‘ইকম্যুনিস্ট’, -সরি, -ইকোনমিস্টের অসততা, ‘স্নবারী’ এবং একটি কার্টুন by মহিউদ্দিন আহমদ

এই এক ডিসেম্বর মাসেই দুনিয়ার সবচাইতে প্রভাবশালী ইংরেজী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ইকোনমিস্ট’ দুই দুইটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওপর।
প্রথম রিপোর্টটি প্রকাশিত হয় গত ৮ ডিসেম্বর এই শিরোনামে, ‘Discrepancy in Dhaka : The war crimes-court in Bangladesh has some explaining to do’, এবং অন্যটি পরের সংখ্যায় ১৫ ডিসেম্বর এই শিরোনামে, ‘The trial of the birth of a nation.’ আমি আমার পুরনো ইকোনমিস্টের কপিগুলোর আরও একটিতেও দেখলাম, গত ২০১১-এর ২৬ নবেম্বর সংখ্যায়ও এই পত্রিকাটি ‘Tried and found wanting’ শিরোনামের লেখাটিতেও আমাদের এই ট্রাইব্যুনালগুলো সম্পর্কে বেশ কিছু কঠোর কথাবার্তা আছে।
প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ইকোনমিস্ট’ বটেই, তবে এই পত্রিকাটিকে ‘ইকম্যুনিস্ট’ নাম দিয়েছেন ইতালির এক সাম্প্রতিক সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি। কারণ এই পত্রিকাটি তাকে দারুণ অপছন্দ করে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে সিলভিও বারলুসকোনির যৌন সম্পর্ক থাকা তার একটি কারণ; আর ‘ইকোনমিস্ট’ মনে করে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত একজন নেতা।
গত সাত-আট বছর আমি এই পত্রিকাটি পড়ছি; আমি লক্ষ্য করেছি ‘ইকোনমিস্ট’ যখনই সুযোগ পেয়েছে সিলভিও বারলুসকোনিকে খোঁচা মেরেছে। তবে বারলুসকোনি থোড়াই কেয়ার করেন ইকোনমিস্টের এসব বিদ্বেষকে। কারণ তারও একটি মিডিয়া সাম্রাজ্য আছে। তিনি ইতোমধ্যে তিনবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন; দুর্নীতির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপীল করেছেন এবং আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ইতালির সাধারণ নির্বাচনে তিনি আবার একজন শক্ত প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামবেন বলে সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগগুলোকেও তিনি উপেক্ষা করছেন। ৭৬ বছর বয়সী এই লোক তাঁর নাতনির বয়সী তার বয়স ২৭, এক মহিলাকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করবেন বলেও সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন। প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সম্পদের মালিক এই সিলভিও বারলুসকোনি। প্রতিমাসে ৪ মিলিয়ন ডলার করে তিনি ২য় স্ত্রীকে খোরপোষ দেবেন। তিনি বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল টিম এসি মিলানেরও মালিক।

॥ দুই ॥
এই ইকোনমিস্টে আমাদের ট্রাইব্যুনালগুলোতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সর্ব-সাম্প্রতিক রিপোর্ট দুটি প্রকাশিত হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারবিরোধীরা, মনে হচ্ছে নতুন করে অক্সিজেন পেয়েছে। বিএনপির দলীয় পত্রিকা দৈনিক আমার দেশে হ্যাকিং করে পদত্যাগকারী বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম এবং ব্রাসেলস প্রবাসী আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কথোপকথন প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা এমন করেছে। আমাদের কতগুলো পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলের খবরে এবং টিভির ‘টকশোতে হইচই চলছে বেশ কিছুদিন। বিএনপি-জামায়াত এবং টক শোর মাহফুজ উল্লাহ-মাহবুব উল্লাহরা বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস গরম করে ফেলেছেন। মিডিয়া রেটিং বাড়ানোর জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চ্যানেল হিসেবে পরিচিত ‘চ্যানেল-৭১’ এবং জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা- এখন যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন- মীর কাসেম আলীর মালিকানায় ‘দিগন্ত’ টেলিভিশনের মধ্যে তেমন কোন ফারাক দেখি না। চ্যানেল দুটোর মধ্যে মনে হচ্ছিল প্রতিযোগিতা চলছে। ইকোনমিস্ট প্রভাবশালী একটি পত্রিকা অবশ্যই; তাই বলে এই পত্রিকাটি যে ‘ফাউল’ করে না তা নয়। গত বছর ২০১১-এর ৯ আগস্ট ‘ইকোনমিস্টের নোংরামি এবং বিদ্বেষ’ শিরোনামে দৈনিক ‘আমাদের সময়’ পত্রিকাটিতে আমার একটি লেখা পত্রিকাটির প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল। আমার লেখার বিষয়বস্তু ছিল এই ইকোনমিস্টে ২০১১-এর ৩০ জুলাই ‘India Bangladesh : Embraceable you’ শিরোনামের একটি রিপোর্ট। রিপোর্টটির শুরুতেই এই কথাগুলো ছিল : ‘Ever since 2008, When the Awami League helped by bags of indian Cash and advice triumphed in general election in Bangladesh relations with India have blossomed.’
