বিদেশি মিডিয়ার রিপোর্ট: ‘লাজুক গৃহিণী’ হলেন কাণ্ডারি
বার্তা সংস্থা এপি লিখেছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় এক প্রজন্ম ধরে দেশের রাজনীতিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাকে তিনি ও তার দল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ দুর্নীতির মামলাটিতেও তাকে খালাস দেন। যা তাকে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন।
বিএনপি জানায়, ২০২০ সালে অসুস্থতার কারণে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার পরিবার তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসনের কাছে কমপক্ষে ১৮ বার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়। জানুয়ারিতে তিনি লন্ডনে যান এবং মে মাসে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলো কাটে হত্যা, অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়ার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সেনা প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। এক বছর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) গঠন করেন। তাকে দেশে গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করার কৃতিত্ব দেয়া হয় । তবে ১৯৮১ সালে তিনি এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থান পরবর্তী সেনাশাসনের বিরুদ্ধে এক গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করে। এর পরিণতিতে ১৯৯০ সালে সাবেক সেনাপ্রধান ও স্বৈরশাসক এইচ. এম. এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।
অনলাইন বিবিসি লিখেছে, খালেদা জিয়ার স্বামী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন। সে সময় খালেদা জিয়াকে তাদের দুই ছেলের প্রতি নিবেদিত ‘লাজুক গৃহিণী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির (বিএনপি) নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের কঠোর রাজনীতির অঙ্গনে তিনি দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েন। বহু বছর কারাবন্দি থাকতে হয় তাকে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই অভিযোগগুলো বাতিল করা হয়। ওই অভ্যুত্থানে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান।
ভারতের দ্য উইক লিখেছে, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ডাক্তারদের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং বুকের জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং কয়েক দিন ধরে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বিএনপি জানায়, ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পরই ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
দলের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে বলা হয়, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা ছিল, যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ দুর্নীতির মামলাটিতেও খালাস দেন। ফলে তিনি আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেতেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তার মৃত্যু আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই আন্দোলনের ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা তখন থেকেই ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় আছেন। আর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুব আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলায় তার দণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কথা উল্লেখ করে তাকে দেশে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার মারা গেছেন। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার পালাবদল ও তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যে রাজনীতি করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন এবং চার মাস থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। ২০০৬ সালের পর থেকে খালেদা জিয়া ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবং কয়েক বছর কারাগার ও গৃহবন্দিত্বে কাটালেও তিনি ও তাঁর দল বিএনপি এখনো ব্যাপক জনসমর্থন ধরে রেখেছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত সপ্তাহে দেশে ফিরেছেন এবং ব্যাপকভাবে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীপ্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রয়েছে। নিজের প্রথম নামেই বেশি পরিচিত খালেদা জিয়া। তাঁকে লাজুক ও দুই ছেলেকে বড় করা পরিবারমুখী নারী হিসেবে বর্ণনা করা হতো, যতক্ষণ না তাঁর স্বামী, সামরিক নেতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় নিহত হন। তিন বছর পর তিনি তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রধান হন এবং ‘বাংলাদেশকে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করার’ তাঁর স্বামীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।

No comments