দু'ভাগ হলো ঢাকা by রাশেদ মেহেদী

ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগে ভাগ হলো। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা 'স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন বিল ২০১১' গতকাল মঙ্গলবার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠভোটে পাস হয়ে গেল মাত্র সাড়ে ৩ মিনিটে। এর মধ্য দিয়ে আইনি ভাষায় ঢাকা সিটি করপোরেশন দু'ভাগ করা হলেও আক্ষরিক অর্থে চারশ' বছরের পুরনো সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকাকে বিভক্ত করে দুটি নতুন নামকরণ করা


হলো। এখন থেকে রাজধানী ঢাকা আর ঢাকা নয়, পরিচয় হবে উত্তর ঢাকা আর দক্ষিণ ঢাকা। রাজধানীবাসী নিজেদের পরিচয় দেবেন কেউ উত্তরের আর কেউ দক্ষিণের বাসিন্দা হিসেবে।
এদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্ত করার প্রতিবাদে গতকালও নগর ভবনে অবিভক্ত ডিসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ মহাসমাবেশ
করেছে। বিকেলে কেন্দ্রীয়
শহীদ মিনারে অবিভক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার আহ্বানে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা সমাবেশ করেন। সমাবেশে সরকারের সিদ্ধান্তকে জনমত এবং জনস্বার্থবিরোধী উল্লেখ করা হয়। সমাবেশে তিনি আবারও ঢাকা বিভক্ত না করার আহ্বান জানান সরকারের প্রতি। এদিকে সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আজ বুধবারের মধ্যেই উত্তর ও দক্ষিণ ঢাকার দু'জন প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী ডিসিসি দুই ভাগ করার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেছেন, জনগণের অধিক সেবা প্রদানের জন্য সরকার আইনটি করেছে। স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, মূলত জনগণের দোরগোড়ায় সেবা নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই বিভক্তিকরণ।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ইতিহাস : ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে সে সময় থেকে পরবর্তী প্রায় দুশ' বছর ঢাকায় কোনো পৌরসভা বা উন্নয়নের জন্য পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক 'কমিটি অব ইমপ্রুভমেন্ট' নামে একটি কমিটি গঠন করে ঢাকা শহরের উন্নয়নের জন্য। এই কমিটির প্রধান ছিলেন তৎকালীন ঢাকার প্রধান রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তা মি. ওয়াল্টার। ১৮৪০ সালে 'কমিটি অব ইমপ্রুভমেন্ট'-এর নাম পরিবর্তন করে 'ঢাকা কমিটি' গঠন করা হয় এবং এর দায়িত্বের পরিধিও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো এই কমিটি পরিচালিত হয় একটি সুনির্দিষ্ট বিধির মাধ্যমে। এরপর ১৮৬৪ সালে 'ডিস্ট্রিক্ট মিউনিসিপ্যাল ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট'-এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো 'ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি' গঠিত হয়। তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। এরপর ১৮৮৪ সালে ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। এই কর্তৃপক্ষের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন আনন্দ চন্দ্র রায় এবং ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন খাজা আমিরউল্লাহ। এ ছাড়া কয়েকটি ওয়ার্ড কমিশনার পদও সৃষ্টি করা হয়। ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষ ছিল ওই উপমহাদেশে প্রথম কোনো নির্বাচিত শহর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ১৯২২ সালে প্রণয়ন করা হয় বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট। এই আইনের মাধ্যমে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্তৃপক্ষে মহিলা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে ওয়ার্ড কমিশনারের পদ সংরক্ষণের বিধান চালু হয়।
পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে গঠিত ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কমিটি বাতিল করা হয়। ১৯৫৩ সালে আবার ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি কমিটির নির্বাচন হয়। ১৯৫৯ সালে এই মিউনিসিপ্যালিটি বাতিল করা হয়। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যাল এলাকায় ৩০টি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
