দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের চ্যালেঞ্জ by আনু মুহাম্মদ

দেড় শ কোটিরও বেশি মানুষের বাস এই দক্ষিণ এশিয়ায়। যেসব বহুল প্রচলিত কাঠি ব্যবহার করা হয় উন্নয়ন মাপার জন্য, তার কয়েকটিতে বেশ সন্তোষজনক চেহারাই দেখা যায় অঞ্চলের। বিশ্বের গড় হার বিবেচনায় এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার ভালো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিরাপদ, মুদ্রাস্ফীতি আয়ত্তের মধ্যে, বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যোগাযোগ সম্প্রসারণশীল, সব কটি অর্থনীতিই আমদানি-রপ্তানি উদারীকরণে এগিয়ে, বিনিয়োগ হার ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি। তা ছাড়া উর্বর জমি, মৎস্যসম্পদ, পানিসম্পদ, খনিজ সম্পদ, ভূবৈচিত্র্য, সমুদ্রসম্পদ, প্রাণবৈচিত্র্য, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ইত্যাদি সবদিক থেকেই এই অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ‘উন্নয়ন’ নামে মুনাফা উন্মাদনার আগ্রাসনে অনেক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও এখনো এই অঞ্চল অনেক সম্ভাবনাময়।
প্রচলিত মাপকাঠিতে পরিসংখ্যান অনেক ভালো খবর দিলেও পাশাপাশি তা এটাও বলছে যে পুরো দক্ষিণ এশিয়া এখন বিশ্বের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শতকরা প্রায় অর্ধেক মানুষের অঞ্চল, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষ কেন্দ্রীভূত এই অঞ্চলে। জাতিসংঘের ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক’ (Multidimensional Poverty Index) অনুযায়ী বিশ্বের দরিদ্রদের এক-চতুর্থাংশ আফ্রিকায় বাস করে, আর অর্ধেক বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়। এই সমীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, আফ্রিকার ২৬টি দরিদ্রতম দেশের চেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষ ভারতের আটটি রাজ্যে বাস করে। বলা হয়, এই সূচক অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় দরিদ্র মানুষের অনুপাত শতকরা ৫৫। যদি দিনপ্রতি আয় দুই ডলার ধরে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়, তাহলে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী এই অঞ্চলের শতকরা ৭৭ জন মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে। বিশুদ্ধ পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, আশ্রয়—সব কটিতেই এসব দেশের বেশির ভাগ মানুষ বিপন্ন অবস্থায় আছে। শ্রেণিগত, জাতিগত, লিঙ্গীয়, ধর্মীয়, বর্ণগত বৈষম্য নিপীড়নে ক্ষতবিক্ষত শতকোটি মানুষ। প্রচলিত মানব উন্নয়ন সূচক বিবেচনা করলে শ্রীলঙ্কা ছাড়া সব কটি দেশই ১২০-এর পরে।
শ্রেণি ও লিঙ্গীয় বৈষম্য নিপীড়নে সব কটি দেশেই কমবেশি একই চিত্র। এ ছাড়া ভারতে বিশেষভাবে বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়ন, পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নি-আহমদিয়া, বাংলাদেশে জাতিগত নিপীড়ন, শ্রীলঙ্কায় জাতিগত নিপীড়ন ও সংঘাত এবং এসব দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত কয়েক দশকে, বিশেষত নব্বইয়ের পর সব কটি দেশেই জাতিবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক-ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে।
