প্যারিস এবং আইসিস by হামিদ মীর

খুব বেশি দিন হয়নি। ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর পক্ষ থেকে ফ্রান্সের ১২টি মহাসড়কের নাম এমন সাংবাদিকদের নামে নামকরণ করা হয়েছে, যাদের গত কয়েক বছরে হত্যা করা হয়েছে বা কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। প্যারিসের একটি স্ট্রিটের নাম দেয়া হয়েছে সালিম শাহজাদ স্ট্রিট। এটি ওই স্ট্রিট যেখানে পাকিস্তানি দূতাবাস অবস্থিত। সালিম শাহজাদকে ২০১১ সালে ইসলামাবাদ থেকে অপহরণ করা হয় এবং ঝিলামের একটি শাখা নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার হত্যাকারী আজ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সালিম শাহজাদসহ ১২ জন সাংবাদিকের নামকে প্যারিসের ইতিহাস ও ভূগোলের অংশ বানিয়ে সাংবাদিকদের অন্য সংগঠনকে জোরালো ধাক্কা দিয়েছে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও ব্রাজিলের কিছু সাংবাদিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ২৭ নভেম্বর প্যারিসে একটি বৈঠক ডাকা হবে। ৩০ নভেম্বর থেকে প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হবে এবং সারা বিশ্বের সাংবাদিক প্যারিসে সমবেত হবেন। ২৭ নভেম্বর বৈঠকের উদ্দেশ্য ওই সম্মেলন উপলক্ষে আগত সাংবাদিকদের এ কথা জানানো যে, সোমালিয়া, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া ও মেক্সিকোর পর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও ব্রাজিলেও সাংবাদিকদের হত্যা করা হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের হত্যা বন্ধের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকা খুবই প্রয়োজন। ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসকে ধন্যবাদ দেয়ার কথা ছিল, কেননা এ সংগঠনের কেন্দ্রীয় দফতর প্যারিসে। ওই প্রতিনিধিদলে আমাকেও রাখা হয়েছিল। ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় কলম্বো থেকে এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে ফোনে অবহিত করলেন, ২৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। ৩০ নভেম্বর প্যারিসের আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে আনুষঙ্গিক আরো অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৪ নভেম্বর প্যারিসে ঘটিত হামলার পর কিছু অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।
১৪ নভেম্বরের হামলা ফ্রান্সের নাইন-ইলেভেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা মুসলমানদের জন্য সঙ্কট তৈরি করেছিল। ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বরের হামলাও মুসলমানদের জন্য ইউরোপের ভেতর ও বাইরে বেশ জটিলতা সৃষ্টি করবে। নাইন-ইলেভেনে একজন পাকিস্তানিও জড়িত ছিলেন না। তারপরও নাইন-ইলেভেনের ধ্বংসযজ্ঞে পাকিস্তানের উপজাতীয় গোত্রীয় অঞ্চলগুলো ও খায়বারপাখতুনখাওয়া তছনছ হয়ে যায়। প্যারিসে ১৪ নভেম্বরের হামলাতেও কোনো পাকিস্তানি জড়িত ছিলেন না। কিন্তু পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, হামলাকে পুঁজি করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক নতুন অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আলজাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রামাণ্য চিত্রে আফগান সেনাবাহিনী ও আফগান তালেবানের প্রতিনিধিদের বলতে দেখা গেছে যে, আফগানিস্তানে দাঈশ বা আইসিস বা আইএসের তৎপরতা এমন লোকেরা শুরু করেছে, যারা অতীতে নামসর্বস্ব লস্করে তইয়েবার সাথে যুক্ত ছিল। আশ্চর্য কাহিনী। পাশ্চাত্য শক্তিগুলো আগে ইরাক ও সিরিয়াতে আইএসকে নিজেদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। এখন তালেবান ও ইরানবিরোধীদের বিরুদ্ধে আইএসকে ব্যবহার করতে প্রস্তুত। একটা সময় পশ্চিমারা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করেছে। এরপর সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘটিয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলায়। সাদ্দাম হোসেনের ফাঁসির পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। সাদ্দাম হোসেন ও উসামা বিন লাদেনের শরীরী অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। এখন আইসিসের অস্তিত্ব দাঁড় করানো হয়েছে। যাদের উগ্রতায় আলকায়েদার চেয়ে দশ কদম অগ্রসর দেখা যাচ্ছে।
আইএস প্যারিস হামলার দায় স্বীকার করে পাশ্চাত্য শক্তিগুলোকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর হামলার বৈধতা তৈরি করে দিয়েছে। প্যারিস হামলার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। পাকিস্তানের উচিত মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোকে এক যৌথ কর্মসূচি গ্রহণে আকৃষ্ট করা।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১৬ নভেম্বর, ২০১৫ হতে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
* হামিদ মীর : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

No comments

Powered by Blogger.