নাইবা হল পারে যাওয়া-সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কতটা সাহায্য করবে? by মামুন রশীদ

য়েক বছর ধরে নতুন একটি বিষয় শুনে আসছি_ 'মানিয়ে চলার মুদ্রানীতি'। এতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে। এ ধরনের নীতিতে, সম্প্রসারণ থেকে সংকোচনমূলক নীতিতে এবং এর বিপরীত অর্থাৎ সম্প্রসারণমূলক থেকে সংকোচনের নীতিতে তুলনামূলক দ্রুত চলে যেতে দেখি।


সাধারণত এ ধরনের ঘটনা ঘটে মূল্যস্ফীতির শিকার অর্থনীতিতে, যার উৎস অভ্যন্তরীণ যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি বৈদেশিক কারণবশত


বাংলাদেশের গণমাধ্যম যথেষ্ট সক্রিয় ও সংবেদনশীল। তারা সদাসতর্ক। আর আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও মিডিয়াবান্ধব হিসেবে পরিচিত। তাদের কল্যাণে আমরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছি, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি সংক্রান্ত ঘোষণা আসছে। যখন মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিট অর্থাৎ ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, নিট বিদেশি ঋণ-অনুদান কমে যাচ্ছে, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ সীমিত, সর্বোপরি বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ধারাবাহিকভাবে কমার পাশাপাশি বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার মান অব্যাহতভাবে পড়ে যাচ্ছে_ সে সময়ে এ ধরনের চিন্তা প্রাধান্য পেয়ে থাকলে তাতে দূষণীয় কিছু মনে হবে না। কিন্তু নীতিগত বিষয়াদি সম্পর্কে যারা গবেষণা করেন তাদের সংশয় থাকতেই পারে যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিই কি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং যারা এর দ্বারা প্রভাবিত কিংবা সংশ্লিষ্ট তাদের 'মনের শান্তি' নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট? কিংবা এভাবেও বলা যায় ; নীতিনির্ধারকরা কি এমন পর্যায়ে পেঁৗছে গেছেন যে, 'এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই?' এটা কি আইএমএফকে তুষ্ট পদক্ষেপ? সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দাতা দেশ ও সংশ্লিষ্টদের জন্যও কি এভাবে আমরা বলব? প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠতেই পারে। নিয়ন্ত্রকরা এ বিষয়টি নিয়ে আগেভাগে ভাবেননি কেন? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে_ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের লাগাম টেনে ধরার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ত্রিশ বছর আগে আমরা অর্থনীতির পাঠ থেকে জেনেছি_ মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রার সরবরাহ, প্রাপ্যতা এবং মূল্য বা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর লক্ষ্য থাকে মূল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রেখে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন। মুদ্রানীতি তুলনামূলক নমনীয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক আঘাত বা ধাক্কা এলে তা প্রয়োজনমতো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনা যায়। কিন্তু আর্থিক নীতিতে এটা হয় না। এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের জন্য সময় প্রয়োজন পড়ে।
মুদ্রানীতি সম্প্রসারণমূলক হতে পারে। অর্থাৎ এর সাহায্যে মুদ্রার মোট জোগান বা সরবরাহ বাড়ানো যায়। এর বিপরীত হচ্ছে সংকোচনমূলক নীতি অনুসরণ, যা মোট মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে দেয়। মন্দার সময় বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং এ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হলে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সুদহার কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এর বিপরীতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ সহনশীল করার চেষ্টা করা হয়।
