গরমে সুস্থ থাকতে

সারা দেশে এখন গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে জীবন ওষ্ঠাগত। প্রচণ্ড গরমে শিশু-কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষ রোজ কোনো না কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছেন। এসব স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণটি হচ্ছে হিট স্ট্রোক। এছাড়া আরও কয়েকটি রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে এ সময়। একটু সতর্কতার সঙ্গে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে অস্বাভাবিক এ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
গরমে যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা হয়
আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে আমাদের শরীর থেকে ঘাম নিঃসৃত হয় এবং এই ঘামের সঙ্গে নিঃসৃত হয় সোডিয়াম ক্লোরাইড, যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গরমের দিনে এবং কঠিন পরিশ্রমে শরীর থেকে প্রায় তিন-চার লিটার ঘাম নিঃসৃত হয়, সেই সঙ্গে লবণ বেরিয়ে যায় ১ দশমিক ৫-২ গ্রাম। ফলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে। দেখা দেয় নিন্মোক্ত স্বাস্থ্যগত সমস্যা-
১. হিট স্ট্রোক
২. ডায়রিয়া
৩. গ্যাস্ট্রিক সমস্যা
৪. হজমে গোলমাল
৫. গরমজনিত ঠাণ্ডাজ্বর
৬. সামার বয়েল বা র‌্যাশ
৭. ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা
হিট স্ট্রোক
এই গরমে একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সমস্যার নাম হিট স্ট্রোক। প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে শরীরের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেলে তাকে হিট স্ট্রোক বলে। হিট স্ট্রোকে অজ্ঞান হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুও হতে পারে।
লক্ষণ
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মাদ যায়েদ হোসাইন হিমেল যুগান্তরকে বলেন, গরমের সময় হিট স্টোকের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ৫৫ বছরের বেশি বয়স্ক মানুষ হিট স্ট্রোকের শিকার হতে পারে। হিট স্ট্রোক করলে রোগীর মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করে না। চোখে অন্ধকার বা ঝাপসা দেখতে থাকে। রোগীর শরীরের চামড়া ধরলে বেশ গরম অনুভূত হতে পারে, মাথা ঝিম ঝিম করে ও মাথায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে, বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে, শরীর বেশ দুর্বল ও অবসাদ লাগতে পারে।
করণীয়
ডা. যায়েদ হোসাইন বলেন, কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমেই রোগীর শরীরের তাপমাত্রা কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীকে দ্রুত ছায়ায় নিয়ে বাতাস দিতে হবে। মাথায় পানি দিতে হবে। রোগীকে সম্ভব হলে বরফ বা ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করিয়ে দিলে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা কমে যাবে। তবে এক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে রোগীর কাঁপুনি না ওঠে।
এ সময় সুস্থ থাকতে যা খাবেন হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন কিছু খাবার খেলে আপনি হিট স্ট্রোকসহ গরমের বিভিন্ন রোগ ও এর ঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারেন। সেগুলো হচ্ছে-
ডাবের পানি
গরম থেকে বাঁচতে ডাবের পানির কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে। তাই তো এই গরমে রোজ এক করে ডাব বা বাটার মিল্ক খেতে পারেন, তাহলে দেখবেন শরীর একেবারে চাঙ্গা থাকবে। ডাবের পানি আর বাটার মিল্ক শরীরে খনিজের ঘাটতি হতে দেয় না। ফলে যে কোনো ধরনের শারীরিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কমে।
অ্যাপেল সিডার ভিনেগার
এক গ্লাস পানি নিয়ে তাতে পরিমাণ মতো অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে খেয়ে ফেলুন। এমনটা করলে শরীরে খনিজ এবং ইলেক্ট্রোলাইটসের ঘাটতি দূর হয়। ফলে অতিরিক্ত গরম এবং ঘামের কারণে শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকে না।
অ্যালোভেরা জুস
গরম থেকে বাঁচতে এই প্রাকৃতিক উপাদানটি দারুণভাবে সাহায্য করে। রোজ সকালে এক গ্লাস অ্যালোভেরা জুস পান করলে শরীর গরম সহ্য করার জন্য তৈরি হয়ে যায়, ফলে গরমের কারণে শরীর খারাপ হওয়ার আর কোনো আশঙ্কাই থাকে না।
