জনস্বাস্থ্য- ফরমালিনের অপব্যবহার ও প্রস্তাবিত আইন by আ ব ম ফারুক

বাংলাদেশের দুধ, ফল ও মাছে অসাধু ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ফরমালিন মেশানোর ফলে যে মারাত্মক জনস্বাস্থ্যগত দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ফরমালিনকে নিয়ন্ত্রণ এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার জন্য গণদাবি উত্থাপিত হয়েছে।
অতিসম্প্রতি তথাকথিত আমের জুসে প্রিজারভেটিভ হিসেবে ফরমালিন ব্যবহারের দুঃসংবাদটি জনরোষে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে দাবি উত্থাপিত হলেও কোনো সরকারই এতে কর্ণপাত করেনি।
গত ২১ ডিসেম্বরের প্রথম আলোর সংবাদে জানা গেল, সরকার খুব দ্রুত ফরমালিন নিয়ন্ত্রণে একটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগে প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘বদলে যাও বদলে দাও মিছিল’ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সহ-আলোচক হিসেবে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তিনি আলোচনার শেষে এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, সেটি নিছক কথার কথা ছিল না। দেরিতে হলেও জনগুরুত্বপূর্ণ এমন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। তবে এ প্রসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যে বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার আলোকে আইনটি যাতে অর্থবহ ও কার্যকর হয়, সে জন্য সবিনয়ে কিছু প্রস্তাব রাখতে চাই।
ইতিমধ্যে খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে এফবিসিসিআই কিছু উদ্যোগ নিয়েছে; যার মধ্যে অন্যতম হলো রাজধানীর মালিবাগ, শান্তিনগর, মহাখালী, গুলশান ও মোহাম্মদপুর বাজারকে ‘ফরমালিনমুক্ত’ করা। এসব বাজারে এফবিসিসিআইয়ের উদ্যোগে ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্র বসানো হয়েছে। পরীক্ষায় ফরমালিনের উপস্থিতি শনাক্ত হলে কোনো খাদ্যপণ্যকেই বাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বাজার কমিটিগুলো এ কাজে সহায়তা দিচ্ছে। সরকার ও এফবিসিসিআইয়ের এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।
কিন্তু এ উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথমত, শহর ও গ্রামনির্বিশেষে দেশের সব বাজার ও দোকান এ কর্মসূচির আওতায় আনা দুরূহ কাজ। দ্বিতীয়ত, ফরমালিন শনাক্তকরণের যন্ত্রটি আমদানি ও সারা দেশে বিক্রয়ের মাধ্যমে কেউ কেউ এটিকে নতুন ব্যবসা হিসেবে নিতে পারেন। তাই ফরমালিন শনাক্তকরণ ও ফরমালিনমুক্ত বাজার চিহ্নিত করার পাশাপাশি দেশের কোথাও কেউ যেন খাদ্যপণ্যে ফরমালিন মেশাতে না পারে, সেদিকেও জোর দিতে হবে। তার জন্য কঠোর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তাই সরকার যে আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তা যাতে সত্যিকার অর্থে একটি কার্যকর আইন হয়, দেশবাসীর প্রত্যাশা তা-ই। নইলে এটি আরেকটি অকার্যকর কাগুজে আইন হয়েই থাকবে।
প্রথমত, খাদ্যে ব্যবহূত প্রিজারভেটিভের একটি সহনীয় মাত্রা থাকলেও ফরমালিনের তা নেই। কারণ, এটি প্রিজারভেটিভ নয়, বরং অত্যন্ত বিষাক্ত। শরীরে এর মারাত্মক ক্ষতির কারণে, বিশেষ করে পাকস্থলী ও লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ওপর এর বিধ্বংসী ক্রিয়ার কারণে কোনো খাদ্যে এক লাখ ভাগের এক ভাগ ফরমালিন থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়। পৃথিবীর খাদ্যনিরাপত্তাময় দেশগুলোর কোথাও এ কারণে ফরমালিনের কোনো গ্রহণযোগ্য সহনীয় মাত্রা নেই।
