আদুরীদের পাশে দাঁড়াবার ডাক দিয়ে যাই by সাইফুল আলম

‘কত নদী, কত মরু, কত যে সাগর,
পার হয়ে এলি তুই শিশু জাদুকর।’
শিশুরা পৃথিবীতে আসে স্বর্গের দূতরূপে। তাদের নিষ্পাপ পবিত্রতা জাদু বলে প্রতিভাত হয়। যে উপলব্ধিকে কবি বর্ণনা করেন শিশু জাদুকর রূপে। পৃথিবীতে আসা স্বর্গের দূত শিশুদের পৃথিবীর সর্বত্রই চোখের মণির যত্নে লালন করা হয়। পালন করা হয় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে। ব্যতিক্রম শুধু আমরা। আমরা স্বর্গীয় দূত এই শিশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিই আমাদের সব কলুষ, ব্যর্থতা। মনুষ্যত্ব দূরের কথা, অনেকেই আমরা তাকে স ষ্টার সৃষ্টি একটি অসহায় প্রাণী বলেও বিবেচনা করি না। আর তাই হাঁটতে শিখতে না শিখতেই আমরা তার কাঁধে চাপিয়ে দেই শ্রমের জোয়াল। জঠর জ্বালায় বিক্রি হয়ে যায় কোলের সন্তান। এসব আমাদের দেশে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। কিন্তু সেই জানাশোনা বিষয়টিও মাঝে-মধ্যেই খবর হয়ে বজ বিদ্যুতের মতো ঝলসে ওঠে সংবাদপত্রের পাতায়। তেমনই একটি মর্মন্তুদ খবর ডাস্টবিন থেকে মৃতপ্রায় শিশু আদুরীকে উদ্ধার। মৃত ভেবে নির্যাতনকারী গৃহবধূ আদুরীকে ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছিল- এই সংবাদ ইসলামের ইতিহাসের সেই আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেয়ার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দুর্বিষহ ওই সংবাদ মানুষের চোখের অশ্র“কেও বাষ্পে পরিণত করে। হায় মানবতা! সেই মহিলার নাম ‘নদী’- অথচ হাঙ্গরের মতো তার আচরণ। গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার যথার্থই বলেছিলেন, ‘কি বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস!’ পিতা-মাতা যে কন্যাশিশুটিকে আদুরী নামে ডেকেছিলেন পরম মমতায়, তার প্রতি অনাদর আর বর্বরতার কি সীমাহীন পরাকাষ্ঠা!
২.
গত শতকের আশির দশকে তখন আমি দৈনিক জনতার সিনিয়র রিপোর্টার। অফিসের কাজে রংপুর গেলাম। সেখানে দেখা হল সংবাদের সে সময়কার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি মোনাজাত উদ্দিনের সঙ্গে। নানা কথার ফাঁকে মোনাজাত ভাই বললেন, সাইফুল এখানে একটি মেয়ে আছে অন্ধ। চিকিৎসা পেলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। কিন্তু অর্থাভাবে সেটি হচ্ছে না। আপনি ওকে নিয়ে জনতায় লেখেন। যদি কিছু হয়। যদি কারও দয়া বা করুণায় মেয়েটি আবার সব দেখতে পায়।
মোনাজাত ভাইয়ের কথার মধ্যে এমন গভীর আন্তরিকতার ছোঁয়া ছিল যে আমি তা এড়াতে পারিনি। দৈনিক জনতা তখন টিকাটুলি অভিসার সিনেমা হলের সামনে থেকে বের হয়। পত্রিকার মালিক তখনকার অঘোষিত প্রধান সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পত্রিকাটি দেখভাল করতেন তার ভায়রা ভাই মোস্তাফিজুর রহমান। ওই পত্রিকায় তখন যে কোনো নাগরিক ও মানবিক প্রকৃত সমস্যা নিয়ে লিখলেই পরদিন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। খুব ভোরে কাগজ পড়তেন এরশাদ এবং যথারীতি ‘জনতা’ সবার আগে। তাই ব্যবস্থা নিতে দেরি হতো না। যে কারণে সে সময় কাগজটি ব্যাপক জনপ্রিয়তাও লাভ করে। কিন্তু এক বছরের মাথায় মোস্তাফিজুর রহমানের কারণে সে কাগজ থেকে সব সাংবাদিক এক সঙ্গেই বিদায় হন। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে অনেকদিন চলেছে পরিবর্তিত মালিকানায় এখনও চলছে। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
