ট্রাম্পের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী শক্তিগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে by জেরেমি বোয়েন

বিবিসির বিশ্লেষণঃ ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এর আগে কখনও দেখা যায়নি এমন শক্তভাবে দেখালেন যে, নিজের ইচ্ছাশক্তির উপর তার বিশ্বাস। তার এ বিশ্বাস ভরসা পায় নগ্ন মার্কিন সামরিক শক্তির পেছনে। তার নির্দেশেই এখন মাদুরো কারাগারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে তারা এখন ভেনেজুয়েলা চালাবে।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অবস্থিত নিজের ক্লাব ও বাসভবনে এক ব্যতিক্রমী সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে। তিনি বলেন, যতদিন না আমরা একটি নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিবেচিত রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতে পারি, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। ট্রাম্প বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ কথা বলেছেন। তিনি নাকি বলেছেন, আপনাদের যেটা দরকার আমরা সেটাই করব। তিনি যথেষ্ট ভদ্রতা প্রদর্শন করেছেন এ সময়। কারণ, তার সামনে আসলে কোনো বিকল্প নেই।

ট্রাম্প খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনায় যাননি। তিনি শুধু বলেছেন, ‘প্রয়োজনে (ভেনেজুয়েলায়) স্থলবাহিনী পাঠাতে আমরা ভয় পাই না।’ কিন্তু তিনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে, দূর থেকে ভেনেজুয়েলা শাসন করা সম্ভব? মার-এ-লাগোতে রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ তাকে ঘিরে যে প্রশস্তি শোনা গেল- সেটা কি লাতিন আমেরিকার অন্য নেতাদের ভীতসন্ত্রস্ত্র করে আজ্ঞাবহ করতে যথেষ্ট হবে? শোনার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল, তিনি তা-ই বিশ্বাস করেন। কিন্তু প্রমাণ বলছে, এ পথ সহজ হবে না।

থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ গত অক্টোবরে সতর্ক করেছিল, মাদুরোর পতন ভেনেজুয়েলায় সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে। একই মাসে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা যুদ্ধাভ্যাসের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছিলেন, মাদুরো পতনের পর কী হতে পারে। তাদের উপসংহার ছিল, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে সহিংস বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা।

নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণ ও কারাবন্দি করা আমেরিকান সামরিক শক্তির অসাধারণ প্রদর্শন। যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বহর জড়ো করে বিন্দুমাত্র প্রাণহানি ছাড়াই লক্ষ্য অর্জন করেছে। মাদুরো জনগণের রায় উপেক্ষা করে নিজের নির্বাচনী পরাজয় বাতিল করেছেন এবং নিঃসন্দেহে তার বিদায় ভেনেজুয়েলার বহু নাগরিককে স্বস্তি দেবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের অভিঘাত ভেনেজুয়েলার সীমানা পেরিয়ে বহু দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হবে। মার-এ-লাগোর সংবাদ সম্মেলনের আবহ ছিল বিজয়োৎসবের মতো- যেন এক নিখুঁত সামরিক অভিযানের সাফল্য উদ্যাপন ছিল সেটা।

কিন্তু সামরিক অভিযান কেবল প্রথম ধাপ। রাজনৈতিক অনুসরণ পর্বই নির্ধারণ করে এর সাফল্য বা ব্যর্থতা। গত ৩০ বছরে সামরিক শক্তি দিয়ে ‘রেজিম-চেঞ্জ’ করার আমেরিকার রেকর্ড ভয়াবহ। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর দেশটি রক্তাক্ত বিপর্যয়ে নিমজ্জিত হয়। আফগানিস্তানে দুই দশকের ‘রাষ্ট্রগঠন’ প্রচেষ্টা ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর কয়েক দিনের মধ্যেই ধসে পড়ে।

লাতিন আমেরিকায় অতীতের হস্তক্ষেপের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা- একইভাবে অশুভ। ট্রাম্প এবার মনরো ডকট্রিনের নতুন নাম দিলেন- ‘ডনরো ডকট্রিন’। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর সেই ঘোষণা, যাতে পশ্চিম গোলার্ধে অন্য শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা ছিল। ট্রাম্প বলেন, মনরো ডকট্রিন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা এখন সেটা অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছি। আমাদের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অধীনে পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকান কর্তৃত্ব আর কখনও প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। তিনি আরও বলেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে নিজের পশ্চাৎদেশ সামলাতে হবে। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, মেক্সিকো নিয়েও কিছু একটা করতে হবে।