ইকোনমিস্ট এই রিপোর্টে ব্যাগভর্তি ভারতীয় টাকায় আওয়ামী লীগ সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছে। কিন্তু ২০০৮-এর ডিসেম্বরের ২৯ তারিখে যে সাধারণ নির্বাচনটি হলো তার মাত্র ১৮ দিন আগে একটি রিপোর্টে এবং নির্বাচনটির ঠিক পরদিন ২০০৮-এর ৩০ ডিসেম্বর আরেকটি রিপোর্টে কি বলেছিল তার উল্লেখ করে আমি একটি তুলনামূলক মূল্যায়ন তুলে ধরি। আজকের এই লেখায় ইকোনমিস্টের তখনকার সাংঘাতিক ‘ফাউলটি’ আবারও পাঠকের সুবিধার্থে এখন দেখাচ্ছি। দৈনিক ‘আমাদের সময়’-এ প্রকাশিত আমার লেখাটির প্রাসঙ্গিক অংশটুকু নিচে উদ্ধৃত করছি :
“ইকোনমিস্ট পত্রিকাটি ২০০৮-এর ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ১৮ দিন আগে ‘Bangladesh : after we were so rudely interruped’ শিরোনামের প্রকাশিত ঢাকা থেকে পাঠানো রিপোর্টে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণীই করেছিল। এ প্রসঙ্গে তাদের রিপোর্টের শেষ বাক্যটির আগের বাক্যটি ছিল এমন-‘Polls by the intelligence service point to a landslide for the Awami Legue’ (গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ একটি ভূমিধস বিজয় অর্জন করবে)।
এ রিপোর্টটির আরও কয়েকটি বাক্য ছিল এমন -১. ‘250 international monitors will be present’ 2. ÔThis time 37% voter are considering voting for a different party than in 2001, according to opinion polls. carried out by AC neilson’ (AC Neilson, কোম্পানি কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা যায়- এবারের সাধারণ নির্বাচনে ৩৭% ভোটার ২০০১ সালের নির্বাচনের বিপরীতে অন্যকোনও ভিন্ন দলকে ভোট দেওয়ার কথা ভাবছে), ৩. ‘The BNP harder hit by the armies anti corruption drive appears not to fancy its chances. (বিএনপি রাজনৈতিক দলটি সামরিক বাহিনী পরিচালিত দুর্নীতি দমন অভিযানে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের কোনও সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছে না)।
তারপর সাধারণ নির্বাচনটির পরদিন ২০০৮-এর ৩০ ডিসেম্বর এ একই ইকোনমিস্ট ‘Bangladesh Election : the temerity of hope’ শিরোনামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে আগের দিন অনুষ্ঠিত নির্বাচনটির মূল্যায়ন করে যে রিপোর্টটি প্রকাশ করে তার সাব-হেডিং হিসেবে ছিল এ কথাগুলো- ‘Against all evidence of past experiences Bangladesh’s voter enjoy a moment of optimism after a pretty clean election and decisive result. (অতীতের সকল প্রকারের অভিজ্ঞতার বিপরীতে বাংলাদেশের মানুষজন একটি সদ্যসমাপ্ত পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং প্রশ্নাতীত ফলাফলের পর একটু আশাবাদী হয়ে উঠেছে)।
এ রিপোর্টটির প্রথম বাক্যটি ছিল এমন- ‘It went better than anybody dared hoped. On December 29th Bangladesh held its first general election for seven years. It was well attended, with 70% turn-out, well organized, largely peaceful and despite some vote buying and other malpractices. far cleaner than its predecessors.’ (এই সাধারণ নির্বাচনটি সব রকমের আশা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর তারিখে ৭ বছর পর বাংলাদেশে এই সাধারণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হলো। ৭০ শতাংশ ভোটার এ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, নির্বাচন আয়োজন ছিল সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ। ছোটখাটো ঘটনা এবং ভোট বেচা-কেনার কয়েকটি ঘটনা ছাড়া এ নির্বাচনটি অতীতের সবগুলো নির্বাচনের চেয়ে পরিচ্ছন্ন (Cleaner) ছিল)।
