ছাত্রলীগের নববর্ষ: দামি পিস্তল ও সস্তা জীবন by ফারুক ওয়াসিফ

কোনো কোনো দেশে আইন আছে, সব তরুণকেই বাধ্যতামূলকভাবে কিছুদিন সামরিক সার্ভিসে যোগ দিতে হবে। বাংলাদেশে তেমন কোনো নিয়ম নেই। তবে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর বাধ্যতামূলকভাবে ছাত্রলীগ করার ‘নিয়ম’ আছে। নবাগত শিক্ষার্থী হিসেবে আপনি যদি হলে সিট পেতে চান, সম্মান বাঁচিয়ে চলতে চান, তাহলে ছাত্রলীগের মিছিলে মাঝেমধ্যে যেতেই হবে। এইভাবে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে মিছিল করাত ইসলামী ছাত্রশিবির, এইভাবে মিছিল করাত বাংলাদেশ ছাত্রদল। নিজেদের সুদিনে ছাত্রলীগও সেই ধারা বজায় রেখেছে। খ্রিস্টিয় নববর্ষ এসেছে সবার জীবনে। ছাত্রলীগের জীবনেও। তার জানান দিতে মিছিল করতে হবে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে। তা নিয়ে ছাত্রলীগের দু্ই পক্ষে দ্বন্দ্ব হবে। ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে অস্ত্রের মহড়ার জের ধরে সিলেটে নিহত হলেন ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান। প্রকাশ্যে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া ও তিন খুনের ঘটনায় জড়িত টিলাগড় ছাত্রলীগ। গত মঙ্গলবার নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক ছাত্রলীগ কর্মীকে। চট্টগ্রামেও দলীয় কোন্দলে ছাত্রলীগ নেতারা খুন হচ্ছেন। অভিযোগ দলীয় কর্মীর বিরুদ্ধে এবং হত্যার অস্ত্র প্রায়শই পিস্তল। গত শুক্রবারের প্রথম আলোয় সিলেটের পিস্তলধারী ছাত্রলীগ নেতার ছবি ছাপা হয়েছে। এভাবে নিহত হওয়ার জন্য কিংবা হত্যা করার জন্য নতুন মুখ চাই। মিছিলের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর জন্যও নতুন মুখ চাই। পিস্তল কেনার জন্যও অনেক টাকা চাই। নেতা হওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন নেতার ভালবাসা চাই। খেলা চলতে থাকে, খেলারামরা খেলে যান। বনেদি ও প্রাচীন ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের মিছিল করা তো গৌরবের ব্যাপার। সংগঠনটির ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিছিলে যোগ দেওয়ার সেই গৌরব থেকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, সে জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কক্সবাজার শহরে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর অভূতপূর্ব মিছিল হওয়ার সংবাদ দেখেছি। সেসব মিছিলে ‘বাধ্যতামূলক’ আনন্দে শামিল হতে হয়েছে অনেককেই। যেখানে প্রতিবাদ করা বৃথা সেখানে, মানে ছাত্রাবাস নামক মুরগির খোঁয়াড়ে এসব মেনে নেওয়াই নিয়ম।
এই নিয়ম সব ছাত্রাবাসে মোটামুটি চালু রয়েছে। নতুন ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীর জোগান যত দিন থাকবে, আর যত দিন থাকবে রাষ্ট্রক্ষমতার মদদ, তত দিন নতুন মুখের অভাব পড়বে না। কিন্তু ভেড়ার পালে আরেকটি ভেড়া হতে চাননি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আফসানা আহমেদ ইভা। ছাত্রলীগের মিছিলে যোগ দেওয়ার নির্দেশ মানেননি বিধায় তাঁকে হল থেকে বের করে দিয়েছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ রকম ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। ইভাকে তাঁরা বের করে দিয়েছেন তীব্র শীতের রাতে। প্রাধ্যক্ষ ও প্রক্টরকে ফোন দিয়ে সাড়া পাননি এই ছাত্রী। স্মরণকালের তীব্র শীতে লেপ-কম্বলের উষ্ণতা থেকে বের না-হওয়ায় তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না। জীবনটা তো একটু উষ্ণতার জন্যই নিবেদিত, সেই উষ্ণতা ক্ষমতারও। সারা রাত হলের ফটকের সামনে শীতে কাঁপতে হয়েছে তাঁকে। কারণ, তিনি যে সংগঠন করেন, সেই সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ক্ষমতার উষ্ণতা থেকে কিছুটা দূরে। ইভা যা পেরেছেন, তা কোনো সাধারণ ছাত্রছাত্রীর পক্ষে পারা কঠিন। আদর্শ ও নীতিনিষ্ঠতা মানুষকে সাহস দেয়। ইভা সাহসী হয়েছেন। কিন্তু কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে দেখা গেল না তাঁর পাশে দাঁড়াতে। এক ইভার শীতার্ত নিঃসঙ্গতা থেকে বোঝা যায়, কতটা ভয়ের হিমে জমে অনেকের চেতনাই বরফ হয়ে গিয়েছে। ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওয়ালিদ আশরাফ উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আমরণ অনশন করেছিলেন, তখনো তাঁকে একাই বসে থাকতে হয়েছে। হলে থাকা কোনো শিক্ষার্থীর সাহস হয়নি তাঁর পাশে বসার। অবশ্য অনেকে গোপনে এসে সংহতি খাতায় সংহতি জানিয়ে গেছেন—তবে হল বা বিভাগের পরিচয় গোপন করেই। জানতে পারলে হলের সিট বাতিল হতে পারে, বেয়াদবির শারীরিক শাস্তিও বিরল নয়। শিক্ষাঙ্গনে নিঃসঙ্গ প্রতিবাদই বুঝিয়ে দেয়, সাহস দেখানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ছেলেটি বা মেয়েটিকে অঢেল আদরে বড় করেন মা-বাবা। সামান্যতম ব্যথা-বেদনা তারা যাতে না পায়, সাধ্যমতো সেদিকে খেয়াল রাখেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে আশা করেন, পুত্রধন-কন্যারত্নটি অন্তত নিরাপদ থাকবে। এদের অনেককেই ছাত্রাবাস-ছাত্রীবাসে থাকতে হয়। সেই আদরের পুত্র-কন্যারা বাড়িতে হাসিমুখে ফেরে বটে, কিন্তু হলগুলোয় তারা কীভাবে থাকে, কী আচরণ পায়, সেই কাহিনি বোবা হয়ে থাকে। আদরের পুত্র-কন্যারা ঘুণাক্ষরেও সেসব কাহিনি মা-বাবাকে বলে না। যদি তাঁরা কষ্ট পান, যদি উদ্বেগে তাঁদের ঘুম না হয়? ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে বের করে দেওয়ার ঘটনাটায় কোনো নতুনত্ব নেই। স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের চেহারাছবিই এই। হেন কোনো ক্যাম্পাসের হেন কোনো আবাসিক ছাত্রছাত্রী নেই, যাঁদের প্রথম বর্ষে এ রকম বাধ্যতামূলক মিছিল করতে হয় না। সেই নীরব নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে তাঁদের অনেকের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছার ব্যক্তিত্ব এমন বেঁকে যায়, সারা জীবনে আর সোজা হয় না। এইভাবে রাজনৈতিক দলে কর্মীর জোগান চলতেই থাকে, আনুগত্যের আর দাসত্বের প্রজন্ম তৈরি হতেই থাকে।
জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা এভাবে ভয়ে বা প্রতাপে কাটানোর দুর্ভাগ্য আমাদের শেষ হয় না। এভাবেই উজ্জীবিত তরুণেরা বদলে ‘নিরীহ’ হয়ে যায়। দিনবদলের এই অতিমানবিক কাহিনি সংবাদমাধ্যমে কমই আসে। কেউ কেউ আবার ‘বুদ্ধিমান’। তারা কেউ লোভে পড়ে কেউবা চাপের বশে ক্ষমতাসীন সংগঠনে যোগ দেয়। প্রথম বর্ষের এই রিক্রুটদের দিয়েই তাদেরই সহপাঠীদের দলে টানা হয়, দরকার পড়লে নির্যাতনও করা হয়। তাদের মধ্যে থেকেই তৈরি হয় পিস্তল বা কিরিচ হাতের সন্ত্রাসী—বিশ্বজিতের খুনিরা, আফসানার ঘাতকেরা, খাদিজাকে রক্তাক্তকারী দানবেরা। গোলাগুলি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে এভাবে তৈরি হয় সেলিব্রিটি সন্ত্রাসী, সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে ক্যাম্পাসে পয়দা হয় উদীয়মান ছাত্রনেতার—মাঝখানে পড়ে থাকে নিহত লাশ অথবা জীবিত বোবা প্রজন্ম। সন্ত্রাসীদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ মন্ত্রী-সাংসদ হন। নীরব প্রজন্ম নীরবেই সর্বংসহা নাগরিকে পরিণত হয়। দেশটা এভাবেই এগিয়ে চলে—রসাতলের দিকে। এটা সেই সময়, যা সন্ত্রাস-মাদক-দুর্নীতি ও নারী নির্যাতনের দাগে ক্ষতবিক্ষত। এরাও আমাদেরই তরুণ, যারা অন্তর্কোন্দলে নিহত হয়। এরাও আমাদেরই তরুণ, যারা শীতের রাতে নিরাশ্রয় হয়। যারা মারে তারাও আমরা, যারা মরে তারাও আমরাই। আমরা আর আমাগো মামুদের এই কারবারে তারুণ্য নিজে যেমন হুমকি, তেমনি তারা নিজেরাও হত্যা, মাদক ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ার হুমকিতে পড়ে থাকছে। জীবন ও তারুণ্য কি এতই সস্তা এ দেশে? এত অবলীলায় মেরে ও মরে শেষ হওয়া যায়?
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
faruk.wasif@prothom-alo.info

No comments

Powered by Blogger.