সাক্ষরতা ও উন্নয়ন-তিন বছরেই নিরক্ষরতা থেকে মুক্তি! by খ ম রেজাউল করিম

সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়ন ও শান্তির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ। ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষরতামুক্ত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করার মতো দুরূহ কাজটি সরকারের একার পক্ষে করা যে সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য।


এ জন্য বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন পশ্চাৎপদ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। বলা হয়, বিশ্বে নিরক্ষর লোকের প্রায় ১৪ শতাংশ বাংলাদেশে বসবাস করছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে ২০০৮ সালে পরিচালিত 'লিটারেসি অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে' রিপোর্টে দেখানো হয়েছে ৪৮ দশমিক ৮ শতাংশ। উইকিপিডিয়ায় এখনও দেওয়া আছে ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আবার বেসরকারি সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের জরিপ অনুযায়ী এর পরিমাণ ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এক সময় নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন, তা জানলেই তাকে স্বাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০ সালের দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই স্বাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত হয়। আজকাল ধরে নেওয়া হয় সাক্ষরতা কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভাষা ও হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে কমপক্ষে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর সমমানের যোগ্যতা অর্জন করবে। দেশে সাক্ষরতা নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, সাক্ষরতা বলতে পরিচিত বিষয় ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়বস্তু পড়তে ও লিখতে পারার দক্ষতা অর্জন এবং সমাজে কার্যকর ভূমিকা পালনে দৈনন্দিন জীবনে এ দক্ষতাগুলো ব্যবহার করতে পারার ক্ষমতাকে বোঝায়। অতি সম্প্রতি এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
একটি জাতি গঠনের প্রধান মাধ্যম হলো শিক্ষা। জনগণই একটি দেশের চূড়ান্ত সম্পদ। কিন্তু সেই মানুষ সম্পদ হয়ে জন্ম নেয় না। শিক্ষার মাধ্যমে পরিচর্যা করে তাকে সম্পদে পরিণত করতে হয়। শিক্ষার প্রথম সোপান হলো সাক্ষরতা। সাক্ষরতার ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে উচ্চশিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে মানুষ দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে। আর মানুষ শিক্ষিত ও দক্ষ হয়ে উঠলেই সে কিছু না কিছু উৎপাদন করবে। ফলে তার অভাব দূর হবে। আর অভাব দূর হলেই সমাজে শান্তি আসবে। এ শান্তিই সমাজের উন্নতি বয়ে আনবে। উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের আধুনিকায়নে শিক্ষার অবদানের কথা উলেল্গখ করা যায়।
অন্যদিকে জগৎ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও শিক্ষার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। অনেক মানবতাবাদী, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় নেতা মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করেছেন এবং করছেন। তাদের দেখানো পথে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নানা রকম উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় ক্রমেই জটিলতার পথে ধাবিত সমাজে শান্তি প্রত্যাশায় বিশ্বজুড়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে বিভিন্নমুখী কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। এখানেও নানা রকম সাংগঠনিক উদ্যোগ লক্ষণীয়। এ দেশের সরকারি-বেসরকারি সংগঠনগুলো কাজ করছে জনগণের সুখ, সমৃদ্ধি আর শান্তির প্রত্যাশায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কুটির শিল্প, পরিবেশ, পয়ঃনিষ্কাশন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডকে আজকাল শান্তির অন্যতম উপায় বলে অভিহিত করা হচ্ছে। সে বিচারে বাংলাদেশের বহু কর্মী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
সাধারণ মানুষের শান্তি প্রত্যাশা থেকে উদ্ভূত হয়েছে শান্তি শিক্ষা। জাতিতে জাতিতে সংহতি, পারস্পরিক সহযোগিতা, যুদ্ধবিরোধী মনোভাব উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ উন্নয়ন, শান্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ, পারস্পরিক সম্প্রীতি রক্ষা ইত্যাদি শান্তি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষাবিষয়ক ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক কমিশন শিক্ষার চারটি ভিতের কথা বলেছেন_ জানতে শেখা, করতে শেখা, বাঁচতে শেখা আর মিলেমিশে বাস করতে শেখা। এই মিলেমিশে বাস করতে শেখাই শান্তি শিক্ষা। মিলেমিশে বাস করা মানে পরিবারে-পরিবারে, সমাজে-সমাজে, দেশে-দেশে সহযোগিতার ভিত্তিতে মিলেমিশে থাকা। আসলে সাক্ষরতা ও শান্তি শিক্ষা বিস্তারের মূল উদ্দেশ্য হলো শান্তির মর্মবাণী, নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে যেমন হৃদয়ে ধারণ করা, তেমনি শান্তির মাধ্যমে সামাজিক সমস্যারও সমাধান করা। শান্তিময় সাংস্কৃতিক আবহ তৈরির বিষয়টিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি প্রতিষ্ঠা মানে শুধু সমস্যাগুলোর সমাধান করাই নয়, বরং সমস্যা যাতে সৃষ্টি না হয়, তাও নিশ্চিত করা দরকার। শান্তি শিক্ষার ছত্রছায়ায় বিবদমান সব ব্যক্তি ও দলকে নিয়ে আসা জরুরি। তবেই সাক্ষরতা তথা শিক্ষা যেমন শান্তির ধারক হতে পারবে, তেমনি সাক্ষরতাই উন্নতি আনয়নে সক্ষম হবে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বাধীনতার পরই সাক্ষরতার হার বাড়নোর জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৯৯১ সালে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০ বছরে সাক্ষরতার হার বাড়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে ৫৩ শতাংশ সাক্ষরতা ধরলে ৪০ বছরে বেড়েছে ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। ৪০ বছরে যেখানে ৩৬ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে ৩ বছরে ৪৭ শতাংশ অর্জন কতটা সহজ হবে, তা বলা মুশকিল। তাই বাংলাদেশে সাক্ষরতার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত সুপারিশগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে_
নারী-পুরুষের প্রেক্ষাপট থেকে জাতীয় শিক্ষা কর্মসূচি ও নীতিমালার ফলাফল বিশেল্গষণ করা যেতে পারে।
শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারকল্পে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও নীতি স্থির করা দরকার। (ইতিমধ্যে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে। এর সফল বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে দেশের সাক্ষরতার মাত্রা)।
সবার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার বহুল প্রসার ঘটানো দরকার। এ লক্ষ্যে সরকারি, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে একযোগে আন্তরিকভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যহীন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আরও জোরদার করা আবশ্যক।
জাতীয় বাজেটে শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা দরকার।
দেশের প্রতিটি শিক্ষিত মানুষকে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে কমপক্ষে একজন অশিক্ষিত মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব নেওয়া যেতে পারে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন) শিক্ষা প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়ন ও শান্তির সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ। ২০১৪ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণভাবে নিরক্ষরতামুক্ত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। কিন্তু ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করার মতো দুরূহ কাজটি সরকারের একার পক্ষে করা যে সম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য। এ জন্য বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

ড.খ ম রেজাউল করিম :শিক্ষক, খুলনা সরকারি বিএল কলেজ
 

No comments

Powered by Blogger.