ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে জাপানের প্রতি আহ্বান মাহমুদ আব্বাসের

আসাহি সিম্বুনকে সাক্ষাৎকারঃ ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আশা করছেন ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে জাপান এবং গাজা উপত্যকার পুনর্গঠনে অবদান রাখবে। এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরও জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন শান্তি উদ্যোগ এবং দীর্ঘ দুই বছরের সংঘর্ষে বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯০ বছর বয়সী আব্বাস ২৫ ডিসেম্বর পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাপানের আসাহি শিম্বুন-এর সাংবাদিককে বলেন, আমরা চাই আপনাদের সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিক। আমার মনে হয় না এতে অস্বীকৃতির কোনো কারণ আছে। এই স্বীকৃতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির স্বার্থে।

গত ১০ই অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটি ছিল কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাথে তার প্রথম এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে। জিম্মি ও বন্দি বিনিময়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ প্রায় সমাপ্ত বলে ধরা হচ্ছে। এখন পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা। এতে সম্ভাব্য আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি বোর্ড অব পিস বা অন্তর্বর্তী শাসন কাঠামো গঠন, গাজায় নিরাপত্তা ও যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স মোতায়েন।

এই উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানালেও আব্বাস বলেন, এসব পদক্ষেপ অবশ্যই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্মতি এবং তার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রেখে বাস্তবায়িত হওয়া উচিত।

যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও ইসরাইলি হামলায় আরও ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। ফলে গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। এখনও কিছু সীমান্ত পারাপার বন্ধ রয়েছে এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বিরাজ করছে। তিনি ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করলেও গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, ক্রমাগত নিয়ম লঙ্ঘন, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা- এসবই এই চুক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আব্বাস জানান, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে গাজা শাসন ‘বৈধ ফিলিস্তিনি সরকার’-এর হাতে ফিরিয়ে আনার পক্ষে তারা প্রস্তুত অর্থাৎ হামাসের শাসনের অবসান চান তিনি। ২০০৭ সাল থেকে গাজা কার্যত হামাসের নিয়ন্ত্রণে। আর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসন সীমিত কেবল পশ্চিম তীরেই। তিনি বলেন, এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন এবং এক বৈধ অস্ত্র- এই নীতির ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষই বৈধ শাসন কাঠামো। হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি না থাকলেও তিনি বলেন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং তাদের শাসনের অবসান শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের অপরিহার্য অংশ। শান্তি পরিকল্পনায় গাজার ভবিষ্যৎ শাসন যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে যাবে- এমন নিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, যা ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়- যুদ্ধবিরতির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে দক্ষিণ ইসরাইলে গঠিত সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (সিএমসিসি)। প্রায় ৫০টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধি থাকলেও সেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আব্বাস বলেন, সিএমসিসি-এর ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্ট করছি, যে কোনো পুনর্গঠন বা সমন্বয় কাঠামো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকাকে সম্পূরক হবে, বিকল্প নয়। কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটানো স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সফলতার সম্ভাবনা দুর্বল করে। বোর্ড অব পিস কাজ চালিয়ে যাবে- যতদিন না ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সুশাসন, আইনের শাসন ও স্বচ্ছতাসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে, যা আন্তর্জাতিক মহল দাবি করে আসছে। তিনি একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০০৬ সালের পর থেকে নির্বাচন না হওয়ায় ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের দ্রুত নির্বাচন আয়োজনেরও আহ্বান জানাচ্ছে। আব্বাস তার পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। তবে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। এক কর্মকর্তা জানান, দুই বছরের সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়ায় ভোটার নিবন্ধন ও যাচাইয়ে সময় লাগবে। ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করলে এ কাজ সম্ভব নয়। শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী কোনোভাবেই সরাসরি, পরোক্ষ বা অন্য কোনোভাবে গাজার শাসনে অংশ নেবে না।

আব্বাস পরিষ্কার করেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী শাসন বা প্রশাসনে অংশ নিতে পারবে না। তবে হামাস রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, যে কোনো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক জীবনে অংশগ্রহণের দরজা খোলা। শর্ত শুধু একটাই- তারা যেন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়ে ফিলিস্তিনি আইন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইল পশ্চিম তীরেও অভিযান জোরদার করেছে, পাশাপাশি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলাও বেড়েছে। আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বলেন, বসতি সম্প্রসারণ, কার্যত ভূমি দখল এবং বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসী হামলা- এসবই আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে নস্যাৎ করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা। প্রায় ১৬০টি দেশ দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানালেও, সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে বৃটেন, কানাডা ও ফ্রান্স স্বীকৃতি দেয়।

mzamin

No comments

Powered by Blogger.