সমকালীন প্রসঙ্গ-দুর্নীতি ও সন্ত্রাস বন্ধের উপায় নেই by বদরুদ্দীন উমর

আওয়ামী লীগ জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলছেন যে, তাদের আমলে কোনো দুর্নীতি হয়নি! তাদের অর্থমন্ত্রী বলছেন, সরকারের শীর্ষদেশে কিছু দুর্নীতিবাজ আছে! একই দলের, একই মন্ত্রিসভার দু'জনের মুখে এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য যে বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তা হলো, দল ও মন্ত্রিসভার মধ্যে চিন্তার ঐক্য বলতে যা বোঝায় সেটা আওয়ামী লীগওয়ালাদের মধ্যে নেই। এটা তাদের নিজেদের জন্য কোনো সুখকর অবস্থান নয়।
কিন্তু এর থেকে বড় কথা, এটা জনগণের জন্যও রীতিমতো বিপজ্জনক। কারণ, এর থেকে বোঝার উপায় নেই কে কোন ক্ষেত্রে কী নীতিনির্ধারণ করছে, তাদের কোন নীতি কে কার্যকর করবে ও কীভাবে করবে! বাস্তবত এটাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোতে এখন প্রতিদিনই বড়মাপের নানা আর্থিক দুর্নীতির সংবাদ ছাপা হয়। এসব দুর্নীতির সঙ্গে যে সরকারি দল ও সরকারি লোকেরা সম্পর্কিত এ বিষয়টিও রিপোর্টগুলো থেকে ভালোভাবেই বোঝা যায়। শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, খুন, জখম ইত্যাদি সন্ত্রাসী কাজের বেলাতেও একই কথা। বিপুল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ জড়িত থাকে। কিন্তু এটা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সবসময়ই বলেন যে, তারা ও তাদের কোনো অঙ্গ সংগঠনের লোকই সন্ত্রাস করে না! ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এবং পুলিশের সহায়তার কারণে প্রায়ই অনেক বড় আকারে ও মারাত্মকভাবে সন্ত্রাস করলেও প্রধানমন্ত্রী ধুয়োর মতো করে বলে থাকেন যে, তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসের কোনো সম্পর্ক নেই! চোখের ওপর ঘটনা ঘটলেও তার ওই এক কথা। এ কথার কোনো নড়চড় নেই। মাত্র কয়েকদিন আগে রাস্তার লোকজন, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের ক্যামেরাম্যানদের সামনে প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলেও এ কথা বলতে প্রধানমন্ত্রীর অসুবিধা হয় না যে, তারা ছাত্রলীগের কেউ নয়। তারা হলো জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের লোক! যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্যই তারা এ কাজ করেছে! তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একই কথা বলেন আরও জোর গলায়। দেশের লোককে একেবারে গাধা মনে না করলে এবং অবাস্তবভাবে বেপরোয়া না হয়ে এভাবে উল্টো কথা একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত কারও পক্ষে বলা যে সম্ভব এটা ভাবাই যায় না। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এ ধরনের খেলো (ঝরষষু) কথা বলতে প্রধানমন্ত্রী অভ্যস্ত। এ কারণে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে এ কথা বলতে তার কোনো অসুবিধা হয় নি যে, এই ধরনের হত্যা ঠেকানোর জন্য সকলের বেডরুম পাহারা দেওয়া সরকারের কাজ নয়। দেশে ব্যাপকভাবে খুন-খারাবি বন্ধের জন্য বেডরুম পাহারা দেওয়ার প্রয়োজন হবে কেন? বিশ্বের দেশে দেশে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধ বা কম রাখার জন্য কি তারা সকলের বেডরুম পাহারা দেয়, না শাসন ব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালনা করে যাতে এটা ঘটার কোনো পরিস্থিতি তাদের দেশে থাকে না। প্রধানমন্ত্রীর গদিতে সমাসীন ব্যক্তির যদি এই জ্ঞান না থাকে, তাহলে তাদের হাতে দেশের জনগণ নিরাপদ থাকতে পারে কীভাবে? বাংলাদেশের জনগণের জীবনে নিরাপত্তা বলে যে কিছু নেই এর কারণ কি এর মধ্যেই নিহিত নেই?
