আত্মহত্যা ও গণমাধ্যমের দায় by সাইফুল সামিন

১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে ৪ সেপ্টেম্বর জেনেভা থেকে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যা করছেন। বছরে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা আট লাখ। আত্মহত্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত চার বছরে দিনে গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছেন। আত্মঘাতীদের বড় অংশের বয়স ২১-৩০ বছরের মধ্যে।

ডব্লিউএইচওর জেনেভা প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আত্মহত্যা নিয়ে গণমাধ্যমগুলো বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করায় অনেকে সেখান থেকে উৎসাহিত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন। সংবাদমাধ্যমের প্রচারের সঙ্গে আত্মহত্যার হার কম-বেশি হওয়ার কার্যকারণ সম্পর্কের দিকটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্তত অর্ধশতাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে আত্মহত্যার প্রচার, নাটকীয় বা রং মেশানো বিবরণ, চাঞ্চল্যকর শিরোনাম, স্পর্শকাতর ছবি-ভিডিওর ব্যবহার মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আত্মঘাতী ব্যক্তির স্বজনদের
আহাজারি অনেকের কাছে ভুল বার্তা দেয়। তাঁরা আত্মহত্যাকে মনোযোগ আকর্ষণ বা নিকটজনকে আঘাত দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার উপায় বলে বিবেচনা করেন। গণমাধ্যমে আত্মহত্যার কারণগুলোকে অতিসাধারণীকরণের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয় পরীক্ষায় ফেল, প্রেমে ব্যর্থতা, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রভৃতি কারণে ব্যক্তি আত্মঘাতী হয়েছেন। অথচ আত্মহত্যা কোনো একক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়। ব্যক্তির আত্মহত্যার মানসিক ও অন্যান্য কারণ কখনোই গণমাধ্যমে উঠে আসে না।
ইদানীং পরীক্ষায় ফেল, ইভ টিজিং, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহের জের ধরে আত্মহত্যার খবর অহরহ আমাদের গণমাধ্যমে আসছে। আপাতদৃষ্টিতে এই প্রতিবেদনগুলোকে নির্দোষ মনে হয়। কিন্তু শেষ বিচারে তা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে। কারণ, এই প্রতিবেদনগুলো শিখিয়ে দিচ্ছে—পরীক্ষায় ফেল বা ইভ টিজিংয়ের গ্লানি থেকে মুক্তির মোক্ষম উপায় আত্মহত্যা। কিংবা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়া স্বামীকে শায়েস্তা করার সহজ পথ সন্তানসহ স্ত্রীর আত্মহত্যা। গণমাধ্যম থেকে মানুষ আত্মহত্যার প্লট খুঁজে নেয়, অনুকরণ করে। প্রচারিত প্রতিবেদন পাঠক-শ্রোতা-দর্শক আত্মহত্যার কারণ, স্থান, পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে যান। কোনো ব্যক্তির জীবনে একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে, তাঁরা আত্মহত্যার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে আগ্রহী হন।
হলিউড তারকা মেরিলিন মনরো ১৯৬২ সালের আগস্টে আত্মহত্যা করেন। এ খবর গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। এর পরের মাসেই দেশটিতে আত্মহত্যার হার ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০০১ ও ২০০৪ সালে অস্ট্রিয়ায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, কোনো তারকার আত্মহত্যার খবর যে মাসে পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচার পেয়েছে, সে মাসে আত্মহত্যা কিংবা আত্মহননের চেষ্টা বেড়েছে। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, টেলিভিশনে প্রচারিত আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের কারণে জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যার হার ১০ দিনে বেড়ে গেছে। আবার গবেষণায় এমনও দেখা গেছে, গণমাধ্যমে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রচারের ধরনে পরিবর্তন আত্মহননের হার কমাতে সাহায্য করে। ১৯৭০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত না হওয়ায় ৩৫ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার কমে গেছে। ২০০৩ সালের অক্টোবরে সাংবাদিক ইয়ান ম্যাকলিয়ড ও অ্যান্ড্রু ডাফি তাঁদের গবেষণাধর্মী নিবন্ধে উল্লেখ করেন, প্রকৃতপক্ষেই গণমাধ্যমের সচেতন প্রতিবেদন বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদ প্রচার-সংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালা রয়েছে। জাপানের গণমাধ্যমে তারকা বা বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব না হলে আত্মহত্যাকারীর নাম ও আত্মহত্যার কারণ উল্লেখ করা হয় না। নরওয়ের গণমাধ্যমে কখনোই ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি উল্লেখ করা হয় না। ডেনমার্কে জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হলে ‘আত্মহত্যা’ বা ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ শব্দ পরিহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির ৩৬টি দৈনিকের মধ্যে মাত্র তিনটিতে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তুরস্কের গণমাধ্যমে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে কোনো ধরনের ভিডিও, ছবি ও গ্রাফিকস প্রকাশের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে বিবিসির নিজস্ব নীতিমালা রয়েছে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর বাইরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক, অলাভজনক ও বেসরকারি সংস্থা গণমাধ্যমে আত্মহত্যার প্রতিবেদন প্রচারের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করেছে।
আত্মহত্যার সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশনের (আইএএসপি) নির্দেশনায় অতিরঞ্জন, কারণ সাধারণীকরণ, স্থান-পদ্ধতির হুবহু বিবরণ, চাঞ্চল্যকর ভাষা, সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে উপস্থাপন, গুরুত্ব দিয়ে প্রচার, ফলাও প্রচার পরিহার করতে বলা হয়েছে। সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে শিরোনাম, ছবি-ভিডিও ব্যবহার ও তারকাদের আত্মহত্যার খবর পরিবেশনে। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের মতামত উপস্থাপন, সচেতনতা সৃষ্টি, সাহায্য-প্রাপ্তির তথ্য, শোকাহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং খোদ সংবাদকর্মীদের ওপর আত্মহত্যার সংবাদের প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার সুপারিশে আত্মহত্যার প্রতিবেদন সাদামাটাভাবে উপস্থাপন, ধারাবাহিক প্রচার পরিহার, আত্মঘাতী ব্যক্তির নাম গোপন বা ছদ্মনাম ব্যবহার, ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে আত্মহত্যার সম্পর্ক স্থাপন করতে সংবাদকর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে ‘আত্মহত্যা’ শব্দ ব্যবহার, গ্রাফিকস ব্যবহার, কারণ চিহ্নিতকরণ, চিরকুট প্রকাশ, স্বজনের আহাজারি ও শেষকৃত্যর বিবরণ, আত্মহত্যাকে সফল বা ব্যর্থ বলা, মহামারি হিসেবে উপস্থাপন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও ফিচার পরিহার করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার মহান ব্রতের অংশীদার গণমাধ্যম। সংগত কারণেই আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা কাম্য। গণমাধ্যমের একটু অসতর্কতা, দায়িত্বহীনতায় সমাজে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। নিভে যেতে পারে কোনো মূল্যবান জীবনপ্রদীপ। তখন সেটাকে ‘আত্মহত্যা’ না বলে ‘হত্যা’ বললেও ভুল হবে না।
সাইফুল সামিন: সাংবাদিক।
saiful.samin@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.