বিএনপি বদলাবে কি? by সোহরাব হাসান

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্লোগান নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ। দলটির বয়স ৩৭ বছর। গঠনতন্ত্রে আছে প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল বা জাতীয় সম্মেলন হবে। সে ক্ষেত্রে ১২টি কাউন্সিল হওয়ার কথা। হতে যাচ্ছে ষষ্ঠতম। অর্থাৎ গঠনতন্ত্রের বিধান অর্ধেক মেনে চলেছে বিএনপি। এর আগের সম্মেলন হয়েছে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে। বিএনপির নেতারা বিলম্বিত কাউন্সিলের জন্য বর্তমান বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের দোহাই দেন। কিন্তু অনুকূল পরিবেশ অর্থাৎ বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেও তঁারা নিয়মিত সম্মেলন করেছে, এ রকম নজির নেই। প্রকৃতপক্ষে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলে না। চলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের খেয়ালখুশিমতো। তাঁরা যখন চাইবেন তখন কাউন্সিল হবে, না চাইলে হবে না। আবার কাউন্সিল করলেও তার পূর্বশর্ত মানা হয় না।
এবারের কাউন্সিল নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল, তা আর এখন নেই। বিএনপির নেতাদের আশঙ্কা ছিল সরকার কাউন্সিল করতে দেবে না। প্রথমেই সমস্যা দেখা দেয় জায়গা নিয়ে। বিএনপি কাউন্সিলের স্থান হিসেবে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিলেও প্রথমে সরকার কোনোটিতে সায় দেয়নি। পূর্ত বিভাগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল; কিন্তু পুলিশের অনুমতি মেলেনি। এরপর সরকার যখন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের অনুমোদন দিল, বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হলো, সেখানে স্থানসংকুলান হবে না। সবশেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাংশ ব্যবহারের অনুমতিও মিলল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত অদ্ভুত ঘটনা আছে, তার একটি হলো বিরোধী দলের কাউন্সিল নিয়ে সরকারের টালবাহানা। আওয়ামী লীগের স্থলে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও ব্যতিক্রম হতো না। তবে এত হতাশার মধ্যে আশার খবর, বিএনপির কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমরা আশা করতে পারি, তাঁরা না গেলেও প্রতিনিধি পাঠাবেন। অনুরূপ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলেও বিএনপির প্রতিনিধি আসবেন। এটাই হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
.
যেকোনো দলে জাতীয় কাউন্সিল করার আগে সাংগঠনিক জেলার এবং জেলার কাউন্সিলের আগে উপজেলার কাউন্সিল করার যে বিধান আছে, সেটি কোনো দলই মানে না। বিএনপিও মানেনি। জাতীয় সম্মেলনের আগে অধিকাংশ জেলায় তারা সম্মেলন করেনি অথবা করতে পারেনি। কোনো কোনো জেলায় দেড়-দুই দশকের পুরোনো কমিটি আছে। তাহলে নতুন নেতৃত্ব গড়ে উঠবে কীভাবে? আবার দু-একটি জেলায় সম্মেলন হলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেই কেন্দ্রীয় নেতারা দায়িত্ব শেষ করেছেন। কয়েক দিন আগে পূর্ব সীমান্তের একটি জেলা শহরে গেলে সেখানকার বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের জিজ্ঞেস করি, দলের কাউন্সিলে যাঁরা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাঁদের কীভাবে বাছাই করলেন? জবাবে একজন বললেন, ‘দলের নেতা-কর্মীরা যেখানে প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশই করতে পারছেন না, সেখানে জেলা-উপজেলা সম্মেলন কীভাবে করব।’ তাহলে এর সমাধান কী? আগের কমিটির নেতা-কর্মীরাই প্রতিনিধিত্ব করবেন। বেশির ভাগ জেলার চিত্রই এক। এমনকি কাউন্সিলের আগে বিএনপি খোদ ঢাকা মহানগরেও সম্মেলন বা কমিটি করতে পারেনি। মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে গঠিত আহ্বায়ক কমিটিও নিষ্ক্রিয়। তাঁর ভাগ্য জেলখানা ও জামিনের মাঝখানে দুলছে। প্রশ্ন হলো, এসব নিষ্ক্রিয় কমিটির প্রতিনিধিদের নিয়ে বিএনপির যে জাতীয় কাউন্সিল হতে যাচ্ছে, তা দলকে কতটা উজ্জীবিত করবে?
সর্বশেষ ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন হয়েছিল। সেবার খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন পুনর্নির্বাচিত এবং তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এবার সম্মেলনের আগেই খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপারসন ও তারেক রহমান সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি কোনো পদে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কাউন্সিলররা সব ক্ষমতা দলীয় চেয়ারপারসনের ওপর ন্যস্ত করে চলে যাবেন। এবারের কাউন্সিলে একটি পরিবর্তন আশা করা যায়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারমুক্ত হবেন। কিন্তু দলীয় প্রধানের ইচ্ছা অনুযায়ী এক ব্যক্তি এক পদ নিয়ম মানা কঠিন হবে। দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা শ্রমিক, কৃষক ও মহিলা দলেরও দায়িত্বে আছেন। কেউ কেউ একই সঙ্গে জেলা কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কমিটির আকার বাড়ল কি কমল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিষ্ক্রিয় নেতারা সক্রিয় হবেন কি না? দল নতুন কর্মপন্থা ও কৌশল নিতে পারবে কি না?
৩.
