বিএনপি কেন করেন? by মশিউল আলম

সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। ১০টায়, ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে যখন বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধন হওয়ার কথা, তখনো মেঘেরা ছায়া দিচ্ছিল। কিন্তু কাউন্সিলে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে এত নেতা-কর্মী এসে জড়ো হয়েছেন যে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের দুটো গেটের সামনে ও আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে ঘামের গন্ধে। প্রাচীরঘেরা স্থাপনাটির ভেতরে সাজানো প্যান্ডেলে ঢোকার জন্য ডেলিগেট, কাউন্সিলর ও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে প্রবল হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি, চিৎকার।
শাহবাগের মোড় থেকে মৎস্য ভবনের মোড় পর্যন্ত সড়কে সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। গলায় ডেলিগেট ও কাউন্সিলরের কার্ড ঝুলিয়ে, কাউন্সিল উপলক্ষে কোনো নেতার সৌজন্যে তৈরি টি-শার্ট পরে, কিংবা এসব ছাড়াই অজস্র নেতা-কর্মীর পদচারণে মুখর পুরো এলাকা। শিশুপার্কের সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের পশ্চিম পাশের প্রাচীরের পাশ পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে প্রচুর নেতা-কর্মীর সমাগম। কাউন্সিলের আপ্যায়ন উপকমিটির এক সদস্য বললেন, তাঁরা ৩০ হাজার মানুষের খাবারের বন্দোবস্ত করেছেন। ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন প্রায় ১০ হাজার।
মাদারীপুরের কালকিনি থেকে এসেছেন উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক বি এম রেজাউল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে পান-সিগারেটের এক দোকানের পাশে গল্প করছিলেন কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের কথাবার্তায় কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ। কাউন্সিলের জন্য সরকার সুপরিসর কোনো জায়গা দেয়নি বলে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘স্বৈরাচার’ সরকারের প্রতি ক্ষোভ। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাঁদের আলাপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। জানতে চাইলাম, এই কাউন্সিল থেকে তাঁরা কী আশা করছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কথাবার্তায় বক্তৃতার ঢঙ এসে গেল। এসএসসি পাস পরিবহন ব্যবসায়ী বি এম রেজাউল বললেন, ‘এই কাউন্সিলে আমরা নতুন দিকনির্দেশনা পাব। ম্যাডাম বলবেন, কীভাবে আন্দোলন করতে হবে, কেমন করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে।’ আমি তাঁকে ভাই সম্বোধন করে বললাম, ‘একটু মনের কথা বলেন। আন্দোলন করার সামর্থ্য কি আপনাদের আসলেই আছে?’ রেজাউল পাল্টা আমাকেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বিএনপি শেষ হয়ে গেছে?’ বললাম, ‘আপনারা যে বলছেন এই সরকার স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট, তাহলে এত বড় দল হিসেবে আপনারা কী করছেন?’
‘কী করব, বলেন? আমার বিরুদ্ধে পাঁচটা মিথ্যা মামলা। অ্যারেস্ট হইছি তিনবার। লাখ টাকা খরচ হইছে জামিন পাইতে। কখন আবার অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায় তার ঠিক নাই।’ পাশ থেকে শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলা যুবদলের সভাপতি নাসিরউদ্দিন বলে উঠলেন, ‘এই সরকার হলো মামলা আর হামলার সরকার।’
‘তাহলে আপনারা কী করবেন? এই সরকারকে হঠাবেন কীভাবে?’
