শেয়ারবাজার-কালো টাকা বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন করবে না এনবিআর

দেশের পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলবে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতিষ্ঠানটি গতকাল সোমবার প্রজ্ঞাপন জারি করে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়েছে।পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় এনবিআর এ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপনটি গতকালই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনে (এসইসি) পাঠিয়ে


দেওয়া হয়েছে। এসইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এনবিআরের প্রথম সচিব (করনীতি) তাহমিদ হাসনাত খান স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, 'জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুঁজিবাজারের বিকাশে সব সময় সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে অপ্রদর্শিত আয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাজারের বিকাশ এবং এ খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা। একই বিবেচনায় ২০১১-১২ অর্থবছরে অপ্রদর্শিত আয় বিনা ব্যাখ্যায় স্টক এঙ্চেঞ্জে নিবন্ধিত কম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে তাঁর আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না।' এ সম্পর্কিত বিভ্রান্তি নিরসনকল্পে এবং বিনিয়োগকারীরা যাতে আস্থার সঙ্গে অপ্রদর্শিত আয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ স্পষ্টীকরণ জারি করেছে।
শেয়ারবাজারে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতির পর গত বছরের ডিসেম্বরে ব্যাপক ধস শুরু হয়। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাজারে শেয়ারের দর ব্যাপক হারে কমে যায়। আর্থিক লেনদেনও আশঙ্কাজনক হারে নেমে যেতে থাকে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১০ শতাংশ কর পরিশোধের বিনিময়ে বিনা প্রশ্নে পুঁজিবাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়।
এর আগে গত ৬ জুলাই একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। এতে বলা হয়, '১ জুলাই ২০১১ থেকে ৩০ জুন ২০১২ পর্যন্ত সময়কালের জন্য বাংলাদেশের যেকোনো স্টক এঙ্চেঞ্জে তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে কর অনারোপিত আয় বিনিয়োগ করা হলে উক্ত কর অনারোপিত আয়ের ওপর প্রদেয় আয়করের হার হ্রাস করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো।'
ওই প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়, 'পাবলিক লিমিটেড কম্পানি ব্যতীত অন্য সব শ্রেণীর করদাতাকে উক্ত ১০ শতাংশ হারে কর প্রদান সাপেক্ষে ১৫ জুলাই ২০১২ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারের নিকট নির্ধারিত ছকে কর অনারোপিত আয়ের ঘোষণা প্রদান করতে হবে। ঘোষিত কর অনারোপিত আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে না। ঘোষণাপত্রের সঙ্গে ১০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের সমর্থনে পে-অর্ডারের কপি, বিনিয়োগের সমর্থনে পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট ও বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টের লেজারের কপি সংযোজন করতে হবে। বিনিয়োগকৃত অর্থ ২০১৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে উত্তোলন বা অন্যত্র স্থানান্তর করা যাবে না এবং বিনিয়োগকৃত অর্থ বা তার অংশ উত্তোলন বা স্থানান্তর করলে উত্তোলন বা স্থানান্তরের বছরে স্থানান্তরকৃত ওই অর্থ ঘোষণাকারীর আয় হিসেবে গণ্য হবে। এই সুবিধার আওতায় পরিশোধিত করের উৎস ব্যাখ্যায়িত বলে বিবেচিত হবে।'
সরকারের সেই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই মাসে ঘুরে দাঁড়ায় শেয়ারবাজার। কিন্তু এর পরই বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। আগস্ট মাসে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মন্তব্য করেন, 'অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করলে এনবিআর প্রশ্ন না করলেও এর উৎস নিয়ে অন্য আইনে প্রশ্ন করা যাবে।' অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অর্থের উৎস নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা সরকারের অন্য কোনো সংস্থা থেকে প্রশ্ন তোলা হতে পারে_এ আশঙ্কায় বৈধভাবে অর্জিত কিন্তু কর পরিশোধ করা হয়নি_এ ধরনের অর্থের মালিকরাও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যান। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে পুঁজিবাজারে।
এর প্রভাবে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে দ্বিতীয় দফায় নিম্নগামী শেয়ারবাজারে নতুন বিপর্যয় নেমে আসে। টানা সাড়ে তিন মাস ধরে কমতে থাকে শেয়ারের দর। এ সময় ডিএসই সাধারণ সূচক ২০৬১ পয়েন্ট কমে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মুনাফা তো বটেই, মূলধনেরও বড় অংশ হারিয়ে ফেলে। মৃতপ্রায় অবস্থায় পেঁৗছে যায় দেশের পুঁজিবাজার। প্রায় নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা নেমে আসেন রাস্তায়। চলতে থাকে বিক্ষোভ।
এ অবস্থায় শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে উদ্যোগী হন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাজার-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ডেকে বৈঠক করে দ্রুত ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ দেন তিনি। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় গতকাল অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে স্পষ্টীকরণ জারি করলো এনবিআর।

No comments

Powered by Blogger.