উপাচার্য সরালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তার নিশ্চয়তা কে দেবে? by আবদুল মান্নান

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অচল, কারণ সেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থী আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন করছেন। এরই মধ্যে শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বৈঠক করেছেন এবং আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী উপ-উপাচার্যকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। বিএনপি প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের পক্ষ অবলম্বন করে বিবৃতি দিয়েছে।


দেশের অধিকাংশ মিডিয়া এবং সংবাদ বিশ্লেষকও উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্যের অপসারণের পক্ষ অবলম্বন করেছেন এবং তারা এই মতপ্রকাশ করেছেন যে, এই দুই ব্যক্তিকে অপসারণ করলে ক্যাম্পাসে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠক করার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন এবং তাদের আশ্বস্ত করেছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য তিনি সব কিছু করবেন। শুক্রবার পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তাদের শ্রেণীকক্ষে ফিরে যাবে কিনা সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সম্ভবত তারা কারও ইশারার জন্য অপেক্ষা করছে। বুয়েটের এই অচল অবস্থা চলছে প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে। এর ফলে দেশের এই অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠটি বেশ বড় ধরনের সেশনজটে পড়ল এবং তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলো মূলত শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরা। কোন আন্দোলনে শিক্ষকদের তেমন কোন ক্ষতি নেই, কারণ বেতনসহ তাদের অন্যান্য আর্থিক সুযোগসুবিধা বন্ধ হয় না। বুয়েটের আন্দোলনের সূত্রপাত উপ-উপাচার্যকে অপসারণের দাবিকে কেন্দ্র করে। বুয়েটের ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশে উপ-উপাচার্যের কোন পদ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭৩ সালের পূর্বে কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই এই পদটির অস্থিত্ব ছিল না। ১৯৭৩ সালের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই পদটি সৃষ্টি করা হলেও আশির দশক পর্যন্ত এই পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। পর্যায়ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কর্মকা- সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে এই পদগুলোতে নিয়োগ দেয়া শুরু হয়। ১৯৬২ সালে বুয়েট চালু হলে সেখানে সর্বমোট কয়েকশ’ ছাত্র অধ্যয়ন করত। বর্তমানে বুয়েটের ছাত্র সংখ্যা প্রায় আট হাজার, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রীÑযা ষাটের দশকে ছিল অনেকটা কল্পনাতীত। সুতরাং শুরুতে বুয়েট যেখানে ছিল বর্তমানে সেটি সেখানে নেই। এখন তার কর্মপরিধি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক বিভাগ, অনেক শিক্ষক আর শিক্ষার্থী। যেহেতু উপ-উপাচার্যের কোন পদ ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশে উল্লেখিত ছিল না সেহেতু বর্তমান সরকার অধ্যাদেশ পরিবর্তন করে এই পদটি সৃষ্টি করেছে এবং একজনকে সেই পদে নিয়োগ দিয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষকদের মতে, বুয়েটে এই পদটির কোন প্রয়োজন নেই আর যদি কাউকে নিয়োগ দিতেই হয় তাহলে বুয়েটের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী একজন সিনিয়র শিক্ষককেই নিয়োগ দিতে হবে। যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তিনি অনেক জুনিয়র ছিলেন। উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ, তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং তিনি তার কক্ষে সার্বক্ষণিক বঙ্গবন্ধু পরিষদের লোকজনকে নিয়ে সভা করেন। উপ-উপাচার্যের অপসারণের দাবির কিছুদিন পর শিক্ষক সমিতির ব্যানারে এবার দাবি তোলা হলো উপাচার্যকে অপসারণ করতে হবে, কারণ তিনি ওই পদে থাকার মতো যথেষ্ট সিনিয়র নন এবং তিনি নানা ধরনের প্রশাসনিক একাডেমিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা থাকলে তার অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত এবং তা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এরই মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল যাতে মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যরা ছিলেন। তারা তাদের তদন্তে তেমন বড় ধরনের কোন অনিয়ম পাননি।
