আফগান তালেবানের ভবিষ্যৎ by হামিদ মীর

মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর সত্যতা স্বীকার করা আফগান তালেবানের জন্য এক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। তার পরও তাদের এ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর সত্যতা স্বীকারের পর জালালুদ্দিন হাক্কানি ও মোল্লা মুহাম্মদ ইয়াকুবের মৃত্যুরও দাবি করা হয়। তবে সে দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। অনেকের ধারণা, মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণের ব্যাপারে আফগান তালেবানের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে এবং তাদের সশস্ত্র কর্মসূচিও দুর্বল হয়ে পড়বে। মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের স্থানে মোল্লা আখতার মানসুরকে তালেবানের নয়া আমির বানানোর ঘোষণার পর কিছু আপত্তি উত্থাপিত হয়েছিল। তবে মোল্লা আখতার মানসুর দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই কাবুল সরকারের সাথে আলোচনা বাতিল করে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তিগুলোর শক্ত অবস্থানকে দুর্বল করে দেন। কেননা আপত্তি উত্থাপনকারীদের নিরাপত্তা মোল্লা আখতার মানসুরের ব্যক্তিত্বের পরিবর্তে কাবুল সরকারের সাথে আলোচনার ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল ছিল। মোল্লা আখতার মানসুরের নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি উত্থাপনকারীদের মধ্যে মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের এমন কিছু সাথীও রয়েছেন, যারা কিছুকাল ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করে আসছেন। এ অভিযোগগুলো পাকিস্তানের জন্য বেশ কঠিন সমস্যা তৈরি করতে পারত, তবে পশ্চিমা মিডিয়া ও আফগান সরকারের প্রোপাগান্ডা আফগান তালেবানকে এটা ভাবতে বাধ্য করেছে যে, মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর পর তারা যদি নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক নতুন লড়াই শুরু করে তাহলে ফায়দা হবে দুশমনের। দুশমনেরা দাবি করেছে মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যু পাকিস্তানে হয়েছে। তালেবান ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে দুশমনেরা বলে, মোল্লা মুহাম্মদ ওমরকে আফগানিস্তানে দাফন করা হয়েছে বটে, তবে তাকে হত্যা করা হয়েছে পাকিস্তানে। এ দাবিও প্রত্যাখ্যাত হলে এক নতুন মনোরম দাবির জন্ম হয়। এক সাংবাদিক লিখেছেন, মোল্লা মুহাম্মদ ওমর করাচির লি মার্কেটে আলু বিক্রি করতেন। করাচি ও কোয়েটায় মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের উপস্থিতির দাবি যারা করেছেন, তারা আজ পর্যন্ত নিজেদের বক্তব্যকে সত্য প্রমাণের জন্য সামান্যতম কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। মোটকথা মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর পর তালেবানের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার ঝড় তালেবানের ক্ষতির পরিবর্তে উপকার সাধন করেছে। তারা একে অপরের সাথে মিলেমিশে নিজেদের মধ্যকার মতবিরোধ দূর করার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে মাওলানা সামিউল হক ও ড. শের আলী শাহ সাহেবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মোল্লা আখতার মানসুরের প্রতি আপত্তি উত্থাপনকারী আফগান তালেবানদের একটি প্রতিনিধিদল দারুল উলুম হাক্কানিয়া আকোড়া খাট্টাক পৌঁছে এবং মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দিকনির্দেশনা আবেদন করে। মাওলানা সামিউল হক তাদের নিজেদের পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধ দূর করার পরামর্শ দেন। এরপর মাওলানা মোল্লা আখতার মানসুরের প্রতি আপত্তি উত্থাপনকারী কিছু তালেবান নেতার সাথে নিজে যোগাযোগ করেন এবং ধীরে ধীরে মোল্লা আখতার মানসুরের বিরোধীরা চুপ হয়ে যায়। মোল্লা আখতার মানসুরের পক্ষ থেকে কাবুল সরকারের সাথে আলোচনার কর্মসূচি বাতিল করার পর আফগানিস্তানে তালেবানের হামলায় তীব্র গতিসঞ্চার হয়েছে। তালেবান কাবুলে পুলিশ অ্যাকাডেমি ও পশ্চিমা সৈন্যদের একটি কেন্দ্রে হামলা করে বিশ্বশক্তিকে এ পয়গাম পৌঁছিয়ে দিয়েছে যে, মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর পরও তালেবান কার্যকর শক্তি হিসেবে টিকে আছে। সম্ভবত ওই হামলাগুলোরই প্রতিফল যে, পাকিস্তানে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত আকোড়া খাট্টাক মাওলানা সামিউল হকের কাছে ছুটে যান এবং তার কাছে আবেদন করেন, তিনি যেন আফগান তালেবানকে আলোচনার কার্যক্রম আবার শুরু করতে রাজি করান।
