রিজার্ভ সেনা ইস্যুতে আগুন নিয়ে খেলছে ইসরাইল: গাজায় দুর্ভিক্ষ- জাতিসংঘ, ইসরাইলের অস্বীকার
বুধবার আইডিএফ প্রধান অব স্টাফ ইয়াল জামির ৬০ হাজার রিজার্ভকে আগামী মাসে ডেকে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০ হাজার সেনার দায়িত্ব ৪০ দিন বাড়ানো হবে। কেউ গাজায় যাবে, আবার কেউ অন্যত্র মোতায়েন হবে। গাজায় মোতায়েন এক রিজার্ভ সেনা বলেন, ব্রিগেড কমান্ডাররা তাদের দুর্দশা বোঝেন না, শুধু সফলতার পেছনে ছুটেন। তিনি বলেন, ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে সেনাদের জীবনের চেয়ে তার পদোন্নতি বড় ব্যাপার। তাই প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
তার কাছে একটাই ব্যাখ্যা- এটা জায়নবাদ। কিন্তু তিনি বোঝেন না, তার ইউনিটের লোকেরা ফ্রিজে খাবারও রাখতে পারছে না, সন্তানরা দুই বছর ধরে আতঙ্কে আছে কারণ তাদের বাবা যুদ্ধে। উত্তর সীমান্তে দায়িত্বে থাকা এক সেনা বলেন, অনিশ্চয়তায় রিজার্ভরা কষ্ট পাচ্ছে। যুদ্ধের দুই বছর পর আমরা বুঝে গেছি এটা শিগগির শেষ হবে না। কেউ আমাদের সময়সূচি জানাতে পারে না। অন্তত কেউ যদি বলত- তুমি এই দুই মাস রিজার্ভে থাকবে, তাহলে আমরা জীবন পরিকল্পনা করতে পারতাম। কিন্তু হঠাৎ ফোনে ডাকা হয়, একদিন পরেই আদেশ এসে যায়। তিনি জানান, প্রতিবার ডাক পাওয়ার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা ২৫০ দিনেরও বেশি সেবা করেছি, হাজির হয়েছি। কিন্তু কেন এই অবহেলা, কেন আমাদের পরিবারকে এভাবে কষ্ট সহ্য করতে হবে? তিনি সতর্ক করে বলেন, একসময় যদি সেনারা উপস্থিত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি তুষারগোলার মতো গড়াতে থাকবে, থামানো যাবে না।
এক জরিপে দেখা গেছে, ৪০ ভাগ সেনার যুদ্ধের প্রেরণা কমেছে। ১৩ ভাগ বেড়েছে, আর বাকিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই। এক অভিজাত ইউনিটের রিজার্ভ সেনা চতুর্থবার গাজায় যাচ্ছেন। বলেন, তিনি ও তার সহযোদ্ধারা দায়িত্ব অস্বীকারের কথাও ভেবেছেন। তার ভাষায়, আমরা স্থির করেছি যদি অস্বীকৃতি জানাই, তা সবাই মিলে জানাবো। এখনো দেখছি কোথায়, কতদিন পাঠানো হয়। তিনি আরও বলেন, অক্টোবর ৭-এর পর আমরা আর আগের সেই সেনা নই। আমরা ক্লান্ত, চাকরি বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছি।
যুদ্ধের কোনো লক্ষ্য নেই। আমরা শুধু পাহারায় থাকি আর ধ্বংস হওয়া ভবনে হামলা চালাই যেগুলোকে সন্ত্রাসী অবকাঠামো বলা হয়। তবুও তিনি উপস্থিত হবেন বলেই জানালেন- আমার প্রথম দায়বদ্ধতা আমার টিমের প্রতি। আমরা একসাথে বড় হয়েছি। তাদের ছাড়া থাকা কল্পনা করতে পারি না।
কমান্ডাররা জানেন, অনেক সেনা হয়তো আসবে না বা যতদিন ছুটি সম্ভব চাইবে। তাই ইউনিটগুলো যতজন সম্ভব সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। এক সেনা বলেন, তার শেষ দায়িত্বকালীন সময়ে জনবলের অভাব ছিল। তিনি বলেন, কিছু মিশন আমরা পূরণই করতে পারিনি, যেমন আহতদের সরিয়ে নেয়া বা ভেতরে থাকা বাহিনীকে সহায়তা। তাই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন সেনা খোঁজা হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবার আছে এমন সেনা বা দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারীদের কিছুটা সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ফল সীমিত।
গাজায় দুর্ভিক্ষ- জাতিসংঘ, ইসরাইলের অস্বীকার
গাজায় দুর্ভিক্ষ। সেখানে খাবারের অভাবে মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। একটু খাবার খুঁজতে গিয়ে তারা বন্দুকের গুলির নিশানায় পরিণত হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্ববাসী তা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কারো মুখে রা নেই। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠী নীরবে ঘুমের দেশে আছে। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হয় গাজাবাসী মানুষ নয়। পশুপাখি যে অধিকার ভোগ করে, তাদের সেই অধিকারও নেই। পশুপাখি মুক্তভাবে উড়তে পারে। আকাশ তার অবারিত ভুবন। তাকে বাধা দেয়ার কেউ নেই। কিন্তু গাজার মানুষ অবরুদ্ধ। তাদের নড়াচড়া করার কোনো অনুমতি নেই।
অনলাইন বিবিসি বলছে, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গাজা সিটি ও এর আশপাশের এলাকায় নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ চলছে বলে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, এটা মানবতার ব্যর্থতা। অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এটি একটি মানুষের তৈরি বিপর্যয়। জাতিসংঘ সমর্থিত একটি সংস্থা গাজার কিছু অংশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ স্তর ফেজ ৫-এ উন্নীত করেছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) জানিয়েছে, গাজা জুড়ে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারাত্মক অবস্থার মুখোমুখি।
ইসরাইল এ প্রতিবেদনকে সরাসরি মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছে এবং দুর্ভিক্ষের দাবি অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘ বলছে, ইসরাইল এখনো গাজায় সাহায্য প্রবেশে সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে। তবে ইসরাইল তা অস্বীকার করেছে। কিন্তু এই অস্বীকৃতি মাঠ পর্যায়ের সাক্ষী, শতাধিক মানবিক সংস্থা, একাধিক জাতিসংঘ সংস্থা এবং ইসরাইলের কয়েকটি মিত্র প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ অবস্থানে।
আইপিসি সতর্ক করেছে, তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক পদক্ষেপ না নিলে দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যু অগ্রহণযোগ্যভাবে বৃদ্ধি ঘটবে। সংস্থাটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দুর্ভিক্ষ গাজার দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এই সময়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বা প্রায় ৬,৪১,০০০ মানুষ আইপিসি ফেজ ৫-এর মারাত্মক পরিস্থিতিতে পড়বে। আর ফেজ ৪ (জরুরি পরিস্থিতি)-এর আওতায় পড়বে ১.১৪ মিলিয়ন মানুষ (জনসংখ্যার ৫৮ ভাগ)।
আইপিসির রিপোর্ট বলছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অপুষ্টি পাঁচ বছরের কম বয়সী ১,৩২,০০০ শিশুর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অপুষ্টিতে ইতিমধ্যে ২৭১ জন মারা গেছে, তাদের মধ্যে ১১২টি শিশু। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর আইপিসি এখন পর্যন্ত মাত্র চারটি দুর্ভিক্ষকে চিহ্নিত করেছে। সর্বশেষটি ২০২৪ সালে সুদানে। তবে আইপিসি আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে পারে না; সাধারণত তা করে সরকার বা জাতিসংঘ।

No comments