যে ইকোনমিস্ট পত্রিকাটি ২০০৮-এর ১১ ডিসেম্বর তারিখে আওয়ামী লীগের বিজয় সম্পর্কে এমন প্রায় নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করল, সেই ইকোনমিস্ট এখন সাধারণ নির্বাচনটির আড়াই বছর পর বলছে, বস্তাভর্তি ভারতীয় টাকা এবং উপদেশ আওয়ামী লীগের বিজয় অর্জনে সাহায্য করেছে। বলতেই হবে, ইকোনমিস্টের এ প্রতিবেদক ২০০৮-এর ১১ ডিসেম্বর এবং ৩০ ডিসেম্বর তারিখ দুটোতে তারই পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট দুটো পড়েননি অথবা এতদিন পর তিনি ঘুমের মধ্যে কোন ঐশ্বরিক বাণীতে উজ্জীবিত হয়ে এমন নোংরা, ভিত্তিহীন কথা লিখতে পেরেছেন।”

॥ তিন ॥
এই লেখাটির প্রস্তুতিতে ইন্টারনেটে বেশ কতগুলো ‘ওয়েবসাইট’ দেখলাম। ‘Economist.com’ টাইপ করে গুগলে ক্লিক করলে কতগুলো ওয়েবসাইট ভেসে উঠবে মনিটরের পর্দায়। এখানকার একটি ওয়েবসাইট, ‘Who publishes Economist’ ক্লিক করলে ইকোনমিস্টের ওপর ‘উইকিপিডিয়া’ ওয়েবসাইটটিও আসবে। এখানে ক্লিক করলে এই পত্রিকাটির ইতিহাস, বিভিন্ন মালিক, সম্পাদকের নাম এবং পত্রিকাটির এডিটরিয়াল পলিসি- সম্পাদকীয় নীতি সম্পর্কে সকল মৌলিক তথ্য পাওয়া যাবে।
১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পত্রিকাটির বর্তমান প্রচারসংখ্যা প্রায় পনেরো লাখ, শুধু উত্তর আমেরিকাতেই সাড়ে আটলাখ, যুক্তরাজ্যে দুই লাখ দশ হাজার, এশিয়া-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ। বাংলাদেশে কত পাঠক আছে এই পত্রিকাটির, তা জানতে পারিনি। বালাদেশে এই পত্রিকাটির প্রতি সংখ্যার দাম এখন ৫০০ টাকা।
পত্রিকাটি দম্ভের সঙ্গে তার বিজ্ঞাপনে এমনও বলেছে, ‘বি ধৎব হড়ঃ ৎবধফ নু সরষষরড়হং’. (আমাদের কোটি কোটি পাঠক নেই)। মানে, আমাদের পত্রিকাটি যারা পড়ে থাকে, তাদের সকলেই প্রভাবশালী, ‘ডিসিশন মেকারস’, নীতিনির্ধারক।
পত্রিকাটি সম্পাদকীয় নীতিতে ‘ফ্রী ট্রেড’-এ বিশ্বাসী, কঠোর বাধাবিঘ্ন ছাড়া, বিভিন্ন দেশের মধ্যে ইমিগ্রেশনের পক্ষেও লেখালেখি করে। মাদকদ্রব্যের বৈধকরণ, সমকামীদের মধ্যে বিয়ে, গ্লোবালাইজেশন, আমেরিকায় গান কন্ট্রোল এ সবের পক্ষেও ইকোনমিস্টের অবস্থান।
জামায়াতীরা যখন পত্রিকাটির সাম্প্রতিক রিপোর্ট দুটো নিয়ে মাতামাতি করছে, তখন ইকোনমিস্টের একটি লেখার প্রতি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই পত্রিকাটি ‘গড’, সৃষ্টিকর্তার মৃত্যু ঘোষণা করে একটি ওবিচুয়ারীও প্রকাশ করেছে তার ‘মিলেনিয়াম’ সংখ্যায়।