বিএনপি এবার সম্মেলনের প্রতিপাদ্য করেছে ‘মুক্ত করবই গণতন্ত্র’। অর্থাৎ তাদের মতে দেশের গণতন্ত্র এখন অবরুদ্ধ। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগও একই ধরনের প্রতিপাদ্য ঠিক করেছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা কোনো রাজনৈতিক শক্তিই দলীয় কাঠামোয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়নি। গঠনতন্ত্রের সঙ্গে কার্যক্রমের মিল কদাচিৎ ঘটে। আর বিএনপির গঠনতন্ত্রটাই এমনভাবে করা যে সব ক্ষমতা দলীয় প্রধানের ওপর ন্যস্ত। দলীয় গণতন্ত্রের আরেক রূপ দেখলাম সদ্য অনুষ্ঠিত জাসদের সম্মেলনে। দলটি জঙ্গিবাদ ও আগুন-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বুলন্দ আওয়াজ তুললেও একটি কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপি এবার সম্মেলনের আগেই দলীয় চেয়ারপারসন ও জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ তাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন। তাঁরাই বাছাই করবেন অন্যান্য পদের নেতাদের। তাতে কেউ পদোন্নতি পাবেন, কারও পদাবনতি হবে।
৪.
একটি দল তো কেবল সাংগঠনিক কাঠামো ঠিক করতেই কাউন্সিল করে না। কাউন্সিল করে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক মত ও পথ তথা কর্মপন্থাও ঠিক করতে। সেখানে সাধারণ সম্পাদক ছয় বছরের দলীয় কাজের রিপোর্ট পেশ করবেন। এবং তার ওপর কাউন্সিলররা আলোচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করবেন। অতীতের কাজে কোনো ভুলত্রুটি হলে কাউন্সিলে সেটি সংশোধন হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা হলো তারা কেউ ভুল স্বীকার করে না। আর ভুল স্বীকার না করলে সংশোধনেরও প্রশ্ন আসে না। বিগত কাউন্সিলে বিএনপি তাদের আগের শাসনামলের ভুলগুলো স্বীকার করেনি। এবারের সম্মেলনে গত ছয় বছরের কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
কাউন্সিলে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিএনপির শক্ত অবস্থানের ঘোষণা আসতে পারে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে। বিএনপির নেতারা আগে থেকেই বলে আসছিলেন যে মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তারা কৌশলগত জোট বাঁধলেও দুই দলের রাজনীতি ভিন্ন। জামায়াত ধর্মীয় ধ্যানধারণায় পুষ্ট একটি দল। আর বিএনপি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু ২০১২-১৫ পরিসরে দলের গৃহীত কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রেই জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক হয়ে পড়েছিল। বিএনপির নেতারা বলার চেষ্টা করছেন যে, সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যেসব সহিংসতা হয়েছে, তা তাঁদের কর্মীরা করেনি। জামায়াত–শিবির করেছে। বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত–শিবির সহিংসতা করলে তার দায় কীভাবে তাঁরা এড়াবেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি যে জঙ্গিবাদ তোষণ নীতি নেয়, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দলটিকে প্রায় বন্ধুহীন করে ফেলে। এতে কেবল প্রতিবেশী ভারতই বৈরী হয়নি; বিরাগভাজন হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোও। এমনকি যে চীনের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্ব বাংলাদেশে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটিয়েছিল, সেই চীনও বিএনপির বর্তমান রাজনীতিকে সুনজরে দেখছে না। ২০০৮ সালের পর নির্বাচনের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান না করে সব দায় ‘ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের’ ওপর চাপিয়ে দিয়ে বিএনপির পার পাওয়ার চেষ্টা সফল হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। মনে রাখা প্রয়োজন, বিএনপির ভুল নীতিই এক–এগারোকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মধ্যপন্থী এই দলটি বহুধারার সমন্বয়ে গঠিত হলেও সাবেক বামরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। ফলে দৌরাত্ম্য বেড়েছে ডানদের। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন কিংবা ২০১৫ সালে তিন মাসব্যাপী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষ তো বটেই দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মনোভাবও জানার চেষ্টা করেননি শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের বৃহত্তর অংশই মনে করে ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত ছিল। সে সময়ে লন্ডন থেকে পাঠানো চরমপত্রগুলো যে দলকে হঠকারী পথে ধাবিত করেছে, সে কথাও বলার অপেক্ষা রাখে না।
৫.
বিএনপি সূচনা থেকে যে নেতিবাচক রাজনীতি করে আসছে, সেটি হলো আওয়ামী লীগ বিরোধিতা। আওয়ামী লীগ যেহেতু বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, সেহেতু তারা সোনার পাথরবাটির মতো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আবিষ্কার করেছে। আওয়ামী লীগ যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে, সেহেতু তাকে বর্জন করতে হবে। এটাই বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন। গেল শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে সেই দর্শন রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তা সম্ভব নয়। এখন বিএনপিকে জনগণের সমর্থন পেতে হলে জনগণের মৌলিক সমস্যাকে নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। কাউন্সিলকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো বিএনপি বদলাবে কি? বদলানো মানে স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ধারণ করা; বদলানো মানে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।
বদলানো মানে দলের সর্বস্তরে গণতন্ত্রের অনুশীলন। বদলানো মানে অতীত নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি না করে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো। বদলানো মানে প্রত্যাদেশের অপেক্ষায় না থেকে বাস্তবতার আলোকে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ। বদলানো মানে দলে তারুণ্যকে স্বাগত জানানো। গণমানুষের সপক্ষে কর্মসূচি নেওয়া। আর সেটি যে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী কোনো শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে সম্ভব নয়, সে কথাও হলফ করে বলা যায়।
আজকের কাউন্সিলই নির্ধারণ করবে বিএনপি নেতৃত্ব কোন পথে যাবে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.