যেসব কারণে বুয়েটে দুর্ভাগ্যজনকভাবে অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তার রেশ ধরে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য বদলের জন্য আন্দোলন করা সমীচীন নয় বলে মনে করি, কারণ এমনটি ঘটতে থাকলে কোন একজন উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য তার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। বর্তমানে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে দেখা যাবে, যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র হলেও একটি উপাচার্যবিরোধী গোষ্ঠী থাকে এবং সুযোগ পেলেই তারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দেয়ার চেষ্টা করে। বর্তমান সরকারের সময় যতই ফুরিয়ে আসবে ততই এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আলামত বেশি দেখা যাবে এবং এ ধরনের দাবি শুধু উপাচার্য বদলের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংক্রমিত হবে। গত কয়েক দিন সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ছাত্ররা তাদের বিভাগীয় সভাপতির দফতরের সামনে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করে এবং তার পদত্যাগ দাবি করে সেখানে অবস্থান ধর্মঘট করছে। পরবর্তীকালে এ ধরনের কর্মকা- যে অন্যখানেও দেখা যাবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? হঠাৎ করে বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে বেশ কিছু বাংলাদেশী আন্না হাজারের আবির্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আন্দোলনের মাধ্যমে উপাচার্য সরানোর রেওয়াজের শুরু সম্ভবত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯০-এর ডিসেম্বর মাসে এরশাদের পতন হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে একটি বিজয় র‌্যালি বের হয়, যার অগ্রভাগে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন (বর্তমানে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস)। র‌্যালি শেষে তিনি তার সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তৃতায় বলেন, ‘একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধীরা নব্বইয়ে বিপ্লবী সেজেছে। তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।’ যাদের উদ্দেশে এই কথা বলা তারা উপাচার্যের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং প্রকৃতপক্ষে ওই মুহূর্ত হতেই বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেয়। তাদের এই কর্মকা-ে দুঃখজনকভাবে সঙ্গে পায় তাদেরই কিছু পরামর্শদাতা শিক্ষক। সকল বাধা অতিক্রম করে ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর ছাত্র শিক্ষকদের বৃহত্তম অংশ ক্লাসে ফিরতে গেলে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবী কারিরা সশস্ত্র অবস্থায় তাদের ওপর হামলা করে, কমপক্ষে পঞ্চাশ শিক্ষককে গুরুতর আহত করে এবং ছাত্রমৈত্রী নেতা ফারুকুজ্জামানকে হত্যা করে। একই সঙ্গে তারা পুরো ক্যাম্পাসকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, উপাচার্যের বাসভবনকে সাব-জেল ঘোষণা করে তাকে সপরিবারে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে সেখানে বন্দী করে রাখে। তার বাড়ির সামনে মাইক লাগিয়ে ১২ দিন পালা করে একাত্তরের পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর উত্তরসূরীরা লাগাতার উপাচার্য আর তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবিরাম অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। তখন বেগম জিয়া ক্ষমতায় এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী তার শিক্ষামন্ত্রী। এমন অবস্থায় একদিন শিক্ষামন্ত্রী গেলেন ক্যাম্পাসে। সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন। উপাচার্যের বাসভবনে প্রবেশের পূর্ব মুহূর্তে তিনি অবরোধকারীদের কাছ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণ করলেন এবং ভিতরে গিয়ে উপাচার্যকে অনুরোধ করলেন ছাত্রদের দাবি মেনে নিয়ে তিনি যেন পদত্যাগ করেন। অধ্যাপক আলমগীর সিরাজুদ্দিন সিনেটে সর্বোচ্চ ৭২ ভোট পেয়ে উপাচার্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেন তিনি কিছু ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তের দাবি মেনে পদত্যাগ করবেন? সরকার একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি চট্টগ্রামে এসে একটি লোক দেখানো তদন্ত করলেন এবং ফিরে গিয়ে এক অদ্ভুত রিপোর্ট দিলেন যার উপসংহারে লেখা ছিল, ‘বর্তমান উপাচার্যকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় চালু রাখা যাবে না আবার তাকে সরালেও সমস্যার সমাধান হবে না।’ এই উপসংহারের একটি অংশকে পুঁজি করে দুর্বৃত্তরা আরও দ্বিগুণ উৎসাহে তাদের দুর্বৃত্তপনা বাড়িয়ে দিল। সঙ্গে তাদের মুরুব্বি শিক্ষকরা তো আছেনই। তখন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন দেশের রাষ্ট্রপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চ্যান্সেলর। তিনি আন্দোলনে ইন্ধন যোগানদাতা শিক্ষকদের একদিন তার কার্যালয়ে ডেকে পাঠালেন। সঙ্গে শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে দারুণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন এবং ইন্ধন দাতাদের অনেকটা তিরস্কারই করলেন। তিনি এও বললেন, বিচারবিভাগীয় তদন্ত রিপোর্ট কোন আদালতের রায় নয় এবং তা নিয়ে হইচই করারও কিছু নেই। এটি গ্রহণ করা না করা সম্পূর্ণভাবে সরকারের এক্তিয়ারে। এর মধ্যে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের মেয়াদ শেষ হয়ে পড়লে রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি দায়িত্ব নিয়েই উপাচার্যকে এই মর্মে নোটিস জারি করেনÑতাঁকে কেন তার দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দেওয়া হবে না তার কারণ দর্শাতে। তিনি সেই নোটিসের জবাব দিতে পরামর্শের জন্য গেলেন ব্যারিস্টার ইশতিয়াকের কাছে। ব্যারিস্টার ইশতিয়াক অন্যায় দাবির প্রতি নতজানু না হওয়ার জন্য উপাচার্যকে অভিনন্দন জানালেন এবং এও বললেন, সরকার যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে আপনাকে সরাবে সেটি তারা করবে, তবে আপনি আপনার অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য ওই কারণ দর্শানো চিঠির একটা জবাব দিন। ব্যারিস্টার ইশতিয়াক সেই চিঠির জবাব লিখে দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর উপাচার্যকে ১৮৯৭ সালের জেনারেল ক্লজেস এ্যাক্টের বলে তার দায়িত্ব হতে সরকার অব্যাহতি দেয়। উপাচার্য সরানোর এই যে একটি খারাপ নজির বিএনপি সৃষ্টি করেছিল তা এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বুয়েটের আন্দোলনে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে আর তা হচ্ছে প্রকাশ্যে ছাত্র, শিক্ষক আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একসঙ্গে এই উপাচার্য উৎখাত আন্দোলনে শামিল হওয়া। এখানে কোন রাখঢাক ছিল না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হঠাত আন্দোলনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ত তেমন একটা ছিল না। যারা বলছেন উপাচার্য পদত্যাগ করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তারা কি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন, আরেকজন উপাচার্য এলে তিনিও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন না? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি অনুযায়ী শরীফ এনামুল কবির গেলেন। নিয়োগ পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আনোয়ার হোসেন। তিনি দ্রুত সিনেটে প্যানেল নির্বাচন দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন। কিন্তু কেউ কি হলফ করে বলতে পারবেন, আগামীতেও তার বিরুদ্ধে আরেকদল ছাত্র শিক্ষক আন্দোলন শুরু করবে না ? আন্দোলন করলেই তো উপাচার্য বদল করা যায় তেমন একাধিক নজির তো ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। এরপর তা হয়তো সংক্রামিত হবে কোন একটি স্কুলে বা কলেজে। বুয়েটের আন্দোলনকারীদের দাবি হচ্ছে রেওয়াজ অনুযায়ী সবচাইতে সিনিয়র শিক্ষককে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে। এটি একটি অদ্ভুত দাবি, কারণ সব চাইতে সিনিয়র যিনি তিনি একজন সফল উপাচার্য হবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। উপাচার্যের পদটি যেমন একাডেমিক তেমন প্রশাসনিক। উভয় ক্ষেত্রে একজন উপাচার্যের স্বীকৃত যোগ্যতা থাকা অপরিহার্য। দেশে দেশে তাই হয়ে আসছে। একজন সিনিয়র শিক্ষকের এই সব যোগ্যতা থাকতেই পারে আবার নাও পারে। আর উপাচার্য নিয়োগদানের ব্যাপারটি একান্তভাবে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারে। তার কাজে অযথা হস্তক্ষেপ না করা সকলের জন্য মঙ্গলজনক। আগে তো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বিভাগীয় প্রধানরা সব সময় সর্ব জ্যেষ্ঠ শিক্ষকই হতেন। তিনি অবসর না নেয়া পর্যন্ত সেই পদে অধিষ্ঠ থাকতেন। ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য নিয়োগ দিতেন উপাচার্য। এখন রোটেশনের ভিত্তিতে বিভাগীয় প্রধান নিয়োগ পান আর ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্যরা শিক্ষকদের ভোটে নির্বাচিত হন। তাতে তো তেমন কোনো অসুবিধা হয় না।
