কী বার্তা দিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নতুন ও সাবেক সাধারণ
সম্পাদক হাতে হাত ধরে অভিনন্দনের জবাব দেন
একটি সুশৃঙ্খল, সফল ও আলোকসজ্জা–শোভিত সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এখন ফুরফুরে মেজাজে আছেন। আরও ফুরফুরে আছেন দলের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি প্রায় প্রতিদিনই দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, সংবাদ সম্মেলন করছেন। বৃহস্পতিবার দুটি জাতীয় দৈনিকে তাঁর সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীেগর সাধারণ সম্পাদক দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, নির্বাচন, জঙ্গিবাদ ইত্যাদির ওপর আলোকপাত করেছেন।
চলমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু না বললেও ওবায়দুল কাদের দলকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করার কথা বলেছেন। দলের হাইব্রিড নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথা বললেও কীভাবে হাইব্রিড নেতারা দলে এলেন, তাঁদের বের করে দেওয়া হবে কি না, তা বলেননি তিনি। ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগকে আরও গতিশীল করা এবং চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় জানানোর পাশাপাশি দলে যে কিছু সমস্যা আছে, তা–ও স্বীকার করেছেন। বিএনপির সঙ্গে সংলাপের প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘বিএনপি কি আসলেই সংলাপ চায়? সংলাপ চাইলে তো তারা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিত। প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করে আমন্ত্রণ জানালেও বিএনপির চেয়ারপারসন তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিএনপি এখনো গত নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার খেসারত দিচ্ছে। ৫০০ লোকের মিছিলও করতে পারছে না। তারা বিরোধী দলের সম্মানও হারিয়েছে। আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে ভুলের চোরাবালিতেই আটকে থাকবে বিএনপি।’ (সমকাল, ২৭ অক্টোবর ২০১৬) যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই যে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে এ কথাও বলতে হবে যে বিএনপির ভুল সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নির্বাচন, সংসদ ও গণতন্ত্র। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে এ দেশের মানুষ যে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা কীভাবে অপহৃত হলো? ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি আসেনি মানলাম। কিন্তু পরবর্তী উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে হওয়া পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তো তারা অংশ নিয়েছে। সেসব নির্বাচন কেন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলো না? কেন মানুষ পছন্দসই প্রার্থীকে ভোট দিতে পারল না?
আওয়ামী লীগের নতুন সাধারণ সম্পাদক কি সেসবও বিএনপির ভুলের খেসারত বলে চালিয়ে দেবেন? ওবায়দুল কাদের ওই সাক্ষাৎকারে একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আগামী সংসদ নির্বাচনও সর্বদলীয় সরকারের অধীনে হবে। যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়ে থাকে, ঠিক সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।’ আগামী নির্বাচন কমিশন সবার প্রত্যাশা পূরণ করে গ্রহণযোগ্য অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করবে বলে তিনি মনে করেন। (সাক্ষাৎকার, ওই)। বিএনপির দাবিও তো তা–ই। গত বুধবার এক সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, নির্বাচন যেই সরকারের অধীনে হোক না কেন, নির্বাচন কমিশন হতে হবে সব দলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে। গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা ও জাতীয় পরিষদের সদস্য রানা আফজল খান বলেছেন, তাঁদের দেশে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। সরকারি ও বিরোধী দল থেকে তিনটি করে নাম দেওয়া হয়। এর মধ্যে যে নামটি মিলে যায়, তাঁকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। পাকিস্তানের উদাহরণে অনেকে ভ্রু কুঁচকাতে পারেন। কিন্তু স্বীকার করতে হবে, ওখানে সব দল মিলে একটি নির্বাচন করতে পেরেছে। আমরা পারিনি। অপর সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘আমাদের প্রথম টার্গেট আগামী নির্বাচন। পরবর্তী টার্গেট রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন। অর্থাৎ উন্নত ও মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা। ...এই মুহূর্তে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদ আমাদের প্রধান বিপদ। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে তারা ভয়াবহ হামলার প্রস্তুতি যে নিচ্ছে না, এ কথা বলার উপায় নেই।
এ বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ অক্টোবর ২০১৬) তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবেন না। জঙ্গিবাদ যে দেশের প্রধান বিপদ, সে সম্পর্কে মানুষ সজাগ। বরং সরকারের ঘুমটা ভেঙেছে হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির পর। আগে ভাঙলে হয়তো আরও অনেক অঘটন থেকে দেশ রেহাই পেত। তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল, আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের কাছে বিএনপি প্রত্যাশা করছে, তারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেবে এবং নতুন নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে; আপনি কী বলবেন? জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘গণতন্ত্র ও নির্বাচন সবই আছে। একটা গণতান্ত্রিক দল দীর্ঘদিন সরকারের বাইরে আছে। সরকারের বাইরে থেকে বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা যদি যথাযথভাবে পালন করে এবং গত নির্বাচনের মতো নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি যদি তারা না ঘটায়, তাহলে দেশে স্বস্তি আসবে। ...