‘ক্রসরোডে’ বাংলাদেশের রাজনীতি

কাঠমান্ডু পোস্টের নিবন্ধঃ ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু বিএনপির রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর দলের ভিতর যে বিভক্তি তৈরি হয়, তিনি তা সামলে নিয়ে নেতৃত্ব দেন। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কৃতিত্বও তার। অনলাইন কাঠমান্ডু পোস্টে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ পলিটিক্স অ্যাট এ ক্রসরোডস’ শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন নয়া দিল্লির মনোহর পারিকার ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষণা ফেলো স্মৃতি এস পট্টনায়ক। তিনি ওই নিবন্ধে বেগম খালেদা জিয়া, তার রাজনীতি এবং বিএনপিতে পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপির ভেতরে একরকম শূন্যতা তৈরি হবে। তিনি লিখেছেন, বেগম জিয়ার নেতৃত্বেই বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। পরবর্তীতে তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দ্বিতীয় সারির নেতারাও উঠে আসেন। এবার নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে লড়ছে। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাবন্দি থাকার সময় তারেক রহমান লন্ডন থেকে অনলাইনে দল পরিচালনা করেন, ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন এবং প্রার্থী মনোনয়নে ভূমিকা রাখেন। তবু বেশির ভাগ নেতা দলত্যাগ করেননি। এটা তাদের সংগঠনের প্রতি আনুগত্যেরই প্রমাণ। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা তারেক রহমান বিএনপিকে নতুন উদ্দীপনা দিয়েছেন। এবারের নির্বাচন তার নেতৃত্বে প্রথম। অতএব দলের সব সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব তার কাঁধেই পড়বে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় লড়াই মূলত বিএনপিজোট ও জামায়াতজোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

স্মৃতি এস পট্টনায়েক আরও লিখেছেন, শেখ হাসিনার পতনের পর উদীয়মান ছাত্রদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)’তে বড় পরিবর্তন এসেছে। তারা হঠাৎ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোটে যোগ দেয়। শুরু থেকেই যাকে অনেকে ‘জামায়াতের বি-দল’ বলছিলেন, সেই অভিযোগ এবার বাস্তবে রূপ নেয়। দল গঠনের সময় শিবিরপন্থী নেতাদের শীর্ষ পদ না দিয়ে যে আদর্শিক দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছিল, তা ভেঙে যায়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্তত ৩০ জন দল থেকে পদত্যাগ করেন। কিছু নারী নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে যাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, শেষ মুহূর্তে এ জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়, যাতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিকল্প ভাবার সুযোগ না থাকে।

এনসিপির অন্যতম নারী নেত্রী তাসনিম জারা নিজ নির্বাচনী এলাকায় এক ভাগ নিবন্ধিত ভোটারের স্বাক্ষর জোগাড় করে স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন এবং এটা ঘটছে এমন এক সময়ে যখন ইসির সার্ভার বিভ্রাট চলছিল।

দলটি ‘নতুন রাজনীতি’র অঙ্গীকার দিয়েও, জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বহু সমর্থককে হতাশ করেছে। এনসিপি ও বিএনপি উভয়েই যুক্তি দিচ্ছে- এটি কৌশলগত জোট, মতাদর্শিক নয়। তবে এনসিপি বড় দল ছাড়া নির্বাচন জেতার সম্ভাবনা না থাকায়- এ জোটকে অনেকেই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখছেন।

ওই নিবন্ধে আরও বলা হয়, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলেও এটাই বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। এটি হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা। আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় বিএনপির রাজনৈতিক বয়ান অনেকাংশে জামায়াতের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। অতীতের প্রচলিত ‘ইসলাম প্রসঙ্গ’ বা ‘সার্বভৌমত্ব হুমকিতে’ ধরনের স্লোগান- সম্ভবত জামায়াত আবার সামনে আনবে।
ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারেক রহমানকে ‘ভারতের ঘনিষ্ঠ’- এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তবু জুলাইপরবর্তী উত্তাল রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার নেতৃত্বই বিএনপিকে এগিয়ে নিতে পারে- এমন প্রত্যাশা রয়ে গেছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/196786_Abul-1.webp

No comments

Powered by Blogger.