কিউবাও নিঃসন্দেহে এই তালিকায় আছে, যেখানে ভূমিকা রাখছেন কিউবান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত রুবিও। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৯৯৪ সালে আমি হাইতিতে ছিলাম- যখন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ২৫ হাজার সেনা ও দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠান। সেদিন কোনো গুলি না ছোঁড়ায় শাসন ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু ভালো ভবিষ্যৎ আসে নি- গত ৩০ বছর প্রায় অবিরাম দুর্দশায় কেটেছে হাইতির মানুষের। আজ দেশটি সশস্ত্র গ্যাং দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক ব্যর্থ রাষ্ট্র সেটি।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলাকে ‘মহান’ করার কথা বলেছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের কথা বলেননি। তিনি নোবেলজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেশ পরিচালনার পক্ষে নন বলে স্পষ্ট জানান। তিনি বলেন- তার পক্ষে নেতা হওয়া খুব কঠিন। তার সমর্থন নেই, সম্মান নেই। তিনি উল্লেখই করেননি এডমুন্দো গনজালেসের নাম, যাকে অনেকে মনে করেন ২০২৪ সালের নির্বাচনের প্রকৃত বিজয়ী। বরং আপাতত যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিচ্ছে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে। মাদুরোকে সরাতে যে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বা সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তা হয়তো কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে। তবে হুগো শাভেজের গড়া শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট  আছে বলেই মনে হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সহজে রাজি হবে, সে সম্ভাবনা কম।
শাসনের সঙ্গে যুক্ত সামরিক ও বেসামরিক গোষ্ঠীগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের ধনী করেছে, এ সুবিধা তারা হারাতে চাইবে না।

বেসামরিক মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিয়েছে সরকার, এছাড়াও দেশটিতে রয়েছে অপরাধচক্র ও কলম্বিয়ান গেরিলারা, যারা আশ্রয়ের বিনিময়ে মাদুরোকে সমর্থন দিয়েছে। ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ট্রাম্পের বিশ্বদৃষ্টিকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। তিনি খোলাখুলি অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি লোভের কথা বলেন। এমনকি ইউক্রেনের সম্পদ বিনিময়ে সামরিক সহায়তার প্রসঙ্গও সামনে এসেছে আগে। তিনি ভেনেজুয়েলার বিপুল খনিজসম্পদ ও জাতীয়করণকৃত তেলশিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে আগ্রহী। ট্রাম্প বলেন, আমরা মাটির নিচ থেকে বিপুল সম্পদ তুলব, যা যাবে ভেনেজুয়েলার মানুষের কাছে, বাইরে থাকা ভেনেজুয়েলানদের কাছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবে।

এতে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। কারণ সেখানেও ট্রাম্পের আগ্রহ রয়েছে। মাদুরোকে আটক করার অভিযান আরেকটি বড় আঘাত আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ধারণায়। ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, তিনি অপছন্দের আইন উপেক্ষা করতে দ্বিধা করেন না। ইউরোপীয় মিত্ররা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারসহ এখন এমন ভাষা খুঁজছেন যাতে আন্তর্জাতিক আইনকে সমর্থন জানান, আবার একইসঙ্গে মাদুরো অভিযানের নিন্দাও না করেন- যদিও এটি জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি- এটি কেবল এক ‘মাদকসম্রাট’ গ্রেপ্তারের আইনগত সহায়তা। কিন্তু ট্রাম্পের স্পষ্ট ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্র এখন দেশটির তেলশিল্পসহ পুরো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এই যুক্তিকে দুর্বল করে।
মাদুরোকে আটক করার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি কারাকাসে চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। চীন এই পদক্ষেপের নিন্দা জানায়। তারা বলে, মার্কিন আধিপত্যমূলক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করছে। তবে একইসঙ্গে এই নজিরকে চীন হয়তো নিজের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবেও দেখবে। তাইওয়ানকে তারা ‘বিদ্রোহী প্রদেশ’ মনে করে এবং পুনর্মিলনকে জাতীয় অগ্রাধিকার ঘোষণা করেছে। এ কারণেই মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্রেট সহ-সভাপতি মার্ক ওয়ার্নার সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিদেশি নেতাকে গ্রেপ্তারের অধিকার দাবি করে তাহলে চীন কেন তাইওয়ানের নেতাদের বিরুদ্ধে একই দাবি তুলতে পারবে না? পুতিন কেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে অপহরণের যুক্তি দাঁড় করাবেন না? এই সীমা একবার ভাঙা হলে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী নিয়ম ভেঙে পড়তে শুরু করবে এবং প্রথম সুযোগ নেবে কর্তৃত্ববাদী শাসনগুলো।

ডনাল্ড ট্রাম্প যেন বিশ্বাস করেন, নিয়ম তিনিই বানান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যা প্রযোজ্য, অন্যদের জন্য তা নয়। কিন্তু বাস্তব বিশ্বের শক্তির রাজনীতিতে তা এভাবে চলে না। ২০২৬ সালের শুরুতেই তার পদক্ষেপ আরেকটি অস্থির বছরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

mzamin

No comments

Powered by Blogger.