে-গান গাওয়া সত্ত্বেও চোখে ঘুম আসছে না, ছোট্ট রোহণ দুধ খেয়ে যাচ্ছে…। যে বালক বয়স তাকে প্রায় সময় তাড়া করত, যা একদিন হারিয়ে এসেছে, সেই বয়স ও স্মৃতি আবার ওকে পেয়ে বসল, এবং চন্দ্রমল্লিই যেন ডাকছে সেই জগতে, সেও যেন ফিরে গেছে তার নিজস্ব অনুভবের জগতে, রোহণও ফিরে পাচ্ছে সেই অনুভূতি, সেই দুর্দান্ত শিহরণ জগতের।

মানুষ কল্পনায় স্বপ্নবাস্তবতার রাজ্যে ফিরে গেলেও তার একটা মাত্রা বোধ হয় থাকে, তার দেহটিও হয়তো বাস্তব জগতে পড়ে থাকে। রোহণও শিশু বয়সে চলে গেলেও শরীর তো পড়ে আছে, চেয়ারেই তো বসে আছে বাস্তবতার বয়সটি নিয়ে। চন্দ্রমল্লি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে বলছে, তোমার অনেক দুঃখ, এখন আরো অনেক বেশি ঝাঁপিয়ে পড়েছে একসঙ্গে, তার চেয়ে বেশি দুঃখ সব কথা কাউকে বলতে না পারার। তুমি যা-যা প্রকাশ করতে পার না তা সবই আমি বুঝি, আমি জানি। ঠিক সে-রকম আমিও কিছুই তোমাকে বলতে পারি না। আমার না-বলা কথাগুলো তোমারই তো সবচেয়ে বেশি জানা ও বোঝার কথা। হয়তো সব তুমি জানো, আমিও তা জানি। আজ আমার কোনো ক্ষোভ নেই। কোনো অভিযোগও নেই। কারণ তুমি ফিরে এসেছ তোমার নিজের কাছে। আমিও এতদিন চেয়ে থেকেছি কখন তুমি নিজের কাছে ফিরে আস। তোমার নিজের কাছে ফিরে এলেই জানতাম তোমাকে পাব আমি। মীনাক্ষীকে তুমি বিয়ে করেছ অশেষ করুণাবশত। তুমি খুব ভালো জানতে যে, মীনাক্ষী মরণরোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তারপরও তুমি তাকে বিয়ে করলে। অলির সঙ্গে তোমার বিয়ের কথা ছিল। সেই অলি কিছুতেই তোমাকে বিয়ে করতে চাইল না, তার কারণও তুমি জানো। মানুষ তার ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু বিশেষ-বিশেষ মানুষ পারে নিজেকে অতিক্রম করে যেতে। তুমিও পারবে, তোমাকে পারতে হবে।… বলতে-বলতে মাথাটি বুকে টেনে নিল।



রোহণ সব শুনছে অথচ শুনছে না, সব জানে অথচ জানে না। চন্দ্রমল্লির সব কথাই হয়তো ঠিক, কারণ রোহণের সবই তার জানা, এমনকি তার ভেতরের মনটির ঘরেও তার অবাধ আনাগোনা।

চন্দ্রমল্লি তখন রোহণের মুখটি তুলে ধরে বলল, আমি তোমাকে ঘুম পাড়াতাম মনে আছে?

হ্যাঁ, খুব আছে।

তোমার দাদার সঙ্গে না থেকে তোমার সঙ্গে আমাকে থাকতে বলতে কি?

মনে আছে।

কেন থাকিনি এখন বুঝতে পারছ? নাকি, ছেলেবেলার মতো এখনো বোঝ না। রোহণ এবার চুপ। সে ভাবতে লাগল। তখন সে চন্দ্রকে খুব চাইত। জ্বালাতন করত। ছোটাছুটি দৌড়াদৌড়ি করতে ডাকত। বুকে মুখ গুঁজে গন্ধ শুকত, সাঁতার শেখার সময় কত কান্ড! কত পুলকিত অনুভব, এখন সে সেই ছেলেবেলায় চলে এসেছে…।

রোহণ এখন কী করবে? তার মনে হলো সে বড় হয়নি, সেই বারো-চৌদ্দ  বছুরে স্কুলের ছাত্রটি…। চন্দ্রবউদির বুকে মাথা রাখতে পেরে তার খুউব ঘুম পাচ্ছে, মাথাটা সে ছেড়ে দিলো, নিজের মাথার ভার বইবার শক্তি যে তার নেই আর… তার খুব ঘুম পেয়েছে, ঘুম। কতদিন সে ঘুমোয় না, কতদিন তার এভাবে আকাশ ভাঙা ডাকাত ঘুম আসে না, চন্দ্রবউদি বহুদিন পর তাকে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছে… ঘুম ঘু-উ-ম… ঘু-উ-ম!

চন্দ্রও অবাক হয়ে দেখল রোহণ ওই অবস্থায় ওর বুকে মুখ গুঁজে ঘুমুচ্ছে, সে জানে না রোহণ আবার তার ছেলেবেলায় ফিরে গেছে… হয়তো জানতে পারবে ঘুম থেকে জাগলে… আর       আস্তে-আস্তে চন্দ্রমল্লি অত্যন্ত যত্নে দু হাতে ধরে চেয়ার থেকে দাঁড় করাল, পরম আদরের ছেলেবেলার রোহণকে নিয়ে বিছানার দিকে চলেছে, বিছানায় ঘুমুচ্ছে তাদের অনির্বাণ…।


ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহার, ঢাকা।

No comments

Powered by Blogger.