নয় মাসের মহান মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের পর ঢাকা হয় প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক রাজধানী। ১৯৭৭ সালে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সময় প্রথমবারের মতো পৌরসভা অধ্যাদেশ জারি করে 'ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি' গঠন করা হয় এবং ৫০টি ওয়ার্ড সৃষ্টি করা হয়। ১৯৭৮ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটিকে করপোরেশনে উন্নীত করা হয় এবং এর নাম হয় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি করপোরেশন এবং এর প্রধানকে মেয়র পদমর্যাদা দেওয়া হয়। ১৯৮২ সালে সেনাশাসক এরশাদ সরকার ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির সঙ্গে মিরপুর ও গুলশান নামে আরও দুটি মিউনিসিপ্যালিটি সৃষ্টি করে এবং পৃথক প্রশাসক নিয়োগ করে। এ সময় তিনটি মিউনিসিপ্যালিটিতে ওয়ার্ডসংখ্যা দাঁড়ায় ৫৬। ১৯৯০ সালে গুলশান ও মিরপুর মিউনিসিপ্যালিটি বাতিল করে ঢাকা সিটি করপোরেশন গঠন করা হয় এবং দশটি আঞ্চলিক অফিস সৃষ্টি করা হয়। ১৯৯৩ সালে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের বিধান করা হয়। ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পান। ঢাকা সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে। এই নির্বাচনে ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি তার নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদের অতিরিক্ত আরও সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। তবে তৃতীয় নির্বাচনের আগেই গতকাল মঙ্গলবার সংসদে আইন পাসের মধ্য দিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্ত হলো উত্তর ও দক্ষিণে।
কেন এই বিভক্তি : অবিভক্ত ঢাকা সিটি কপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচিত মেয়রের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৭ সালের মে মাসে। সে সময় ক্ষমতায় থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচনের আয়োজন না করে আইন অনুযায়ী আগের মেয়াদে নির্বাচিত মেয়রকেই অন্তর্বর্তীকালীন মেয়রের দায়িত্ব দেয়। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, এমন খবর কয়েকবার প্রচারিত হয়। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয়নি। আগের মেয়াদের মেয়র সাদেক হোসেন খোকাই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৯৩ সালের আইন অনুযায়ী ঢাকা সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের কোনো বিধান ছিল না। এ কারণে নির্বাচন ছাড়া আগের মেয়াদের মেয়রকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ ছিল না। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে নির্বাচন কমিশন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে। সে সিদ্ধান্তের আলোকেই গতকাল মঙ্গলবার ডিসিসি দু'ভাগ করার আইন পাস হয়। এই আইন পাসের ফলে ঢাকার মেয়রের পদ হারালেন বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা। নতুন আইনের মাধ্যমে বিভক্ত দুই সিটি করপোরেশনে পছন্দমত প্রশাসক নিয়োগের সুযোগও পেল সরকার।
ঢাকা বিভক্তির বিরুদ্ধে জনমত, আন্দোলন :গত ৩১ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ঢাকা বিভক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরই সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানানো হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, বিশিষ্ট নাগরিক_ সবাই এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গত ২৩ নভেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর থেকে নগর ভবনে ডিসিসি বিভক্ত করার প্রতিবাদে লাগাতার কর্মবিরতি, বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু হয়। গত ২৭ নভেম্বর বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়। আন্দোলনে নামার কারণে ডিসিসি কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক মেজবাহুল করিমকে স্ট্যান্ডরিলিজ করা হয়। শাহবাগ থানায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এগার জনসহ অজ্ঞাতনামা ৩০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আবারও নগর ভবনে সমাবেশ করে বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দুপুরে নগর ভবনের নিচতলার বারান্দায় আয়োজিত সমাবেশে আক্তার হোসেন দেওয়ান বলেন, 'প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। তিনি আমাদের সঙ্গে আগামী ৫ ডিসেম্বর বসবেন বলে জানিয়েছেন। এ জন্য আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে। তবে শুধু বৃহস্পতিবার ও রোববার নগর ভবন কম্পাউন্ডে বিক্ষোভ মিছিল করা হবে।'
ওই সমাবেশে ঐক্য পরিষদের অন্য নেতারা জানান, ৫ ডিসেম্বরের আলোচনায় দাবি পূরণ না হলে এরপর থেকে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এর আগে গতকাল সকাল থেকেই ডিসিসি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নগর ভবনের নিচে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা ডিসিসি ভাগ না করার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ ছাড়া আন্দোলনের জের ধরে পুলিশের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মেজবাহুল করিমের বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে স্লোগান দেন। এ সময় নগর ভবনে সব ধরনের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। তবে যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় নগর ভবনের বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল।
বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করেন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। এ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমেদ, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুর রউফ, ঢাকার সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস প্রমুখ। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেন, 'সরকার নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করছে। তারা যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে জনমত এবং জনস্বার্থ কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না। সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের বাইরে আর কিছুই দেখছে না সরকার। আর এ কারণেই সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে বাধ্য হতে হচ্ছে। ঢাকা বিভক্ত করার বিল পাস হলে ঢাকাবাসী রাজপথের আন্দোলনে থাকবে। সমাবেশে ঢাকার মেয়র বলেন, কোনো অবস্থায়ই ঢাকা বিভক্তি মেনে নেওয়া হবে না।
সংসদে বিল পাস : শহীদ মিনারে ঢাকার মেয়রের আহ্বানে বিশিষ্ট নাগরিকদের সমাবেশ শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা পরই জাতীয় সংসদে ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্ত করার আইন পাস হয়। বিকেলে সংসদের বৈঠক শুরু হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংসদে 'স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) বিল নামে এই বিলটি উত্থাপন করেন। বিলে সংশোধনী দেওয়া সংসদ সদস্যরা এ সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে বিলটি উত্থাপনের মাত্র সাড়ে ৩ মিনিটেই পাস হয়ে যায়। সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার আদলে বিভক্ত হয়ে যায় ঢাকা সিটি করপোরেশন।
বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া : ঢাকা বিভক্ত করে সংসদে বিল পাস হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আমিনুজ্জামান সমকালকে বলেন, এর মধ্য দিয়ে ঢাকায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্য প্রকট করা হলো। উত্তর ঢাকার অর্থনৈতিক এবং সামাজিক রূপ এক রকম, দক্ষিণ ঢাকায় আরেক রকম। পৃথিবীর আর কোনো দেশে রাজধানী শহরে এভাবে দুটি মেয়রের পদ সৃষ্টি করে বিভক্ত সিটি করপোরেশন নেই। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার জনমত নেওয়ার বা শোনারও প্রয়োজন মনে করেনি। এটা গণতন্ত্রের জন্য, জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক সিদ্ধান্ত। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ সমকালকে বলেন, এতবড় একটা আইন সংসদে মাত্র কয়েক মিনিটে পাস করা হলো। সংসদীয় কমিটিতে একটা পূর্ণ আলোচনাও হলো না। জনমতের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা তো দেখানোই হয়নি। এ সিদ্ধান্তের পক্ষে বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞদের একজনও ছিলেন না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ঠিকই; কিন্তু প্রবল জনমত উপেক্ষা করে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেই সঙ্গত হয়নি। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক সমকালকে বলেন, এর মাধ্যমে সাংবিধানিক জটিলতারও সৃষ্টি হলো। রাজধানীর নাম উত্তর ও দক্ষিণ সাংবিধানিকভাবে হতে পারে না। কারণ সংবিধানের ৫(১) ধারা অনুযায়ী রাজধানীর নাম ঢাকা এবং ৫(২) ধারা অনুযায়ী রাজধানীর সীমানা আইনের দ্বারা নির্ধারিত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ডিসিসি বিভক্ত করার পক্ষে সরকার নাগরিক সেবার অজুহাত দেখালেও এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তা সবাই বোঝে। এর মাধ্যমে সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনের মর্যাদা ও ক্ষমতা ক্ষুণ্ন করল।
উত্তর ও দক্ষিণ ঢাকা :উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভেতরে দেশের জাতীয় স্থাপনাগুলোও ভাগ হয়ে গেল। রাষ্ট্রপতির ভবন বঙ্গভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় জাদুঘর, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পড়েছে দক্ষিণে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদ ভবন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, নির্বাচন কমিশন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পড়েছে উত্তরে।
একইভাবে উত্তরা, গুলশান, বনানীসহ অভিজাত এলাকাগুলো পড়েছে উত্তরে। এর ফলে উত্তর ঢাকা হচ্ছে প্রভাবশালী এলিট শ্রেণীর ঢাকা। অন্যদিকে নাগরিক সুবিধায় পিছিয়ে পড়া পুরান ঢাকা, বাড্ডা, লালবাগ, ধানমণ্ডির জিগাতলা অংশসহ অপেক্ষাকৃত কম অনুন্নত এলাকা হয়ে গেল দক্ষিণ ঢাকা। ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্ত করা হলেও মঙ্গলবার সংসদে পাস হওয়া আইনে ঢাকার আগে উত্তর ও দক্ষিণ শব্দ দুটি যোগ হয়েছে। এর ফলে আক্ষরিক অর্থে ঢাকার দুটি নাম হয়ে গেল।

No comments

Powered by Blogger.