২৩ ডিসেম্বর ঢাকার ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার পত্রিকায় বিকাশ কুমার বিশ্বাস নামে এক মারাত্মক ক্রিমিনালের হঠাৎ মুক্তির সংবাদ ছাপা হওয়ার সঙ্গে কীভাবে সরকারি লোকজন এই কাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত সেটাও বলা হয়েছে। কয়েকদিন আগে এ বিষয়ে রিপোর্ট সকল সংবাদপত্রেই ছাপা হয়েছিল। কিন্তু উপরোক্ত পত্রিকা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে এই ক্রিমিনালের মুক্তির ব্যবস্থা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সূত্রের উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়েছে যে, পুলিশ এবং আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে নিযুক্ত অন্যান্য এজেন্সিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই ক্রিমিনালের মুক্তির ব্যপারে কোনো বাধা সৃষ্টি না করতে! শুধু তাই নয়, এই একই সূত্র অনুযায়ী বলা হয়েছে যে, একজন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা বিকাশের মুক্তির ব্যবস্থা ও তদারকি করেছেন! পুলিশ এবং অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে কোন্ মন্ত্রী এই নির্দেশ দিতে পারেন এটা বোঝার অসুবিধা কারও নেই। তাছাড়া আওয়ামী লীগের যে প্রভাবশালী নেতার কথা বলা হয়েছে তিনিই-বা কে? দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনরা অনেকে আত্মীয়তার সুবাদেই দলের মধ্যে খুব প্রভাবশালী। তাছাড়া এত বড় একটা বিষয় যার সঙ্গে একজন মন্ত্রী জড়িত আছেন সেটা যে প্রধানমন্ত্রীর অবগতির বাইরে থাকবে এটাও ভাবার উপায় নেই। পত্রপত্রিকার রিপোর্টে আরও বলা হচ্ছে, শুধু বিকাশ বিশ্বাসই নয়, আরও অনেক ক্রিমিনাল এভাবে জেল থেকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বড় বড় সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতির কোনো যথাযথ তদন্ত, বিচার ও শাস্তি হচ্ছে না। উচ্চ পর্যায়ের সরকারি লোকজন যখন এগুলোর সঙ্গে জড়িত, তখন এটাই স্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, যেখানে বড়মাপের জাতীয় স্বার্থ জড়িত, সেখানেও সরকারি লোকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, অপরাধী হিসেবে তাদের চিহ্নিতকরণ ঠেকানোর জন্য, সরকার যে কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে এটা বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতু অর্থায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্নীতির ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এটা কি চিন্তা করা যায় যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়া এ কাজ হচ্ছে?
অর্থমন্ত্রী শুধু দু'একদিন আগেই নয়, ইতিপূর্বে কয়েকবারই বলেছেন, দুর্নীতির জন্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকদিন আগে তিনি বলেছেন, এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও অর্থমন্ত্রী থাকার কোনো ইচ্ছা তার আর নেই। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কতটুকু সেটা স্বতন্ত্র প্রশ্ন; কিন্তু সাধের মন্ত্রিত্ব সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী এই বক্তব্যের কারণ কী? তিনি যেভাবে এটা বলেছেন, তাতে কি মনে হয় বার্ধক্যের কথা চিন্তা করে তিনি এটা বলেছেন, না দুর্নীতিবাজদের হুকুম মান্য করতে করতে ক্লান্ত ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে তা বলছেন? অর্থমন্ত্রীর যখন এই অবস্থা তখন গত চার বছরে তাদের আমলে তাদের দ্বারা কোনো দুর্নীতি হয়নি_ এই মর্মে প্রধানমন্ত্রীর সদম্ভ ঘোষণা হাস্যকর ছাড়া আর কী?
২৪.১২.২০১২

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

No comments

Powered by Blogger.