বুয়েটের উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের একটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত বের করে মিছিল সহকারে গিয়ে উপাচার্যের অফিসের সামনে তা ঢেলে দেয়া। এটি একটি অরুচিকর কাজ তো বটেই অন্য কোন সভ্য দেশ হলে যারা এই কাজটি করেছে তাদের বিরুদ্ধে ভীতি সৃষ্টি করার অভিযোগে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হতো। আরও দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এই কাজটি যখন শিক্ষার্থীরা করছিল কোন বিবেকবান শিক্ষক এগিয়ে এসে তাদের এই হেন কাজ হতে নিভৃত করেননি এবং আরও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই ঘটনাটিকে অনেকগুলো মিডিয়া বেশ উৎসাহভরে ফলাও করে প্রকাশ করেছে।
শঙ্কার কথা হচ্ছে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলো বর্তমান সরকারের আমলে একেবারে একশতভাগ না হলেও নির্ঝঞ্ঝাট চলছিল। মাঝে মাঝে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু দুর্বৃত্ত অছাত্র সুলভ কাজ করে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অপ্রস্তুত কারেছে, যার সর্বশেষ উদহারণ সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তারা উপাচার্যকে অবরোধ করে রেখে প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ ভ-ুল করে দিয়েছে। তাদের দাবি, যাকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হবে তিনি জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা। অথচ পত্রিকার খবর অনুযায়ী তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল হতে অফিসার সমিতির নির্বাচন করেছেন। আসল ঘটনা নাকি কোন এক ছাত্রলীগ নামধারীকে একটি কাজের টেন্ডার না দেয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে কর্মচারী নিয়োগ সবখানেই এই সব দুর্বৃত্তদের হস্তক্ষেপ চলছে এবং এর ফলে আগামীতে কোন উপাচার্যের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা কাঠিন হয়ে পড়বেএ
সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় উচ্চ শিক্ষাঙ্গনকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারেনি। তারা হয়তো ধরে নিয়েছে যেহেতু উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে উচ্চশিক্ষিত মানুষের বিচরণ সেহেতু এই সব শিক্ষাঙ্গনে তেমন একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বাস্তবটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষিত হলেই যে সকলে যৌক্তিক আচরণ করে তা কিন্তু নয়। উচ্চ শিক্ষাঙ্গন তো বটেই সমাজে অধিকাংশ সমস্যার জন্মদাতা কিন্তু তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ । এমন একটি কথা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দুর্নীতি বিষয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলে গিয়েছিলেন। কথাটি তখনও যেমন সত্য ছিল এখনও সত্য। এই তথাকথিত শিক্ষিতজনদের অযৌক্তিক দাবি মানার ব্যাপারে সরকার যদি এখন হতেই সতর্ক না হয় তাহলে আগামীতে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আরও নানা বেফজুল সমস্যা দানা বেঁধে উঠবে। বুয়েটের উপাচার্যকে হয়তো সরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হওয়ার পরিবর্তে হীতেবিপরীত হতে পারে। হয়তো একই আন্দোলন শুরু হবে ঢাকা বা অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। একসময় যে বুয়েট অনেক ভাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তা থেকে কী তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিটকে পড়ল? সকল বাধা উপেক্ষা করে পঠন-পাঠন আর জ্ঞান চর্চার প্রকৃত পরিবেশ ফিরে আসুক দেশের এই সেরা বিদ্যাপীঠে।

সেপ্টেম্বর ৭, ২০১২
লেখক : শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষক।

No comments

Powered by Blogger.