খালেদা জিয়া: প্রতিরোধের এক জীবন
১৭ কোটি মানুষের দেশে, যেখানে ২৩শে নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল, সেখানে টিপুর এই প্ল্যাকার্ডের ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালের গেটের বিপরীত পাশে ফুটপাথে দিন কাটাতে থাকেন। অঙ্গীকার করেন সুস্থতার খবর না পাওয়া পর্যন্ত সরে যাবেন না। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া আমার মায়ের মতো। তিনি গণতন্ত্রের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করেছেন। আমার একমাত্র দোয়া- আল্লাহ যেন তাকে আসন্ন নির্বাচন দেখা পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু তা আর হলো না। ৩০শে ডিসেম্বর ভোরে, ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ফেসবুকে দেয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি বলেছে, আমাদের প্রিয় জাতীয় নেত্রী আর নেই। তিনি আজ সকাল ৬টায় আমাদের ছেড়ে গেছেন।
তার আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে। তখন খালেদার মৃত্যু এক দীর্ঘ তিন দশকব্যাপী অধ্যায়ের সমাপ্তি টানে। এদেশের এই দুই নেত্রীকে ‘বেগম জুটি’ নামে ডাকা হতো এবং তারা বাংলাদেশের রাজনীতিকে শাসন করেছেন। তারা দু’জনই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছেন। যদিও হাসিনার মতো বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনপীড়নের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠেনি। তবুও তিনি ছিলেন শক্তিধর এক চরিত্র। সংসদ বর্জন, দীর্ঘ আন্দোলন, আপসহীন ভঙ্গি- তাকে যেমন অনুগত সমর্থন দিয়েছে।
উত্থান
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ১৫ই আগস্ট, দিনাজপুরে। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার মূলত ফেনীর মানুষ। পরবর্তীতে তিনি জলপাইগুড়িতে চা ব্যবসা করার পর পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এদেশ হয় পূর্ব পাকিস্তান। পরে স্বাধীনতা অর্জন করে নাম হয় বাংলাদেশ। খালেদা দিনাজপুরেই শৈশব কাটান, দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন।
তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় তার ইচ্ছা থেকে নয়, বরং এক অস্থির পরিস্থিতির কারণে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে ব্যর্থ সামরিক বিদ্রোহে তার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং প্রতিষ্ঠাতা ছাড়া বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও, বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করতেন, কেবল খালেদাই বিভিন্ন পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন। এর মধ্যেই ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ জারি করেন। এই অস্থির সময়েই খালেদার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়- একজন বেসামরিক চ্যালেঞ্জার হিসেবে।
তিনি ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর তিনি তিন দফা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। দীর্ঘমেয়াদে শেখ হাসিনার সঙ্গে সমান্তরালে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। তার ব্যক্তিজীবনও ছিল বেদনাময়। বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালে নির্বাসনে চলে যান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মারা যান। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তিনি কারাবন্দি হন। পরবর্তীতে অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতা তার জীবনকে গ্রাস করে। তারেক অবশেষে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগের জীবন
যারা তাকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁকে বর্ণনা করেন- ভদ্র, নীরব, সংযত মানুষ হিসেবে। তিনি ১৯৬০ সালে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। তখন তার বয়স ছিল প্রায় ১৫। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর জিয়া জাতীয় নেতায় পরিণত হন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত তারা বসবাস করতেন ঢাকা সেনানিবাসের ৬, মঈনুল রোডের সরকারি বাসায়। তখনকার এডিসি কর্নেল হারুনুর রশীদ খান স্মরণ করেন, তিনি নিজেই অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন। পরিবারের সবকিছু দেখতেন। আমি কখনও তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখিনি।
কিন্তু সবকিছু বদলে যায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে। স্বামীকে হত্যার খবর শুনে তিনি নিস্তব্ধ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। কর্নেল খান বলেন- তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে সরকার ওই বাড়িটি তাকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকার তাকে উচ্ছেদ করে।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া
১৯৮০-এর দশকে খালেদা ও শেখ হাসিনার দল যৌথভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চালায়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি তার নেতৃত্বে নির্বাচন বর্জন করে। এর ফলে তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে জনমনে জায়গা করে নেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তার একের পর এক গৃহবন্দি হওয়া তার ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে এবং খালেদা দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
শাসন, সাফল্য ও বিতর্ক
তিনি তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনা করেন। ১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদী সরকার ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তার সরকার ক্ষমতায় ছিল। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, গার্মেন্টস খাতের বিস্তার, মেয়েশিশুদের শিক্ষায় অগ্রগতি, তুলনামূলক মুক্ত গণমাধ্যম- উল্লেখযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। সে সময় বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ‘বাংলাদেশ এশিয়ার পরবর্তী টাইগার অর্থনীতি’।
‘গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার’
তার সহকর্মীরা বলেন, তিনি কখনও নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি দেশ ছাড়তে পারতেন। কিন্তু তা করেননি, বরং কারাবাস, মামলা, স্বাস্থ্যঝুঁকি- সবকিছু সয়ে গেছেন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা পতনের পর মুক্তি পেয়ে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে কর্মীদের আহ্বান জানান, যা অনেককে বিস্মিত করে। ৭৭ বছর বয়সী নাজিম উদ্দিন বলেন, দুই নেত্রীই দেশ শাসন করেছেন। তবে আমার মতে খালেদা ভালো করেছেন।

No comments