তালেবান শাসিত আফগানিস্তান রাষ্ট্রহীন একক্ষমতা ব্যবস্থা
এই পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে ঐক্য এনেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তৈরি করেছে ভঙ্গুরতা। কেন্দ্রীভবন প্রকাশ্য বিরোধিতা কমিয়েছে ঠিকই। কিন্তু নীতি উদ্ভাবনকে করে তুলেছে পঙ্গু। মন্ত্রণালয়গুলো নীতিনির্মাতা নয়, বরং আদেশ বাস্তবায়নকারী দপ্তর। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এমন এক পরিবেশে বন্দি, যেখানে বিতর্ক মানে অবাধ্যতা, আর ভিন্নমত মানে ধর্মচ্যুতি। ফলে শাসনব্যবস্থা হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল, কাঠিন্যপূর্ণ ও অস্বচ্ছ। তালেবানের অভ্যন্তরীণ কাঠামো এই চিত্রকে আরও জটিল করে। উপরিতলে ঐক্যের প্রদর্শন থাকলেও, বাস্তবে ক্ষমতা বিভক্ত। কান্দাহারকেন্দ্রিক আলেমেরা আদর্শিক দিকনির্দেশনা দেন, অন্যদিকে হাক্কানি নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা ইস্যুতে স্বাধীন প্রভাব বজায় রেখেছে। এতে আপাত ভারসাম্য রক্ষা সম্ভব হলেও, একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে দ্বৈত ব্যবস্থা- কাগজে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, বাস্তবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। উত্তরাধিকারী ঠিক করার সুস্পষ্ট কাঠামো না থাকায় অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব টিকে থাকে যতদিন সেই ব্যক্তি আছেন। কিন্তু পরিবর্তনের মুহূর্তে এমন আন্দোলনগুলোই সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়।
তালেবান শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখা যায় নিজেদের ভেতর মতভিন্নতা মোকাবিলায়। ধর্মীয় আলেম ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষাবিষয়ক নীতিতে প্রশ্ন তুললে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এটি শুধু রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নয়; বরং ধর্মীয় ব্যাখ্যার গ্রহণযোগ্য পরিসরকেও সংকুচিত করা। এভাবে অভ্যন্তরীণ ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক অপরাধে রূপ নিলে আফগান ধর্মীয় ঐতিহ্যের বহুত্ববাদই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। সবচেয়ে বড় আদর্শিক কার্যকারিতা সংঘর্ষ ঘটছে শিক্ষা খাতে। শিক্ষাকে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনে নেয়া হয়েছে। কারণ তালেবান বোঝে, ক্ষমতা গড়ে ওঠে শুধু ভূখণ্ড নয়, ধারণা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও। তবে পাঠ্যসূচি থেকে নাগরিক, আইন, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান সরিয়ে ফেলা হলো এক ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে ভবিষ্যৎ প্রশাসন, বাজার ও কূটনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাই ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। মেয়েদের শিক্ষাবঞ্চিত রাখা শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংকট। দুর্বল অর্থনীতির দেশে উৎপাদনশক্তির এমন ক্ষতি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকেই ক্ষয় করে। এটি তালেবানের অভ্যন্তরেও মতভেদের রেখা তৈরি করেছে- আদর্শিক কঠোরতা ও সামাজিক বাস্তবতার সংঘাতে।

No comments