রংপুরের অন্ধ মেয়েটিকে নিয়ে লিখলাম আমি ‘গোলাপ তার প্রিয়, গোলাপের নামে নাম তবু গোলাপ সে চোখে দেখেনি।’ জনতার প্রথম পাতায় ছবি দিয়ে গোলাপের করুণ কাহিনী ছাপার পরদিনই এরশাদ সাহেবের নির্দেশে সরকারের বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা শুরু হয়ে যায়। সুস্থ হয়ে ওঠে গোলাপ। আবার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় সে। তারপর যথারীতি ফিরে যায় রংপুরে।
জানি না কোথায়, কেমন আছে গোলাপ? দু’একবার দেখা সেই মুখটিও আর মনে নেই। কিন্তু স্মৃতিটা এখনও জ্বলজ্বল করছে। স্মৃতি কি কেবল বেদনাই জাগায়? নাকি বেদনার ভেতরও এক ধরনের আনন্দ ধারণ করে। আশা করব, গোলাপ এখনও বেঁচে আছে, আর এখন সে তার প্রিয় ফুল গোলাপ দেখতে পায়।
এতদিন পর গোলাপের কথা মনে পড়ল মিডিয়ায় আদুরীর খবর পড়ে ও দেখে। অভাবের সংসারে ৯ সন্তানের পরিবারে কত ভালোবেসেই না তার বাবা-মা নাম রেখেছিল আদুরী। কোথায় থাকার কথা, অথচ তাকে পাওয়া গেল ডাস্টবিনে। ২৩ সেপ্টেম্বর। অভাবের সংসারের একটি ছোট্ট মেয়ের জীবনযুদ্ধের শুরুটা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। তার পুরো শরীরে নির্যাতনের বিষাক্ত ছোবল সভ্যতার মুখে কালিমা লেপন করেছে। ইট, পাথর, বালু ও সিমেন্টের এই রাজধানীতে আদুরীরা আসলে কতটা নিষ্পেষিত, তা ভাবতে গেলে গা শিউরে ওঠে। মানুষের নির্মমতা কতটা বীভৎস হতে পারে আদুরী তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কতটা নির্মম আর হৃদয়হীন হলে এতটা সম্ভব? নওরীন আক্তার নদী নামের ওই গৃহকর্ত্রীর পাশবিকতায় মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিল আদুরী। নদী একজন মেয়ে। আদুরীও একটি মেয়ে। সে তো নদীর মেয়ে হতে পারত। বোন হতে পারত। কিন্তু এর কোনোটাই আদুরী হয়ে উঠতে পারেনি। নদী কেবল ডাইনির রূপ ধরে নিজের নামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
এ রকম ঘটনা মাঝে-মধ্যেই ঘটছে। এসব ঘটনায় আমাদের মানবতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এই সমাজ, সংসার কোথায় চলেছে? মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেললে মানুষের আর কী থাকে? কিছু কিছু পশুত্ব আছে, যা ছোঁয়াচে অসুখের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এটাও কি সে রকম কিছু?
আদুরীর ওপর যে নির্মমতা তা যদি আমাদের অন্তর্গত মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে জাগ্রত করতে না পারে তবে মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের দাবি করতে পারি না।
৩.
আদুরীর মা-বাবা আদুরীকে নিয়ে গ্রামে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। তাদেরকে মামলা তুলে নেয়ার আলটিমেটাম দিয়েছে অপরাধীরা। এ সংবাদও পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। অর্থাৎ অপ্রতিরোধ্য প্রভাবশালীর অপরাধে ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’ বলে যে বঞ্চনার কথা কবি লিখেছিলেন- সে বঞ্চনা, আর আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে রংপুরের গোলাপের চোখে যে আলো ফুটেছিল- সেই আলোর জগতেই ওই ঘটনার প্রায় ত্রিশ বছর পর বর্বর নির্যাতনে আদুরীদের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। তাহলে কি বলব দীর্ঘ ত্রিশ বছরে আমাদের অর্জন শুধু নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা আর অমানবিকতা? অপরাধীর ঔদ্ধত্য সীমাহীন। সেই সীমাহীন ঔদ্ধত্য রুখতে, আদুরীদের পাশে সবাইকে দাঁড়াবার ডাক দিচ্ছি।
সাইফুল আলম : যুগান্তরের নির্বাহী সম্পাদক

No comments

Powered by Blogger.