দ্বিতীয়ত, ফরমালিন বাংলাদেশে উৎপন্ন হয় না। ভারতেও এর কারখানা নেই বলে এটি চোরাচালান হয়ে বাংলাদেশে ঢুকবে, সেই আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশে ব্যবহূত ফরমালিনের সবটাই সরকারের অনুমতি নিয়ে আমদানি করতে হয়। ল্যাবরেটরিতে জীবদেহ সংরক্ষণের কাজে ফরমালিন ব্যবহূত হয়। কিন্তু একবার নমুনা তৈরি করে বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা যায় বলে আমদানি করা ফরমালিনের খুব সামান্যই এ কাজে ব্যবহূত হয়। বড় হাসপাতালগুলোর অস্ত্রোপচার কক্ষ জীবাণুমুক্ত করার কাজে কোথাও কোথাও ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এ খাতে ব্যবহূত ফরমালিনের পরিমাণও অত্যন্ত নগণ্য। দেশের কিছু প্লাস্টিক ও খেলনা তৈরির কারখানায় ফরমালিনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এভাবে ফরমালিন ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। হিসাব করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫৫০ টন ফরমালিন আমদানি হয়, কিন্তু উপর্যুক্ত তিনটি খাতে ফরমালিন ব্যবহূত হতে পারে বছরে সর্বোচ্চ ১০০ টন। অর্থাৎ বছরে বাকি প্রায় ৪৫০ টন ফরমালিনের ক্রেতা অসাধু ব্যবসায়ীরা; যারা দুধ, মিষ্টি, দই, সবজি, আপেল, কমলা, নাশপাতি, আঙুর, ছোট মাছ, বড় মাছ, ফ্রুট জুস ইত্যাদিতে ফরমালিন মেশায়। এগুলো যাচ্ছে আমাদেরই পেটে। বছরে এই ৪৫০ টন ফরমালিনের অপব্যবহার রোধ করতে পারলেই আমাদের জনস্বাস্থ্য সমস্যাটি মিটে যায়।
তাই আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, কারা কী উদ্দেশ্যে ফরমালিন আমদানি করছে এবং কার কতটুকু ফরমালিন প্রয়োজন, প্রস্তাবিত আইনে তা ভালো করে যাচাই করার ব্যবস্থা রাখা। এরপর যাদের আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে, তারা আমদানি করা পরিমাণের ফরমালিনটুকু নিজস্ব গুদামে পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে যেন রাখে, তার ব্যবস্থা করা এবং স্টক রেজিস্টার পদ্ধতি চালু করা। ফলে কবে কতটুকু ফরমালিন কী কাজে ব্যবহূত হলো, তার হিসাব রেজিস্টারে রক্ষিত থাকবে। মাঝেমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুদাম পরীক্ষা করার এবং সেখানে যতটুকু ফরমালিন থাকার কথা, তা না পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা আইনে থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রস্তাবিত আইনে খোলাবাজারে ফরমালিনের বেচাকেনা নিষিদ্ধ করা। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, খাদ্যে যারা ফরমালিন মেশায়, তারা কেউ ফরমালিন আমদানি করে না। তারা সবাই খোলাবাজার থেকে এগুলো সংগ্রহ করে। তাই বৈধ ব্যবহারকারীরা বাদে কাউকে ফরমালিন আমদানির অনুমতি না দিলে এবং বৈধ ব্যবহারকারী পর্যায়ে স্টক রেজিস্টার পদ্ধতির মাধ্যমে ফরমালিন ব্যবহারের নিয়ম চালু করলে অসাধু আমদানিকারকের পক্ষে খোলাবাজারে, অর্থাৎ কালোবাজারে ফরমালিন বিক্রি করা সম্ভব হবে না। ফলে অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ী চাইলেও তার খাদ্যপণ্যে মেশানোর লক্ষ্যে ফরমালিন কিনতে পারবে না। তার পরও কেউ খোলাবাজারে ফরমালিন বেচাকেনা করলে উভয়ের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা আইনে রাখতে হবে।
চতুর্থত, ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো যখন কোনো বাজারে অভিযান চালান, তখন তাঁরা মাছের, ফলের বা সবজির দোকানে ফরমালিনের উপস্থিতি শনাক্ত করার পাশাপাশি সেই বাজারের বা বাজারের পাশের ওষুধের দোকান ও হার্ডওয়্যারের দোকানেও যেন অভিযান চালাতে পারেন, তার ব্যবস্থা প্রস্তাবিত আইনে রাখতে হবে। কারণ, অতি ছোট মাছ, দুধ, সবজি, ফল বিক্রেতা সেই বাজারের এসব দোকান থেকেই এক দিনের প্রয়োজন অনুযায়ী ১০-২০ টাকার ফরমালিন কিনে থাকেন। ফরমালিন পাওয়া গেলে ওষুধের দোকান ও হার্ডওয়্যারের দোকানিকেও শাস্তি দেওয়ার বিধান রাখা প্রয়োজন।
আগেই বলেছি, সরকার ও এফবিসিসিআই যৌথভাবে ফরমালিনমুক্ত বাজার তৈরির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু শুধু এ উদ্যোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সারা দেশ থেকে ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের কোনো বিকল্প নেই। আর কঠোর ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রাক্কালে উপর্যুক্ত প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় রাখতে সরকারকে অনুরোধ জানাই। খাদ্যপণ্যে ফরমালিনের মতো প্রাণঘাতী বিষের ব্যবহার বন্ধে সরকার সফল হোক, এই কামনা করি।
অধ্যাপক আ ব ম ফারুক: ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
abmfaroque@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.