ট্রাভেল এজেন্সি ছাড়াই অল্প খরচে সিকিম! by ওয়ালিউল বিশ্বাস

গ্যাংটক
সিকিমের রাতগুলো একটু বেশি গভীর। রাজধানী গ্যাংটকে রাত ৯টার সময় মনে হলো মধ্যরাত। নিজেদের পায়ের শব্দে নিজেরাই আঁতকে উঠছি। পাহাড়ের ওপর শহর। তাই হোটেল খুঁজতে কখনও পাহাড়ের গাঁ বেয়ে নামতে হচ্ছে, কখনও উঠতে হচ্ছে। যে হোটেলেই যাই, দামে ঠিক পড়ে না বা পছন্দ হয় না।
শেষ অবধি ভাগ্য সহায় হলো। হোটেল মিললো। ভাড়া প্রতি রাত ১৮০০ রুপি। দোতলার রুমে গিয়ে তো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! ১৮০০ রুপিতে এমন রুম পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের বিষয়। লাক্সারি রুম। চোখ বন্ধ করে এই রুমের ভাড়া ৩ হাজার রুপি হওয়ার কথা!
ভাড়া কম হওয়ার বিষয়টি প্রথমে বুঝতে পারিনি। ঠিক পরের দিন বোঝা গেলো। সকালে নাশতা সেরে হোটেলে ফেরার পর রুমে এলো বেয়ারা। সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিলো, রুম ছাড়তে হবে! এটা একদিনের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তার দিকে তাকিয়ে মনে হলো– সে হয়তো বজ্রদেবতা, মুখ দিয়ে বজ্রপাত ঘটাচ্ছেন।
আকস্মিক এমন নির্দেশনার ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। নিজেদের সামলে রিসিপশনে ম্যানেজার বাবুর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি মুখে অমায়িক সুন্দর হাসি রেখে কথা দিয়ে মোটামুটি বুকে ছুরি চালিয়ে দিলো! তার কথায়, ‘রুম ভাড়া নেওয়ার সময় গতকাল রাতে আপনাদের বলেছিলাম, এটা একদিনের জন্য। লাচুং থেকে আমাদের অতিথি আসবে। রুমটা ছেড়ে দিতে হবে।’
আমার নিশ্চিত মনে আছে, আমাদের মধ্যে এমন কোনও কথা হয়নি। হোটেলে ঢুকে রুমের ভাড়া জেনেছি, তারপর রুম দেখে আর নিচে নামিনি। রাতে খাবার খাওয়ার সময় বুকিং মানি ও নাম-ঠিকানার কাগজ পূরণ করেছি। আমার ভ্রমণসঙ্গী সাহিত্যিক আশিক মুস্তাফার কাছে জানতে চাইলাম, আসলেই ভদ্রলোক এমন কথা বলেছিলেন? সেও ‘না’ সূচক মাথা ঝোঁকালো। এমন কোনও কথাই সে শোনেনি। ম্যানেজার বাবুকে কিছুক্ষণ যুক্তি দিলাম। কিন্তু ভদ্রলোক ‘তালগাছটা আমার’ ভাব ধরে আছেন। কোনও লাভ হলো না। অগত্যা রুম ছেড়ে নতুন হোটেলের সন্ধানে বের হলাম। কোথায় বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির কাছে গিয়ে ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর দরদাম করবো, তা আর হলো না!
একবার ভাবলাম পাশের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে একটা নালিশ ঠুকে দিই। কিন্তু নিরিবিলি একটু ঘুরতে গেলে মন খারাপের কাজ না করাই ভালো। তাই আর ঝামেলায় যাইনি।
গ্যাংটক শহর
গ্যাংটক শহর
সিকিমে ঢোকার মুখ থেকেই যেন নানাবিধ নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়েছি। গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশি, নেপালি আর বিদেশিদের জন্য ভিন্ন নিয়ম ও তরিকায় হাঁফ ধরে যায়। এরপর তো আছে গ্যাংটক থেকে সিকিমের বিভিন্ন গ্রামে যাওয়ার ট্যুরিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ ও নিয়ম। এতোশত নিয়ম মনে রাখাও বিশেষ দক্ষতা। এখানকার মানুষগুলো যেন সেগুলোতে খুব দক্ষ! সেই সঙ্গে আছে অনুমতি নেওয়ার মতো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলি। পুরো সিকিম ঘোরার জন্য প্রথমে যেতে হবে রাজধানী গ্যাংটকে। সড়কপথ বেছে নিলে বাংলাবান্ধা বা চ্যাংড়াবান্ধা থেকে আসতে হবে শিলিগুড়ি। এরপর সেখান থেকেই শুরু হবে ধকল। বাংলাদেশি বা নেপালিদের এমনকি অন্য বিদেশিদের আলাদা জিপ নিতে হয়। জোট বেঁধে নিতে চাইলেও তারা নেবে না। এরপর গ্যাংটকে ঢোকার আগে লাগবে অনুমতি। যেমন, পাসপোর্টে অ্যারাইভাল (আগমন) ও ডিপারচার (বহির্গমন) তারিখ বসাতে হয়।
গ্যাংটকে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা বা রাত। সেখানে থাকতেই হবে। সারারাত ভেবে ঠিক করবেন কোন স্পট বা গ্রামে যাবেন। গ্যাংটক থেকে এগুলোর প্রায় প্রতিটির দূরত্ব ৫-৬ ঘণ্টার। একটি রুটে যেতে পারবেন সারাবছর, তা হলো বরফঘেরা জিরো পয়েন্ট। এ পথে মিলবে ইয়ামথাং ভ্যালি ও লাচাং।
কাটাও বা সাঙু লেক গেলে আলাদা রুট। এসব স্পটে যাওয়া ও সেখানে থাকার জন্য ট্রাভেল প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করে। এগুলোতে যেতে, থাকতে ও খেতে ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার প্যাকেজ আছে।
ইয়ামথাং ভ্যালি
ইয়ামথাং ভ্যালি
তবে মজার বিষয় হলো, একটু সাহসী ও বুদ্ধিমান হলে এই রুটগুলো প্রায় অর্ধেক খরচে শেষ করা যাবে। জিরো পয়েন্ট যাওয়ার সময় ড্রাইভারের কথায় তা বোঝা গেছে। একটা ট্রাভেল প্রতিষ্ঠানকে আমরা ছয়জন মিলে দিয়েছি ১৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ড্রাইভারকে তারা দিয়েছে ৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১১ হাজার টাকার মধ্যে আমাদের এক রাত থাকা এবং রাত, সকাল ও দুপুরের খাবার। যে মানের খাবার পেয়েছি তাতে জনপ্রতি তিনবেলা ৩০০ রুপি খরচ। সেই হিসাবে ছয়জনের ১৮০০ রুপি লেগেছে। অর্থাৎ একরাতের দুটি রুমের খরচ রাখা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ রুপি! অথচ মাত্র ২ হাজার রুপিতে এগুলো ব্যবস্থা করা সম্ভব!
তাই নিজেই যদি কোনও সহযোগিতা ছাড়া কম খরচে সিকিম ভ্রমণ করতে চান, তাহলে তিনটি কাজ করতে হবে।
১. ৮-৯ সদস্যের বড় দল নিয়ে বেড়াতে যাওয়া।
২. গাড়িচালকদের সহযোগিতা নেওয়া।
৩. হোটেলগুলোতে ফোন করে আগেই দরদাম করে ফেলা।
লাচাং গ্রামের একটি কটেজ
লাচাং গ্রামের একটি কটেজ
দল বড় থাকলে একটা জিপ নিজেরাই ভাড়া করে নেওয়া সম্ভব। এতে বাংলাদেশি বা বিদেশি বলে আলাদা করে দেওয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ আটজনের জন্যও যত ভাড়া, দুই জনের জন্যও একই।
আগে থেকে হোটেলগুলোতে যোগাযোগ রেখে বা বুকিং দিয়ে গেলে হুট করে বের করে দেওয়ার মতো বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। সিকিম সরকার তাদের ওয়েবসাইট অসাধারণ সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। রেজিস্টার্ড ৪০০টি হোটেল-মোটেলের তথ্য রয়েছে এতে। এছাড়া প্রদেশগুলোর গ্রামে আবাসিকে থাকার জন্য আরও ৯০০ কটেজের ঠিকানা আছে।
* নিবন্ধিত ৪০০টি হোটেল-মোটেলের তথ্য জানতে ক্লিক করুন:

* প্রদেশগুলোর গ্রামে থাকার তথ্য জানতে ক্লিক করুন:
গ্যাংটকের পৌঁছার পর ভালো একজন ড্রাইভার খুঁজে নিলে সুবিধা হয়। তিনিই স্পটগুলোতে নিয়ে যাবেন। চাইলে সেসব স্পটের হোটেলে কম খরচে থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। ওয়েবসাইট থেকে হোটেল বেছে নেওয়ার সুযোগ তো আছেই।
জিরো পয়েন্টের রাস্তায়
জিরো পয়েন্টের রাস্তায়
সিকিমের বিভিন্ন প্রদেশে ঢুকতে অনুমতি লাগে। এক্ষেত্রে ড্রাইভারের সহযোগিতা চাইলে তিনিই সব ব্যবস্থা করবেন। চাইলে নিজেও ব্যবস্থা করা যায়।
সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোর ফোন নম্বরের জন্য ক্লিক করুন:

সব মিলিয়ে সিকিম ট্যুরের জন্য ৮-৯ জনের দল জরুরি। আর সহায়িকা হিসেবে খুব গোছানো ওয়েবসাইট দেখে নিতে ক্লিক করুন:
ভালো কথা, ভাষা একই হলেও কলকাতা বা বিহারের লোকজনের চেয়ে স্থানীয় লোকদের সহযোগিতা বেশি নেবেন। তাদের হৃদয় অনেক বড়!
>>>ছবি: লেখক

No comments

Powered by Blogger.