গত কয়েক বছর ধরে আমরা নতুন একটি বিষয় শুনে আসছি_ 'মানিয়ে চলার মুদ্রানীতি।' এতে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে। এ ধরনের নীতিতে, সম্প্রসারণ থেকে সংকোচনমূলক নীতিতে এবং এর বিপরীত অর্থাৎ সম্প্রসারণমূলক থেকে সংকোচনের নীতিতে তুলনামূলক দ্রুত চলে যেতে দেখি। সাধারণত এ ধরনের ঘটনা ঘটে মূল্যস্ফীতির শিকার অর্থনীতিতে, যার উৎস অভ্যন্তরীণ যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি বৈদেশিক কারণবশত।
অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোতে মুদ্রানীতি প্রণয়নের জন্য নানা উপাদানের ওপর নির্ভর করা হয়। যেমন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুদহার, মুদ্রার দ্রুতি, বিনিময় হার, বন্ড ও ইকুইটি, সরকার বনাম বেসরকারি খাতের ব্যয়-সঞ্চয়, আন্তর্জাতিক মূলধন প্রবাহ এবং অর্থ সংক্রান্ত বিষয়াদি থেকে উদ্ভূত বিভিন্ন বিষয়। উন্নত দেশগুলো কখনও কখনও সম্পদ পুনঃক্রয়ের মতো কর্মসূচির মতো অগ্রসর কৌশল অনুসরণ করে থাকে।
এর বিপরীতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে মুদ্রানীতি প্রায়শই অবিকশিত আর্থিক বাজার, স্বল্পমাত্রার মাথাপিছু আয় এবং উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দারিদ্র্যের কারণে চাপের মধ্যে থাকে। বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণেও পরিস্থিতি জটিল হয়। নবীন অর্থনীতির দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মূল্যস্ফীতির ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্য থেকে যথাযথ নিয়মকানুন প্রণয়ন এবং বিনিময় হার বজায় রাখতে হয়।
বাংলাদেশে অন্যান্য নবীন অর্থনীতির দেশগুলোর মতোই বৈদেশিক মূলধন হিসেবে নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে একই ধরনের কৌশল ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। মুদ্রাগত সমষ্টিভিত্তিক নীতি ও কর্মসূচি মূলধন হিসেবে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে অর্থনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখে। মুদ্রার মজুদে প্রভাব বিস্তারকারী নীতিগত উপাদানগুলো ব্রডমানির গতির প্রতি লক্ষ্য রাখে। ক্যাশ রিজার্ভ ও স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রিকোয়ারমেন্টকে (সিআরআর ও এসএলআর) মৌল সুদহার নীতির (বাংলাদেশে রেপো, রিভার্স রেপো সুদহার) বাইরেও উপযুক্তরূপে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে প্রথম থেকেই সুদহার ও বিনিময় হারের ওপর প্রত্যক্ষ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হয়। একই সঙ্গে ঋণপ্রবাহের পরিমাণ ও গতিপথও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্যাভিমুখী ঋণদানের অবসান ঘটেছে এবং সুদের হারের ক্ষেত্রেও উদারীকরণ করা হয়েছে। এভাবে সুদহার হয়ে উঠছে বাজার চাহিদাভিত্তিক। বিনিময় হার হেরফের করার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তারল্য নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা ক্রয় ও বিক্রয়ের কাজ করে থাকে। যদিও আমরা মাঝে মধ্যে 'ম্যানেজড ফ্লট' বা 'শক্তি নয় বরং নীতিবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত' কথা শুনে থাকি। তবে মোট কথা হচ্ছে, ক্যাশ রিজার্ভ রেসিও (সিআরআর) এবং স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেসিও (এসএলআর) অধিকতর স্থিতিশীল হয়েছে।
ড. সালেহ্ উদ্দিন আহমদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালে মুদ্রানীতি সংক্রান্ত বিবৃতিগুলোতে মূল্যস্ফীতি আউটলুক, প্রবৃদ্ধি আউটলুক, এক্সটারনাল সেক্টর আউটলুক, ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন এবং এক্সচেঞ্জ রেট ম্যানেজমেন্ট প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার দেখা যেত। আমি নিশ্চিত যে, নতুন যে মুদ্রানীতি প্রণীত হতে যাচ্ছে তাতে অভ্যন্তরীণ ভোগ্যপণ্য মূল্য পরিস্থিতি, 'ততটা প্রয়োজন নয়' এমন পণ্যের প্রবৃদ্ধি নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি উত্তর আমেরিকা ও বিশেষ করে ইউরো অঞ্চলের