বিশ্বসুন্দরীর অমৃত বাণী ও মাতৃমৃত্যু by উম্মে মুসলিমা

অনেক দিন থেকেই বিষয়টা নিয়ে লেখার জন্য তাগিদ অনুভব করছিলাম। ২০১৭ সালের বিশ্বসুন্দরী আর একটু উসকে দিলেন তাঁর প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশ্বসুন্দরী ভারতের মানুষি ছিল্লারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—কোন পেশায় সবচেয়ে বেশি বেতন হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন এবং কেন। ছিল্লার নম্রভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কারও জন্য বেতন বিবেচ্য বিষয় নয়, তবে আমার কাছে মনে হয় মাতৃত্বের জায়গাটাই সবচেয়ে সম্মানের হওয়া উচিত। এখানে অর্থকড়ি মূল্যহীন। পুরোটাই ভালোবাসা আর সম্মানের।’ তাঁর জবাবে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। বিশ্বসুন্দরীর মুকুট উঠে গেল তাঁর মাথায়। কুড়ি বছরের একটি মেয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই মাতৃত্বের মহিমাকে অমূল্য হিসেবে হৃদয়ে লালন করবেন সন্দেহ নেই। কিন্তু বাস্তব যে কত নিষ্ঠুর, তা কেবল জানেন যে মায়েরা সন্তান ধারণ ও লালন করেন। আর প্রতিবছর যেসব শিশু জন্মের পরই হারাচ্ছে তাদের মাকে, তাদের বেড়ে ওঠার বেদনা যে কত দুর্বিষহ, তা সেই সব শিশুই জানে। সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমেনি বরং বেড়েছে। সাত বছর আগে সর্বশেষ মাতৃমৃত্যু জরিপে দেখা গিয়েছিল ১ লাখ শিশু জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৪ জন মায়ের মৃত্যু হয়েছে, ২০১৫ সালের পর থেকে তা বাড়ছে। সুতরাং বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু–সম্পর্কিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করতে পারেনি। ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যায় ১০ থেকে ১১ লাখ পথশিশু। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের। সম্পদশালী আছে মাত্র ৮০-৯০ লাখ। প্রতিবছর আমাদের দেশে ৩২ লাখ শিশু জন্ম নেয়।
প্রতিবছর প্রসবকালীন ১৫ হাজার নারীর মৃত্যু ঘটে। এ ক্ষেত্রে এ বছরের বিশ্বসুন্দরীর দেশের অবস্থা আমাদের দেশের চেয়ে কোনো অংশেই ভালো নয়। বিশ্বসুন্দরী বললেন যে মাতৃত্বের জায়গাটিই সবচেয়ে সম্মানের হওয়া উচিত, এখানে অর্থকড়ি মূল্যহীন। তাঁর দেশে যে হারে মেয়ে ভ্রূণ হত্যা চলছে, তাতে মাতৃত্বের সম্মানই বড় হওয়া উচিত। কিন্তু মেয়ের বিয়ের জন্য কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা–মাতার অর্থকড়ির আয়োজনে নিজেদের জীবন ধারণ যেভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে মাতৃত্ব অভিশাপ। তাহলে দেখা যাক আমাদের ও তাদের দেশে এত মাতৃমৃত্যুর কারণ কী। ইউনিসেফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মা নিরাপদ মাতৃত্বের আওতায় আছেন। বাদবাকি মায়েদের প্রত্যক্ষ মৃত্যুর কারণের মধ্যে রয়েছে প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, খিঁচুনি, প্রসব জটিলতা, দীর্ঘ সময় ধরে প্রসব, গর্ভপাত, হৃদ্‌রোগ, জন্ডিস ইত্যাদি। পরোক্ষ কারণ অপরিণত বয়স, দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা, প্রয়োজনীয় খাবারের অপ্রতুলতা, রক্তস্বল্পতা, অদক্ষ ধাত্রী, অর্থাভাব, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব ও কুসংস্কার। এ ছাড়া প্রসব-পূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসব-উত্তর সেবাযত্নের অভাবও একটা বড় কারণ। এখনো ৬৮ শতাংশ প্রসব বাড়িতে হয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীদের দ্বারা হয় ৩৩ শতাংশ। একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রসূতিকক্ষ। আবেদা খাতুনের শাশুড়ির ইচ্ছা ছিল না হাসপাতালে দুনিয়ার লোকজনের মধ্যে ঘরের বউ বাচ্চা প্রসব করুক। তা ছাড়া হাসপাতালে এলেই খরচ। হাতে টাকাপয়সা নেই। ছেলে ঢাকায় রিকশা চালায়। কবে আসবে তার কোনো ঠিক নেই। কিন্তু আবেদার বড় বোন নাছোড়বান্দা। তাঁর নিজের তিনটি সন্তানের মধ্যে কেবল শেষেরটাই বেঁচে আছে। তিনিও মরতে মরতে কোনোমতে বেঁচে উঠেছেন, তা কেবল হাসপাতালে এসেছিলেন বলেই। ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে বোন আর বাচ্চাটাকে বাঁচানোর জন্য জোর করে হাসপাতালে এনেছেন। কিন্তু একটা বাচ্চা জন্ম দিতে শরীরে যেটুকু শক্তির দরকার, আবেদার তা ছিল না। রক্তশূন্য, পুষ্টিহীন, কোটরাগত পাংশু চোখ আর কাঠির মতো হাত-পায়ের আবেদাকে দেখে ডাক্তার আশা দিতে পারলেন না। বোন মানুষি ছিল্লার, আমাদের উপমহাদেশে অর্থকড়ি মূল্যহীন নয় বরং মাতৃত্ব রক্ষায় অন্যতম উপযোগ। বাল্যবিবাহ রোধ, কুসংস্কার থেকে মুক্তি, শিক্ষা, স্বনির্ভরতা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির সমন্বয় যেদিন হবে, সেদিন হয়তো মাতৃমৃত্যু ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে আসবে।
হয়তো একদিন এ দেশে অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রতি পরিবারের সবাই সচেতন ও যত্নবান হয়ে উঠবেন। কিন্তু যত দিন না হয়, তত দিন গর্ভবতী নারীর নিজেকে প্রসবের পূর্বে অল্প অল্প করে কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে হবে। এ শুধু নিম্নবিত্ত নারীর সমস্যা নয়, অনেক মধ্যবিত্ত নারীও চূড়ান্ত মুহূর্তে অর্থের সংকটে পড়েন। দেখা গেল প্রসবের জটিলতায় অস্ত্রোপচার দরকার, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য রক্তের প্রয়োজন বা নবজাতকের সুস্থতার জন্য ওষুধ-পথ্য চাই, কিন্তু আর্থিক প্রস্তুতি নেই। গ্রামীণ দরিদ্র নারীরা গর্ভধারণের পর থেকেই মাটির ব্যাংকে প্রতিদিন দুই-পাঁচ টাকা করে রাখলেও হাসপাতালে যাওয়ার ভ্যান ভাড়াটুকু জোগাড় থাকে বা সপ্তাহে দু-একটা ডিম খেতে পারেন। বিত্তহীন নারীদের মুষ্টিচাল সংরক্ষণের মাধ্যমেও কিছু অর্থের সংস্থান হয়। কেবল শিক্ষিত বা প্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হওয়াই নারীর জন্য সব নয়। সব নারীই উপার্জনক্ষম হতে পারবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় চাকরিরত নারীরা সন্তানধারণের পরপরই শারীরিক, সাংসারিক ও দাপ্তরিক জটিলতায় চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। সন্তান স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই। মায়েরা সন্তান জন্ম দেবেন আর বাবারা হবেন সন্তানের দাবিদার—এসব দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে হবে। কোন পেশায় সবচেয়ে বেশি বেতন হওয়া উচিত—এই প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বসুন্দরীর জবাব হতে পারত—মাতৃত্ব কোনো পেশা নয় (গর্ভ ভাড়া ব্যতীত), কিন্তু সন্তানধারণ ও লালনকালীন নারীকে স্বামীর বা সরকারের বেতন দেওয়া উচিত। কারণ, শেষাবধি তাঁর সন্তান রাষ্ট্রেরই সম্পদ হবে। তবে বেতনের বিকল্প হতে পারে নারীর জীবনের যে সময়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল, সংকটপূর্ণ, অসহায়, পরিবর্তনে প্রক্রিয়াধীন, রূপান্তরময়—সেই সব সময়ে উত্তরণে স্বজনের সেবা, সহায়তা ও সহমর্মিতা।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।
muslima.umme@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.