পেঁয়াজের রস
গরম থেকে বাঁচতে পেঁয়াজের রসের কোনো বিকল্প হয় না বললেই চলে। এই রস কানের পেছন দিকে এবং বুকে লাগাতে হবে। এমনটা করলেই দেখবেন শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস পাবে। সেই সঙ্গে কমবে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও।
তেঁতুল পানি
অল্প পরিমাণ তেঁতুল পানি নিয়ে কম করে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। পরে সেই পানি পান করুন। প্রসঙ্গত তেঁতুলে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় খনিজ, ইলেক্ট্রোলাইটস এবং ভিটামিন, যা শরীরের তাপমাত্রা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ডায়রিয়া, পাতলা পায়খানা হলে কিছুতেই টক খাবেন না।
প্লামের পানি
গরমকালে শরীরে পানির মাত্রাকে ঠিক রাখাই আমাদের সব থেকে প্রথম কাজ। এমনটা করলেই দেখবেন হিট স্ট্রোকের মতো মারণ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে না। আর এ কাজটাই করে থাকে প্লাম। সেই সঙ্গে শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এই ফলটি। ফলে শরীরের প্রদাহ কমে গিয়ে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কা হ্রাস পায়।
মিন্ট জুস
অল্প করে মিন্ট পাতা নিয়ে জুস বানিয়ে ফেলুন। এই জুস গরমকালে রোজ খেলে হিট স্ট্রোকের কবলে পড়ার আশঙ্কা কমে।
চন্দন পেস্ট
শরীরের তাপমাত্রা কমাতে চন্দনের পেস্ট দারুণ কাজে দেয়। অল্প করে চন্দন বেঁটে নিয়ে সেই পেস্ট কপালে এবং বুকে লাগালেই শরীর ঠাণ্ডা হতে শুরু করে।
খাদ্য তালিকায় আরও যা রাখতে পারেন
* এই গরমে পানি, তরলজাতীয় ও ঠাণ্ডা খাবার যেমন লেবুর শরবত, খাবার স্যালাইন, তরমুজ, ঠাণ্ডা দুধ এবং সহজে হজম হয় এমন খাবার খাদ্য তালিকায় রাখুন।
* পূর্ণবয়স্ক মানুষ দৈনিক চার-পাঁচ লিটার পানি পান করতে পারেন।
* ‘পানিশূন্যতা’ বা ডিহাইড্রেশন’ রোধ করতে বারবার খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি স্বাভাবিক সব খাবার গ্রহণ করবেন।
* আপেল, শসা, তরমুজ, লেটুস পাতা, মুলা, লেবু, কমলা গরমের সময় বেশি বেশি খেলে উপকার পাওয়া যায়।
যা খাবেন না
তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারক পানীয় যেমন- চা, কফি গরমের সময় পরিহার করা উচিত। বাইরের খাবার বিশেষ করে ফাস্টফুড পরিহার করুন। তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলবেন। সেই সঙ্গে পরিপাকে সময় লাগে এমন খাবার না খাওয়াই ভালো।
আরও যা করবেন
* পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হলে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন ও তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে, পাশাপাশি স্বাভাবিক সব খাবার খেতে হবে।
* বদহজম বা গ্যাস্ট্রিক থেকে বাঁচতে হলে তেলে ভাজা খাবার, বাইরের খাবার, অধিক ঝাল ও মশলাযুক্ত খাবার পরিহার করুন।
* বারবার গোসল থেকে বিরত থাকুন, নয়তো গরমজনিত ঠাণ্ডা বা জ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন।
* প্রেসারের রোগীরা কিন্তু ওষুধ সময়মতো খাবেন এবং সতর্ক থাকবেন। বেশি সময় চুলার পাশে বা রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকবেন না। গরমের সময় সপ্তাহে একবার প্রেসার চেকআপ করানো উচিত।
ঢিলেঢালা পোশাক
গরমে রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচতে হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা ভালো। পড়–ন সুতি ও আরামদায়ক পোশাক। ঘামে পোশাক ভিজে গেলে দ্রুত পাল্টে ফেলুন। এসময় টেরিকটস, সিন্থেটিকের মতো পোশাক পরে দিনের বেলায় বেরোবেন না। তাতে গরমে ত্বক শ্বাস নিতে পারে না। ফলে শারীরিক অস্বস্তি বেড়ে যায়। বাইরে বের হওয়ার আগে বাইরে বেরোলে সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি নিয়ে বের হন। ওআরএস বা নুন-চিনির পানিও নিতে পারেন। ছাতা, টুপি বা স্কার্ফ ব্যবহার করুন। এগুলো ব্যবহার করলে অনেকটাই রোদের হাত থেকে রেহাই পাবেন। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময়, যতটা সম্ভব একটু ছায়া দেখে হাঁটার চেষ্টা করুন। খুব বদ্ধ এমন কোনো ঘরে একনাগাড়ে বেশিক্ষণ না থাকাই ভালো।

No comments

Powered by Blogger.