তো, ইকোনমিস্টের ওপর উইকিপিডিয়ায় একটি বড় অংশ আছে পত্রিকাটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নানান রকমের কন্ট্রোভার্সি বিতর্ক নিয়ে। ১৯৯১ সালে দুনিয়ার আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত জেমস ফালোস্ নামের এক কলাম লেখক ইকোনমিস্ট সম্পর্কে এই কথাগুলোও লিখেছিলেন, ‘The Economist suffers from British class snobbery, pretentiousness and simplistic argumeatation’. সিঙ্গাপুর সরকারও পত্রিকাটিকে পছন্দ করে না। কয়েক বছর আগে ইকোনমিস্টের বিরুদ্ধে ‘লাইবেল’-এর অভিযোগে সিঙ্গাপুরে মামলা করে সিঙ্গাপুর সরকার। পত্রিকাটি থেকে তখন ক্ষতিপূরণও আদায় করেছিল। জিম্বাবুয়েতে মিথ্যা খবর প্রকাশ করার অভিযোগে পত্রিকাটির সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। পরে পত্রিকাটি ভুল স্বীকার করলে সেই সাংবাদিককে ছেড়ে দিয়ে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পত্রিকাটি ভারতের ওপর কোন রিপোর্টে যদি কাশ্মীরের ম্যাপ ছাপে, ম্যাপের ওপর আলকাতরা দিয়ে ম্যাপটি মুছে তারপরই বিতরণের জন্য ছাড়া হয়।
ইকোনমিস্টের সর্বসাম্প্রতিক বর্ষশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদ কাহিনীগুলোর একটি হচ্ছে, ‘A rough guide to Hell’ও। এই প্রচ্ছদ কাহিনীতে দুনিয়াটিকে একটি দোজখ হিসেবে দেখানো হয়েছে। পত্রিকাটির কভারে যে রঙ্গীন ছবিটি আছে সেখানে মানুষরূপী শিংওয়ালা বেশ কতগুলো শয়তানও আছে।
সিলভিও বারলুসকোনি এবং সদ্যপতিত মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল পেট্রাউস মাথায় শিংবিশিষ্ট এক ‘ভলাপচুয়াস’ মহিলার পেছনে ছুটছেন। দোজখের গরম রঙ্গীন পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন ইরানের আহমাদিনেজাদ, রাশিয়ার পুতিন, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ, আর তাদের উঠতে দিচ্ছে না ত্রিশূল হাতে অনেকগুলো শয়তান। আরও আছে দোজখের হ্যাকার সেন্টারে কর্মরত আরও কিছু শয়তান এবং ‘ব্রিটিশ জার্নালিস্টস’ লেখা প্রকা- একটি ময়লার গাড়ি থেকে উপড়ে ফেলা হচ্ছে কিছু সাংবাদিককে,- এমন সব দৃশ্যও আছে এই প্রচ্ছদে
আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইকোনমিস্টের ওপর যে সমন নোটিস জারি করেছে তার ওপর ওয়াশিংটন পোস্ট, হাফিংটন পোস্ট, ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং আমাদের ডেইলি স্টার- পত্রিকাগুলোতে যেসব খবর বিভিন্ন শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোও ইকোনমিস্টের ওপর উইকিপিডিয়ার ‘কন্ট্রোভার্সি’ সেকশনে দেখেছি।

॥ চার ॥
ইকোনমিস্ট পত্রিকাটির অসততা, স্নবারীর এখন আরেকটি উদাহরণ। গত ২৬ মে তারিখে ‘Bangladesh’s Toxic Politics : Hello Delhi’ শিরোনামের এক সম্পাদকীয়তে এই কথাগুলোও বলা হয় : ‘The squabbling has turned into a crisis which threatens to make life still worse for the 170m poor muslims who suffer under one of the world’s worst governments.’ এমন কঠোর মন্তব্যের মাত্র পাঁচ মাস পর গত ৩ নবেম্বর তারিখে ‘Bangladesh : out of the basket’ শিরোনামে প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অগ্রগতির বর্ণনা দিয়েছে পত্রিকাটি। তো এই অগ্রগতিগুলো কি গত পাঁচ মাসেই ঘটে গেল? অর্জিত হলো? এই পত্রিকাটি ২০০৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়কে কেমন প্রত্যাশিত ছিল, নির্বাচনটি কেমন স্বচ্ছ সুষ্ঠু ছিল, তার বর্ণনাও ছিল; আর তার বিপরীতে মাত্র আড়াই বছর পর বলল, ভারতের বস্তাভর্তি টাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতেছে, অসৎ সাংবাদিকতার আর কোন উদাহরণের দরকার আছে?