যেসব ঘটনা দেশকে পিছিয়ে দেয়, গণতন্ত্রকে রক্তাক্ত করে, দেশের স্থিতিকে রক্তাক্ত করে, সেসব ঘটনা না ঘটিয়ে তারা জনগণকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন করুক। জনমত গড়ে তুলুক। বিরোধী দল বা বিরোধী পক্ষ শক্তিশালী হলে সরকার আরও শক্তিশালী হয়।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এই বক্তব্যের সঙ্গেও আমরা একমত। গণতন্ত্রকে রক্তাক্ত করা কিংবা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা কোনো দায়িত্বশীল দলের কাজ হতে পারে না। অতীতে বিএনপি আন্দোলনের নামে জ্বালাও–পোড়াও করলেও এখন তাদের একমাত্র দাবি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। এমনকি সরাসরি না বললেও আওয়ামী লীগের নেতারা যে হরদম বলে বেড়াচ্ছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগেও নির্বাচন দেবেন না,
সেটিও তাঁরা মেনে নিয়েছেন। পরের প্রশ্ন ছিল, বিএনপি আপনাদের স্বাগত জানিয়েছে—বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের মতের বিভেদ থাকতে পারে। তবে রাজনীতিতে সৌজন্য হারিয়ে যাবে, এটা ঠিক না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা কাজের পরিবেশ থাকা ভালো। তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোরও স্বাস্থ্য ভালো থাকে। বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে, আমিও তাদের শুভেচ্ছা জানাই।’ কিন্তু উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করলাম, তাঁর এই উপলব্ধিই এক দিন পরই পাল্টে যায়। পরদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিলেন। এর মাধ্যমে কী বার্তা দিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক? তিনি অরাজকতার পুরো দায় যেমন বিএনপির ওপর চাপালেন, আবার বিএনপির নেতারা আওয়ামী লীগের ওপরও চাপাতে পারেন। কিন্তু সংকট উত্তরণের উপায়টা কী? ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির কাজ এখন প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে’ কিংবা ‘তারা ৫০০ লোককে নিয়ে মিছিলও করতে পারে না’। সত্যিই কি বিএনপি ৫০০ লোককে নিয়ে মিছিল করার সামর্থ্য হারিয়েছে? সেটা হলে তো আওয়ামী লীগের উচিত বিএনপির মনোনীত ব্যক্তিদের দিয়ে একটি নির্বাচন কমিশন করে জনপ্রিয়তা যাচাই করা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে বোমাসন্ত্রাস যেমন কাঙ্ক্ষিত নয়, তেমনি বাঞ্ছিত নয় কোনো দলকে ঘরে আটকে রাখাও। বিএনপির কোনো নেতা বা কর্মী যদি অতীতে বা বর্তমানে সন্ত্রাসী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত থেকে থাকেন, সরকারের দায়িত্ব তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা; উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া। কিন্তু সব শীর্ষ নেতাকে হুকুমের আসামি করে দৌড়ের ওপর রেখে ক্ষমতার বাহাদুরি দেখানো যেতে পারে, তাতে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না।
এতে বরং আন্দোলনের নামে যাঁরা জ্বালাও-পোড়াও করেছেন, তাঁদের ছাড় পাওয়ার আশঙ্কা থাকবে; ইতিমধ্যে অনেকে ছাড় পেয়েও গেছেন। সম্প্রতি সিলেটে ছাত্রলীগের এক নেতার হাতে খাদিজা নামের এক কলেজশিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতারা জোরেশোরে বলতে থাকলেন, ‘অপরাধীদের কোনো দল নেই। অপরাধ যে–ই করুক না কেন, তাকে শাস্তি পেতে হবে।’ একই যুক্তি কেন বিএনপির নেতা-কর্মীদের বেলায় প্রযোজ্য হবে না। তবে ওই সাক্ষাৎকারে ওবায়দুল কাদের দলের নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে যে আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য রেখেছেন, সে জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। কেননা, আমাদের কোনো দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাই দলীয় কর্মীদের দোষ স্বীকার করেন না। সবকিছুর জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেন। তাঁর মতে, ‘দলকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা আমাদের অন্যতম কাজ। উন্নয়ন আর আচরণকে একই ধারায় বহমান করা দরকার। উন্নয়ন যতই হোক না কেন, আচরণ খারাপ করলে উন্নয়ন ম্লান হয়ে যায়। আবার ভোটের রাজনীতিতেও এর প্রভাব আছে। এখন থেকেই এ কাজটি আমাদের করতে হবে।’ এর মাধ্যমে তিনি অন্তত দলীয় শৃঙ্খলা ও কর্মীদের আচরণগত সমস্যাটি অনুধাবন করেছেন বলে ধারণা করি; রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা গণমাধ্যমের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেননি। সম্প্রতি দলের দুজন সাংগঠনিক সম্পাদকও ব্যক্তিগত আলাপে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আচরণগত সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেছেন, কেবল উন্নয়ন দিয়ে নির্বাচনে জেতা যায় না; নির্বাচনে জিততে হলে আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নেতাদের আচরণ ও ভাষাভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। আর নেতারা পরিবর্তন না হলে কর্মীদের কাছে সেটি আশা করাও অবান্তর। আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই দল ও দেশের পার্থক্যটি বোঝেন না। তাঁরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ মানেই দেশ। অর্থাৎ, দেশকে ভালোবাসলে সবাইকে আওয়ামী লীগারই হতে হবে। তাঁরা ভুলে যান যে দেশের কোনো জনগোষ্ঠী বা শ্রেণির মানুষকে বাদ দিয়েও একটি দল গঠিত হতে পারে, কিন্তু দেশটি হয় সবাইকে নিয়ে। যদি কোনো দল ধরেই নেয় যে তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক এবং তাদের বাইরে যারা আছে, তারা সব দেশবিরোধী; তাহলে দেশ, সমাজ ও গণতন্ত্র এক অনিরামেয় ব্যাধির শিকার হতে বাধ্য।
আমরা কি সেদিকেই যাচ্ছি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.