সংকটের প্রসঙ্গ উল্লেখ থাকবে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কোথায় ভুল হয়েছিল এবং কীভাবে আমরা এ অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পেঁৗছেছি সে বিষয়ে আমাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার কিংবা অন্তত তার একটি অংশ গ্রামীণ অর্থনীতি এবং প্রায় শহর এলাকায় আরও অর্থের প্রবাহ ঘটিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে চেয়েছে। এ জন্য তারা কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বেশি পরিমাণে ঋণ ছাড় করার জন্য চাপ দিয়েছেন। তবে এ নীতিকে বলা যায় গ্রামীণ বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সফলতা অর্জনকারী মাইক্রোফিন্যান্স ইনস্টিটিউটের মডেলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আরও দুঃখজনক হচ্ছে, এ ধরনের 'বিগ পুশ' মুদ্রা ছাড় অর্থনীতির প্রকৃত ক্ষমতা বাড়ানো কিংবা উৎপাদনশীলতার উন্নয়নের পরিবর্তে ভোগ চাহিদা ও স্পেকুলেশন চাহিদা বাড়াতে সহায়তা করেছে (এর উল্লেখযোগ্য অংশ পুঁজি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টিতেও সাহায্য করেছে বলে জানা যায়)। তদুপরি এটা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রধান এবং কতিপয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের বসদের ছবি সংবাদপত্রে ছাপার উপলক্ষ হতে পেরেছে। সংবাদপত্রের জন্যও তা লাভের কারণ হয়েছে বলে মনে করা হয়। যখন সরকারের বিপুল ঋণের কারণে বিদেশি সূত্রের অর্থের পরিবর্তে দেশীয় সূত্রের অর্থ ব্যবহার বাড়তে থাকে, তখনও সংসদের জনপ্রিয় অনেক সদস্য এবং বাধ্য সরকারি কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ নীরব থাকেন।
আমাদের ম্যাক্রো অর্থনীতিতে অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে। এ অবস্থায় আমরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি সমর্থন করি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা জানতে চাইব_ কোথায় কীভাবে এটা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বছরে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এর মধ্যে বিলাসদ্রব্য হিসেবে চিহ্নিত পণ্যের পরিমাণ মাত্র ১.৫ বিলিয়ন ডলার। ইতিমধ্যে এলসি খোলার হার ২০ শতাংশ কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ভাণ্ডার ও প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এমন সন্তোষজনক অবস্থায় পেঁৗছাতে সময় লাগবে, যা দিয়ে আমদানিজনিত দায়দেনা সহজে পরিশোধ করা যায়। বিদ্যমান অবস্থায় আমরা অপরিহার্য পণ্য আমদানির জন্য আরও কিছু বৈদেশিক মুদ্রা হয়তো ছাড় করতে পারি, কিন্তু তা যেন আমাদের আসন্ন সভরেন ক্রেডিট রেটিং রিভিউ এবং মনিটরি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রত্যাশার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ না হয়। চাহিদার চাপ সহজ করার জন্য 'প্রশাসনিক ব্যবস্থা' অনুসরণের অনুকূল সময় এখন নয়।
আমাদের নীতি প্রণয়নকারী ব্যক্তিবর্গ এটা নিশ্চয়ই মেনে নেবেন যে, সরকারের উচ্চ মাত্রার ঋণ নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। এ জন্য দরকার আর্থিক খাতে আরও শৃঙ্খলা। এটা শুধু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকায় কমিয়ে ফেলার বিষয় নয়, আমাদের অবশ্যই 'ততটা প্রয়োজনীয় নয়' প্রকল্পের হাত থেকে রেহাই পেতে হবে। একই সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত মান অনুসরণ করে আমাদের বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের দিকে ঝুঁকতে হবে। ঋণ সংকোচনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতের প্রকল্পগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। বেসরকারি খাতের স্বার্থের হানি ঘটিয়ে সরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আমাদের আদৌ সন্তুষ্ট করতে পারে না।

মামুন রশীদ :অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

No comments

Powered by Blogger.