এমন অসৎ সাংবাদিকতার মোকাবেলা করতে পেরেছে সিঙ্গাপুর সরকার। মোকাবেলা করতে পেরেছে; কারণ, সিঙ্গাপুরের সব সরকার দক্ষ, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত থেকেছে; সারা দুনিয়ার সুনাম তারিফও কুড়িয়েছে।

॥ পাঁচ ॥
গত ২৬ ডিসেম্বর, মোহতারেমা খালেদা জিয়া তাঁর এক পথসভায় আওয়ামী লীগকে সাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। জবাবে প্রত্যাশিতভাবেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, সাপের ঝাঁপি নিয়ে বেগম খালেদা জিয়াই খেলছেন।
মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনার পাল্টা অভিযোগটিই ঠিক। ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকাটির একটি পুরনো রিপোর্ট এবং তার সঙ্গে প্রকাশিত একটি কার্টুন দেখলে অন্তত তাই মনে হবে। ২০০৬ সালের ২৫ মার্চ ‘Bangladesh and India : A problem shared’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টটির সঙ্গে প্রকাশিত কার্টুনটিতে দেখা যায়, ‘ইসলামিক টেরর’ লেখা একটি ঝাঁপি থেকে প্রকা- একটি বিষধর সাপ ফণা উঁচিয়ে, প্রকা-ভাবে হা করে, হা করার কারণে লম্বা জিহ্বা এবং তীক্ষ্ম দুটি দাঁত বেরিয়ে এসেছে, মোহতারেমা খালেদা জিয়াকে গিলে খেতে উদ্যত। আর ভীত-সন্ত্রস্ত মোহতারেমার হাত থেকে সাপ খেলানোর বাঁশিটি পড়ে যাচ্ছে ! ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বছরগুলোতে খালেদা জিয়ার শাসনামলে জেএমবির বাংলাভাই, শায়খ আবদুর রহমানরা, জামায়াতী-শিবিররা যেমন আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছিল; আর দেশের ৬৪টি জেলার ৬৩টিতে ৫০০ বোমা হামলা হয়েছিল, তার বিশদ বর্ণনাও আছে এই রিপোর্টে।
ইকোনমিস্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু লবিস্ট, তদ্বিরকারী আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের কারও সঙ্গে দেখা হলে আমি প্রশ্ন করতাম, গুয়ানতানামো বে-তে দশ-বারো বছর ধরে কোন রকমের বিচার ছাড়াই আটক বন্দীদের সম্পর্কে তোমরা কি কোন প্রশ্ন তুলেছ? এই যে ইরাকে এবং আফগানিস্তানে এত লাখ লাখ নিরপরাধ সিভিলিয়ান, নারী শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে মেরে ফেললে, তার ব্যাখ্যাটি কি? প্রতিমাসে ড্রোন হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে; তাদের বিচার কাজ শেষ করে- তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কি কোন আদালতে প্রমাণিত হয়েছে?
আফগানিস্তানে হামলার পক্ষে তবুও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু এমন কিছুই ছিল না ইরাকের ক্ষেত্রে। জাতিসংঘের তখনকার মহাসচিব কোফি আনান ইরাকে মার্কিন হামলাকে তখন স্পষ্ট ভাষাতেই ‘অবৈধ, বেআইনী’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

‘শিউলীতলা’, উত্তরা, ঢাকা।
শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২
mohiuddinahmed1944@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.