মাওলানা সামিউল হক আলোচনার পক্ষে, তবে তিনি আফগান রাষ্ট্রদূতকে তালেবানের নিরাপত্তা ও সাবধানতা অবলম্বন সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের জেলগুলোতে বন্দী তালেবানদের ওপর কঠিন নির্যাতন চলা অবস্থায় প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকার যেন মোল্লা আখতার মনসুরের চালচলনে কোনো নমনীয়তার আশা না করে। মাওলানা সামিউল হক সর্বদা আফগান তালেবানের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার রাজনীতির সাথে মতবিরোধ করা যেতে পারে। তবে তার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। সম্প্রতি তিনি আফগান তালেবান সম্পর্কে ইংরেজিতে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। যার নাম Afghan Taliban : War of Ideology, Struggle for Peace (আফগান তালিবান : ভাবাদর্শের যুদ্ধ, শান্তির জন্য সংগ্রাম)। ওই গ্রন্থে তিনি আফগান তালেবান ও মোল্লা মুহাম্মদ ওমর সম্পর্কে বেশ কিছু ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের দারুল উলুম হক্কানিয়ায় পড়ালেখা করার কোনো রেকর্ড নেই, তা সত্ত্বেও তিনি দারুল উলুমের দু’জন পুরনো ছাত্র মৌলভি ইউনুস খালেস ও নবী মুহাম্মদীর ছাত্র। দারুল উলুম হক্কানিয়া মোল্লা মুহাম্মদ ওমরকে এক সম্মানসূচক ডিগ্রি অবশ্যই প্রদান করেছে। ওই গ্রন্থের তথ্য মোতাবেক মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের বিবি দু’জন। মাওলানা সামিউল হক লিখেছেন, মোল্লা মুহাম্মদ ওমর মেয়েদের শিক্ষার বিরোধী ছিলেন না। তবে তিনি সহশিক্ষার বিরোধী ছিলেন। ওই গ্রন্থে মাওলানা দাবি করেছেন, তালেবান শাসনামলে রীতিমতো প্রথম আফগানিস্তানের ক্রিকেট টিম গঠন করা হয় এবং তালেবান সরকার পাকিস্তানের মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভের চেষ্টা করে, তবে এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
ব্রিটিশ সাংবাদিক জেমস ফার্গুসন আফগান তালেবান সম্পর্কে তার এক গ্রন্থে লিখেছেন, আফগানিস্তানের ইতিহাসে মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের কাছ থেকে যে সম্মান কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, তা হচ্ছে, তিনি তার শাসনামলে পপি চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং ‘সাভারা’র মতো প্রথাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যে প্রথায় গোত্রীয় শত্র“তা দূর করার জন্য মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া হতো। ফার্গুসন লিখেছেন, মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের শাসনামলে কারি বরকতুল্লাহ সালিম কাবুলে একটি গার্লস স্কুল পরিচালনা করতেন, যেখানে সাত হাজার ছাত্রী পড়ালেখা করত। মোল্লা মুহাম্মদ ওমর আফগানিস্তানে হিন্দু ও অন্য বিধর্মীদের নিরাপত্তার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বিশ্বমিডিয়ায় তার ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। বিশ্বমিডিয়া মোল্লা মুহাম্মদ ওমর ও আফগান তালেবানকে শুধু আল কায়েদার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখেছে। পাকিস্তানের সরকারগুলো সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মোল্লা মুহাম্মদ ওমরকে আলকায়েদা ও ওসামা বিন লাদেন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। মোল্লা মুহাম্মদ ওমর সব সময় পাকিস্তানের স্বার্থের প্রতি খেয়াল রেখেছিলেন, কিন্তু পাকিস্তান সরকারের ইচ্ছা ও আবেদন শেষ পর্যন্ত কখনো বুঝে উঠতে পারেননি।
২০১০ সালে আফগান তালেবান ও পাক সরকারের মধ্যে বেশ ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়। মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী উবায়দুল্লাহ আখুন্দ পাকিস্তানের এক জেলখানায় মারা যান এবং তার পরিবারের কাছে মৃত্যুর খবর গোপন রেখে তাকে চুপচাপ দাফন করে দেয়া হয়। তালেবান সরকারের আরো একজন সাবেক মন্ত্রী উস্তাদ ইয়াসিরও পাকিস্তানের এক জেলখানায় গোপন মৃত্যুর শিকার হন। এরপর মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের আরো একজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী মোল্লা আব্দুল গনি বেরাদারকে করাচিতে গ্রেফতার করা হয়। আমার এ কথা বলার প্রয়োজন নেই যে, ২০১০ সালে পাকিস্তানের কোন কোন দফতরে কে কে প্রধান ছিলেন। তবে আফগান তালেবানকে জোরজবর-দস্তিমূলক আমেরিকা ও হামিদ কারজাইর সাথে আলোচনায় রাজি করার প্রচেষ্টায় তারাই লিপ্ত ছিলেন, যারা পরে সিআইএর এজেন্ট রেমন্ড ডেভিসের মুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজেদের অবসারকালীন জীবনে বিদেশে চাকরির বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন। এটা এমন একটা সময়, যখন মোল্লা মুহাম্মদ ওমরকে ভারতসহ বেশ কিছু দেশ নিজেদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মোল্লা মুহাম্মদ ওমর সর্বাত্মক অভিযোগ সত্ত্বেও পাকিস্তানের ব্যাপারে চুপ থাকেন। তা সত্ত্বেও আফগান তালেবানের ওপর পাকিস্তানের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশ কমে যায়। মোল্লা মুহাম্মদ ওমরের মৃত্যুর পর তালেবান ও আফগান সরকারের মাঝে আলোচনার কর্মসূচি বাতিল হয়ে গেছে। এ কর্মসূচি আবার শুরু হওয়া উচিত। তার পরও এ ব্যাপারে পাকিস্তানকে সতর্কতা, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিকে ধৈর্য ও প্রজ্ঞা এবং বিশ্বশক্তিগুলোকে নিরপেক্ষতা প্রকাশ করতে হবে। আফগান তালেবানের জাতিসত্তা ও স্বার্থকে সামনে রাখতে হবে। যদি তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করা হয় এবং মিথ্যা বলা হয়, তাহলে পাল্টা জবাব হিসেবে বিস্ফোরণের আওয়াজের পর আওয়াজ আসতে থাকবে।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং
১০ আগস্ট, ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com
লেখক- হামিদ মীর: পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

No comments

Powered by Blogger.