জেলহত্যা দিবস আজ

জ ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। জাতির ইতিহাসের এক কলঙ্কময় দিন। ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৭৫ সালের এই দিনে রাতের অন্ধকারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারগারের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মুনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে বন্দি অবস্থায় নৃশংসভাবে হত্যা করে। কারাগারে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।


দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম জেলহত্যার বিচারে কমিশন গঠনের দাবি জানান।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী এই চার জাতীয় নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যু-পাল্টা ক্যুর রক্তাক্ত অধ্যায়ে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় নৃশংসতম জেলহত্যা। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নৃশংস হত্যার বিচার দীর্ঘদিন হয়নি। হত্যাকাণ্ডের একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এর বিচার শুরু হয়। ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ বিচারকাজ চলার পর গত জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে পলাতক তিন আসামির ফাঁসি, কর্নেল ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ ও বজলুল হুদাসহ ১২ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়। এছাড়া সাবেক মন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, কেএম ওবায়দুর রহমান, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানকে খালাস দেয়া হয়। পরে রায়ের বিরুদ্ধে ৪ জন যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি আপিল করলে গত ২০০৮ সালের ২৮ অক্টোবর হাইকোর্ট রিসালদার মোসলেহউদ্দিনের ফাঁসির আদেশ বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার আবুল হোসেন মৃধাকে খালাস দেন। এছাড়া নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব্যাহতি) মো. বজলুল হুদা, মেজর (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মদকে খালাস দেন হাইকোর্ট। অন্য পলাতক আসামিরা আপিল না করায় হাইকোর্ট তাদের সাজা বহাল রাখেন। মামলাটি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বাণী : জেলহত্যা দিবসে বাণীতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার পাশাপাশি জাতিকে নেতৃত্বহীন করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কারাবন্দি অবস্থায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চারে নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বঙ্গবন্ধুর মেয়ে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০২১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশগড়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আসুন আমরা শোককে শক্তিতে পরিণত করে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘ সোনার বাংলা’ বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে অবদান রাখি।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী : জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড ছিল জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ধারাবাহিকতারই অংশ উল্লেখ করে বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ৭৫-এর সেই ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতদাতারা পরে ২১ বছর দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। কখনও সামরিক লেবাসে, কখনও বা গণতন্ত্রের মুখোশ পরে, অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা আঁঁকড়ে থেকে শাসকগোষ্ঠী আত্ম-স্বীকৃত খুনিদের রক্ষা করতে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে হত্যাকারীদের বিচারের বদলে পুরস্কৃত করেছে, রাজনীতিতে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার কাজ শুরু করে। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর করা হয়েছে। জেলহত্যা মামলা সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। এদেশে যাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হয়, উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত হয় সেজন্য প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আমাদের সবাইকে সজাগ থেকে সব ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে হবে।
দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চক্রান্তকারী এবং গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হাত-পা গুটিয়ে বসে নেই। তারা এদেশে গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতার পক্ষ শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে বারবার হামলা চালিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে বাস্তব রূপ দিতে এবং বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অশিক্ষামুক্ত একটি উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ধারাকে সমুন্নত রাখতে হবে বলে বাণীতে তিনি উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি : দিবসটি পালন উপলক্ষে আওয়ামী লীগ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, আজ ভোরে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, কালো পতাকা উত্তোলন ও কালোব্যাজ ধারণ, সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনে জমায়েত এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদসহ জাতীয় নেতাদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত এবং বিকেল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে আলোচনা সভা।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার, পলী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জেলহত্যা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পালনের জন্য দলের সকল শাখা এবং সহযোগী সংগঠনের সব স্তরের নেতা-কমী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিএনপি-জামায়াত জেলহত্যার আলামত নষ্ট করা হয়েছে : মোহাম্মদ নাসিম : আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম অভিযোগ করেছেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জেল হত্যার সব আলামত নষ্ট করা হয়েছে। আসামিদের মুক্তি দেয়া হয়েছে।
গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় তিনি তদন্ত কমিশন গঠন করে হত্যাকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে বলেন, জেলহত্যার প্রকৃত বিচারের জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। অবশ্যই এ মামলার বিচার সম্পন্ন হবে।

No comments

Powered by Blogger.