আরব বসন্তে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রনায়করা এখন কোথায়?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ ২৬ বছর বয়সী তিউনিসিয়ার তরুণ মোহাম্মদ বৌয়াজ্জির মৃত্যুর ১৫ বছর গত হয়েছে। যিনি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নিজের শরীরে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। তার এই প্রতিবাদের ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের অভাব, দুর্নীতি এবং দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে পরিবর্তনের আকঙ্খা ছিল প্রবল। টানা ২৮ দিনের বিক্ষোভে তিউনিসিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবিদিন বিন আলির পতন হয়। যিনি টানা ২৩ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিউনিসিয়ার জনগণের এই বিক্ষোভের সফলতা গোটা আরব বিশ্বকেই নাড়িয়ে দেয়। একে একে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং সিরিয়াতেও ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতালোভী আরব রাষ্ট্রনায়কদের পতন ঘটানো সাধারণ মানুষের এই বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতিতে আরব বসন্ত নামে পরিচিত। যার মাধ্যমে পাঁচ দেশের অতি প্রভাবশালী প্রেসিডেন্টের পতন হয়। এসব নেতাদের সঙ্গে কি ঘটেছিল তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।

তিউনিসিয়ার জয়নাল আবিদিন বিন আলি  
তার জন্ম ১৯৩৬ সালে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্বাসনে থেকেই ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেন আলি প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবাকে শারীরিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কঠোর শাসন কায়েম করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও দুর্নীতি, বৈষম্য ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। টানা এক মাসের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি বেন আলি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। পরে তিউনিসিয়ার আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ২০১৯ সালে সৌদি আরবে নির্বাসনে তার মৃত্যু হয়।

মিশর: হোসনি মুবারক
১৯৮১ সালে আনোয়ার সাদাত হত্যার পর ক্ষমতায় আসেন মুবারক। জরুরি আইন ও সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন। ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি গণবিক্ষোভ শুরু হয় এবং ১৮ দিনের মাথায় ১১ ফেব্রুয়ারি মুবারক পদত্যাগে বাধ্য হন। বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হলেও পরে তা বাতিল হয়। দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন আটক থাকার পর ২০১৭ সালে মুক্তি পান। ২০২০ সালে কায়রোতে তার মৃত্যু হয়।

ইয়েমেন: আলি আবদুল্লাহ সালেহ
ইয়েমেনের রাজনীতিতে দক্ষ কৌশলী হিসেবে পরিচিত সালেহ ৩৩ বছর দেশ শাসন করেন। ২০১১ সালের আন্দোলনের পর ২০১২ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তিনি সাবেক শত্রু হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলে সহায়তা করেন। কিন্তু ২০১৭ সালে সেই জোট ভেঙে গেলে হুথি বাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন।

লিবিয়া: মুয়াম্মার গাদ্দাফি
১৯৬৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসা গাদ্দাফি চার দশকের বেশি সময় লিবিয়া শাসন করেন। তেল সম্পদের ওপর ভর করে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। ২০১১ সালে বেনগাজিতে আন্দোলন শুরু হলে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ন্যাটোর বিমান হামলা ও বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় তার শাসনের অবসান ঘটে। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সির্তে শহরে বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়ে তিনি নিহত হন।

সিরিয়া: বাশার আল-আসাদ
২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় আসেন। ২০১১ সালে দারা শহরে শিক্ষার্থীদের গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত ও অর্ধেকের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তি এতে জড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের দ্রুত অভিযানে দামেস্কের পতন ঘটে। বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ মস্কোতে পালিয়ে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন।
আরব বসন্ত বহু স্বৈরশাসকের পতন ঘটালেও অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কারও পরিণতি হয়েছে মৃত্যু, কারও নির্বাসন, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ- আরব বসন্তের উত্তরাধিকার আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

mzamin

No comments

Powered by Blogger.