নিকোলাস মাদুরো: বাসচালক থেকে লৌহমুষ্টি শাসক
কিন্তু বহু ভেনেজুয়েলাবাসীর কাছে মাদুরো কখনোই শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে ধরা দেননি। তার শাসনামলে সাত মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়ে অভিবাসনে গেছে। অভিযোগ রয়েছে নির্বিচার গ্রেপ্তার, সাজানো বিচার, নির্যাতন ও সেন্সরশিপের। দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে টানা চার বছর অতিমুদ্রাস্ফীতি এবং এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে ৮০ ভাগ পতনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতার লাগাম ধরে রাখতে মাদুরো ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক অল্প কিছু মিত্রের ওপর। বিশেষত চীন, কিউবা ও রাশিয়া, পাশাপাশি দেশের সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা ও আধাসামরিক বাহিনীর ওপর।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে তার বিতর্কিত বিজয়ের পর যে প্রতিবাদ শুরু হয়, তা দমনে ২,৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, ২৮ জন মারা যায় এবং প্রায় ২০০ জন আহত হন। এই সহিংসতা তার আগের দমনপীড়নের ধারাবাহিকতা। ২০১৪, ২০১৭ ও ২০১৯ সালেও একই রকম অভিযান চালানো হয়।
‘প্রথম যোদ্ধা’
উঁচু দেহ, ঘন গোঁফ ও পেছনে আচড়ানো পাকা চুল এমন চেহারার মাদুরো প্রথম ক্ষমতায় আসেন ২০১৩ সালে এবং দাবি করেন যে তিনি দু’বার পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচন ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ হিসেবে সমালোচিত। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার তৃতীয় দফার শপথ সম্পন্ন হয় যা পূর্ণ হলে তিনি ১৮ বছর ক্ষমতায় থাকতেন। এটা হতো তার বিপ্লবী নায়ক হুগো শাভেজের চেয়েও বেশি। শাভেজ ১৪ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে মাদুরো ছিলেন সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস প্রেসিডেন্ট। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর তিন মাস আগে নিজ উত্তরসূরি হিসেবে তাকেই বেছে নিয়েছিলেন শাভেজ। কিন্তু শাভেজের মতো বক্তৃতা ও ব্যক্তিত্বের জৌলুস মাদুরোর ছিল না, যা শাসক দল পিএসইউভির ভেতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তিনি অল্প ব্যবধানে জিতেছিলেন। এরপর তিনি একের পর এক সঙ্কট সামাল দেন- যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, আবার তেলের দামের পতনে দেশের প্রধান আয়ের উৎস হারানো- সবকিছুর মাঝেও তিনি টিকে থাকেন।
২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মহলের বড় অংশ সংসদীয় স্পিকার হুয়ান গুইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তার সমান্তরাল সরকার দ্রুত ভেঙে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচন শেষে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশ ও কয়েকটি লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র বিরোধী নেতা এডমনদো গনজালেজ উরুতিয়াকে প্রকৃত নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। সবসময়ই তার পাশে ছিলেন স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। তাকে তিনি ডাকেন ‘প্রথম যোদ্ধা’ ও ‘সিলিতা’ নামে। পেশায় সাবেক সরকারি কৌঁসুলি ফ্লোরেস ছিলেন সংসদ সদস্য ও পরে জাতীয় পরিষদের স্পিকার । পর্দার আড়ালে মাদুরো শাসনে তিনি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভোররাতের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী মাদুরোর সঙ্গে তাকেও আটক করে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে।
‘মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান’
রাজধানী কারাকাসজুড়ে সর্বত্র টাঙানো মাদুরোর বিশাল পোস্টার ও দেয়ালচিত্র। নিজেকে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন- নিজেকে বলেন বেসবলপ্রেমী, সালসা নাচের ভক্ত এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রায়ই নাচতে দেখা যেত তাকে, পাশে স্ত্রীকে নিয়ে। কারাকাসে জন্ম নেয়া মাদুরো নিজেকে একইসঙ্গে ঘোষিত মার্কসবাদী ও খ্রিস্টান বলে দাবি করেন। কৈশোরে তিনি একটি রক ব্যান্ডেও গিটার বাজাতেন। ধারণা করা হয়, ইংরেজিতে ইচ্ছে করেই তিনি ভুল বলেন- যাতে উচ্চবিত্ত মনে না হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে নানা ধরনের বাস্তব ও কল্পিত হুমকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৮ সালে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন হামলা ব্যর্থ হলেও কয়েকজন সেনা আহত হন। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দায় এড়াতে তিনি শাভেজের আমলের মার্কিনবিরোধী ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এগিয়ে নেন। বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে তাকে উৎখাতের চক্রান্তে অভিযুক্ত করেন। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার দাবি করতে করতে তিনি দেশের রাজনৈতিক বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দেন। যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, বিচারহীন আটক ও বিরোধীদের দমন ছিল নিয়মিত। তার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও দক্ষ প্রমাণিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচন আয়োজনের চুক্তিতে রাজি হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করাতে সক্ষম হন। তবে পরবর্তীতে তিনি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ভেনেজুয়েলার ক্লান্ত জনগণের দৈনন্দিন জীবনে মাদুরো ছিলেন প্রায় সর্বব্যাপী চরিত্র নিয়মিত টেলিভিশনে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তৃতা দিতে দেখা যেত তাকে।
এমনকি কার্টুন চরিত্র হিসেবেও তিনি জনপ্রিয় ছিলেন- ‘সুপার-বিগোতে’ বা ‘সুপার-মোচ’ নামে এক কেপ পরা সুপারহিরো, যে নাকি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

No comments