মর্মান্তিক -ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত ৪

রাজধানীর কাওরানবাজারে ট্রেনের ধাক্কায় ও কাটা পড়ে নিহত হয়েছেন চার জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৬ জন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় পাঁচ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে দু’টি ট্রেন আসা-যাওয়া করলে রেললাইনে জড়ো হওয়া লোকজন বিভ্রান্ত হয়ে এই দুর্ঘটনার শিকার হন। তবে দুর্ঘটনার জন্য রেললাইনে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা মাছের বাজার কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন নিহতের স্বজনরা। দুর্ঘটনার সময় রেললাইনের উপরে মাছের বাজারে উপচেপড়া ভিড় ছিল ক্রেতা-বিক্রেতাদের। এই দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রায় সবাই সেখানে মাছ কেনার জন্য যান। কেউ বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করতে রেললাইনের উপরে বসেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন মাছ বাজারে এলে লোকজন সরে পাশের লাইনে দাঁড়ান। ওই ট্রেনটি বাজার অতিক্রম করার মুহূর্তের মধ্যেই বিপরীত দিক থেকে কমলাপুরগামী একটি ট্রেন জড়ো হওয়া লোকজনের লাইন দিয়ে এলে ‘ট্রেন ট্রেন’ বলে চিৎকার করতে থাকেন আশপাশের মানুষ। কেউ দূরে দাঁড়িয়ে ‘আল্লারে আল্লারে’ বলে চিৎকার করছিলেন। এর মধ্যেই ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে নিহত হন রেললাইনের বাজারের কলা বিক্রেতা নুর মোহাম্মদ (৪০)। তার শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার তীরবোলা গ্রামের মকবুল হোসেনের পুত্র। দীর্ঘদিন থেকে ঢাকার খিলগাঁওয়ের মৌলভীরটেকে ভাড়া বাসায় থাকতেন। দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আট জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয় লোকজন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মো. আবদুল মালেক (৬০)। তিনি খামারবাড়িস্থ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (অর্থকরী ফসল)। দুই ছেলে ও দুই কন্যার জনক আবদুল মালেক পরিবার নিয়ে ৪০, পশ্চিম তেজতুরি বাজার, তেজগাঁও এলাকার একটি বাসায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতের পুত্র মোর্শেদ আলম জানান, তার পিতা প্রতিদিন সকালে হাঁটার জন্য বের হন এবং  ফেরার সময় রেললাইনের বাজার থেকে কেনাকাটা করেন। তার সঙ্গে কোন ফোন ছিল না। বিকালে তার স্বজনরা হাসপাতালের মর্গে গিয়ে তার লাশ শনাক্ত করেন। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত মনোয়ারা বেগম (৫৫) বিকাল চারটায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দুই পুত্র-কন্যার জননী মনোয়ারা বেগম স্বামী কাওসার হাওলাদারকে নিয়ে থাকতেন ৬৬ ইস্কাটন রোডস্থ বাংলামোটর এলাকায়। মনোয়ারা বেগমের স্বামী কাওসার হাওলাদার জানান, তার স্ত্রী প্রতিদিনের মতো মাছ বাজার করতে কাওরানবাজারে গিয়েছিলেন। নিহত চার জনের মধ্যে এক নারীর পরিচয় জানা যায়নি। নিহত নারীর আনুমানিক বয়স ২২ বছর। সালোয়ার কামিজ পরা ওই নারীর গায়ে গোলাপি রঙের বোরকা ছিল। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মনসুর আহমেদ জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আট জনের মধ্যে তিন জন মারা গেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্রোপচার ও রক্ত সরবরাহ করে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাধীন পাঁচ জনের মধ্যে সৈয়দ হোসেন (৪৫)-এর অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি কোহিনুর ক্যামিকেল কোম্পানির একজন কর্মচারী। স্ত্রী, সন্তান নিয়ে তেজগাঁও এলাকায় বসবাস করেন। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলবে। সৈয়দ হোসেনের আত্মীয় রিমা জানান, তিনি রেললাইনের বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন। আহত অন্যরা হচ্ছেন- শরিয়তপুরের জাজিরার সালমা বেগম (৪৫)। তিনি হাতিরঝিল সংলগ্ন একটি বাসায় বসবাস করেন। তার স্বামী মোতালেব হোসেন জানান, মাছ কেনার জন্য তিনি রেললাইনের বাজারে গিয়েছিলেন। একই ভাবে সকালে বাজার করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন পারুল বেগম (৬০)। তিনি ৪৬/১, কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা। রেললাইনের বাজারে কলা বিক্রি করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ফজলু খান (৪২) ও তার ভাইপো রাকিব খান (২০)। তারা খিলগাঁওয়ের ২৫৬ নবীনবাগের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুরে।
 
>> দুর্ঘটনায় আহত কলা ব্যবসায়ী রাকিবের পাশে নির্বাক স্ত্রী রায়মুনা -ছবি: শাহীন কাওসার
দুর্ঘটনা সম্পর্কে রেলওয়ের সহকারী পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইদুল ইসলাম জানান, জামালপুর থেকে ছেড়ে আসা যমুনা এক্সপ্রেস কাওরানবাজার এলাকায় পৌঁছলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় একই সময়ে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া কর্ণফুলি এক্সপ্রেস পাশের লাইন দিয়ে যাচ্ছিল। সকাল থেকে ওই রেললাইনে বাজার বসেছিল বলে জানান তিনি। এ কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করে রেললাইন সংলগ্ন ক্ষুদে ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান জানান, ওই সময়ে কর্ণফুলি হর্ন বাজিয়ে চলে যাওয়ার পরপর যমুনা এক্সপ্রেস আসে। কিন্তু যমুনা কোন হর্ন বাজায়নি। যে কারণে লোকজন বুঝতে পারেনি যে, এই রেলপথ দিয়ে আরেকটি ট্রেন আসছে। কমলাপুর জিআরপি (রেলওয়ে) থানার ওসি আবদুল মজিদ জানান, রেল দুর্ঘটনায় নিহত চার জনের মধ্যে একজনের পরিচয় জানা যায়নি। বাকি তিন জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.