মাদুরোকে ২১০০ মাইল পাড়ি দিয়ে যেভাবে নেওয়া হলো নিউইয়র্কে

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। গতকাল শনিবার ভোরে তুলে নেওয়ার পর তাঁকে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে নিউইয়র্কে আনা হয়। মাদুরোর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও ছিলেন। তবে ফ্লোরেসের সর্বশেষ অবস্থান এখনো নিশ্চিত করে জানা যায়নি।

কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জায়গায় গতকাল ভোরে ‘বড় পরিসরে’ হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় এদিন ভোর ৪টা ২১ মিনিটে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য জানান।

ট্রাম্প লেখেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ধরতে এক ‘দুঃসাহসিক অভিযান’ চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জানানো হয়, সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্সসহ মার্কিন এলিট সেনারা মাদুরোর ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ আবাসস্থল থেকে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে আনেন।

এর পর থেকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় ৭ ঘণ্টা পর ট্রাম্প নিজে ‘আটক’ মাদুরোর ছবি ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেন। ছবিতে দেখা যায়, মাদুরোর চোখ বাঁধা ও হাতে হাতকড়া। পরনে ধূসর রঙের নরম কাপড়ের তৈরি ট্রাউজার–জ্যাকেট। বলা হয়, ছবিটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডব্লিউও জিমায় তোলা।

গতকাল ভোরেই কারাকাস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হেলিকপ্টারে নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে উড়িয়ে নেওয়া হয়। গন্তব্য ছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইডব্লিউও জিমা। ক্যারিবীয় সাগরের কোনো এক অজানা জায়গায় যুদ্ধজাহাজটি অবস্থান করছিল।

এরপর যুদ্ধজাহাজটি মাদুরোকে কিউবার গুয়ান্তানামো বে মার্কিন নৌঘাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে উড়োজাহাজে করে মাদুরোকে নেওয়া হয় নিউইয়র্কে।

স্থানীয় সময় গতকাল বিকেল ৫টার দিকে উড়োজাহাজটি নিউইয়র্ক সিটি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অরেঞ্জ কাউন্টির স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোয় প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে ওই উড়োজাহাজের দরজায় মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এফবিআইয়ের ইউনিফর্ম পরিহিত কর্মকর্তাদের দেখা যায়। এরপর উড়োজাহাজটি থেকে মাদুরো বেরিয়ে আসেন। কারাকাস থেকে তুলে নেওয়ার ১৫ ঘণ্টা পর তাঁকে নিউইয়র্কে দেখা যায়।

একটি অস্পষ্ট ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ভেনেজুয়েলার বন্দী নেতার পরনে একটি নীল জ্যাকেট, মুখ ঢাকা। মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁকে উড়োজাহাজের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনছেন। তাঁকে ঘিরে ছিলেন এফবিআই ও মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সদস্যরা। এ সময় তাঁর সঙ্গে স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে দেখা যায়নি।

এরপর মাদুরোর গন্তব্য ছিল নিউইয়র্ক শহর। উড়িয়ে নেওয়া হয় হেলিকপ্টারে। বিবিসির খবরে বলা হয়, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে একটি হেলিকপ্টারে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এ তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ হোয়াইট হাউসের সরকারি র‍্যাপিড রেসপন্স অ্যাকাউন্ট থেকে মাদুরোর একটি ছোট ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। ভিডিওতে মাদুরোকে ‘পার্প ওয়াক’ বা ‘অপরাধীকে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নেওয়ার মতো’ করে হাঁটিয়ে নিতে দেখা গেছে।

সিএনএন বলছে, ভিডিওতে দেখা যায়, কালো হুডি পরা মাদুরো একটি করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। সেখানকার নীল রঙের কার্পেটে ‘ডিইএ এনওয়াইডি’ (মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা-ডিইএ, নিউইয়র্ক বিভাগ) লেখা রয়েছে।

কারাকাস থেকে নিউইয়র্ক—বন্দী নিকোলা মাদুরো এ যাত্রায় পাড়ি দিয়েছেন ২ হাজার ১০০ মাইল বা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড–সংশ্লিষ্ট অভিযোগে মামলা করা হয়।

মাদুরোকে তুলে নেওয়া ‘ডেল্টা ফোর্স’ কী

সিএনএনের এক্সপ্লেইনারঃ নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নেওয়ার অভিযানে নিজেদের বিশেষায়িত বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’ ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি অভিজাত বাহিনী। এ বাহিনী সম্পর্কে জানেন—এমন কয়েকটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর একাধিক বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। এসবের মধ্যে ডেল্টা ফোর্স অন্যতম। এ ইউনিট মূলত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার, সরাসরি সামরিক হামলা ও বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি-সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রশিক্ষিত। চড়া মূল্যের লক্ষ্য পূরণে ডেল্টা ফোর্সকে ব্যবহার করা হয়।

ডেল্টা ফোর্স প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৭ সালে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের (জেএসওসি) সরাসরি অধীনে কাজ করে। নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ব্র্যাগভিত্তিক ডেল্টা ফোর্সের মোট ৮টি অপারেশনাল ‘সেবরে স্কোয়াড্রন’ বা হামলা চালানোর উপযোগী স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট রয়েছে।

ডেল্টা ফোর্স–সম্পর্কিত প্রায় সব তথ্যই সর্বোচ্চ মাত্রায় গোপন রাখা হয়। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে এ ইউনিটকে সবচেয়ে জটিল, গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কুখ্যাত ‘এসইএএল টিম সিক্স’-এর মতো ডেল্টা ফোর্স সাম্প্রতিক ইতিহাসে বেশ কয়েকটি আলোচিত সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার উদ্ধার অভিযান অন্যতম।

ওই বছর সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। কয়েকজন মার্কিন সেনা আটকা পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানে ডেল্টা ফোর্স অংশ নিয়েছিল। এ অভিযান নিয়ে ২০০১ সালে ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ নামের একটি ছবি মুক্তি পায়।

লাতিন আমেরিকার দেশ পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরতে ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ পরিচালনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এতেও অংশ নিয়েছিল ডেল্টা ফোর্স। গত শনিবার শেষরাতে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তা অপারেশন জাস্ট কজের প্রসঙ্গ টেনেছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-04%2Fn4ajlp1l%2FMaduro.avif?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বন্দী অবস্থার এ ছবি ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

No comments

Powered by Blogger.