দু’বছরে সরকারের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা by একে এম শাহনাওয়াজ

২০১৪-এর নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। কিন্তু দুর্বল গণতান্ত্রিক এই দেশ খুব যৌক্তিক ও জীবন্ত শক্তিতে এগোতে পারে না। ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিরোধী দল জনমত গঠন করে সরকার পরিবর্তনের ঝামেলায় যেতে চায় না- সময় ক্ষেপণও করতে চায় না। তাই সরকারকে টেনে নামানোর স্থূল শক্তি প্রয়োগে অরাজকতা তৈরি করতে বেশি পছন্দ করে। সরকার পক্ষও চায় নানা কৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। সেখানেও শক্তি প্রয়োগের বিষয়টিই প্রাধান্য পায়। এ ধারার দুরাচার অপার সম্ভাবনার দেশটির এগিয়ে যাওয়ার পথটিকে বারবার কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোট সরকার গঠন করা হয়। এ পর্বে বিএনপি অনেকটা ব্যাকফুটে চলে যায়। সে সময় রাজনীতিতে যে কৌশলী ভূমিকা রাখার দরকার ছিল, বিএনপি নেতৃত্ব সেখানে সফল হতে পারেনি। বিপরীতে নানা শক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকার নিজেকে অনেকটা স্থিতির মধ্যে নিয়ে আসে। এই পর্বে আওয়ামী লীগ নেত্রী অনেক বেশি দূরদর্শিতা দিয়ে উন্নয়নের নীতিনির্ধারণ করেন এবং নানা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যান।
আওয়ামী লীগের টার্গেট ছিল উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দলটিকে পরবর্তী নির্বাচনেও বিজয়ী হয়ে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ যতটা কৌশলী পথে হাঁটতে থাকে, বিএনপি ততটাই খুঁজতে থাকে বিভ্রান্ত রাজনীতির পথ। অনেকের মতে, এ সময় বিএনপি বন্দি হয়ে পড়েছিল জামায়াতের অক্টোপাস বেষ্টনীতে। যে কারণে ২০১৪-এর নির্বাচনে যাওয়ার আগে দল সুসংগঠিত করে জনমত গঠনের কোনো চেষ্টা বিএনপি করেনি। তার বদলে জামায়াতের সঙ্গী হয়ে নির্বাচনে না গিয়ে নির্বাচন ঠেকানোর কথা বলে দেশজুড়ে অরাজতকা তৈরি করতে চাইল। বোঝা উচিত ছিল, সে সময়ের বাস্তবতায় এ পথে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করা যাবে না। উল্টো লাগাতার হরতাল-অবরোধের ডাকের ভেতর ঘটতে থাকল নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। পেট্রলবোমায় পুড়ে মরতে থাকল নিরীহ মানুষ। যদিও এখন অনেক বিএনপি নেতা বলতে চান- এসবের দায় তাদের নয়, সব সরকারের ষড়যন্ত্র। কিন্তু ভুক্তভোগী মানুষকে বিশ্বাস করানো কঠিন হবে একথা। বিএনপির যদি আত্মবিশ্বাস থাকত তবে সে সময় ঝলসানো মানুষকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পারতেন বিএনপি নেতারা। কিন্তু তাদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর এসবের ভেতর থেকে আওয়ামী লীগের কুশলী নেতারা বিএনপি-জামায়াতকে বিপন্ন করার জন্য সব রসদ পেয়ে যান। এখন প্রতিদিনই এসব রসদ ব্যবহার হচ্ছে। আর কৃশকায় হয়ে পড়ছে বিএনপি।
দেশে সার্বিকভাবে গত দুই বছরে অনেক ইতিবাচক ভূমিকায় আসতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। উন্নয়নের জন্য যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য তা স্পষ্ট হল। স্বেচ্ছায় না হলেও রাজনৈতিক ভুলের খেসারত দিতে বিগত দু’বছরে বিএনপি ইতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটে দল সুসংগঠিত করায় ভূমিকা রাখতে পারেনি।
এমন বাস্তবতায় উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় অনেকটা পথ হাঁটতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। সুতরাং বলা যায়, এ দুই বছরে সরকারের সাফল্যের ভাণ্ডারে একটি জোয়ার ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মানুষের যাপিত জীবনকে অনেকটাই সহজ করেছে। বিশ্বব্যাংক পিছিয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো একটি বিশাল প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল আগেই। এ দুই বছরে তা বাস্তবায়নের পথে পা বাড়িয়েছে। এ সাফল্যকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও যাত্রা শুরু হয়েছে এ বছর। এ দুই বছরে শেখ হাসিনা সরকার সড়কপথের অনেক উন্নয়নের পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। বেশ ক’টি মহাসড়ক চার লেন হওয়ার পথে। কোনো কোনোটি এর মধ্যে বাস্তবায়িতও হয়ে গেছে। সরকারের আগের মেয়াদ এবং বর্তমান দু’বছরে অনেক উড়াল সেতু নির্মিত হয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় বেশ ক’জন প্রথম সারির অপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এ দুই বছরে বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখিয়েছে।
কিন্তু এ দু’বছর নানা ধরনের আনুকূল্য থাকার পরও কিছু জরুরি বিষয়ে সরকার কেন যে দৃষ্টি দেয়া থেকে বিরত থাকল ঠিক বোঝা গেল না। আমাদের মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথমবার আওয়ামী লীগ এবং সরকার অনেক বেশি শক্ত মাটির ওপর দাঁড়াতে পেরেছে। এমন অবস্থায় ইতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটে দলকে জনসমর্থনের উচ্চাসনে বসানোর কথা। কিন্তু এ জায়গায় খুব গতানুগতিক হয়ে গেল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। আশা ছিল, এ বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান চালাবে। দুর্বৃত্তদের দল থেকে বের করে দিয়ে এসব সংগঠনের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু এমন পথে হাঁটতে দেখা গেল না। অভিজ্ঞ অনেকের ধারণা, আজকাল রাজনৈতিক দলগুলো নাকি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক যুদ্ধে সন্ত্রাসীর প্রয়োজন থাকে বলে তাদের পেলে-পুষে রাখে। হয়তো গণতান্ত্রিক চেতনায় দৃঢ় থাকলে গণশক্তির ওপরই ভরসা করতে পারতেন তারা।