‘আল্লাহ ভরসা। এভাবে চিরদিন চলবে না।’
আল্লাহর ওপর ভরসার কথা উচ্চারিত হলো আরও বেশ কয়েকজনের মুখে। ‘এইভাবে চিরদিন চলবে না’—এমন মরিয়া আশাবাদের বিপরীতে অবশ্য দমন-পীড়নে কোণঠাসা অবস্থার কথাই শোনা গেল বেশি। যাঁর সঙ্গেই কথা বলি, তিনিই বলেন ‘মিথ্যা মামলা’ আর পুলিশি হয়রানির কথা। গোবিন্দগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি ফারুক আহমেদ বললেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে ১৯টা। গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনবার, শরীরে পুলিশি নির্যাতনের চিহ্ন দেখাতে চাইলেন; বললেন, জামিন পেতে খরচ করতে হয়েছে অস্বাভাবিক অঙ্কের টাকা। মুন্সিগঞ্জের কুমারভোগ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মজিবর রহমান খান লাবলু বললেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে আটটা, ২০ দিন জেল খেটেছেন, পুলিশি রিমান্ড এড়াতে পেরেছেন সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ করে। লৌহজংয়ের জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের এক নেত্রী বললেন, ‘আমার বিরুদ্ধে পাঁচটা মামলা। আমি বলে বাস পোড়াইছি, মারামারি করছি, কারেন্টের তার ছিঁড়ছি।’ তাঁর পাশ থেকে আরেক নেত্রী বলে উঠলেন, ‘বইয়া রইছি সরার্দি উদ্যানে, মামলা হইতে পারে আমি মাওয়া ঘাটে মারামারি করছি!’
‘এত মামলা আর এত হয়রানি সত্ত্বেও আপনারা বিএনপি করেন কেন?’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে এক যুবক বলে উঠলেন, ‘গণতন্ত্র মুক্ত করার পরে আর করুম না।’ অন্যরা হো হো করে হেসে উঠলেন। আরেকজন বললেন, ‘আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র সিন্দুকে ভইরা তালা মাইরা রাখছে। আমরা ওই তালা ভাঙ্গুম।’
‘কীভাবে ভাঙবেন? আপনারা তো দৌড়ে দিশা পাচ্ছেন না!’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে আরেকজন বললেন, ‘দেখেন, কেমনে কী হয়! অয়েট করেন!’
সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে যে বিএনপি প্রবল আন্দোলন করেছিল, সেই দল আজ আওয়ামী লীগের হাতে পর্যুদস্ত কেন, কেন তারা আন্দোলন সংগঠিত করতে পারছে না—এই প্রশ্ন অনেককে করেছি। উত্তরে প্রায় সকলেই বলেছেন, মিছিল বের করলেই যদি গুলি খেয়ে মরতে হয়, তাহলে আন্দোলন করা কঠিন। লৌহজংয়ের এক নেতা অবশ্য বললেন, বিএনপির কিছু বয়স্ক নেতার জন্য আন্দোলন হচ্ছে না, কারণ এই নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগসাজশ করে চলছেন। গোবিন্দগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন পাতা বললেন, বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জামায়াতের কুপরামর্শে বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিরাট ভুল করেছে। জোটের কারণে বিএনপির বক্তব্য স্পষ্টভাবে জনগণের কাছে পৌঁছায়নি।
জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার ফলে বিএনপির খুব ক্ষতি হয়েছে, জামায়াতের অনেক কর্মী বিএনপি ও ছাত্রদলের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন—এমন কথাও বললেন অনেকে।
খালেদা জিয়ার বয়স হয়েছে, বিএনপির নেতৃত্বে এখন তারেক রহমানকে প্রয়োজন—এই মত ব্যক্ত করলেন পাঁচজন। একজন ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একদমই অসম্ভব হলে বিএনপির হাল ধরবেন তাঁর স্ত্রী জোবাইদা রহমান। তাঁর মতে, তখন বিএনপি ভীষণ ‘চাঙা’ হবে। এঁরা সবাই আমাকে তাঁদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেলা পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বললেন, এই কাউন্সিল বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। টাকার বিনিময়ে (৮ লাখ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত) ও তদবিরের জোরে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়া যদি বন্ধ না হয়, যদি তাঁর ভাষায় ‘ত্যাগী ও পরিশ্রমী’ নেতারা কমিটিতে স্থান না পান, তাহলে বিএনপি আরও ক্ষয়িষ্ণু দলে পরিণত হবে। কারণ, ক্ষমতাসীন সরকারের সাত-আট বছরের দমন-পীড়নে বিএনপির সক্রিয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলা করার জন্য তৃণমূল পর্যায়ে ‘ত্যাগী ও পরিশ্রমী’ নেতাদের প্রয়োজন, টাকাওয়ালা ও তদবিরবাজ নেতাদের দিয়ে সেটা হবে না।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.