গত কয়েক দশকের উন্নয়ন ধারায় এই দেশগুলোয় খুবই ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে বিপুল ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি, নির্লজ্জ মাত্রার ভোগবিলাস ও চোরাই অর্থনীতির দাপট বেড়েছে। ভারত ও পাকিস্তানে শুধু যুদ্ধ উন্মাদনাতেই বিপুল সম্পদ ব্যয় হয়। দারিদ্র্য-নিরক্ষরতা-বঞ্চনাভরা দুটো দেশের শাসকেরাই বিপুল অর্থব্যয়ে ভয়ংকর পারমাণবিক বোমা বানিয়ে গর্বিত এবং জনগণের মধ্যে এই গর্ব উন্মাদনা ছড়ানোতে তৎপর।Õ স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) সংকলিত তথ্য অনুযায়ী ভারত বর্তমান বিশ্বের সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক এবং পাকিস্তান তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। দারিদ্র্যের পাশাপাশি ঐশ্বর্যের আর ধ্বংস উন্মাদনার এ রকম অশ্লীল সহাবস্থান খুব কম অঞ্চলেই আছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করার জন্য বিতর্ক করা দরকার দারিদ্র্য বঞ্চনার কদর্য চেহারা আর প্রাচুর্যের জৌলুশ; মুক্ত চিন্তার পাশাপাশি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি; ক্রমবিস্তারমান বিরাজনীতিকৃত মধ্যবিত্তের পাশে বিভিন্ন প্রান্তে অপমানিত-বঞ্চিত কোটি মানুষের অদম্য লড়াই; গণতন্ত্রের চর্চার পাশাপাশি নিপীড়নের বর্বরতা ও ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ ইত্যাদি বৈপরীত্য নিয়েই দক্ষিণ এশিয়া। এই অঞ্চলে মিয়ানমার ছাড়া আর কোনো দেশেই এখন প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন নেই, কিন্তু সব দেশেই সামরিকীকরণ বেড়েছে। প্রায় সব কটি দেশেই নির্বাচিত সরকারের অধীনে একের পর এক ‘নিরাপত্তা আইন’, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ আর দমনমূলক নানা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন ও মূলধন সংবর্ধনের ধরন, বিশ্ব পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তার যুক্ততা, করপোরেট স্বার্থে মানুষ ও প্রকৃতিবিরোধী আগ্রাসন ইত্যাদিতে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের ঐক্য আছে। ঐক্য আছে নিপীড়নমুখী রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধির অবিরাম চেষ্টায়। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় কমবেশি অঙ্গীভূত সব কটি দেশই। ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’ এখন সব দেশের শাসকদেরই নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিস্তারের প্রিয় কৌশলসূত্র।
রাষ্ট্র ও জনগণ সমার্থক নয়। অখণ্ড কোনো দেশ নেই, একক সত্তা বলে কোনো কিছু নেই। জাতীয়তাবাদী কিংবা ধর্মান্ধ আওয়াজ তুলে রাষ্ট্র নিজের পেছনে মানুষকে জমায়েত করতে চায়, সংঘাত আর বৈরিতার দেয়াল তুলতে চায় জনগণের মধ্যে। কিন্তু সব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ অভিন্ন। সব দেশেই করপোরেট জগতের একটি অভিন্ন প্রচার আছে। যারা মানুষের জীবন-জীবিকার পক্ষে দাঁড়ায়, যারা ভুল প্রতিশ্রুতিতে নির্মিত বাঁধের জন্য উচ্ছেদ হওয়া কোটি কোটি মানুষের লড়াইয়ে শামিল, যারা নির্বিচার রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, লক্ষ কোটি মানুষ উচ্ছেদ করে ‘করপোরেট হাব’ বানানোর বিরোধী, যারা জনগণের শিক্ষা ও চিকিৎসা অধিকার নিয়ে সোচ্চার, তাদেরই, বাংলাদেশের মতোই, ভারতেও ‘উন্নয়নবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। উন্নয়ন দর্শনে রাষ্ট্রগুলোর সংহতি আছে, সেখানে কাঁটাতার নেই। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভারতের সঙ্গে অন্য দেশের জনগণের যোগাযোগ খুবই কম, মাঝখানে দৃশ্যমান অদৃশ্য অনেক রকম কাঁটাতার।
সব দেশে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও আমরা যারা অভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করি, তারা মানুষের জীবনকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন বিচার করি। আর তাই প্রকৃতি-পানি-মাটি রক্ষা আমাদের কর্তব্য জ্ঞান করি। আমাদের কাছে শিক্ষা-চিকিৎসা অধিকার, ব্যবসায়ীর পণ্য নয়। আমরা নদী, পানি, বন ও খনিজ সম্পদকে আমাদের সবার সম্পত্তি মনে করি; এগুলো কোনোভাবে মুনাফাখোরদের হাতে যেতে দিতে চাই না। আমাদের কাছে মানুষের মর্যাদা সবার ওপরে, লিঙ্গ বা ধর্ম বা বর্ণ বা ভাষা বা জাতি নয়। আমরা মনে করি, এই বিশ্বে মানুষের জন্য সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু লুটেরা দস্যুদের জন্য সেই সম্পদ মানুষের হাতছাড়া অথবা বিপর্যস্ত। তাদের দখল লোভের জন্যই যুদ্ধ সংঘাত নিপীড়ন আর এই রাষ্ট্রব্যবস্থা। এর বিরুদ্ধে মানুষের দক্ষিণ এশিয়ার কণ্ঠ অভিন্ন, জীবন ও মরণ অভিন্ন লক্ষ্যে নিয়োজিত।