সরকার দৃশ্যত সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। প্রতি সেক্টরে ঘুষ-দুর্নীতি সাড়ম্বরেই চলছে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা বহাল থাকায় সরকার জনআকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারছে না। এবারই আওয়ামী লীগ বন্ধু বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারত। এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত আর পাকিস্তানপন্থী বিএনপির নেতা-নেত্রী বাদ দিলে বৃহত্তর মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন। এদের অধিকাংশের নৈতিক সমর্থন থাকে আওয়ামী লীগের প্রতি। আবার আপাত দলনিরপেক্ষ অনেক মেধাবী মানুষ পারিবারিক প্রেক্ষাপটে এবং আদর্শিক জায়গায় আওয়ামী লীগের সরাসরি সমর্থক। এ সময়ে আওয়ামী লীগ এদের সম্মানিত করে ঘনিষ্ঠভাবে কাছে টানতে পারত। এতে দলের শক্তি নিশ্চয়ই অনেক বৃদ্ধি পেত। কিন্তু দলীয়করণের অন্ধ মোহ থেকে আওয়ামী লীগ দলকে অনেকটা সংকুচিত করে ফেলেছে।
এ দুই বছরে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা উন্নয়নের কথা বলে যতটা দামামা বাজিয়েছে সরকার, শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে আঘাত করেছে এর চেয়ে বেশি। শিক্ষানীতির বাইরে থেকে কোমলমতি শিশুদের পিইসি নামের পরীক্ষায় এনে আত্মবিকাশের শুরুতে তাদের কাছ থেকে শৈশব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই সূত্রে কোচিং ব্যবসা আর গাইড ব্যবসাকে পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার নামে এসব শিশুকে কোথাও কোথাও পরীক্ষায় নকল করার প্রথম পাঠ দেয়া হচ্ছে। জীবনের শুরুতে এসব শিশু শিক্ষার্থীর সুস্থ বিকাশের পথ বন্ধ করে দেয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না।
এ দু’বছরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশ অনেকটাই নষ্ট করে দিয়েছে। দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ করতে গিয়ে মেধাবীরা ছিটকে পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। নিষ্ঠাবান শিক্ষক গবেষকরাও অস্বস্তির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। অথচ সুস্থ রাজনীতির পথে হাঁটতে পারলে আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল পরিবেশ তৈরির কৃতিত্ব দেখাতে পারত।
এ বছরে সরকারকে একটি বড় ধূম্রজালে ফেলে দিয়েছে পে-কমিশন ও এর রিপোর্ট। একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পে-স্কেল ঘোষিত হওয়ার পরও সরকার এর ভেতর থেকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারল না। উল্টো ডেকে আনল নানা সংকট। এই একটি জায়গায় এসে প্রধানমন্ত্রী কোনো কুচক্রী মহলের হাতে যেন বন্দি হয়ে গেলেন! এতসব কায়দা-কানুন না করে মানুষের কাছে সাদরে গৃহীত পুরনো ধারাক্রমে স্কেল সাজালে কী ক্ষতি হতো? এর বদলে গোটাতিনেক সুপার স্কেল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কেল অবনয়ন করে ক্ষোভ বাড়ানো হয়েছে। টাইম স্কেল এবং সিলেকশন গ্রেডের সুবিধা অকারণেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। ক্যাডার সার্ভিসের একটি পক্ষ ছাড়া সবাইকে খেপিয়ে তোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, ২৬টি ক্যাডার সবাইকে আন্দোলনের মাঠে নামানোর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। অথচ এ অবস্থা সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ চিন্তার পরিচয় এর আগে অনেকবার পাওয়া গেছে। পে-স্কেল সংক্রান্ত জটিলতায় এই প্রাজ্ঞ চিন্তার প্রতিফলন এখনও দেখা যাচ্ছে না। এটি তো স্পষ্ট, সরকারকে জটিলতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে কোনো এক পক্ষ। পাকিস্তান আমল থেকে এ কথাটি প্রচলিত ছিল- আমলাতন্ত্র চাইলে কোনো সরকারকে ডোবাতে পারে আবার ভাসাতেও পারে। সাম্প্রতিক অতীতে এ দেশের আমলাতন্ত্রকে অতটা নেতিবাচক অবস্থানে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা যায়নি। কে জানে গোকুলে কোনো পক্ষ বেড়ে উঠল কিনা! সরকারের পকেটে থেকে পকেট কাটলে সেই ঘূণপোকা থেকে রেহাই পাওয়াটা কঠিন।
আওয়ামী লীগ সরকার এখন প্রকৃতপক্ষেই তেমন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে নেই। এমন বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনে দেয়ার কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারই দেখাতে পারে। আমরা আশা করব, সরকার তৃতীবর্ষে পা ফেলে দেশকে একটি যৌক্তিক ও নৈতিক পথে চলার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবে। বক্তৃতা আর রাজনৈতিক কূটকৌশলে নয়, জনআস্থা আসে গণমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.