আশার কথা এই যে মানুষ নির্দিষ্ট মডেলের পতনে থেমে নেই, সব দেশেই জনগণের বিভিন্ন মাত্রার লড়াই আছে জল-জমি-জঙ্গলের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, লড়াই আছে করপোরেট আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে শ্রেণি, জাতি, ধর্মীয়, লিঙ্গীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে, লড়াই আছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে। এসব লড়াইয়ের মধ্যে যে ঐক্যসূত্র আছে, তা থেকেই আমরা একটি মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি, যেখানে করপোরেট স্বার্থ নয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের নতুন চেহারা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্র, সাম্য ও মর্যাদা নিয়ে নতুন ইতিহাস পর্বে প্রবেশ করবে এই এলাকার মানুষ। কিন্তু এর জন্য জনগণের লড়াই ও মুক্ত চিন্তার যে সংহতি দাঁড় করা দরকার, সেখানে বড় ঘাটতি আছে।
বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে তাই যোগাযোগ বাড়ানো দরকার, কথা বলা দরকার, সংহতি দৃঢ় করার জন্য বিতর্ক করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে আমরা এই যাত্রা জোরদার করতে পারি। যেমন: প্রথমত, সর্বজনের মুক্ত বিশ্বের রূপকল্পের সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার রূপকল্প দাঁড় করানো এবং তা মানুষের চিন্তা ও সক্রিয়তায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়ার সব সম্পদ, বিশেষত খনিজ সম্পদ ও পানিসম্পদ যাতে সব মানুষের কাজে সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব হয়, সে জন্য আঞ্চলিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন বা নকশা তৈরির কাজ। এটা হবে বিশ্বব্যাংক, ইউএসএআইিড ও দেশি-বিদেশি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মুনাফামুখী উন্নয়ন কৌশলের পাল্টা নকশা। তৃতীয়ত, নদী ও পানিপ্রবাহ নিয়ে, সবার অধিকারে স্বীকৃতি দিয়ে, সমন্বিত চিন্তা ও পরিকল্পনা মূর্ত করা। চতুর্থত, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, শ্রেণি-লিঙ্গ-জাতি-বর্ণগত নিপীড়ন ও বৈষম্যবিরোধী আমাদের চিন্তা ও লড়াইকে পরস্পরের কাছে পরিষ্কার রাখা এবং সমন্বয় করা।
কয়েক হাজার একর জমি নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বিরোধ জিইয়ে ছিল ৬৮ বছর। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির পর বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ভারত এত দিন এটা আটকে রেখেছিল। এর জন্য দুই দেশের ছিটমহলে আটকে থাকা দুই দেশের মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এত বছর। ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে এ-সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হলো যে ইচ্ছা করলে সহজ কাজ কত সহজে করা যায়! এত বছর পরে হলেও অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে, সে জন্য আমরা খুশি। আমরা চাই এখন সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে, কাঁটাতারের বেড়া থেকেও বাংলাদেশ মুক্ত হবে। আমরা চাই অভিন্ন নদী নিয়ে আমাদের বিপর্যয়ের অবসান হবে। আমরা চাই ট্রানজিট নিয়ে লুকোচুরি, অস্বচ্ছতা ও আগ্রাসী তৎপরতা বন্ধ হবে। আমরা চাই, সুন্দরবনধ্বংসী সব প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ ঘোষণা দিয়ে সরে যাবে এবং সুন্দরবন বিকাশে মন দেবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

No comments

Powered by Blogger.